Published : 04 May 2026, 10:59 PM
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিরুদ্ধে চীন এমন একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ১৯৮৫ সালে জাপান নিতে পারেনি। চীন ২০২১ সালে একটি আইন প্রণয়ন করেছিল যা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের ঘোষণার আগপর্যন্ত তারা কার্যকর বা প্রয়োগ করেনি। তবে ওই আইনটিকে তারা এখন কার্যক্ষেত্রে সামনে এনেছে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে, তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্বীকার করবে না। আজ থেকে ৪০ বছর আগে এই একই ধরনের চাপের মুখে, মার্কিন অন্যায় নীতির কাছে জাপান পিছু হটেছিল, কিন্তু চীন পিছু হটেনি বরং পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে। এইবার ওই বিষয়টির একটু ব্যাখ্যা করা যাক।
সম্প্রতি ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, পরমাণু চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ওপর কঠোর অবরোধ চলবে। ওই একই দিনে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেন, ‘স্থায়ী ক্ষতি’ (permanent damage)। এই শব্দ দুটি উচ্চারিত হয়েছিল খার্গ দ্বীপকে লক্ষ্য করে, যা ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র।
আরোপিত মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান থেকে তেলবাহী জাহাজ লোড করা সম্ভব হবে না, ফলে তেলের মজুত বাড়তে থাকবে। একসময় মজুত পরিপূর্ণ হয়ে গেলে উৎপাদন বন্ধ করে রাখা ছাড়া ইরানের আর কোনো উপায় থাকবে না। সমস্যার শুরু মূলত এখানেই। দীর্ঘ সময় তেল উৎপাদন বন্ধ থাকলে কূপের চাপের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং উৎপাদন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে মাস বা বছর লেগে যেতে পারে। এটাই হচ্ছে স্কটের ওই ‘স্থায়ী ক্ষতির’ হিসেব। এর মাধ্যমে ইরানের তেল অবকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত করাই তাদের উদ্দেশ্য।
এ পর্যন্ত বিষয়টি ইরানকে ঘিরে মনে হলেও আসল উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন। আসল লক্ষ্য হচ্ছে চীন। চীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ উৎপাদন কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এ কথা সবারই জানা। কিন্তু যে কথাটি সবার জানা নেই তা হলো, তাদের এই বৃহৎ ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে ব্যবহৃত তেলের প্রায় ৭৩ শতাংশই তাদের আমদানি করতে হয়।
আর বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সস্তায় তেল বিক্রি করছে কে? মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা ইরান। কেন তাদের তেল সস্তা? কারণ, কোনো বিক্রেতার দর কষাকষির ক্ষমতা না থাকলে তাকে সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়, আর ক্রেতা লাভবান হয়। সেখানে সেটাই ঘটছে।
প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল ইরান থেকে চীনে যায়, বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে। এটাই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের উৎপাদন প্রতিযোগিতায় সুবিধা দেওয়ার এক অদৃশ্য জ্বালানি। ডনাল্ড ট্রাম্প এই সমীকরণ ভালোভাবে বুঝেছেন। তাই তিনি সরাসরি চীনের ওপর চাপ না দিয়ে তার জ্বালানি উৎসের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছেন। যদি ইরানের উৎপাদন দীর্ঘ সময় কম থাকে, তাহলে চীন আগের মতো সস্তায় তেল পাবে না। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাবে এবং রপ্তানি আয় ধীরে ধীরে কমে যাবে। এটাই হচ্ছে ইরানকে ঘিরে চীনকে আটকে ফেলার ট্রাম্পের কূটকৌশল।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র এই চেইনের একটি অংশে আঘাত হানে। তারা একটি বেসরকারি চীনা রিফাইনারি হেংলি পেট্রোকেমিক্যালসহ প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠান ও ট্যাঙ্কারকে একসঙ্গে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করেছে। হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বেসরকারি খাতের। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হলে চীন সরকার একে সরাসরি পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করত এবং তার প্রতিশোধ প্রায় নিশ্চিত ছিল। বেসরকারি খাত বেছে নেওয়ার মাধ্যমে বার্তাটি তুলনামূলকভাবে মৃদু মনে হলেও তারা আসলে বলতে চায়, চীনের কোম্পানিগুলো যদি ইরানের তেল কিনতে থাকে, তবে তার মূল্য দিতে হবে।
এই ঘোষণা ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা যে সময় নির্ধারণ করেছে তা গুরুত্বপূর্ণ। ডনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে এটি হচ্ছে চীনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত চাপ। তাদের ধারণা ছিল, চীন হয়তো নীরবে নিষেধাজ্ঞা মেনে নেবে। কিন্তু গত শুক্রবার চীনের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।
চীন প্রথমবারের মতো তাদের ২০২১ সালের ‘বৈদেশিক অবরোধ বিরোধী আইন’ (Anti-Foreign Sanctions Law) কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। এই আইনের মূল কাঠামো সহজ; যদি যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশ চীনের কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তবে চীন ওই নিষেধাজ্ঞা অস্বীকার করতে পারবে এবং তার প্রয়োগ নিষিদ্ধ করতে পারবে। চীনে কার্যরত কোনো কোম্পানি এসব নিষেধাজ্ঞা মানতে বাধ্য নয়; মানলে তা চীনা আইন ভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে।
চীনের আদালত এই ব্যবস্থাকে অতি সম্প্রতি সক্রিয় করেছে। এতে হেংলি পেট্রোকেমিক্যালের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চীনের ভেতরে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ট্যাঙ্কার মালিক, বিমা কোম্পানি, ব্যাংক বা মধ্যস্থতাকারী যদি এই নিষেধাজ্ঞার কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে চীনা আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা হতে পারে। এটাই চীনের প্রকৃত অস্ত্র, নিজস্ব বাজারের আকারকে আইনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। এর বাস্তব অর্থ হলো, এখন প্রতিটি ট্যাঙ্কার মালিক, বিমা কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে; যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, নাকি চীনের বাজার?
এই পদক্ষেপের গুরুত্ব বুঝতে হলে ১৯৮৫ সালের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৮৫ সালে ‘প্লাজা অ্যাকর্ড’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ইয়েনকে শক্তিশালী করে তাদের রপ্তানির প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয়। এরপর শুরু হয় জাপানের অর্থনীতিতে স্থায়ী স্থবিরতা এবং হারিয়ে যায় তাদের উন্নয়নের ত্রিশটি বছর। চীন গত ৪০ বছর ধরে এই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করেছে। তাদের কৌশলের কেন্দ্রে একটি মূলনীতিই ছিল, জাপানের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা। এবং চীন ঠিক সেটাই করছে।
চীনের আজকের ‘না’ ওই নীতিরই বাস্তব প্রয়োগ। ২০২১ সালে এভারগ্র্যান্ড গ্রুপ ধসের মাধ্যমে চীনের রিয়েল এস্টেট খাত দুর্বল হয়ে গেছে, এখন তাদের প্রধান ভরসা উৎপাদন ও রপ্তানি। সস্তা জ্বালানি হারালে ওই ভিত্তিও নড়বড়ে হয়ে যাবে। এবার চীন যুক্তরাষ্ট্রের ওই ফাঁদ ও পথ প্রত্যাখ্যান করেছে।
এমন বাস্তবতায় এখন সামনে সম্ভাব্য চারটি পরিস্থিতি চিন্তা করা যায়: ১. ডনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি চীনের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করতে পারেন এবং এতে পরিস্থিতি দ্রুত অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ২. দুই পক্ষই কঠোর অবস্থানে থেকে ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে শক্তি প্রদর্শন চালিয়ে যেতে পারে। ৩. যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় চীনা রিফাইনারির ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়ালে এবং চীন পাল্টা আইনি ব্যবস্থা নিলে উত্তেজনা বহুগুণ বাড়বে। ৪. কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে উত্তেজনা কমিয়ে এনে বিষয়টিকে স্বাভাবিক রাখা।
চীন বরাবরই বলে আসছে, জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া একতরফা কোনো নিষেধাজ্ঞা তারা মানবে না। বিশেষ করে ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’ বা অন্য দেশের ওপর খবরদারি করার মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে চীন এখন শক্ত অবস্থানে। ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই দাবার চাল আসলে এক বিশাল বৈশ্বিক লড়াইয়ের অংশ। এই খেলা সহজে থামার নয়।