২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

মরিয়ম মরিয়া প্রমাণ করিল, কিছু প্রশ্ন ফিরে ফিরে আসে

মরিয়মের মৃত্যু কি শুধু একটি আত্মহত্যার ঘটনা, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহুবিবাহ ও নৈতিক স্খলনের প্রসঙ্গও।

মরিয়ম মরিয়া প্রমাণ করিল, কিছু প্রশ্ন ফিরে ফিরে আসে

মরিয়মের মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন যতটা আইনের, ততটাই নৈতিকতার।

আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ

Published : 22 Sep 2026, 01:12 AM

Updated : 22 Sep 2026, 01:12 AM

সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় স্ত্রীসহ রিমান্ডে যাওয়ার ঘটনা বিরল এবং অস্বাভাবিক। যদিও ২০১৩ সালের সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সাংবাদিক পেটানোর মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তৎকালীন সরকারদলীয় এমপি গোলাম মাওলা রনি। কিন্তু সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সস্ত্রীক রিমান্ডে যাওয়ার ঘটনা জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেই প্রথম ঘটল। কোনো রাজনৈতিক মামলায় নয়, তিনি গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে গেছেন দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার মামলায়। যে মামলার আসামি তার প্রথম স্ত্রীও।

গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ‘আত্মহত্যা’র ঘটনায় বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে।

১. নৈতিক স্খলনের সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলায় দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও গাজী নজরুল কীভাবে সংসদ সদস্য পদে বহাল রয়েছেন?

২. ইসলাম একাধিক বিয়েকে বৈধতা দিলেও সেটি কি সবার জন্য?

৩. একাধিক বিয়ে বৈধ হলেও এক ঘরে দুই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস কি নৈতিকতার বিবেচনায় সমর্থনযোগ্য?

৪. মৃত্যুর পরে মরিয়মের হাতে লেখা কিছু চিরকুট সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে, যেখানে তার রাগ-ক্ষোভ-অভিমানের কথা ফুটে উঠেছে। যেগুলোকে অনেকটা সুইসাইড নোট বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু মরিয়মের মা বলছেন, চিরকুটের হাতের লেখা তার মেয়ে মরিয়মের নয়। যদি তাই হয়, তাহলে এগুলো কে লিখেছেন? কেন লিখেছেন? এই ঘটনাটি কি তাহলে আত্মহত্যা নয়? অবশ্য গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিতর্কিত ভিডিও ফাঁসের পর থেকে ওর মা-বাবার আচরণ ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

৫. মরিয়মের মতো একজন টিনেজ মেয়ে কোন বাস্তবতায় তার বাবার বয়সী একজন পুরুষকে বিয়ে করেছিলেন বা করতে বাধ্য হয়েছিলেন? তিনি কি শেষ পর্যন্ত একজন ক্ষমতার বলি হলেন?

মরিয়মের মৃত্যু নীতি-নৈতিকতা নিয়ে এমন একগুচ্ছ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সমাজকে, যা ফিরে ফিরে আসে। মরিয়ম মরিয়া প্রমাণ করিল, সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

প্রসঙ্গত, গত জুলাই মাসে একজন তরুণীর সঙ্গে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের একাধিক ভিডিও নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ঘটনার পর এই ভিডিওকে ভুয়া বা বানানো বলে দাবি করলেও পরবর্তীতে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াত। ঘটনার পরে বলা হয়, মরিয়ম নামে ওই তরুণী এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে যার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যেহেতু একজন সংসদ সদস্যকে চাইলেই গ্রেপ্তার করা যায় না, ফলে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে তাকে সস্ত্রীক গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং আদালতে নিয়ে রিমান্ড আবেদন করলে আদালত নজরুল ইসলামের চারদিন এবং তার প্রথম স্ত্রীর একদিন রিমান্ড মঞ্জুর করে।

চিরকুট রহস্য

মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের সময় বেশ কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। যার একটিতে লেখা আছে, “শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।” আরেকটিতে লেখা, “আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।”

আরেকটি চিরকুটে আছে দুটি লেখা। একটিতে আছে, “সে ছিলো অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!”

যদি এই চিরকুটগুলো সত্যিই মরিয়মের লেখা হয়ে থাকে তাহলে এটা স্পষ্ট যে, এই চিরকুটগুলো তিনি তার স্বামী গাজী নজরুল ইসলামকে উদ্দেশ করেই লিখেছেন—যেখানে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ ও অভিমান ফুটিয়ে তুলেছেন।

অবশ্য মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার আগে মরিয়মের মা বলে গিয়েছেন, হাতে লেখা যে কয়েকটি চিরকুট পাওয়া গেছে, এগুলো মরিয়মের লেখা নয়। প্রশ্ন হলো, মরিয়মের মা কি নিশ্চিত যে এগুলো তার মেয়ের লেখা নয়? সব মা-বাবা কি তার সন্তানের হাতের লেখার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত থাকেন? মরিয়মের বাবা তো অকপটে স্বীকার করেছেন, মেয়ের হাতের লেখা তার চেনা নেই। একই লোকের হাতের লেখা একেক সময় একেকরকম হতে পারে। যদি সত্যিই কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তার আগ মুহূর্তে তিনি যে মানসিক অবস্থার ভেতর দিয়ে যান, তখন তার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে বা তার পরিচিত ঢংয়ে চিরকুট বা সুইসাইড নোট লেখা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু ধরা যাক মরিয়মের মায়ের কথাই সত্য যে, চিরকুটগুলো মরিয়মের লেখা নয়। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, এই চিরকুটগুলো কে লিখেছেন এবং কেন লিখেছেন? এটি কি তাহলে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং এটিকে আত্মহত্যা প্রমাণের জন্য চিরকুটের নাটক সাজানো হচ্ছে? মরিয়ম খুন হবেন কেন? তাকে খুন করে এমপি নজরুল বা তার প্রথম স্ত্রীর কী লাভ? নাকি এর পেছনে কোনো রাজনীতি আছে? নির্মোহ তদন্তে নিশ্চয়ই এগুলো বের হয়ে আসবে।

বহু বিবাহের তর্ক

মরিয়মের মৃত্যুটি যদি আত্মহত্যাই হয়ে থাকে, তাহলে এটি স্পষ্ট যে, এক ঘরে বড় বউয়ের সঙ্গে বসবাসকে মরিয়ম সম্মানজনক মনে করেননি। তার স্বামী তার ওপর সুবিচার করতে পারেননি। ইসলাম একাধিক বিয়েকে বৈধতা দেয়। কিন্তু সেটি শর্তসাপেক্ষ। একজন পুরুষ চাইলেই একাধিক বিয়ে করতে পারবেন কি না, সেটি প্রথমত শরিয়ার প্রশ্ন, তার চেয়ে বেশি নৈতিকতার প্রশ্ন। ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো লজ্জা। একই ঘরে একাধিক স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করা ইসলামের সেই বৈশিষ্ট্যেরও খেলাপ। সুতরাং একই ঘরে দুই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস কোনোভাবেই নৈতিক বিবেচনায় সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু একজন আইনপ্রণেতা সেই কাজটিই করলেন।

দ্বিতীয়ত, ইসলাম একাধিক এমনকি চারটি বিয়ে অনুমোদন করে বলে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, সেটিও অর্ধসত্য। কেননা ইসলামে একাধিক বিয়ে করার ঢালাও লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। বরং এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারের কঠিন শর্ত। তাছাড়া যে বাস্তবতায় মহানবী (স.) একাধিক বিয়ে করেছিলেন, সেটি সাধারণ মুসলমানের জন্য প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। এমনকি মহানবীর সময়েও একাধিক বিবাহের বিষয়টি সাধারণ নিয়ম বা সকল উম্মতের জন্য অনুমোদিত ছিল না। বরং যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে সমাজে প্রচুর বিধবা, এতিম ও সহায়-সম্বলহীন নারীর সংখ্যা বেড়ে গেলে, সেই সামাজিক সংকট মোকাবিলা এবং নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে বহুবিবাহ একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। সুতরাং, এই সময়ের বাস্তবতায় বহু বিবাহ কতটা সমর্থনযোগ্য তার ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই ইসলামিক স্কলাররা আরও ভালো দিতে পারবেন।

প্রশ্ন হলো, যারা বহু বিবাহকে ইসলামসম্মত বলে মনে করেন, তারা মহানবীর (স.) আদর্শগুলো কতটা মেনে চলেন? মহানবী সারা জীবনে একটি মিথ্যা কথা বলেননি। মানুষের হক নষ্ট করেননি। সারা জীবন ন্যায়বিচার করেছেন। অমুসলিমরাও তাকে তার বিশ্বস্ততার জন্য আল-আমিন (বিশ্বাসী) উপাধি দিয়েছিলেন। তার কাছে সকল ধর্মের মানুষই ছিল নিরাপদ। কিন্তু যারা এখন বহু বিবাহকে ইসলামসম্মত মনে করেন, তাদের কতজন মহানবীর মতো সত্যবাদী এবং ন্যায়পরায়ণতার নীতি মেনে চলেন?

নৈতিক স্খলনের পরেও এমপি?

একজন নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ফাঁসের জেরে যে গাজী নজরুল ইসলামকে তার দল জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হলো, তিনি দেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী এখনও সংসদ সদস্য পদে বহাল আছেন। এটি নিয়েও প্রশ্ন তোলার সময় হয়েছে যে, একজন এমপি কেবল যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে এবং সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলেই তার এমপি পদ চলে যাবে; তিনি ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড পেলেই কেবল তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে—অথচ তার নৈতিক স্খলের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরেও তিনি কী করে স্বপদে বহাল থাকেন? নিজ দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও তিনি এমপি হিসেবে যে সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, এটি কি গ্রহণযোগ্য?

গাজী নজরুল যে কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, সেটি কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। কিন্তু দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনাটি যদি আত্মহত্যাও হয়ে থাকে, তাহলে এখন যেহেতু তিনি আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে আছেন, ফলে তার ব্যাপারে সংসদের সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার বলে মনে হয়। নৈতিক স্খলনের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকলে কেউ সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না, এরকম আইন প্রণয়নও এখন সময়ের দাবি।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল: aminalrasheed@gmail.com