Published : 07 Oct 2025, 11:05 PM
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের সংরক্ষিত আসন নিয়ে যে কাণ্ডকারখানা চলছে, তা নিঃসন্দেহে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ‘শীর্ষ নাটক’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখানে নারীর ক্ষমতায়নের ধারণা বিশ্বমানের নয়, বরং দলীয় মনোরঞ্জনের একটা নির্দিষ্ট মডেল মাত্র। এই মডেলের প্রথম শর্ত, দলের বড় ভাই-আপাদের হাসিমুখ দেখা। দ্বিতীয় শর্ত, মনোনয়নপত্র পাওয়া, যা একপ্রকার ভিআইপি পাসের মতো, সরাসরি সংসদের ভেতরে ঢুকে পড়ার টিকেট।
সংসদে ঢোকার পর কর্মপরিকল্পনা খুব সহজ। যেমন:
ধাপ ১: মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে দলের চেয়ারম্যান, সভাপতি বা নেতার সুস্বাস্থ্য কামনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেওয়া।
ধাপ ২: মাঝেমধ্যে দলের সিদ্ধান্তে হাত তুলে ‘জ্বি’ বলা—কোন বিল, প্রস্তাব, নীতি কিছুই জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই।
ধাপ ৩: টিভি টকশোতে গিয়ে প্রমাণ করা যে সংরক্ষিত আসন মানে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’, যদিও বাস্তবে জনগণের ভোট, জবাবদিহি বা নিজের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।
জনগণের ভোট বা দায়বদ্ধতা নিয়ে কথা উঠলেই বলা হয়, “এগুলো পশ্চিমা ষড়যন্ত্র বা বিদেশি এজেন্ডা!” ফলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণটা পরিণত হয়েছে রঙিন মঞ্চসজ্জার মতো—যেখানে নায়িকা বদলায়, কিন্তু চিত্রনাট্য একই থাকে। অথবা বলা যায়, এটা রাজনীতির পুতুলনাচ: নারীরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু সুতো টানছেন অন্য কেউ। হাসি, তালি, বক্তৃতা—সবকিছু অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। নিজের কণ্ঠ নয়, পুরুষতান্ত্রিক চিত্রনাট্যের সংলাপই তাদের মুখে।
বাহাত্তরের সংবিধানে নারী আসন সংরক্ষণের শুরু হয়েছিল যৌক্তিক কারণেই। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতি ছিল প্রায় শূন্য। তখন যুক্তি ছিল, শুরুতে কিছু জায়গা আলাদা করে দিতে হবে, যাতে নারীরা রাজনীতির মঞ্চে পা রাখতে পারে। কিন্তু ৫০ বছর পরও আমরা একই যুক্তি দিচ্ছি, শুধু ফরম্যাট বদলেছে। এখন সরাসরি ভোট তো দূরের কথা, আসন বিতরণ হয় দলীয় অফিসে—যেন লটারি বা পুরস্কার। নারীরা জনগণের প্রতিনিধি হয়ে যান না, বরং দলের ‘বিশ্বস্ত মুখ’ হয়ে যান—নেতার দান নিয়ে সংসদে প্রবেশ করেন। একটা রিপোর্ট বলছে, সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে ১৪শতাংশ চাকরিজীবী, বাকিদের মধ্যে অল্প কিছু শিক্ষক, আইনজীবী বা কৃষক। প্রশ্ন ওঠে, তারা কি সত্যিই জনসমস্যা সমাধানের জন্য এসেছেন, নাকি দলীয় নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের রিটার্ন তুলতে?
ব্যবসায়ীরা রাজনীতিকে ব্যবসা সম্প্রসারণের হাতিয়ার বানান, চাকরিজীবীরা দলীয় আনুগত্য নিয়ে বেতনভোগীর মনোভাবে সংসদে বসেন। সম্প্রতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রস্তাব করেছে, আসন্ন নির্বাচনে কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে। শুনে মনে হয়, নারী প্রতিনিধিত্বের পথ খুলছে। কিন্তু বাস্তবে এগুলোও ভোটবিহীন, দলীয় মনোনয়নভিত্তিক। পাঁচ শতাংশ নারীকে জায়গা দিয়ে কি আমরা গণতন্ত্রের মহান কাজ করে ফেললাম? নাকি এটা রাজনৈতিক ট্রফির শেলফে নারীদের সাজানোর আরেকটা কৌশল?
রাজনৈতিক দলগুলো যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাতেও আগামী জাতীয় সংসদের পাঁচ শতাংশ আসনে সরাসরি নারী প্রার্থীদের মনোনয়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে ইসলামপন্থী দলগুলোর অনীহা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংসদের ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের নিশ্চয়তা দেওয়ার সুপারিশ করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। নারী অধিকারকর্মীরাও প্রায় একই ধরনের দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু ঐকমত্যের আলোচনায় এই দাবি পূরণ না হওয়ায়, এমনকি পাঁচ শতাংশ আসনেও সরাসরি নারী মনোনয়নের প্রস্তাবে কিছু ইসলামপন্থী দলের বিরোধিতা নারী অধিকারকর্মীদের মধ্যে হতাশা জাগিয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়ে সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের আলাদা দুটি প্রস্তাব ছিল। সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে ১০০ করার পাশাপাশি সরাসরি ভোটের প্রস্তাব করেছিল দুই কমিশনই। ঐকমত্যের সংলাপে ওই দুই প্রস্তাবের কোনোটিতেই একমত হতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো।
সংসদে ১০০ আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এতে নারী রাজনৈতিক অধিকার পরাজিত হয়েছে। কেউ জয়ী হয়নি। পুরুষতন্ত্র জয়ী হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনায় পাঁচবার উত্থাপন হলেও ১০০ আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যাপারে ঐকমত্য হয়নি।”
সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রে সংখ্যা আছে, কিন্তু ক্ষমতা নেই—যেন নারীদের কেক কাটার অনুষ্ঠানে ডাকা হয়, সিদ্ধান্তের টেবিলে নয়। প্রথম ধাপেই শেখানো হয়, বড় মন্ত্রীর চারপাশে জড়ো হয়ে ছবি তোলাই বড় কাজ। তাই তারা রাজনীতির শোপিস হবেন না কেন!
রোজাবেথ মস ক্যান্টারের ‘টোকেনিজম’ তত্ত্ব এখানে দারুণভাবে মিলে যায়। এই তত্ত্ব বলে, যখন কোনো কাঠামো সংখ্যালঘুকে সীমিত জায়গা দেয়, তাদের তাদের মূলত সাজসজ্জার জন্য ব্যবহার করে, নীতি তৈরিতে নয়। বাংলাদেশের সংরক্ষিত আসন প্রায় সেই উদাহরণ—সংখ্যা আছে, সিদ্ধান্তের ক্ষমতা নেই।
ইসলামের শুরা (পরামর্শ সভা) ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের জন্য ন্যায়, দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে নারীরা সরাসরি রাজনৈতিক পরামর্শ দিতেন—যেমন হুদায়বিয়ার চুক্তিতে উম্মে সালমা (রা.)-এর ভূমিকা। সেখানে ‘উপহারস্বরূপ আসন’ বা ‘দানভিত্তিক নেতৃত্ব’-এর ধারণা ছিল না—সবাই যোগ্যতা ও অবদানের ভিত্তিতে নেতৃত্ব পেতেন। আজকের সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা ওই ইসলামী ন্যায় থেকেও অনেক দূরে—জনম্যান্ডেট নেই, দলীয় মনোনয়নই একমাত্র টিকেট।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ৩৩ শতাংশ নারীকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করার প্রস্তাবে অনেকের চোখে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। মহিলা পরিষদও বলেছে, সংরক্ষিত আসন থাকুক, কিন্তু সরাসরি ভোটে। যুক্তি স্পষ্ট, এতে এতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) আর এসডিজি-২০৩০-এর লিঙ্গ সমতার লক্ষ্য পূরণ হবে। শুনতে চমৎকার—এক ঢিলে দুই পাখি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো একসঙ্গে ঘোষণা দিল, “এটা বাস্তবসম্মত নয়।” বাংলাদেশি রাজনীতিতে এই কোড মানে “এতে আমাদের নিয়ন্ত্রণ কমবে।”
কারণ সরাসরি ভোট মানে নারী প্রার্থীরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হবেন, ‘দলীয় চাটুকারিতা’ ছাড়া কাজ করতে হবে—যা দলীয় কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু ইতিহাস ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বলে এ ভয় ভিত্তিহীন।
২০২৪-এর গণআন্দোলনে নারীরা সামনে ছিলেন—প্ল্যাকার্ড হাতে, রোদে পোড়া মুখে, জলকামান সহ্য করে। কিন্তু আন্দোলন শেষে পুরস্কার বিতরণে চিত্র হবে উল্টো—মনোনয়ের জন্য দলীয় অফিসে চক্কর, সিনিয়র নেতাদের সামনে অপেক্ষা এবং শেষে চুপচাপ সংসদে বসা। অনেক নারী এমপির নাম শুনে স্থানীয়রা অবাক হয়েছেন পূর্বে, ভবিষ্যতেও হবেন—“সে তো আমাদের ভোটে আসেনি, কীভাবে সংসদে?” উত্তর সহজ, দলীয় লটারি জিতে। ভোটের ঝামেলা নেই, তাই এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ শূন্য—না প্রচারণা, না সমস্যা শোনা। এলাকাবাসী তাদের দেখে এমনভাবে তাকায়, যেন কেউ হঠাৎ সিনেমার পর্দা থেকে নেমে বাস্তবে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে।
সংরক্ষিত আসনের এমপিদের সংসদীয় কাজ ‘অফিস টাইম’-এর মতো—সংসদে ঢোকা, দলের ভোট দেওয়া, প্রশংসা করা, বাকি সময় নীরবতা। কোনো বিল নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঝুঁকিপূর্ণ—দলীয় বিরক্তি ডেকে আনা। আমরা আসন সংরক্ষণকে নারীর ক্ষমতায়ন বলি, অথচ এর প্রকৃত রূপ হলো দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার। ভোটবিহীন আসন নারীকে ক্ষমতা দেয় না, বরং পুরুষতন্ত্রকে মজবুত করে। রাজনৈতিক দলগুলো যেন নারীদের বলে দেয়, “তোমরা আমাদের সঙ্গে থাকো, হাসিমুখে করতালি দাও, আমরা তোমাদের সংসদে বসিয়ে দেব—তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের কাছেই থাকবে।”
এই ব্যবস্থায় নারী রাজনীতিকেরা ‘পটভূমির সাজসজ্জা’—মঞ্চে উপস্থিত, কিন্তু কণ্ঠ পুরুষের স্ক্রিপ্টে বাঁধা। তারা তালি দেবেন, ঘোষণাপত্রের প্রশংসা করবেন, ‘নারী অগ্রগতি’ নিয়ে বক্তৃতা দেবেন—যেখানে অগ্রগতি মানে পদ রক্ষা। বিদ্রূপের বিষয়, এই নারীরাই এ সমস্যা নিয়ে চুপ। কারণ তাদের আসন ভোট নয়, দলীয় পাস—প্রশ্ন করা মানে নিজের চেয়ার হারানো। ফলে তারা এই অসম কাঠামোর পক্ষে কথা বলেন, কারণ সেটাই তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের শর্ত।
এভাবে সংরক্ষিত আসন একদিকে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দুর্গকে অক্ষত রাখে, অন্যদিকে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ নামে বিজ্ঞাপন বানায়। মঞ্চে, মাইকে, পোস্টারে নারী—কিন্তু রিমোট পুরুষের গোপন টেবিলে। আমরা ‘শর্টকাট’ বানিয়েছি—ভোট ছাড়া আসন, দলীয় অনুমতিতে। কিন্তু দুনিয়ার অনেক দেশ দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতায়ন মানে করুণা নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তন।
রুয়ান্ডায় সংসদের ৬১ শতাংশ নারী—কোনও ‘দলীয় দয়া’ নিয়ে, ভোটে জিতে আসেন, আইন-বাজেটে ভূমিকা রাখেন। নরওয়েতে দলগুলোতে ৪০ শতাংশ নারী প্রার্থী বাধ্যতামূলক, তারা ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করে। নেপালে এক-তৃতীয়াংশ নারী এমপি বাধ্যতামূলক, অর্ধেকের বেশি সরাসরি নির্বাচিত। তিউনিসিয়ায় প্রার্থী তালিকায় নারী-পুরুষ পালাক্রমে সাজানো, যাতে নারীদের ‘পেছনের বেঞ্চে’ পাঠানোর সুযোগ না থাকে।
আমাদের মডেল একদম উল্টো। এখানে নারীরা ‘দলীয় ব্যাকডোর’ দিয়ে সংসদে প্রবেশ করেন—ক্ষমতায়ন নয়, নির্ভরশীলতাই মুখ্য। সংরক্ষিত আসনকে ‘দলীয় দয়া আসন’ বললে সততা বাড়ে। ভোটবিহীন আসন অনুদান—নারীরা উঠবেন, কিন্তু অন্যের সিঁড়িতে, যেখানে সাইন থাকবে, “তুমি জনগণের নয়, আমাদের প্রতিনিধি।” তাদের ক্ষমতা অনুমতিভিত্তিক, কণ্ঠ স্ক্রিপ্টভিত্তিক, অবস্থান পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক। ম্যান্ডেটবিহীন ক্ষমতা যত চকচকেই হোক, তা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ভাড়া—যার ভাড়াটে নারী রাজনীতিকেরা, আর জমিদার থাকে পুরুষতান্ত্রিক দলীয় কাঠামো।
শেষমেশ, নারীরা মঞ্চে থাকবেন—কিন্তু আলো, সংলাপ, তালির নিয়ন্ত্রণ পেছনের অদৃশ্য হাতে। জনগণ চুপচাপ পুতুলনাচ দেখবে।