মাটির খেলা থেকে স্ক্রিন প্রজন্ম: গল্প হয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা
একসময় গ্রামের মাঠে দৌড়াদৌড়ি, বৌছি, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা আর ঘুড়ি উড়ানো ছিল শৈশবের আনন্দময় স্বরূপ। আজ সেই আনন্দ হারিয়ে গেছে মোবাইলের স্ক্রিনে—শুধু খেলা নয়, হারাচ্ছে গ্রামীণ শৈশব এবং সংস্কৃতির প্রাণও।
সময়ের হিসেবে খুব বেশি নয়, মাত্র কয়েক দশক আগের কথা। তখনো গ্রাম-গঞ্জে চোখে পড়ত শিশু-কিশোরদের হৈ-হুল্লোড়, দৌড়াদৌড়ি। খেলার এত রকমফের ছিল যে সবগুলো গুণে বের করতে হিমশিম খাওয়া লাগত। আশির ও নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা মানুষের কাছে সেসব এখন শুধুই স্মৃতি।
রতন পোদ্দার, ষাট পেরোনো এক মানুষ, চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে স্মৃতিমেদুর কণ্ঠে বলছিলেন সেই দিনগুলোর কথা— “আমরা তখন সকাল আর সন্ধ্যা—এই দুবেলা পড়াশোনা করতাম। এটাই ছিল আমাদের রুটিন। বাবার সাথে মাছ ধরতে যেতাম কখনও-সখনও। বাকি সময় ঘুড়ি উড়িয়ে, দাড়িয়াবান্ধা, কানামাছি ও লুকোচুরি খেলে কাটিয়ে দিতাম। ‘মাটির দোকান’ সাজিয়ে মিছিমিছি বেচাকেনা করতাম। এই রকম কত খেলাধুলা যে করতাম—এক খেলা শেষ হতে না হতেই আরেক খেলা শুরু হতো। ছেলে-মেয়ে সবাই মিলে একসাথে খেলতাম। সন্ধ্যার আগে কেউ ঘরে ফিরত না। সন্ধ্যার পরে আবার বাইরে থাকার অনুমতি ছিল না। মোবাইল ফোন তো দূরের কথা রেডিও- টেলিভিশন পর্যন্ত ছিল না। মাঝেমধ্যে সন্ধ্যের পর যাত্রাপালা দেখতে যেতাম, সে-ও বড়দের সাথে। এই এলাকাতেই—পাবনার বেড়ার নাকালিয়ায়—অনেক যাত্রা হতো। এখন তো ছেলেমেয়েদের খেলার জায়গাও নেই, আর এসব খেলার প্রতিও তাদের কোনো আগ্রহ দেখি না।”
শেষ কথাগুলো বলতে বলতে আফসোস মিশে যায় তার কণ্ঠে। তার কথা শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, সত্যি তাই যুগের চাকা এগিয়ে চলেছে, আমাদেরও এগোতে হয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের বিশ্বাস, মেধা আর শারীরিক পরিশ্রমের সক্ষমতা।
একসময় যখন ক্যালকুলেটর ছিল না বা তেমন ব্যবহার হতো না, তখন হিসাবের জন্য মানুষ মগজখাটাত। তখন সময় লাগলেও সহজ হিসাবগুলো দ্রুতই করতে পারতাম আমরা।
কিন্তু যখন ক্যালকুলেটরের বহুল ব্যবহার শুরু হলো, তখন থেকে সহজ হিসেবের জন্যও যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। এতে সময় ও নির্ভুলতার দিক থেকে সুবিধা হলেও, ধীরে ধীরে আমরা অলস হয়ে উঠেছি।
আজকের দিনে এমনকি দুইয়ে দুই যোগ করার জন্যও অনেকে ক্যালকুলেটর খোঁজে।
পরিশ্রম করতে আমরা আর আগ্রহী নই, চিন্তা করতে চাই না, মগজ ব্যবহার করতে যেন ভয় লাগে। প্রযুক্তি আমাদের শুধু অলসই করেনি, অনেক সময় বিরক্তিকরও করে তুলেছে।
রাত গভীর হলে যখন মোবাইলের রিংটোন বেজে ওঠে, তখন সেটা ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে অনেকে সারাক্ষণ চিন্তিত থাকে। অথচ একসময় আমাদের জীবন এতটা ব্যস্ত, একঘেয়ে, আর প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না।
গ্রামের থাকার কারণে আমি এখনো কিছু কিশোর-কিশোরীকে খেলাধুলা করতে দেখি। তারা এখনো কিছু পুরনো খেলা খেলতে পারে, তবে সময় খুব সীমিত।
এই চিত্র গ্রাম আর শহরে ভিন্ন। শহরের অধিকাংশ শিশুই এসব গ্রামীণ খেলা চেনে না, খেলেও না। ওদের সময় কাটে স্কুল, প্রাইভেট, কোচিং, মোবাইল ফোন আর চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি জীবনে। এটাই তাদের 'বিনোদন' হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলার মাঠ নেই, উপযুক্ত পরিবেশও নেই। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা একটা বড় প্রশ্ন। অভিভাবকরাও চান না যে সন্তানরা বাইরের মুক্ত পরিবেশে গিয়ে বিপদে পড়ুক।
শিশুদের সামনে কেবল প্রতিযোগিতা, প্রতিযোগিতা আর প্রতিযোগিতা। খেলার নামে শহরের ছেলেরা হয়তো কিছুটা ক্রিকেট বা ফুটবল খেলে, কিন্তু অন্য কোনো খেলার চর্চা নেই বললেই চলে। আর মেয়েরা তো প্রায় ঘরের কোণেই থেকে যায়।
গ্রামের কিশোর-কিশোরীদের এখনও কিছুটা স্বাধীনতা আছে। অনেক জায়গায় তাদের স্কুলের মাঠে ছুটোছুটি করতে দেখা যায়। তারা এখনো কয়েক দশক আগের কিছু খেলা খেলে, যেমন—দাঁড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি কিংবা ঘুড়ি ওড়ানো।
একটি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলতে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থী বলছিল—"আমরা মেয়েরা শুধু স্কুলেই এভাবে দৌড়াদৌড়ি করে খেলতে পারি। বাইরে নয়।"
তারা জানায়, স্কুলের বাইরে ছেলেরা কেউ কেউ মাছ ধরা, ঘুড়ি ওড়ানো কিংবা অন্যান্য ছোটখাটো খেলা খেলে। তবে প্রশ্ন করলে দেখা যায়, দু’-তিনটি খেলার বাইরে আর কোনো খেলার নামই বলতে পারে না।
মাত্র কয়েক দশক আগেও গ্রামীণ মাঠে তাকালেই চোখে পড়ত ছেলেমেয়েদের প্রাণোচ্ছল খেলার দৃশ্য। কত রকম খেলা ছিল, কত নাম! অনেকগুলোর নাম আজ আর মনেও পড়ে না।
একই খেলা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল, আর তাতেও ছিল নিজস্বতা, বৈচিত্র্য।
গ্রামীণ এসব খেলাধুলায় ছিল না কোনো কৃত্রিমতা—ছিল নিখাদ আনন্দ আর সরলতা। জয়-পরাজয় থাকলেও তার পেছনে ছিল না কোনো শাণিত প্রতিযোগিতা বা জটিল অঙ্কের হিসাব।
সেসময়ের জনপ্রিয় কিছু খেলার নাম: দাঁড়িয়াবান্ধা, কানামাছি, গোল্লাছুট, ঘুড়ি ওড়ানো, গোশত চুরি, বৌছি, আতা-পাতা, ইচিং-বিচিং ইত্যাদি। এমন অসংখ্য খেলায় মেতে থাকত কিশোর-কিশোরীরা। এগুলো শুধু সময় কাটানোর উপায় ছিল না, বরং মনের প্রশান্তি ও সামাজিক বন্ধনের মাধ্যম।
নৌকা বাইচের মতো কিছু খেলাধুলা আজও টিকে আছে, তবে নদীর বুক সংকুচিত হয়ে আসায় সেটিও কতদিন থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তাছাড়া আগের মতো দক্ষ মাঝি নেই, নেই ঐতিহ্যবাহী পালতোলা নৌকা। মাছ ধরা ছাড়া এখন আর নৌকার প্রয়োজনও তেমন একটা পড়ে না।
এইসব খেলাধুলা ছিল প্রযুক্তিহীন কিন্তু প্রাণবন্ত।
আরও একটা বিষয় ছিল খুবই স্বাভাবিক—ছেলে-মেয়ে মিলে খেলা করা। তাও শুধু ছোট বয়সে নয়, অনেকটা বড় হয়েও।
আজ যা কল্পনাই করা যায় না, সেসময় ছিল একেবারে স্বাভাবিক বিষয়। যারা গ্রামে বড় হয়েছেন, তারা জানেন—সামাজিকভাবে মিলেমিশে বেড়ে ওঠার যে মনন তা ছিল সম্পূর্ণ ইতিবাচক ও উন্মুক্ত।
আমরাও ছেলেমেয়ে মিলেই প্রতিদিন দল বেঁধে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে লাফালাফি, হাসি-ঠাট্টা—সবকিছুই ছিল খেলারই অংশ।
আজকের প্রজন্ম এসব খেলার নামও জানে না, আগ্রহ তো দূরের কথা। কারণ খেলার জগৎ এখন তাদের ঘরের ভেতর—মোবাইল, ট্যাব, কিংবা কম্পিউটারের স্ক্রিনে।
আজকের কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনে ভরে আছে দুর্দান্ত সব গেমসে—উত্তেজনায় ঠাসা, নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেওয়া খেলা। কিছু গেম তো এতটাই সহিংস ও প্রাণঘাতী যে অনেক দেশে সেগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন প্রাণনাশক খেলাও বাস্তবে নয়, ভার্চুয়াল স্ক্রিনেই। শিশু-কিশোররা এগুলোর মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছে।
যদি গ্রাম টিকে থাকে, তবেই তো টিকে থাকত গ্রামীণ খেলাধুলাও। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আজকের গ্রামগুলোও শহরের রূপ নিতে শুরু করেছে। শহরায়নের ছোঁয়া খেলাধুলাকেও পাল্টে দিয়েছে।
যে গ্রামীণ সমাজে একসময় ছিল নির্মলতা, সহজ-সরল জীবনের ছোঁয়া, সেই মানুষগুলো আজ কঠোর বাস্তব আর লাভ-ক্ষতির অঙ্কে আটকে গেছে। প্রতিটি কথা, প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে শুধুই হিসাব—মন থেকে নয়, মুনাফার মানদণ্ডে।
তাই গ্রামীণ খেলাধুলা না থাকলেও আমাদের ক্ষতি নেই—আমরা যেন এমনটাই ধরে নিয়েছি!
কিন্তু এই সব বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা হয়তো সাহেবদের কাতারে দাঁড়াতে চেয়েছি, অথচ হারিয়ে ফেলেছি নিজেদের শিকড়, নিজস্বতা এবং ঐতিহ্য।
কানামাছি, বৌচি, দাঁড়িয়াবান্ধা আজ বিস্মৃতির অতলে—তাদের জায়গা নিয়েছে ক্রিকেট, ফুটবল, কিংবা আরও 'ভদ্রলোকি' খেলা।
বিশেষ করে পশ্চিমা স্টাইলের ক্রিকেট আমাদের নিজস্ব খেলাগুলোকে একরকম ভুলিয়ে দিয়েছে। সাহেবদের খেলা আজ বিশ্বজোড়া—আর আমাদের মাঠ ফাঁকা।
গ্রামীণ খেলাধুলা যেমন আমাদের আনন্দ দিত, ঠিক তেমনি গ্রামের বিনোদনের ধরনও ছিল একদম আলাদা। তখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না, স্যাটেলাইট চ্যানেল তো দূরের কথা। বিটিভি-নির্ভর সেই এক চ্যানেলের যুগেও গ্রামের মাঠভরা খেলাধুলার কোনো ঘাটতি ছিল না।
এখনকার আধুনিক খেলাধুলার প্রতি গ্রামের সহজ-সরল মানুষের তেমন আগ্রহ ছিল না, কারণ তাদের বিনোদনের উৎস ছিল আরও প্রাণবন্ত, মাটির গন্ধমাখা।
যাত্রাপালা ছিল সেই সময়ের প্রধান বিনোদন। কোনো গ্রামে যাত্রাপালা হলে তা হতো একেবারে উৎসবমুখর আয়োজন। মাসখানেক ধরে চলত অভিনয়ের রিহার্সাল। পুরো গ্রাম যেন ঢেউয়ের মতো জেগে উঠত। নারী-পুরুষ সবাই থাকত উৎসাহে ভরপুর। চারদিকে থাকত সাজ সাজ রব, যেন এক মহোৎসব।
এখন যেমন রিমোট হাতে চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে ক্লান্তি আসে, তবু ভালো কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না—তখন এমনটা ছিল না।
আসলে, আমরা নিজের অজান্তেই এই আধুনিকতায় বিরক্ত হয়ে পড়েছি। যাত্রা ছাড়াও ছিল পালাগান, কুস্তির লড়াই, বায়োস্কোপ—এগুলোই ছিল বিনোদনের নামান্তর।
বিনোদনের মানে তখন ছিল একসঙ্গে দেখা, একসঙ্গে মজা করা, আর মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদ্যতা গড়ে তোলা। এখন, একেকজন একেক কোণায় বসে চোখ গেঁথে রাখে মোবাইলের পর্দায়।
গ্রামীণ খেলাধুলা ও গ্রামীণ সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়—এগুলো আমাদের শেকড়, আত্মপরিচয় এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ। আজও বাংলাদেশের কোনো কোনো দূরবর্তী গ্রামে হয়তো এসব খেলার চর্চা দেখা যায়, কিন্তু সংখ্যায় তা খুবই নগণ্য।
যেভাবে এই সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে, তাতে নতুন প্রজন্ম আদৌ এগুলোর অস্তিত্ব টের পাচ্ছে কি না—সে নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
আমরা যতই আধুনিকতার দিকে এগোচ্ছি, ততই যেন নিজেদের স্বকীয়তা, সহজাত সংস্কৃতি আর শৈশবের নির্মলতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি।
বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর যে খেলাগুলো খেলছে—সেগুলো মানসিক প্রশান্তি দেওয়ার বদলে মনে সৃষ্টি করছে উদ্বেগ, অস্থিরতা ও নেতিবাচক চিন্তার ঢেউ।
ফলে তারা হয়ে উঠছে একরোখা, অসহিষ্ণু, বদমেজাজী এবং একাকিত্বে ভোগা এক ‘স্ক্রিন প্রজন্ম’।
এই খেলাগুলোর সাময়িক উত্তেজনা হয়তো বিনোদনের ভান দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি করছে আমাদের সন্তানদের।
অন্যদিকে, আমাদের সেই নির্মল গ্রামীণ খেলা, যা মানুষকে যুক্ত করত, আনন্দ দিত, শেখাত সহনশীলতা ও বন্ধন—তা আজ আধুনিক সভ্যতার চাপে বিলুপ্তির পথে।
শুধু খেলাই নয়, গ্রামীণ সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে—যার অর্থ, আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের আত্মা।
