১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বোতল দুর্ঘটনা ও অনুশ্রীর আশা জাগানিয়া হারমোনিয়াম

সমাজ সুস্থ না থাকলে মানুষের উন্মাদনা বাড়বেই! কিন্তু সব ভীতি আর অস্থিরতার মাঝেও গান থামে না।

বোতল দুর্ঘটনা ও অনুশ্রীর আশা জাগানিয়া হারমোনিয়াম
ভীতি আর হতাশাকে হারিয়ে সুরের জয়গান করে অনুশ্রী রায়ের চিঠি পেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হারমোনিয়াম উপহার দেওয়ার ঘটনা। ছবি: পিআইডি

অজয় দাশগুপ্ত অজয় দাশগুপ্ত

Published : 08 Aug 2026, 03:15 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

ঘটনাটি এ রকম: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ কনসার্টে গান গাওয়ার সময় দর্শকসারি থেকে ছুড়ে মারা হয় পানির বোতল। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হলেও সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বোতল হামলায় আক্রান্ত ‘আর্ক’ ব্যান্ডের ভোকালিস্ট হাসান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, মঞ্চে গান পরিবেশনার মাঝেই দর্শকসারি থেকে মঞ্চের দিকে বোতল ছুড়ে মারা হয়। নিজের শান্ত প্রতিক্রিয়ায় হাসান বলেন, “ঘটনাটি আমার কাছে খুবই অপ্রত্যাশিত। দীর্ঘ সংগীতজীবনে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কখনো হইনি। বহু বছর ধরে বাংলা ব্যান্ড সংগীত করছি। এই সময়ে বিচিত্র অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু মঞ্চে একজন শিল্পীর দিকে বোতল ছুড়ে মারা হতে পারে, এমনটা কখনো দেখিনি বা ভাবিনি। তারপরও আমি বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে চাই। আমি বিশ্বাস করতে চাই, যে এমনটি করেছে, সে হয়তো না বুঝেই করেছে।”

এ ঘটনার পর দেশের সংগীতাঙ্গনের অনেক শিল্পী ও তারকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে মতামত জানিয়েছেন। তারা কনসার্টে শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এবং এ ধরনের আচরণকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। তাদের অনেকেই বলেন, মতের অমিল বা ব্যক্তিগত অপছন্দ থাকতেই পারে, কিন্তু কোনো শিল্পীর প্রতি এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হঠাৎ করে আমাদের দেশের তারুণ্য বেশ অস্থির আর বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এই অধৈর্য ক্রমেই একধরনের অসুস্থতার জন্ম দিচ্ছে। কেন এই প্রবণতা? আগে আমরা যদি সমাজের পরিবর্তন ও নতুন ধারার দিকে চোখ রাখি তবে দেখব, মানুষ ক্রমাগত অস্থিরতার শিকার হচ্ছে।

এই অস্থিরতার নানাবিধ কারণ আছে। বাজারদর, বন্যার মতো পানির ঢল, যানজট, বেকারত্ব—সব মিলিয়ে মানুষ দিশেহারা। ইদানীং সামাজিক মাধ্যমে দেখছি গ্যাসের সংকট চরমে। মনে রাখা উচিত, সমাজ সুস্থ বা সবল না থাকলে মানুষের মনে এ ধরনের উন্মাদনা বাড়বেই। কারো সাধ্য নেই এর গতি রোধ করে দাঁড়ানোর।

কনসার্টে হাসানের ওপর বোতল ছুড়ে মারার এমন একটা বাজে ঘটনা কি আসলেই বিচ্ছিন্ন কিছু? না, সেটা বলা যাবে না। কারণ শুদ্ধ সংগীত ও শিল্পের আধার হিসেবে পরিচিত ছায়ানটও আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। রেহাই মেলেনি বাম ঘরানার উদীচীরও। কারণ তাদের গানে মানুষ জাগে। মানুষ জাগলে যারা ভয় পায়, তারা যে মানুষকে অন্ধ রাখতে চায়—এটা নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। সে সময় কোনো দেয়াল বা প্রতিরোধ ছিল না, ছিল না দেশময় কোনো প্রতিবাদ। এর মানেটা পরিষ্কার—যে কেউ বা যারা ইচ্ছা করলেই হামলা করতে পারে। আর করলে যে তাদের শাস্তি হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে একটি অপরাধ সাজা না পাওয়ায় আরেকটি অপরাধকে টেনে আনবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

ঠিক এই মুহূর্তে এ কথা বলা যাবে না যে, সংগীতের বাগান বন্ধ করার জন্য এই হামলা চালানো হয়েছিল। তবে এটা বলা সম্ভব যে ভয় দেখানোর জন্য এটা করা হয়েছিল। ভয় দেখানোর একটা সংস্কৃতি কিন্তু বহু বছর ধরে চলে আসছে।

যাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে বিদায় করা হয়েছে, তারাও ভয় দেখাত। তাদের ভয় দেখানোর তরিকা আর আজকের ভয় পাইয়ে দেওয়ার তরিকা আলাদা। তারা ভিন্নমত বা বিরোধিতা সহ্য করত না। সবকিছু বগলদাবা করতে করতে একসময় বগলটাই নাই হয়ে গেল তাদের। আর এখন কোনো এক অজানা কারণে সাহিত্য, সংস্কৃতি, গান-বাজনা ভয়ের নিশানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। না, হাসান এমন কোনো কাজ করেননি বা এমন কোনো গান গান না, যা কারো ভীতির কারণ হতে পারে। তবু তার কনসার্টে বোতল ছুড়ে মারা কি আমাদেরকে সতর্ক করে না?

পুরো বিষয়টা ভয় পাইয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের সংস্কৃতির প্রতি হুমকি। যারা চায় না দেশের গান-বাজনা এগিয়ে যাক, তারা শুরুতে ছায়ানটকে টার্গেট করলেও এখন কাওয়ালি জাতীয় গান ছাড়া বাকিগুলোকেও ছাড় দিচ্ছে না। তাহলে কী ধরে নেব আমরা?

কোনো একটি বিশেষ মহল চাইলেই কি দেশের গান-বাজনা ছাড়া বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি ভয়ের মুখে গুটিয়ে যাবে? সেটি হবার নয়। বাংলাদেশের সবচাইতে বড় শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান আর প্রকৃতি। এই দেশের আকাশে, বাতাসে, গাছে, পাতায়, বাড়ির ছাদে গান। মানুষ আপনমনে গান গায়। যেকোনো উৎসবে, আনন্দ-বেদনায় গান মানুষের শক্তি। সে শক্তিকেই ভয় পাচ্ছে এরা।

মজার বিষয় এবং পরিতাপের ব্যাপার হলো, যে সব মানুষ বা প্রতিষ্ঠান রুখে দাঁড়াতে পারে বা পারতেন, তারা ভয়ে বা নানা কারণে গুটিয়ে আছেন। আশ্চর্যজনকভাবে কবরের স্তব্ধতার মতো এক নীরবতা চলছে সমাজে।

অথচ আমরা পড়েছি, “মৃতের জানাজা মোরা কিছুতেই করিব না পাঠ/ কবরেরও ঘুম ভাঙে/ জীবনের দাবি আজ এতই বিরাট।” উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ নিহত হন। পরদিনের ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় নিহত আসাদের ছবির নিচে পরিচিতি হিসেবে এই পঙ্‌ক্তিগুলো ছাপা হয়েছিল। লিখেছিলেন সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত।

উপায় ক্রমেই কমে আসছে, তবে আশা হারানো যায় না। আশা আবার ফিরে ফিরে আসে। মন ভালো করা একটি খবর শেয়ার করি: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে স্বপ্নপূরণ হলো রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুশ্রী রায়ের। অনুশ্রী রায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পূর্ব নবনিদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রতিযোগিতায় দেশের গানে প্রথম এবং নজরুলসংগীতে তৃতীয় স্থান লাভ করে অনুশ্রী।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনুশ্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে একটি হারমোনিয়াম উপহার দেন।

অনুশ্রী প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি লিখেছিল। সে তার কবিতার মতো কথাবার্তায় বলেছে, এই চিঠি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাবে কি না, সে জানত না। চিঠি পৌঁছেছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে একটি হারমোনিয়াম দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। এর চাইতে সুসংবাদ আর কী হতে পারে? আশাহীনতার বিপরীতে আশা জাগানিয়া অনুশ্রীর হারমোনিয়াম আমাদের বলে দেয়, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়...’।

গান থামে না। সংগীত আকাশের গায়ে তার চিহ্ন রেখে যায়। বাংলাদেশ বুক বাঁধে, আবারো তার বাউল-ফকির থেকে হাসান বা অনুশ্রী—সবাই গান গাইবে। মানুষ শুনবে, মানুষ ভালোবাসবে—এই তো আমাদের স্বদেশ।

অজয় দাশগুপ্ত ছড়াকারপ্রাবন্ধিক  কলামনিস্ট। -মেইলdasguptaajoy@hotmail.com