Published : 16 Nov 2025, 04:21 PM
প্রতিবছর নভেম্বর মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বব্যাপী ‘ওয়ার্ল্ড ডে অফ রিমেমব্রান্স ফর রোড ট্রাফিক ভিকটিমস’ অর্থাৎ সড়কে হতাহতদের স্মরণে একটি বৈশ্বিক দিবস উদযাপিত হয়। বরাবরের মতো এ বছরও নভেম্বর মাসের তৃতীয় রোববার হিসেবে ১৬ নভেম্বর দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।
১৯৯৩ সালে যুক্তরাজ্যে সড়কে হতাহতদের জন্য কাজ করা দাতব্য সংস্থা ‘রোডপিস’ এ দিবস উদযাপন শুরু করে। ১৯৯৪ সাল থেকে ‘ইউরোপিয়ান ফেডারেশন অব রোড ট্রাফিক ভিকটিমস’—এর মাধ্যমে সমগ্র ইউরোপে এবং ১৯৯৫ সাল থেকে আফ্রিকা, এশিয়া, আমেরিকা মহাদেশে দিবসটি ছড়িয়ে পড়ে।
২০০৪ সালে জাতিসংঘ ‘রোড সেফটি কোলাবোরেশন ফোরাম’ প্রতিষ্ঠা করে এবং ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ফলে, এর আগে যেসব দেশে দিবসটি উদযাপিত হয়নি, সেসব দেশেও উদযাপন শুরু হয়। বৈশ্বিক পরিসরে সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে এটি এখন প্রধান বৈশ্বিক দিবস হিসাবে উদযাপিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এ দিবসটি উদযাপন করছে।
বাংলাদেশে গত ১৫ বছর ধরে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর উদ্যোগে সীমিত পরিসরে দিবসটি উদযাপন হলেও এখন অনেকগুলো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা উদযাপন করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), রোড সেফটি কোয়ালিশনের সদস্য সংগঠনসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এ দিবসটি উদযাপন করছে। ২০২৩ সাল থেকে ‘ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি’ এবং ‘ভাইটাল স্ট্রাটেজিস’—এর কারিগরি সহায়তায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি) এ দিবস উদযাপন করে আসছে।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘লস্ট ট্যালেন্টস’। সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু মানুষই অকালে মারা যায় না, এতদসঙ্গে তাদের জ্ঞান, মেধা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং সমাজে এসবের সম্ভাব্য প্রতিফলনের মতো বিষয়গুলোরও বিনাশ ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচে’ বেশি মারা যায় অল্পবয়সী, তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। যারা পরিবার ও সমাজে অনেকদিন ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু সড়কে অকালমৃত্যুর কারণে তাদের সম্ভাব্য অবদান থেকে শুধু পরিবার নয়, রাষ্ট্রও তাদের সম্ভাব্য সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হয়। এই হারিয়ে যাওয়া মানুষ ও তাদের জ্ঞানের অপমৃত্যুকে এবারের প্রতিপাদ্যে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিনিয়ত সড়কে মানুষ মারা যাচ্ছে, যাদের অনেকে অসম্ভব মেধাবী হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। যেমন: সাংবাদিক মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদ; যাদের আমরা ২০১১ সালে হারিয়েছি। বাংলাদেশে টিভি সাংবাদিকতায় আধুনিকতা ও সৃজনশীলতার অন্যতম নেপথ্য কারিগর ছিলেন মিশুক মুনীর। অনেক প্রতিভাবান সাংবাদিকও তৈরি করেছিলেন তিনি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শিল্পে তারেক মাসুদ একজন অসাধারণ পরিচালক ছিলেন। তার নির্মিত চলচ্চিত্র দেশে ও বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি ও তার চলচ্চিত্র অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেছে। বিপরীতমুখী গাড়ির চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর ‘কারণে’ আমরা তাদের হারিয়েছি।
সড়কে এমন অনেক মারা গেছেন, যাদের অনেকে সমাজ ও দেশকে অনেক কিছু দেওয়ার মতো বয়সে ছিলেন। যেমন: সংগঠক ও রাজনীতিক আরিফুল ইসলাম ও শিল্পী সৌভিক অর্জুন। আরিফুল ইসলাম একজন প্রতিভাবান সংগঠক ছিলেন। নেতৃত্ব গুণের কারণে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের একজন সাধারণ সমর্থক থেকে কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়েছিলেন। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আন্দোলনসহ জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন আরিফুল ইসলাম। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনেরও অগ্রণী সৈনিক ছিলেন তিনি। একটি দ্রুতগতির ট্রাকের ধাক্কায় আরিফ ও তার ঘনিষ্ট বন্ধু কবি ও লেখক সৌভিক অর্জুনসহ অকালে মারা যান। সৌভিকের অসাধারণ কিছু গান ও কবিতা রয়েছে। তার লেখা নিয়ে একাধিক বইও রয়েছে। এ দু’জন প্রতিভাবান মানুষের অকালমৃত্যু শুধু তাদের পরিবারের জন্যই নয়, দেশেরও জন্যও বিরাট লোকসান।
২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা যখন আসলই, তখন বলতে হয় ২০১৮ সালে ২৯ জুলাই দুটি বাসের অসম প্রতিযোগিতায় দু’জন কিশোর শিক্ষার্থী (আব্দুল করিম রাজি ও দিয়া খানম মীম) মারা যায়। তারাও আগামীতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে তাদের জ্ঞান, মেধা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে পারত। দুটি পরিবার, স্কুলে সহপাঠী ও শিক্ষকদের অনেক স্বপ্ন ও সম্ভাবনার অকালমৃত্যু ঘটে দুটি বাসের অতিরিক্ত গতির অসম প্রতিযোগিতায়।
এভাবে সড়কে যারা মারা গেছেন, তাদের এ বৈশ্বিক দিবসে স্মরণ করা হয়। যাদের জ্ঞান, মেধা, সৃজনশীলতার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া অসম্ভব। কিন্তু এমন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা যেন আর অকালে মারা না যায়, সেজন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এটাই এ দিবসের অন্যতম তাৎপর্য।
এ দিবসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অকালে যারা মারা গেছে বা পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছে, সেসব পরিবারকে একটি প্ল্যাটফরম দেয়া। সেই সঙ্গে মারা যাওয়া ও পঙ্গুত্বের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণ এবং তাদের জরুরি সেবা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া, সড়ক নিরাপদ করতে গবেষণাধর্মী তথ্য ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণকে উৎসাহিত করা। এ দিবসটি সড়কে অনাকাঙ্খিত মৃত্যু রোধে নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যান, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার ও নিরাপদ গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় আইন-নীতি প্রণয়ন ও কর্মসূচি গ্রহণের তাগিদ সৃষ্টি করে।
সড়ক দুর্ঘটনা এমন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ যা সকলকে প্রভাবিত করে। বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বছরে প্রায় ১২ লাখের বেশি মানুষ মারা যান এবং ৫০ লাখের বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী বা চিরস্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হন। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে অধিকাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অকালমৃত্যু এবং অকালপঙ্গুত্ব ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জীবনে ও পরিবারে ছন্দপতন ঘটায়; জাতীয় অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
এ কারণে বিশ্বব্যাপী সড়কে এসব অনাকাঙ্খিত মৃত্যু প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’র (এসডিজি) ৩.৬-এ বিশ্বব্যাপী সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত ও আহতের সংখ্যা অর্ধেক কমিয়ে আনা এবং ১১.২-এ ২০৩০ সালের মধ্যে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রবীণসহ সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সুলভ ও টেকসই পরিবহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের সমস্যা বহুমাত্রিক। ছোট গাড়ির আধিক্যর কারণে শহরগুলোতে যানজট হয়। এজন্য যানজট থেকে মুক্তি পেলে অধৈর্য্য চালকেরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান; যা পথচারীর ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। সড়ক ও মহাসড়কে অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, মহাসড়কে অনিরাপদ ব্যাটারি রিকশা চলাচল, সড়ক নির্মাণ ও যানবাহনের ত্রুটি, চালকের অদক্ষতা ও আইন বাস্তবায়নে শিথিলতা সড়কে মৃত্যু বাড়িয়ে তুলছে।
দেশের সড়কগুলোকে নিরাপদ করার জন্য সকল সড়ক ব্যবহারকারীর ভূমিকা প্রয়োজন। সকলে ট্রাফিক নিয়ম মেনে সড়ক ব্যবহার, মোটর সাইকেলে মানসম্মত হেলমেট পরা, গাড়িতে সিটবেল্ট ব্যবহার করা, বেপরোয়াভাবে বা অতিরিক্ত গতির পরিবর্তে গতিসীমা মেনে গাড়ি চালানো, জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি থামানো, গাড়ির ফিটনেস যাচাই ও চালকের পরীক্ষা সঠিকভাবে করা, নিরাপদ ডিজাইনের গুরুত্ব দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হলে সড়ক নিরাপত্তার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
পাশাপাশি, প্রশস্ত ফুটপাথ নির্মাণ, জেব্রা ক্রসিং অঙ্কনসহ অবকাঠামোগত উন্নতি করতে হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ও করতে হবে। ব্যক্তিগত বা দাপ্তরিক অথবা মালিকানাধীন গাড়ির চালককে আইন মেনে গাড়ি চালানো নিশ্চিত করতে হবে। সড়ককে নিরাপদ হিসাবে গড়ে সকল সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন হতে হবে।
বিশেষ করে, সড়ক আইন, ট্রাফিক সিস্টেম, গতিসীমা ও মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন। সড়কে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে বেশি মানুষ মারা যায়। গতিসীমা নির্দেশিকা সম্পর্কে প্রচারণার জন্য ডিএনসিসি ও সিসিসি একটি প্রচারাভিযান শুরু করেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আরিফুল ইসলামের স্ত্রী রেবেকা সুলতানা নীলা এতে অংশ নিয়েছেন। তিনি ভিডিওচিত্রে তার অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন এবং গতিসীমা মেনে গাড়ি চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এ ধরণের প্রচারণা যত বেশি হবে তত বেশি মানুষ গতিসীমা সম্পর্কে জানতে পারবে। পাশাপাশি সিগনালগুলোতে সাইনবোর্ড স্থাপন ও ডিজিটাল পর্দাগুলোতে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। সবার সম্মিলিত উদ্যোগে যদি সড়ক নিরাপদ হয়, তবেই এ দিবস উদযাপন সফল হবে।