Published : 05 May 2026, 02:54 PM
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের এই ফলাফল কোনো সাধারণ ক্ষমতার রদবদল নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার বহুত্ববাদী সমাজের ওপর এক আসন্ন সাম্প্রদায়িক বিপর্যয়। গত এক দশক ধরে যে সূক্ষ্ম বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, ৪ মে তার শাখা-প্রশাখা আমাদের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে। এই জয় উন্নয়ন কিংবা সুশাসনের জয় নয়। চিন্তা করলেই দেখতে পাওয়া যায়, এটি একটি সুসংগঠিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ‘ঘৃণার রাজনীতি’ বা ‘হেইট পলিটিক্স’-এর বিজয়। গেরুয়া বিজয়ের উৎসব যখন ঘৃণার ভাষণে মুখর হয়, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের কপালে এটি এক জ্বলন্ত কলঙ্কতিলক হয়ে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের মসনদে এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তির অভিষেক কি শুধু পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের জন্য একটি রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন, নাকি গোটা অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর এক ‘মৃত্যুপরোয়ানা’? আমাদের বর্তমান নীরবতা কি ভবিষ্যতে এক অপূরণীয় আত্মাহুতির পথ প্রশস্ত করবে? এই প্রশ্নগুলো আজ প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের বিবেকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিজেপির এই জয়ের নেপথ্যে যে প্রধান অস্ত্রটি ব্যবহৃত হয়েছে, তা হলো তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’ কার্ড। কিছু মানুষকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘ঘুষপেটিয়া’ হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে বিজেপি এক নোংরা খেলা খেলেছে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বীভৎস সীমান্ত রাজনীতি। নির্বাচনি প্রচারণার প্রতিটি পর্বে আমরা দেখেছি, কীভাবে লাখ লাখ মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহ করে ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে।
স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর-এর নামে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে; তা কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে তাদের রাষ্ট্রহীন করার নীল-নকশা। এই লাখ লাখ মানুষ কি রাতারাতি উধাও হয়ে যাবে? তাদের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে সীমান্তে এক মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিতে পারে, যা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করবে। এই মানুষগুলোকে যদি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মতো রাষ্ট্রহীন হিসেবে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে যে অস্থিরতা ও জনরোষের সৃষ্টি হবে, তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কি আমাদের রয়েছে?
বিজেপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগেই যে ধরনের উসকানিমূলক বয়ান দিয়েছে, তা সরাসরি ‘সাংস্কৃতিক নির্মূল প্রক্রিয়া’ বা ‘ইন্টেনশনাল মার্জিনালাইজেশন’-এর অংশ। জনসমক্ষে তারা মসজিদে মাইকে আজান নিষিদ্ধ করা, খোলা ময়দানে জুমার নামাজ বন্ধ করা এবং ধর্মীয় উৎসবে কোরবানি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল, যা তাদের নির্বাচনের প্রচারণার একটা অংশ ছিল। এগুলো শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে তাদের নিজস্ব মাটি ও সংস্কৃতি থেকে উৎখাত করার একটি বর্বর নীলকশা।
কোনো সভ্য সমাজে বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মৌলিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অধিকার কেন রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হবে? এটি স্পষ্টতই ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার কপালে এক জ্বলন্ত কলঙ্কতিলক। উত্তরপ্রদেশ কিংবা আসামের ‘বুলডোজার কালচার’ এখন পশ্চিমবঙ্গের দোরগোড়ায়।
আমাদের কি ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির নেলি গণহত্যার কথা মনে আছে? এটি আসামের ইতিহাসে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এক কলঙ্কিত দিন। মাত্র ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে আসামের নগাঁও জেলার নেলি এবং পার্শ্ববর্তী ১৪টি গ্রামে চালানো হয়েছিল নারকীয় তাণ্ডব। সেদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলেছিল ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা। সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ২,১৯১ জন হলেও প্রত্যক্ষদর্শী এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে এই সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই গণহত্যার শিকার হওয়া প্রতিটি মানুষ ছিল নিরপরাধ এবং নিরস্ত্র, যাদের অধিকাংশ ছিল নারী ও শিশু। তাদের একমাত্র অপরাধ ছিল, তারা ছিল বাংলাভাষী মুসলিম।
এই ঘটনার কোনো বিচার হয়নি এখনো। ত্রিভুবন প্রসাদ তেওয়ারি কমিশনের ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্টটি আজও ভারতের কোনো সরকার জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। আমরা বাংলাদেশে অনেকেই জানি না, আসামে বাংলাদেশি বিদ্বেষের ইতিহাস বেশ পুরোনো। আমার আশঙ্কার জায়গাটি হলো, এই বিদ্বেষের রাজনীতি এখন আসামে সীমাবদ্ধ রইল না, তা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ভারতে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সময় আমরা দেখেছি, কীভাবে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে অনুপ্রবেশকারী ইস্যুকে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
সামনে যদি এমন সংকট আবার আসে, তবে তার মূল শিকার হবে বাংলাদেশ। বিজেপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বাংলাদেশকে যে ভাষায় সম্বোধন করছেন, তা কোনোভাবেই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ কূটনীতির অংশ হতে পারে না। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী যখন বাংলাদেশকে ‘গাজা উপত্যকা’র সঙ্গে তুলনা করেন কিংবা কয়েকটা ড্রোন দিয়ে ধ্বংস করার দম্ভোক্তি করেন, তখন বুঝতে হবে তাদের লক্ষ্য কেবল ক্ষমতা নয়, বরং এই অঞ্চলের সার্বভৌমত্বকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা যখন ‘পুশব্যাক’-এর নামে মানুষ শিকারের উৎসব করেন এবং বলেন যে ‘অসভ্য মানুষ নরম ভাষা বোঝে না’, তখন সেটি সরাসরি বাংলাদেশের আত্মসম্মানে করা আঘাত। এই উগ্র জাতীয়তাবাদ কেবল ভারতের অভ্যন্তরে নয়, বরং বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক উসকানি হিসেবে কাজ করবে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও পিছিয়ে নেই; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যখন প্রকাশ্যে বাংলাদেশিদের ‘উইপোকা’ বা ‘টার্মিটস’ বলে সম্বোধন করেন। মনে আছে বিজেপির শীর্ষ নেতা সুব্রামানিয়াম স্বামী বলেছিলেন, বাংলাদেশের কিছু অংশ দখল করে নেওয়া উচিত। এ ধরনের মন্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশ যদি এখনই এই পরিস্থিতির তীব্রতা অনুধাবন না করে এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
১৯৭১ সালে ভারতের তৎকালীন মানবিক ও সামরিক ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের মানুষ সবসময় সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতার মানে এই নয় যে, ভারত আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে এবং তাদের সরকারি দলের শীর্ষনেতা আমাদের পোকামাকড়ের সঙ্গে তুলনা করবেন।
পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের ওপর আসন্ন এই অস্তিত্বের সংকট কেবল একটি ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি একটি মানবাধিকার বিপর্যয়। ‘অখণ্ড ভারত’ পরিকল্পনায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অবস্থান কোথায়? হিন্দি আগ্রাসনের নিচে আজ বাংলা ভাষা কেবল কোণঠাসা নয়, রীতিমতন বিপন্ন। বাংলার অর্থনীতি ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ যখন গুজরাটি ও হিন্দিভাষী শক্তির হাতে চলে যাবে, তখন ওপার বাংলার সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আমরাও এর কুফল ভোগ করব। আমাদের মনে রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গের এই পরিবর্তন শুধু সীমানার ভেতরের বিষয় নয়; এটি দুই বঙ্গের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক ইতিহাসের ওপরও আক্রমণ।
এটি একটি পরিকল্পিত ফাঁদ, যেখানে ভারতের সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপরও আক্রমণের পরিস্থিতি তৈরি করা হতে পারে। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক চাল অনুধাবন করার মতো প্রজ্ঞা আমাদের নীতিনির্ধারকদের আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।
সময় আর বেশি নেই। বাংলাদেশ সরকারকে এখনই দিল্লির সঙ্গে দরকষাকষিতে আপসহীন হতে হবে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করা থেকে শুরু করে লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার প্রতিবাদে বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। ভারত যদি নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে দাবি করতে চায়, তবে তাদের কথাবার্তা ও সীমান্ত নীতিতে সেই আভিজাত্য এবং সভ্যতা থাকতে হবে।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক হোক সমমর্যাদার। ঘৃণা নয়, দুই দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি হোক।