ক্যান্সার পেরিয়ে আসা একজন মানুষের উপলব্ধি

‘তোমার নিজের ডাক্তার হতে হবে নিজেকেই এবং জীবনযাপনের নিয়ম সংশোধনের মাধ্যমে প্রকৃতিনির্ভর হয়ে রোগমুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।’

মসিহউদ্দিন শাকের
Published : 4 Feb 2024, 10:22 AM
Updated : 4 Feb 2024, 10:22 AM

মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং অন্যদেরকেও সেভাবে বেঁচে থাকতে সহায়তা করা। এ লক্ষ্য পূরণের জন্যই তার সব কাজকর্ম— শিক্ষা, দীক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ও অর্থনীতি পরিচালিত হতে হবে। এ সত্যটি আমরা অধিকাংশ মানুষ আগে বুঝতে পারি না, অসুস্থ হয়ে নানাভাবে মাশুল দিয়ে বুঝি। অসুখ-বিসুখের কারণগুলোকে মোটাদাগে তিনটি ভাগ করা যায়। প্রথমটি বংশগত, দ্বিতীয়টি পরিবেশগত ও তৃতীয়টি জীবনযাপনের পদ্ধতিগত, যাকে ইংরেজিতে লাইফস্টাইল বলা হয়।

এ তিনটি কারণের মধ্যে আবার একটি সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্কটি এভাবে বলা যায়— রোগ যেন গুলিভর্তি বন্দুক, প্রতিকূল পরিবেশ হচ্ছে এর ট্রিগার এবং ভুল জীবন-যাপন পদ্ধতি হচ্ছে ট্রিগারে চাপ দেওয়া।

প্রথম এবং দ্বিতীয় কারণ দুটোকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামাল দেওয়া যায়, তৃতীয় কারণটি অর্থাৎ জীবন-যাপনের সঠিক পদ্ধতি বা নিয়ম মেনে করা সম্ভব। আমি এখন সে কথাটিই বলব নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে। 

শুরুতে বংশগত অসুখের চিত্রটি তুলে ধরছি। আমার দাদা-নানা দুইজনেই চল্লিশ বছর পেরোতেই মারা যান। মৃত্যুর আগে বছর তিনেক ধরে দাদার গলার ভেতর থেকে রক্ত বের হতো। নিশ্চয়ই তা ক্যান্সার ছিল। তার মৃত্যুতে আমার দাদী তাদের ছয় মাস বয়সী একমাত্র সন্তান আমার বাবাকে কোলে নিয়ে বিধবা হন। আর আমার নানার মৃত্যু হয় স্ট্রোকে। তিনি খুব ভোজনবিলাসী ও মোটাসোটা ছিলেন। তারও একমাত্র সন্তান আমার মা।

ব্রিটিশ আমলে আমার দাদী তার ছেলেকে পড়াশোনা করাতে অনেক কষ্ট করেছিলেন। বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স করে পাকিস্তান আমলে চাকরি করতেন সচিবালয়ে। তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার ছিল গো-মাংস, যা তিনি রোজ প্রচুর পরিমাণে খেতেন। বছরখানেক ব্লাড ক্যান্সারে ভুগে ১৯৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে বাবারও মৃত্যু হয় মাত্র সাড়ে চল্লিশ বছর বয়সে।

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কিন্তু সংসারের একমাত্র উপার্জনশীল সদস্য বাবার মৃত্যুতে আর্থিকভাবে ঢাকায় বাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মা-সহ আমরা চার ভাইবোন গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের দীঘা গ্রামে আমার দাদী প্রায় সারা বছরই থাকতেন ও কিছু জমিজমা দেখাশোনা করতেন। আমার বয়স তখন নয় বছর ও সবেমাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেছি। কিন্তু গ্রামে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই কালাজ্বরে আক্রান্ত হই, যা থেকে সেরে উঠতে বেশ কয়েক মাস লেগে যায়। তখন দেশে কলেরা এবং গুটি বসন্তেরও খুব প্রকোপ ছিল।

যাই হোক, আমি গ্রামের স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর কিশোরগঞ্জ শহরে নানাবাড়িতে থেকে স্কুল পাস করি। তারপর আবার ঢাকায় ফিরে আসা। হোস্টেলে থেকে ঢাকা কলেজে এইচএসসি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যে ডিগ্রিতে পড়ি। এ সময়টা ছিল উত্তাল ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ। পড়াশোনার চাপের পরও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনেও জড়িত হয়ে পড়ি। খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়মই ছিল তখনকার সময়ে আমার জন্য নিয়ম। ফলে ডিওডিনাল আলসারে আক্রান্ত হই।

ছাত্রজীবনের শেষদিকে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে আরও অনিয়ম হয়। আমাশয়েও ভুগি। এরপর বাহাত্তর সালে পড়ালেখার পাট চুকিয়ে স্থপতি হিসেবে কাজ শুরু করি। ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি খুব আকর্ষণ ছিল এবং অষ্টম শ্রেণিতে ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ উপন্যাসটি পড়ার পরে গ্রামে থেকেই ভেবেছিলাম যে, বড় হলে চেষ্টা করব এটির ওপরে একটি সিনেমা বানাতে। পরে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পেছনে এ অনুপ্রেরণাই কাজ করেছিল। সেই আন্দোলনের দাবিগুলোর একটি ছিল— ভালো সিনেমায় সরকারি অনুদান দেওয়ার প্রথা চালু করা। ১৯৭৬ সালে এ দাবিটি পূরণ হয়। সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত চারটি চিত্রনাট্যের একটি ছিল ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’। চাকরি ছেড়ে সিনেমা পরিচালনা করতে যাই। কিন্তু সিনেমা তৈরির জন্য অনুদানের বাইরে যে খরচ লাগে সেটাই মূল ব্যয়ের সিংহভাগ। সেই খরচটা আমাকেই জোগাড় করতে হচ্ছিল। ফলে ছবি শেষ করতে সময় লেগে যায় তিন বছর। এরকম অনিশ্চয়তায় পেটের অসুখগুলোও নানাভাবে ভোগাতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে ছবিটি মুক্তি পেয়ে সে বছরের প্রায় সবগুলো জাতীয় পুরস্কার পায়। আমি ইউরোপের কিছু চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছবিটি নিয়ে কয়েকটি দেশে যাই। একটানা ছয় মাস কাটিয়ে দেশে ফিরি। উৎসবগুলোতে ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ পাঁচটি পুরস্কার পেয়েছিল। কিন্তু নিজ দোষে আমার কপালে জুটেছিল দুর্ভোগ। ওসব দেশে কোমল পানীয়ের সঙ্গে মজাদার ফাস্ট ফুড খেয়ে খেয়ে বাধিয়েছিলাম আরেক রোগ, যার ডাক্তারি নাম ‘আলসারেটিভ কোলাইটিস’ বা বৃহদন্ত্রে ঘা। এর মূল লক্ষণ ছিল দৈনিক ১০ থেকে ১৫ বার মলত্যাগের সঙ্গে রক্তক্ষরণ। সুচিকিৎসা না হলে এটি কোলোন ক্যান্সারে রূপ নেয়। অসুখটির প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা লন্ডনে হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। এ অবস্থাতেই দেশে ফিরে আসি এবং দীর্ঘকাল স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন সত্ত্বেও রোগমুক্ত হতে পারিনি। তখনকার চিকিৎসকরা বলেছিলেন, এ রোগের একমাত্র চিকিৎসা হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বৃহদন্ত্রের আক্রান্ত অংশটুকু কেটে ফেলে দিয়ে তলপেটের একপাশ দিয়ে প্লাস্টিকের নলের মাধ্যমে মলত্যাগের ব্যবস্থা করা। কিন্তু এ পরামর্শে আমি সায় দিতে পারিনি।

অন্যদিকে আমার স্ত্রী জেবুন নেসারও অবস্থা ছিল অনেকটা আমারই মতো শঙ্কাজনক। তার পারিবারিক ইতিহাসেও ছিল স্ট্রোক ও ক্যান্সারের উপস্থিতি। প্রথমবার স্ট্রোক করার সঙ্গে সঙ্গেই তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল। তারও আগে আমার স্ত্রীর মা, নানী এবং নানীর এক চিকিৎসক ভাই ১৯৭৫ সালে খুব অল্পদিনের ব্যবধানে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর কিছুকাল পরে তার এক ভাই, যে ছিল নয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট, সে-ও মারা যায়।

ওদিকে সরকারি চাকরিজীবী বাবার উপার্জন থেকে মায়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসা চলায় আমার স্ত্রীর পরিবারের আর্থিক অবস্থা তখন বেশ নাজুক হয়ে পড়ে। ভাই-বোনদের ভরণপোষণ ও লেখাপড়ার খরচ চালাতে গিয়ে বাবাকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল দেখে সবার বড় সন্তান হিসেবে সে তার লেখাপড়ার ইতি টেনে বাংলাদেশ বিমানে কেবিন ক্রু হিসেবে যোগ দেয়। এর বছর দেড়েক পরেই বাবার মৃত্যু হলে আমার স্ত্রীর আর চাকরি না করে উপায় থাকে না।

এদিকে বিয়ের পরে আমার অসুখটাও মাঝে মাঝে বেড়ে যেত। যা আমার স্ত্রীর উদ্বেগের এক বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অধিকাংশ সময়ে তাকে দেশের বাইরে ডিউটি করতে হতো বলে দুশ্চিন্তা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। মা-বাবাসহ বেশ ক’জন আপনজনের অকাল মৃত্যুর ফলে তার স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল। এক সময়ে তারও পরিপাকতন্ত্রে ডিওডিনাল আলসার দেখা দেয়। তা দ্রুত এতটাই বেড়ে যায় যে, একবার বিদেশে কর্মরত অবস্থাতেই আলসার থেকে রক্তপাত শুরু হয়।

এভাবে চারদিন রক্ত যাওয়ার পরে পঞ্চম দিনে সে মুম্বাই থেকে গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে যাত্রা শুরু করে। এটি ছিল সাড়ে নয় ঘণ্টার ফ্লাইট। ফ্লাইটের শেষদিকে অতিরিক্ত রক্তপাতে দুর্বল হয়ে আমার স্ত্রী বিমানের মধ্যেই পড়ে যায়। ফলে বিমানবন্দরে নামার পরেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত হয় যে, তার পেটে অস্ত্রোপচার করতে হবে। সে সময়েই এথেন্সে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক নিকোলাস জে. লিগিদাকিস অবস্থান করছিলেন। শল্য-চিকিৎসক ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ নিকোলাস সপ্তাহের বেশিরভাগটাই অতি ব্যস্ততার মধ্যে কাটাতেন। এসব দিনগুলোয় তিনি যুক্তরাজ্যসহ অন্য কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করতেন। তবে সপ্তাহান্তের দুটি দিন কাটাতেন নিজ শহর এথেন্সে। নিকোলাসকে দিয়েই আমার স্ত্রীর অস্ত্রোপচার করানোর সিদ্ধান্ত হয় এবং তা সফল হয়। এর পাঁচ বছর পরে বাংলাদেশের প্রথিতযশা চিকিৎসক আজাদ খান আমার স্ত্রীর এ অস্ত্রোপচারটির কথা শুনে বলেছিলেন যে, ‘এটি এত জটিল একটি অপারেশন, যা আমাদের দেশে হাজারে একটি সফল হয়। এ দেশে হলে হয়তো রোগীকে বাঁচানো যেত না।’

অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার স্ত্রীকে নিকোলাস কিছু পরামর্শ দেন। আশ্বাস দেন, তার কথা অনুযায়ী চললে আমার স্ত্রী বাকি জীবন সুস্থ থাকতে পারবে। তবে ছয় মাস পরে আরেকটি অস্ত্রোপচার লাগবে; তা না হলে ক্যান্সার হওয়ার শঙ্কা থাকবে। তখন আমার স্ত্রী আমার অসুখ বিষয়েও তার সঙ্গে কথা বলে। তিনি সব শুনে বলেন, আমিও তার দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী চললে অস্ত্রোপচার ছাড়াই ভালো হতে পারব। তা না হলে আমার অসুখটি ক্যান্সারের দিকে যেতে পারে।

চিকিৎসক নিকোলাস পরামর্শ দেওয়ার সময় আমার স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘তোমার নিজের ডাক্তার নিজেকেই হতে হবে এবং জীবনযাপনের নিয়ম সংশোধনের মাধ্যমে প্রকৃতিনির্ভর হয়ে রোগমুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।’

অথচ এ কথার উল্টোটিই সাধারণত অনেক ডাক্তাররা রোগীদেরকে বলে থাকেন, ‘নিজের ডাক্তার নিজে কখনো হওয়ার চেষ্টা করা যাবে না এবং কেবল প্রচুর ওষুধ খেতে হবে।’

নিকোলাস আমার স্ত্রীকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সহজবোধ্য নিয়মাবলি পড়া এবং সে অনুযায়ী চলার ব্যাপারে উৎসাহ দেন। এরপর থেকে সে দেশে-বিদেশের যেখানেই দৈনিক পত্রিকা, সাময়িকী কিংবা কোনো বইয়ে সহজবোধ্য স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখালেখি দেখত, সেগুলো পড়ত এবং সংগ্রহ করত। তারপর সেই জ্ঞান নিজের ও আমার জীবনে প্রয়োগ করত। এভাবে জীবন-যাপন পদ্ধতিতে অনেক ভুল সংশোধন করে সঠিক জীবনাচরণে অভ্যস্ত হতে হতে আমিও সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলাম।

আমার অবস্থা কতটা সঙ্গীন ছিল তার আরেকটু বর্ণনা না দিলেই নয়। আলসার কোলাইটিসের প্রভাবেই কিনা জানি না, এক সময়ে আমার গলায় টনসিলেও ফোঁড়া হতো। তিনবার সেই ফোঁড়া কাটা হয়েছিল এবং টনসিলটাই কেটে ফেলে দিতে বলা হয়েছিল। আমি ভয়ে রাজি হইনি।

অন্যদিকে বৃহদন্ত্রের ঘা থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণে দেহে হিমোগ্লোবিন কমে গিয়েছিল। চিকিৎসক আমার শরীরে প্রতি মাসে সাত ব্যাগ রক্ত দিতে বলেছিলেন। তিনবার তো বৃহদন্ত্র আংশিক কেটে ফেলার পরামর্শই দেওয়া হয়। কিন্তু এর কোনোটাই করতে হয়নি চিকিৎসক নিকোলাসের দেখানো পথে চলার সুবাদে।

১৯৮৬ সালে আবার লন্ডনে যাই। সেখানকার এক চিকিৎসক বৃহদন্ত্র পরীক্ষা করে জানালেন, আমার কোনো অপারেশন লাগবে বলে মনে হয় না। তার মতে, আমি যেভাবে জীবন-যাপন করছিলাম তা সবদিক থেকে সঠিক। তবে কিছু ওষুধ চালিয়ে যেতে বলেন তিনি। আসলে তখন অজান্তে বা অসাবধানতাবশত কোনো অনিয়মের ফলে রোগের উপসর্গ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে জরুরিভিত্তিতে ডাক্তারের কাছে যেতে হতো। তখন দেখেছি হোমিওপ্যাথি খুব কার্যকর হয়, যদি চিকিৎসক যথেষ্ট অভিজ্ঞ হন। নিকোলাসও এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি এমনকি এ উপমহাদেশে প্রচলিত যোগব্যায়ামকেও অত্যন্ত কার্যকর ও উপকারী বলে মন্তব্য করেছিলেন। আসলে তিনি পৃথিবীর সব মানুষের সুস্থতার জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তাই তিনি ১৯৮৮ সালে খাদ্যনালির ঝুঁকিবিহীন ও মারাত্মক— এ দুই প্রকারেরই ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসার জ্ঞান বিশ্বব্যাপী প্রসারের লক্ষ্যে ক্যান্সারসহ পরিপাকতন্ত্রের যাবতীয় রোগগুলোর চিকিৎসাবিদদের আন্তর্জাতিক সংগঠন International Association of Surgeons, Gastroenterologists and Oncologists (IASCO) প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি প্রতিবছর একটি বৈশ্বিক সম্মেলনের আয়োজন করে যেখানে প্রতিনিধিরা এসব রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবশেষ অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেন। আমরা ডাক্তার নিকোলাসের নির্দেশিত পথে হেঁটে বুঝেছিলাম, শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম আদি কিংবা যথাসম্ভব সবল রাখতে পারলেই সুস্থ থাকা যায়। এটি দেশের প্রতিরক্ষাবাহিনীর মতো, যা শক্তিশালী থাকলে বহিঃশত্রুর আক্রমণ ঠেকানো যায়। তবে আমাদের দেহের শত্রু যে কেবল রোগজীবাণু আকারে বাইরে থেকে এসেই আমাদেরকে কাবু করে— তা নয়। আমাদের ভুল খাদ্যাভ্যাস ও অনিয়ম আমাদেরকে ভেতর থেকেই অসুস্থ করে। দেখা গিয়েছে, খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের বিষয়টি আমাদের সুস্থতার বেলায় শতকরা ৮০ ভাগ এবং ব্যায়াম, কায়িক শ্রম, বিশ্রাম ও মানসিক অবস্থা শতকরা ২০ ভাগ ‍ভূমিকা রাখে। তাই আমি ও আমার স্ত্রী এ বিষয়গুলোতে যত্নবান হয়ে সুস্থ থাকার চেষ্টা করেছি। বিগত চার দশক ধরে অনেকটাই নিরোগ জীবন যাপন করছি।

প্রসঙ্গত একটি ঘটনার উল্লেখ করি। ১৯৯৬ সালে একবার কয়েক মাসের জন্য আমি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় যাই। তখন আমি পুরোপুরি সুস্থ থাকলেও বৃহদন্ত্রে ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করাতে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত এক বন্ধুর পরামর্শে ওখানকার এক হাসপাতালে যাই। কয়েকদিন পরে পরীক্ষার রিপোর্ট আনতে গেলে আমাকে হাসপাতালের ওই বিভাগীয় প্রধানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি তখন ফলাফল সম্পর্কে খানিকটা উদ্বিগ্ন বোধ করছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে বলেন, তিনিও খুব অবাক হয়েছেন আমার বৃহদন্ত্রের অবস্থা দেখে। কারণ ওখানকার ঘা এত ভালোভাবে সেরেছে যে, দেখে মনেই হয়নি ওখানে কখনো ঘা হয়েছিল।

কিন্তু বংশগত প্রবণতা মনে হয় খুব একগুঁয়ে। তা নইলে এরও বিশ বছর পরে আমার মূত্রনালিতে ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ ধরা পড়বে কেন! ২০১৬ সালে ওখানে ছোট একটি টিউমার দেখা গিয়েছিল যা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ফেলে দেওয়া হয়। কোনো কেমোথেরাপি লাগেনি। পরে আর কোনো সমস্যাও হয়নি। তাই ক্যান্সার থেকে রক্ষাপ্রাপ্ত এবং রক্ষা পেতে আগ্রহী সকলের প্রতি আমার আবেদন, সঠিক জীবন-যাপন পদ্ধতি অনুসরণ করুন।

আর এ জন্য যা করতে হবে তা হলো— সকালে ঘুম থেকে উঠে আধা লিটার থেকে ৬৫০ গ্রাম কুসুম গরম পানি খেতে হবে। তারপর ৪৫ মিনিট কিছু খাওয়া যাবে না। এ সময়ে প্রথমে ১০ মিনিট যোগ ব্যায়ামের শবাসনে চিৎ হয়ে এবং আরও ১০ মিনিট উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে হবে। এভাবে খালি পেটে শোওয়ার অভ্যাস দিনের অন্য কোনো এক সময়েও করা ভালো। যাই হোক, শবাসনের পরে হাঁটাহাঁটি এবং হালকা ব্যায়াম এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের যোগব্যায়াম অর্থাৎ প্রাণায়াম করা যেতে পারে। এরপর নাশতায় যতটা সম্ভব ফলমূল ও সবজি খেতে হবে। রান্না করা খাবারে তেল-মশলা কম দেওয়া ভালো। তেল ছাড়া রান্না করা সবচেয়ে ভাল। আমরা তা-ই করি।

তবে এভাবে রান্না করা খাবারও পরিমাণে মোট খাদ্যের ২৫ শতাংশের বেশি না হওয়াই ভাল। বাকি ৭৫ শতাংশ খাদ্য হবে সালাদ জাতীয় কাঁচা সবজি, ফলমূল, বিভিন্ন রকমের বাদাম ও বীজ। কিছু শাক-সবজি রস করেও খাওয়া যেতে পারে।

তাই বলে আমি পুরোপুরি নিরামিষভোজী হতে বলছি না। হতে পারলে ভালো। তা নইলে মাছ, মাংস, ডিম ও ডাল খাওয়া যাবে, যদি কোনো বিশেষ খাবারের বেলায় চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা না থাকে। তবে মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে চারপেয়ে প্রাণীর মাংস না হলেই ভালো। কারণ এতে যে-চর্বি থাকে তা অনেক রোগের কারণ। আর মাংস কিছুটা খেলেও সঙ্গে এর চারগুণ পরিমাণ সবজি খেতে হবে। মাছ এক বেলা— সাধারণত দুপুরে খাওয়া যেতে পারে। চাষের মাছ হলে নিশ্চিত হতে হবে যে তা ট্যানারির বর্জ্যে পুষ্ট নয়। রাতে সবজির নিরামিষ ও সেইসঙ্গে সেদ্ধ ডিম চলতে পারে অল্প পরিমাণে শ্বেতসার খাবারের সহযোগে। কয়েকটি মশলা জাতীয় খাদ্য অবশ্যই নিয়মিত খেতে হবে, যেমন— পেঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচা হলুদ, লবঙ্গ, তেজপাতা ও গোলমরিচ। প্রত্যহ সরতোলা দুধের টক দইও খাওয়া ভালো। তবে একেবারে বাদ দিতে হবে সাদা চিনি ও ময়দার তৈরি খাবার।

সঠিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হলে প্রথমত ৯৫ শতাংশ অসংক্রামক রোগ ঠেকানো যাবে। দ্বিতীয়ত, শরীরের ভেতরের অজানা সামান্য সমস্যাগুলো থাকবে না। তৃতীয়ত, ক্যান্সারের রোগীর রক্ত কমে যাওয়ার প্রবণতার অবসান হয়ে শরীরে রক্ত তৈরি হবে। ফলে রোগমুক্তি সহজ হবে। একই কারণে অন্যান্য রোগও হবে না। এমনকি ক্যান্সারাক্রান্ত Palliative রোগীদের যেহেতু আর কোনো চিকিৎসায় কাজ হয় না, তখনও তাদের গায়ের ব্যথা, হজমের গণ্ডগোল ও ঘুমের ব্যাঘাত অনেকটাই কমে আসবে।

আমার কথা শেষ হয়েও শেষ হবে না যদি না একটি তথ্য না দিই। নিকোলাসের আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে আমার স্ত্রী জেবুন নেসা ২০১০ সালে এদেশে গঠন করে Healthy Energetic Active Life (HEAL) বা ‘সুস্থ সবল কর্মময় জীবন’ নামের একটি সংগঠন। এটি মূলত মানুষের সুস্থ থাকার চেতনাকে জাগ্রত করার কাজে নিবেদিত। এতে সকলের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সহযোগিতা কাম্য।

লেখক: চলচ্চিত্র পরিচালক

(সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের ‘এখানে থেমো না’ বইয়ে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে)