সংবিধান প্রণেতাগণ-১০: ভাষা আন্দোলন থেকে সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত ফকির সাহাবউদ্দীন রেখেছেন অনন্য অবদান

সংবিধান প্রণয়ন কমিটির এই সদস্য পরে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে তিনি ওই পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

আমীন আল রশীদআমীন আল রশীদ
Published : 5 Dec 2023, 11:07 AM
Updated : 5 Dec 2023, 11:07 AM

ভাষা আন্দোলনে উত্তাল সারা দেশ। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। পরদিন ঢাকায় কর্মসূচি। কিন্তু ১৪৪ ধারা। এদিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের যে সিদ্ধান্ত হয়, ওই মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেন ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যে ঐতিহাসিক মিছিল বের হয়; যে মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়, তার অগ্রভাগে ছিলেন ফকির সাহাবউদ্দীন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী।

এর ১৯ বছর পরে ১৯৭১ সালে যখন মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন পাকিস্তানের বিমান যাতে শ্রীলঙ্কার বিমানবন্দর থেকে জ্বালানি নিতে না পারে, সেজন্য শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেছিলেন ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ। শ্রীলঙ্কা সরকার সেই অনুরোধ রেখেছিল। যে ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন, অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহে ‘মি. আহমেদ’ নামে তিনি বিশ্বের নানা প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন।

তিনি ছিলেন জাতীয় চার নেতার একজন তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হন। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির এই সদস্য পরে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে তিনি ওই পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

একজন খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে তিনি আমৃত্যু ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। যদিও জীবনের শেষ চার বছর ছিলেন দৃষ্টিশক্তিহীন।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা: ফকির পরিবারের আলোকিত সন্তান

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রাম। রাজনীতিতে এই পরিবারের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই পরিবারের পূর্বপুরুষ ফকির মজনু শাহের নাম উল্লেখযোগ্য। ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ এই পরিবারের সন্তান।

১৯৮২ সালে ইস্যু এবং ১৯৮৭ সালে নবায়ন করা ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদের যে পাসপোর্টটি তাঁর পরিবারের সংরক্ষণে রয়েছে, সেখানে তাঁর জন্ম তারিখ পয়লা ডিসেম্বর ১৯২৭। কিন্তু তাঁর বড় মেয়ে তাহমিনা জাকারিয়া বলছেন, তাঁর বাবার আসল জন্ম তারিখ ১৬ এপ্রিল ১৯২৫। পাসপোর্টের তারিখটি হয়তো স্কুলের সার্টিফিকেট অনুযায়ী। কিন্তু তাঁরা তাঁর বাবার জন্মদিন ১৬ এপ্রিল ১৯২৫ বলেই জানেন এবং এই তারিখটিকেই সঠিক বলে মনে করেন।

ফকির সাহাবউদ্দীনের বাবা ফকির গিয়াসউদ্দিন আহমদ, মা শায়েস্তা খাতুন। তাঁর চাচা ফকির আবদুল মান্নান ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতি। তিনি ১৯৬৫-১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মূলত চাচা ফকির আব্দুল মান্নানের ঢাকার বাসায় থেকে ফকির সাহাবউদ্দীন মাধ্যমিক পাস করেন। শিক্ষা ও পরবর্তী জীবনে তাঁর এই চাচা নানাভাবে তাঁকে সহায়তা করেছেন। প্রসঙ্গত, ফকির আবদুল মান্নান বিএনপির প্রয়াত নেতা হান্নান শাহের বাবা। অর্থাৎ ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ ও হান্নান শাহ চাচাতো ভাই। ফকির আবদুল মান্নানের আরেক ছেলে অর্থাৎ হান্নান শাহের ভাই শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান ছিলেন আপিল বিভাগের বিচারপতি।

বাংলাদেশের আরেক প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, জাতীয় নেতা, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদেরও জন্ম কাপাসিয়া উপজেলায়। তিনিও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য। ফকির সাহাবউদ্দীন ও তাজউদ্দীন ছিলেন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি কাপাসিয়ার রাজনীতিতে বন্ধু তাজউদ্দীনকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন।

১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ নির্বাচনে ঢাকা সদর উত্তর-পূর্ব আসনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী তাজউদ্দীন আহমদের কাছে হেরে যান মুসলিম লীগ প্রার্থী ফকির আবদুল মান্নান। অর্থাৎ ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদের চাচা হেরে যান তাঁর বন্ধু তাজউদ্দীনের কাছে। তাজউদ্দীন যখন তাঁর পিতার বয়সী ফকির আবদুল মান্নানকে পরাজিত করেন, তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের ছাত্র। (বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ও ফলাফল, ঐতিহ্য/২০২৩, পৃষ্ঠা ২৩৯)। 

শিক্ষা: জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাকের ছাত্র

ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৪২ সালে। ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন প্রমুখ।

তিনি জগন্নাথ অথবা ঢাকা কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন (নিশ্চিত করে জানা যায়নি)। পরিবার বলছে, আই.এ পড়ার সময় তিনি গাজীপুরের কালীগঞ্জ এলাকার একটি স্কুলে পড়াতেন নিজের পড়ালেখার খরচ চালানোর জন্য। ওই সময়ে টিউশনিও করেছেন। প্রচণ্ড অর্থকষ্টে ছিলেন।

আই.এ পাস করার পরে ফকির সাহাবউদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ‘জ্ঞানতাপস’ হিসেবে খ্যাত অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ছিলেন তাঁর সরাসরি শিক্ষক। ফকির সাহাবউদ্দীনের বড় মেয়ে তাহমিনা জাকারিয়া বলছেন, ‘রাজ্জাক স্যার আমাদের বাসায় অনেকবার এসেছেন।’ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ছাত্র ফকির সাহাবউদ্দীন স্নাতকোত্তর করার পাশাপাশি এল.এল.বি ডিগ্রিও অর্জন করেন।

রাজনীতি ও কর্মজীবন

ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় এক মাসের জন্য সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। এর আগের দিন, অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাদা আলাদা সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ওইদিন সন্ধ্যায় সলিমুল্লাহ হলে ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে একুশের ওই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ।

পড়াশোনা শেষ করে ১৯৫৫ সালে তিনি হাইকোর্টে এবং ১৯৫৮ সালে সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন। প্রখ্যাত আইনজীবী এস. আর. পাল ছিলেন তাঁর দীক্ষাগুরু। তাহমিনা জাকারিয়া বলছেন, ‘ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে ওনাকে দেখেছি। মায়ের হাতের রান্না খেয়েছেন।’

১৯৬২ সালে ফকির সাহাবউদ্দীন পাকিস্তান বার কাউন্সিলের সদস্য হন। অবশ্য এর আগেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জুনিয়র হিসেবে একটা মামলা পরিচালনা করার পর আইন পেশায় তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তখন তিনি পুরোনো ঢাকার ১৯ কারকন বাড়ি লেনে আওয়ামী লীগের প্রথম কোষাধ্যক্ষ ইয়ার মোহাম্মদ খানের বাসায় ভাড়া থাকতেন। তাহমিনা বলেন, ‘এই দম্পতি আমাদের পরিবারের পরম শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে পাশে ছিলেন।’

ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিতি ছিলেন। মূলত ঢাকার ইস্কাটনে তাঁর বাড়িটা ছিল গাজীপুর অঞ্চলের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ‘ট্রানজিট স্টেশন’। সবাই এই বাড়িতে এসে প্রথমে উঠতেন। এখান থেকে তাঁরা যেতেন তাজউদ্দীন আহমদের বাসায়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে ঢাকা-২০ (প্রাদেশিক পরিষদ ১৯০) আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে আওয়ামী লীগের আরেকজন নেতার প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এখানে ফকির সাহাবউদ্দীনকে মনোনয়ন দেন এবং তিনি জয়লাভ করেন। এই আসনে মোট ভোটার ছিল ৯১ হাজার ২২৮। ফকির সাহাবুদ্দীন পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৫০০ ভোট, যা প্রাপ্ত ভোটের ৭৯.৪৯ শতাংশ। (বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ও ফলাফল, ঐতিহ্য/২০২৩, পৃষ্ঠা ৩০৫)।

মুক্তিযুদ্ধ: যেভাবে ঘুরে গেলো যুদ্ধের মোড়

মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ। মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে তিনি শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, জাপান, হংকং, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া সফর করেন। এ সফর ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন, অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ করা। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে প্রেরিত মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি দলের সদস্য সচিব ছিলেন তিনি। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই সময় তিনি ‘মি. আহমেদ’ নামে ট্রাভেল করতেন।

তাহমিনা জাকারিয়া বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ২ ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলে আব্বা আমাদের বাসায় রেখে প্রথমে বাসাবো এলাকায় তাঁর এক মামার বাড়িতে যান। সেখান থেকে বেরিয়ে পড়েন। আমরা ৩০ মার্চ বাড়ি ছাড়ি। তখন আমরা ৫ ভাইবোন। মুড়াপাড়ায় বাবা আমাদের সাথে যুক্ত হন। সেখান থেকে নৌকায় চরসিন্দুর, কালিগঞ্জসহ নানা এলাকা ঘুরে সাতদিন পরে গ্রামের বাড়ি কাপাসিয়ার ঘাগটিয়ায় পৌঁছাই। মুড়াপাড়ায় একদিন ছিলাম। নৌকায় তিন চারদিন। ঘাগটিয়ায় ছিলাম দুই থেকে আড়াই মাস।’

ফকির সাহাবউদ্দীনের ছোট মেয়ে মেরিনা আহমেদ বলছেন, ‘আব্বা আমাদের সাথে যাচ্ছেন। আমরা নৌকায় যাচ্ছি। গান করছি। আব্বা সুন্দর গান গাইতেন। দারুণ গলা ছিল তার। রবীন্দ্রসংগীত, দেশাত্মবোধক গান। ও আমার দেশের মাটি, জয় বাংলা বাংলার জয়—এগুলো আমরা সারাক্ষণ গাইতাম।’

এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি ফকির সাহাবউদ্দীন ভারতের উদ্দেশে বের হয়ে যান। পথে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন সুদর্শন। ৬ ফুট লম্বা। ফলে সহজেই চেনা যেত। যদিও তিনি ওই যাত্রায় বেঁচে যান এবং বাড়িতে ফিরে আসেন। বাড়িতে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং ৫ সন্তান রেখে ভারতে চলে যাওয়া নিয়ে তাঁর চিন্তাও হচ্ছিলো। অনেকেই তখন তাঁকে আত্মসমর্পণ করার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর ছোট ভাই ফকির জিয়াউদ্দিন এসে অভয় দেন। তিনি এবং ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কামরুল আহসান খান (সিপিবির সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খানের ছোট ভাই) তাঁকে সীমান্ত পার করে দেন। এপ্রিলের শেষ দিকে তিনি ভারতে চলে যান।    

তাহমিনা জানান, তাঁরা কাপাসিয়ায় মাস দুয়েক থাকার পরে কালিগঞ্জে চলে যান। জুলাইয়ের শেষদিকে কিছুদিন ঢাকায় থাকেন। এরপর ফকির সাহাবউদ্দীনের একজন জুনিয়র সহকর্মী তাঁর গাড়িতে করে সাভার হয়ে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় (ফকির সাহাবউদ্দীনের শ্বশুর বাড়ি) পৌঁছে দেন। পথে পাকিস্তানি আর্মিরা গাড়ি থামালে তিনি উর্দুতে বলেন যে, পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছেন। এভাবে কৌশলে তাঁরা মুক্তাগাছায় পৌঁছান। কিন্তু সেখানেও বেশিদিন থাকতে পারেননি। কারণ আত্মীয়-স্বজনরা ভয় পেতো। তাদের ধারণা ছিল, ফকির সাহাবউদ্দীনের পরিবার এই বাড়িতে আছে জানলে পাকিস্তানি আর্মিরা আক্রমণ চালাবে। ফলে অগাস্ট মাসে তাঁরা ময়মনসিংহ শহরে আরেকজন আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যান। সানকিপাড়া এলাকায় রেললাইনের পাশে দুই রুমের একটি ঘর ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন। এটি ছিল তাঁদের জীবনে অত্যন্ত কঠিন একটি সময়।

মেরিনা আহমেদ বলেন, ‘আব্বা ভারতে চলে গেলেন। ৯ মাস তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। জীবিত আছেন কি না তাও জানতাম না। আমরা অলমোস্ট লুকিয়ে ছিলাম। একবার ছোট চাচা আমাদের দেখতে এসেছিলেন। উনি জাহাজে চাকরি করতেন। তখন আমরা লোকজনকে বললাম, ইনি আমাদের বাবা। আব্বার পরিচয় আমরা লুকিয়ে রাখতাম।  আব্বার সাথে আমাদের দেখা হলো দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে। আমার ছোট ভাই (ফকির সাদউদ্দিন আহমেদ মিশা) তখন আম্মার পেটে। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে ওর জন্ম হয়। আব্বা ওকে দেখলেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে।’

১৯৭১ সালের জুলাই মাসের শেষদিকে ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ শ্রীলঙ্কায় যান। তখন পাকিস্তানি বিমানগুলো শ্রীলঙ্কায় তেল নিয়ে বাংলাদেশে যাওয়া-আসা করত। ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ তখন বাংলাদেশে পাকিস্তানি আর্মিদের গণহত্যার কিছু ছবি নিয়ে যান। এর মধ্যে কিছু ছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মৃতদেহের ছবি। তিনি এই ছবিগুলো শ্রীলংতার তৎকালীন প্রেসিডেন্টকে দেখিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে শুধু মুসলমানদের হত্যা করছে না, বরং বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরও হত্যা করছে। তোমরা কি চাও সেই পাকিস্তানিরা তোমার দেশ থেকে বিমানের জ্বালানি সংগ্রহ করুক? এই ঘটনার পরে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশ থেকে পাকিস্তানি বিমানে জ্বালানি সংগ্রহ বন্ধ করে দেন। তাহমিনা জাকারিয়া মনে করেন, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি টার্নিং পয়েন্ট।

‘চলো ঢাকা’ তখন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি জনিপ্রয় স্লোগান। ১৯৭১ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি দৈনিক পত্রিকায় ফকির সাহাবউদ্দীনের বরাতে লেখা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ ঢাকায় ঢুকে পড়তে চান। অর্থাৎ তখন তাঁরা জয়ের ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত। তাহমিনা জাকারিয়া বলেন, ‘আব্বা বলতেন, তোমরা যাঁদের নাম জান না, স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি।’

গণপরিষদ ও বাহাত্তর-পরবর্তী জীবন

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের জন্য ড. কামাল হোসেনকে প্রধান করে ৩৪ সদস্যের যে কমিটি গঠন করা হয়, ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ ছিলেন সেই কমিটির অন্যতম সদস্য। বঙ্গবন্ধু তাঁকে মনোনীত করেছিলেন কারণ তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ও বিচক্ষণ আইনজীবী। আইন বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ। তাছাড়া একজন মাটিলগ্ন রাজনীতিবিদ হিসেবেও তাঁর সুনাম ছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ছিল আস্থার সম্পর্ক।

ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি। সম্ভবত অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন বলে। ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-২২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মালেক গ্রুপের প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে হেরে যান। ওই নির্বাচনে তাঁর আসনে ভোটার ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৬১। তিনি পেয়েছেন ১৯ হাজার ৯৫৩ ভোট। এই নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির ডা. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ। তিনি পেয়েছিলেন ২৯ হাজার হাজার ৯১৭ ভোট। (বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ও ফলাফল, ঐতিহ্য/২০২৩, পৃষ্ঠা ৩৯৫)।

ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ এরপরে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি।

প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল

ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ ছিলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় অ্যাটর্নি জেনারেল। তবে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পরে প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল। যে কারণে তাঁকে সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল বলা হয়। ১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৬ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে ওই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন এম. এইচ খন্দকার। এই সময়ে সাহাবউদ্দীন আহমদ ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল।

ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ ১৯৭৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭৬ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা বার কাউন্সিলেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। তার আগে পরপর দুই মেয়াদে এই পদে ছিলেন সংবিধান প্রণয়ন কমিটির আরেক সদস্য আছাদুজ্জামান খান। ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ আমৃত্যু বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সফর

১৯৭৫ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত একটি বাংলা সংবাদপত্রের খবরের শিরোনাম: ‘যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের এটর্নি জেনারেল।’ খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে এক মাসকাল সফরকালে তিনি টেক্সাস ও আইওয়া রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ-এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি, মার্কিন বিচারসংস্থাসমূহের প্রশাসনিক দপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করেন। ওই পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমি এটা উপলব্ধি করেছি যে, এ দেশের লোক জানে, আমরা বহু ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছি। এখানকার মানুষ আমাদের দেশের ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ, বন্যা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছে। আমি দেখে আনন্দিত হয়েছি যে, আমেরিকান জনসাধারণ বাংলাদেশের সমস্যাবলি সম্পর্কে খুবই সচেতন এবং আমাদের সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন অগ্রগতি তাঁদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের বিচারব্যবস্থার প্রশংসা করে ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমি দেখেছি বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে বিচারকগণ আনুষ্ঠানিক ও ঘরোয়াভাবে কৌঁসুলিদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সমঝোতার চেষ্টা করেন। আর যে পদ্ধতিতে মামলা-মোকদ্দমা পরিচালিত হয়, তাতে এগুলোর নিষ্পত্তি দ্রুত হয় বলে আমার ধারণা হয়েছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশেও বিচারকার্য পরিচালনার সুবিধার জন্য এসব ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে।

অগাস্ট ট্র্যাজেডি: অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে ইস্তফা

তাহমিনা জাকারিয়া বলেন, ‘১৫ অগাস্ট সকালে আমরা রেডিওতে খবরটা শুনি। বাবা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। সবাই চুপচাপ। তখন আমার বয়স ১৯। রেডিওতে ‘‘দুর্বার’’ নামে একটি অনুষ্ঠানের ঘোষক। মাসে ১৫ দিন। সম্মানি ২২৫ টাকা।’

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরদিন ১৬ অগাস্ট সন্ধ্যায় রেডিওতে তাঁর অনুষ্ঠান ছিল। কিন্তু বাবা ফকির সাহাবউদ্দীন তাঁকে যেতে দিতে চাইলেন না। ‘কিন্তু আমি খুব জেদি ছিলাম। তাছাড়া রেডিওতে যা শুনেছি, তাতে পুরো পরিস্থিতি বুঝতে পারছিলাম না। দেয়ালের বাইরে যেতে চাইলাম। রেডিও থেকে গাড়ি পাঠালো। তারা (কর্তৃপক্ষ) আসলে দেশের মানুষকে দেখাতে চাইলো যে, সবকিছু স্বাভাবিক আছে। আমি বের হলাম। রাস্তায় যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটা গাড়ি দেখলাম।’

এই ঘটনার কিছুদিন আগে থেকে লন্ডনে বসবাসরত ফকির সাহাবউদ্দীনের ছোট ভাইয়ের বিয়ের কথা হচ্ছিল। কিন্তু এর মধ্যে ১৫ অগাস্টের নৃশংস ঘটনা ঘটে যাওয়ায় সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। এর মধ্যেই ২০ অগাস্ট তাঁর বিয়ে হয়। পরিবারের অনেকেই ময়মনসিংহ যান। দুই পক্ষের মিলিয়ে ৬০-৬৫ জন লোক হয়েছিল। তাহমিনা বলেন, ‘বাড়িতে ছোট চাচী এসেছেন। ওই অবস্থার মধ্যেও ছোটরা আনন্দ করলো। কিন্তু বড়রা ‍দুশ্চিন্তায়। আর্মিদের প্রতাপ স্পষ্ট।’ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ

এর পরের ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটতে থাকে। তাহমিনার ভাষ্য, ‘একদিন তাজউদ্দীন আহমদ আব্বাকে বললেন, এখন জেলে থাকাটাই নিরাপদ। না হলে ধরে নিয়ে মোশতাকের কেবিনেটে বসিয়ে দেবে। আসলে ওই সময়ে বেশির ভাগ নেতাই মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন ভয়ে, চাপে পড়ে। কেউ হয়তো লোভে। এর মধ্যে তাজউদ্দীন চাচা গ্রেপ্তার হলেন।’

তাহমিনা বলছেন, ‘আব্দুল হাকিম নামে আমাদের বাসায় পুরোনো ঢাকার একজন লোক আসতেন। আমরা তাঁকে ‘‘হাকিম চাচা’’ বলে ডাকতাম। মোটর সাইকেলে তিনি ঢাকা শহর চষে বেড়াতেন। নেতাদের বাড়িতে তাঁর যাতায়াত ছিল। ৩ নভেম্বর তিনি আমাদের বাসায় এসে বললেন, জেলখানায় গোলাগুলির শব্দ শুনেছেন। আব্বা আরও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। খুব ব্যস্ত হয়ে গেলেন। তাজউদ্দীন চাচার বাসায় গেলেন। শামসুল ইসলাম খানের (পরবর্তীতে বিএনপির শিল্পমন্ত্রী) বাসায় প্রয়াত নেতাদের কুলখানি হলো। নিরবে নিভৃতে। এর আগে অক্টোবরের শেষদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছিল।’ 

অগাস্ট ট্র্যাজেডির সময় ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। কিন্তু এই ঘটনার পরে আদালতে কাজ হচ্ছিল না। তিনি ওই ঘটনার পর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৬ সালের ১৫ মার্চ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছে পদত্যাগপত্র লেখেন।

ছোট মেয়ে মেরিনা আহমেদ জানান, ১৫ অগাস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরপরই তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পদত্যাগপত্রেও ফকির সাহাবউদ্দীন লিখেছেন যে, তিনি যে এই পদে থাকতে চান না, সেটি আগেই রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছিলেন। এরপর ১৯৭৬ সালের ৮ মার্চ বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ মার্চ তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পেশ করেন—যেখানে অনুরোধ করা হয় যে, পয়লা এপ্রিল থেকে যেন তার পদত্যাগ কার্যকর হয়, যদি এর আগে সম্ভব না হয়। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ ১৯৭৬ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন। তার মানে পয়লা এপ্রিলের আগেই তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়।

তবে ঠিক কী কারণে তিনি পদত্যাগ করলেন, সেটি এই চিঠিতে উল্লেখ করেননি। বিচারপতি সাত্তারের সঙ্গেই বা তাঁর কী কথা হয়েছিল তাও জানা যায় না। তবে তাহমিনা জাকারিয়ার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হন। তাঁকে হত্যার পরে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করে, তাদের অধীনে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাননি। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন: অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি তাঁর মেয়াদকালে দেশের স্বার্থে আইন ও নৈতিকতা মেনে চলার চেষ্টা করেছেন। নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছেন।

পারিবারিক জীবন: যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ ৪ নভেম্বর

ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদের শাশুড়ির নাম হাকিমুন নেছা। তাঁর শ্বশুর ময়মনসিংহের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মীর আহম্মদ আলী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ লেজিসলেটিভ এসেম্বলির সদস্য (এম.এল.এ)। তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে ‘কালা মৌলভী’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৫৪ সালের ৪ নভেম্বর ফকির সাহাবউদ্দীন এই দম্পতির মেয়ে আয়েশা আক্তারকে বিয়ে করেন।

তাহমিনা জাকারিয়া বলেন, ‘আব্বার জীবনে ৪ নভেম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। কেননা ১৯৫৪ সালের ৪ নভেম্বর তিনি বিয়ে করলেন, আবার ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হলো। যে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির তিনি ছিলেন একজন সদস্য।’ তাহমিনা বলেন, ‘মা-বাবার ভীষণ প্রেম ছিল। আব্বা যেমন সুদর্শন ছিলেন, প্রায় ৬ ফুট লম্বা, মাও সেরকম সুন্দর। তাঁরও উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। একটা পারফেক্ট কাপল।’

এই দম্পতির সাত সন্তান। তাঁরা হলেন ১. তাহমিনা জাকারিয়া (ছন্দা), ২. সেলিনা সামাদ চৌধুরী (স্বপ্না), ৩. সুলতানা হোসেন (পান্না), ৪. ফকির সালাউদ্দিন আহমেদ (পাশা), ৫. মেরিনা আহমেদ (টিপু), ৬. ফকির সাদউদ্দিন আহমেদ (মিশা), ৭. ফকির সামিউদ্দিন আহমেদ (শিশু)।

ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদের কোনো সন্তান রাজনীতিতে যুক্ত হননি। সবাই দেশের বাইরে থাকেন। তবে তাহমিনা জাকারিয়া প্রায় ৩০ বছর ধরে দেশে আছেন। মেরিনা আহমেদ মাঝেমধ্যে দেশে আসেন।

‘পরের তরে’ সাহাবউদ্দীন আহমদ 

মেরিনা আহমেদ বলেন, ‘আব্বা রাজনীতি করতেন গ্রামের মানুষের জন্য। আমার মনে পড়ে না আমাদের বাসায় কখনো শুধু পরিবারের লোকজনই খাবার খেয়েছি। প্রতিদিনই খাবার টেবিলে গ্রামের বাড়ির লোকেরা কেউ না কেউ থাকতেন। সবাই যে আত্মীয় তাও নয়। যিনিই এসেছেন, আমাদের বাড়িতে না খেয়ে যাননি। আমরা সবার সাথে এক টেবিলে বসে খেতাম। কার কী পরিচয়, কার কী সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা, সেটি আব্বা কখনো বিচার করেননি। একেবারে প্রান্তিক মানুষের সাথেও আমরা একসঙ্গে খেয়েছি।’

একই কথা বলেছেন বড় মেয়ে তাহমিনা জাকারিয়া। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের বাড়িটা ছিল গ্রামের মানুষের বড় আশ্রয়। ব্যারিস্টার রফিকুল হক ছিলেন আমাদের পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি বলতেন, এই টেবিল কখনো কেউ খালি দেখেনি। আমরা আসলে দুয়ার ছাড়া বাড়িতে বড় হয়েছি। কে আপন চাচা কে বাবার বন্ধু চাচা—এটা কখনো মাথায় আসেনি। আমাদের বাড়িটাকে আমার মনে হতো কমলাপুর রেলস্টেশন।’

তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের মায়েরা দারুণ ছিলেন বলে আমাদের বাবারা অনেক কাজ করতে পেরেছিলেন। ঘরের চিন্তা কম ছিল বলে তাঁরা দেশের জন্য এত কিছু করতে পেরেছেন।’

মেরিনা আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বাবারা তো আমাদের জীবন থেকে হারিয়েই গিয়েছেলেন। তাঁরা যে ফিরে এসেছেন, আমরা যে বেঁচে আছি, এটিই বিরাট সৌভাগ্যের।’

ফকির সাহাবউদ্দীনের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন সংবিধান প্রণয়ন কমিটির আরেক সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল মোমিন। তাঁর কাছ থেকে তাহমিনা জাকারিয়া শুনেছেন, একজন ভালো আইনজীবী হওয়ায় ফকির সাহাবউদ্দীন নানা সময়ে দলকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। বিশেষ করে দলের কারাবন্দি কর্মীদের পরিবারকে। যদিও নিজের পরিবারের সাচ্ছন্দ্যের কথা কখনো ভাবেননি।

দৃষ্টিশক্তিহীন জীবনের শেষ দিনগুলো

১৯৭৯ সালের নির্বাচনের পর থেকে ফকির সাহাবউদ্দীনের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে থাকে। ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরে চোখের অপারেশন হয়। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মোটামুটি দেখতেন। ১৯৮৫ সালে আলো-অন্ধকার। কিন্তু এরপর শেষ চার বছর একেবারেই দেখতেন না।

মেরিনা আহমেদ জানান, আশির দশকে একটি বড় মামলায় লড়ছিলেন তাঁর বাবা। ব্যাংকারদের কোনো এটা ইস্যু ছিল। তিনি ছিলেন সেই মামলার প্রধান কৌঁসুলি। তখন তাঁর গ্লুকোমা (চোখের একধরনের রোগ) হয়। একদিন আদালতেই তাঁর জুনিয়রকে বললেন, ‘আমি চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।’ তখন ডাক্তারের কাছ যান। ডাক্তার বললেন অপারেশন করতে হবে এবং তাঁকে বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দেন। যেহেতু বড় একটি মামলা চলছিল, তাই তিনি বিদেশে যাননি। দেশেই অপারেশন হয়। কিন্তু তিনি দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে পাননি। মেরিনা আহমেদ বলছেন, ‘আমাদের ধারণা অপারেশনটা ভুল হয়েছিল।’

চোখে দেখতে না পেলেও আদালতের কাজসহ অন্য সব কাজেই যুক্ত ছিলেন ফকির সাহাবউদ্দীন আহমদ। জুনিয়ররা তাঁকে আদালতে নিয়ে যেতেন। তিনি মামলার ডিকটেশন দিতেন। প্রতিদিন সকালে ৪-৫টা পত্রিকা তাঁকে পড়ে শোনানো হতো। সন্তানরা অনেক সময় ভালো বই পেলে পড়ে শোনাতেন। মেরিনা আহমেদের ভাষায়, ‘আমরা কখনো ফিল করিনি যে আব্বা অন্ধ হয়ে গেছেন। সবকিছুই করতেন।’

১৯৮৯ সালের নভেম্বরের শেষদিকের ঘটনা। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়েছিলেন একজন বন্ধুর বড় ভাইয়ের চিকিৎসার খোঁজ নিতে। নিজে চোখে দেখতেন না। কিন্তু তারপরও এইসব সামাজিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকেনি। রাতে বলেছিলেন পেটে গ্যাস হয়েছে। নিরাময়ের জন্য আদাও খেয়েছেলিন। কিন্তু ওই ব্যথা নিয়ে সকাল পর্যন্ত বাসায় থাকেন। সকালে একজন ডাক্তারকে ফোন করেন। তিনি লক্ষণ শুনে বললেন দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে যেতে। সেখানে ইসিজি করানো হয়। অবস্থা খারাপ দেখে সঙ্গে সঙ্গে পাঠানো হয় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে—যেখানে আগের দিন গিয়েছিলেন আরেকজনের চিকিৎসার খোঁজ নিতে। আজ সেখানে তিনি নিজেই রোগী হয়ে ভর্তি। ওখানে যাওয়ার পরে ৬৮ ঘণ্টা বেঁচেছিলেন।

তাহমিনা জাকারিয়া বলছেন, ‘হাসপাতালে মৃত্যুর আগের দিনও আব্বা শেভ করেছেন। কিন্তু শেষ তিন চার ঘণ্টায় ঘন ঘন দুটি ম্যাসিভ অ্যাটাক হয়। ওই অবস্থায়ও যাঁরা তাঁর সাথে ছিলেন তাঁদেরকে বললেন, গরম লাগছে। ফ্যানটা বাড়িয়ে দাও। ফ্যান বাড়ানোই ছিল। আব্বা তাঁদেরকে বললেন, তোমরা এখন একটু বিশ্রাম করো। এর ১৫ মিনিটে মধ্যে তিনি চলে গেলেন।’ ২৯ নভেম্বর ১৯৮৯।

মেরিনা আহমেদ বলেন, ‘আব্বার মৃত্যুর ৪০ দিন আগে আমি দেশে আসি। খাবার টেবিলে কেন যেন মৃত্যু নিয়ে কথা উঠলো। আসলে আমরা খাবার টেবিলে বসে অনেক গল্প করতাম। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কবর কোথায় হবে? আব্বা পরিষ্কার বললেন, গ্রামের বাড়িতে। ফলে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে দাফন করা হয়েছে কাপাসিয়ার ঘাগটিয়ায় আমাদের গ্রামের বাড়িতে।’

ফকির সাহাবউদ্দীনের মৃত্যুর তিন বছর পরে মারা যান তাঁর মা শায়েস্তা খাতুন। তাঁকে সমাহিত করা হয় ছেলের কবরের পাশে।

সাহাবুদ্দীনের মৃত্যুর মাস কয়েক পরে তাঁর স্ত্রীর স্ট্রোক হয়। কোমায় ছিলেন। এ সময় সন্তানরা শিশুর মতো তাঁকে আগলে রাখতেন। সন্তানদের কেউ না কেউ তাঁর সঙ্গে থাকতেন। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। কিন্তু ২০১৪ সালে দেশে চলে আসেন। বিদেশে থাকতে চাইতেন না। ২০১৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁরও শেষ ঠিকানা হয় স্বামীর কবরের পাশে।