১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কালো টুপির জাতীয়করণ ও মোশতাকের অপূর্ণ খায়েশ

কালো টুপিকে ‘জাতীয় টুপি’ ঘোষণা থেকে মওলানা ভাসানীর শয্যাপাশে ছুটে যাওয়া—খন্দকার মোশতাক চেয়েছিলেন নিজেকে জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।

কালো টুপির জাতীয়করণ ও মোশতাকের অপূর্ণ খায়েশ
খন্দকার মোশতাকের কালো টুপিকে জাতীয় পোশাক হিসেবে নির্ধারণ ও মওলানা ভাসানীর পাশে খন্দকার মোশতাক। ছবি: দ্য বাংলাদেশ অবজারভার, ২১ অগাস্ট ১৯৭৫

রাহাত মিনহাজ রাহাত মিনহাজ

Published : 31 Aug 2026, 04:26 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:55 PM

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রে একধরনের নৈরাজ্য বিরাজ করছিল। খন্দকার মোশতাক আহমদকে ক্ষমতায় বসানো বিদ্রোহী কর্মকর্তারা সেনা কমান্ডে না ফিরে অবস্থান করছিলেন বঙ্গভবনে, যা নিয়ে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ছিল। ঢাকা সেনানিবাসেও ছিল অস্থিরতা। শেখ মুজিব হত্যা-পরবর্তী সময়ে একক, সংগঠিত ও দৃঢ় নেতৃত্বের বদলে বাংলাদেশে চলছিল একধরনের দ্বৈত শাসন, যে শাসনের দুটি কেন্দ্র ছিল বঙ্গভবন ও ঢাকা সেনানিবাস। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের জনতুষ্টিবাদী বিষয় সামনে নিয়ে এসে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করছিলেন রাষ্ট্রপতি পদে আসীন খন্দকার মোশতাক আহমদ, যেগুলোর সংবাদে সয়লাব ছিল সেই সময়ের সংবাদপত্রগুলো। অস্থির এই সময়ের সংবাদপত্রগুলো পর্যালোচনা করে একটি অদ্ভুত ও কৌতূহলউদ্দীপক খবরের সন্ধান পাওয়া যায়। সেটি ছিল খন্দকার মোশতাকের কালো টুপিকে ‘জাতীয় টুপি’ হিসেবে ঘোষণা করার খবর।

খন্দকার মোশতাকের কালো টুপি, যেটিকে জাতীয় টুপি হিসেবে ঘোষণা করে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভা। ছবি: দৈনিক বাংলা, ২২ অগাস্ট ১৯৭৫

খন্দকার মোশতাকের কালো টুপি, যেটিকে জাতীয় টুপি হিসেবে ঘোষণা করে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভা

শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা-পরবর্তী বাংলাদেশে সামরিক ও সান্ধ্য আইনের সেই ভীতিকর সময়ে ২১ অগাস্ট ১৯৭৫, বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে মোশতাক মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হলেও সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল জাতীয় পোশাক হিসেবে মোশতাকের মাথায় শোভাবর্ধন করা কালো টুপিকে ‘জাতীয় টুপি’ হিসেবে ঘোষণা করা। ২১ অগাস্টের ওই বৈঠক নিয়ে ২২ অগাস্ট ১৯৭৫ দৈনিক ইত্তেফাক ‘সংবর্ধনায় তোরণ নির্মাণ, মাল্যদান ও আলোকসজ্জা চলিবে না’ শিরোনামের একটি সংবাদ প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়—রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সভাপতিত্বে গতকাল (বৃহস্পতিবার) বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে—রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীগণ এবং সরকারি কর্মচারীসহ অন্য কাউকেও সংবর্ধনা জ্ঞাপনের উদ্দেশে তোরণ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, মাল্যদান এবং কোনো জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাইবে না। শুধু বিদেশি মেহমানদের সম্মানার্থে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এবং সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হইবে না। বাসস জানাইয়াছে, বৈঠকে নির্দিষ্ট নমুনার কালো রঙের জাতীয় টুপি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের জন্য সরকারি পোশাক হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপযোগী রঙের গলাবন্ধ কোট ও ট্রাউজার (ফুলপ্যান্ট) নির্দিষ্ট করা হইয়াছে। (২২ অগাস্ট ১৯৭৫, দৈনিক ইত্তেফাক)

ভারতবর্ষের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষ ধরনের পোশাক ও টুপি পরার ইতিহাস বেশ পুরোনো। মহাত্মা গান্ধী হাতে বোনা খাদি কাপড়ের ধুতি ও শাল বা চাদর পরতেন, যা তাকে ভারতসহ বিশ্ববাসীর কাছে বিশেষভাবে পরিচিত করেছিল। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু সাদা রঙের একধরনের বিশেষ টুপি পরতেন। এই টুপি ছিল পরিপূর্ণ খাদি কাপড়ে তৈরি এবং সামনে ও পেছনে সুচালো কোণাকৃতির; এই টুপি পরে ‘নেহরু টুপি’ নামে পরিচিতি পায়। মুসলিম লীগ নেতা ও পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও একধরনের বিশেষ টুপি পরতেন। জিন্নাহর টুপি ছিল কালো রঙের এবং ওপরের দিকে একটু বেশি উঁচু। সাধারণত এই টুপি তৈরি হতো ভেড়ার পশম থেকে। কারাকুল জাতের ভেড়ার পশম থেকে তৈরি বলে এই টুপিকে ‘কারাকুল টুপি’ও বলা হতো। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৩৭ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশনে প্রথম এই টুপি পরেছিলেন। এটি পরে উপমহাদেশে মুসলিমদের রাজনৈতিক পরিচয় ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমর্থনের বিষয়টিও সমাজে প্রতিফলিত হতো।

খন্দকার মোশতাকের কালো টুপি। ছবি: দ্য বাংলাদেশ টাইমস্, ২২ অগাস্ট ১৯৭৫

খন্দকার মোশতাকের কালো টুপি

রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব হত্যা-পরবর্তী সেই অস্থির সময়ে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক ঠিক কোন চিন্তা থেকে নিজের কালো টুপিকে জাতীয় টুপি হিসেবে ঘোষণার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন, সে বিষয়ে ওই সময়ের সংবাদপত্রে বিস্তারিত কিছু প্রকাশিত হয়নি। তবে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল রাজনৈতিক চরিত্রের বিপরীতে মোশতাক যে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, সে কথা বলাই বাহুল্য। খুব সম্ভবত এরই অংশ হিসেবে খন্দকার মোশতাক নিজের পরিহিত টুপিকে জাতীয় টুপি হিসেবে ঘোষণার তাগিদ অনুভব করেছিলেন।

রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পর জোর করে ক্ষমতা দখল করে খন্দকার মোশতাক যে নিজের ভাবমূর্তি গঠনে নানা চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, তার আরেকটি প্রতিফলন ছিল ওই ২২ অগাস্টের সংবাদপত্রগুলোতেই। ওই সময় অসুস্থতা নিয়ে শাহবাগের পিজি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক তাকে দেখতে যান এবং ভাসানীর হাতে হাত রেখে ছবি তোলেন।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক। ছবি: দ্য বাংলাদেশ অবজারভার, ২২ অগাস্ট ১৯৭৫

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক

২২ অগাস্ট দেশের সব সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল সেই ছবি ও সংবাদ। দৈনিক বাংলায় ‘ভাসানীর শয্যাপাশে রাষ্ট্রপতি’ শিরোনামের সংবাদে বলা হয়েছিল—বর্ষীয়ান জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গতকাল বৃহস্পতিবার পিজি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত কিছুদিন ধরে তিনি অসুস্থ রয়েছেন। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অসুস্থ মওলানা সাহেবকে দেখার জন্য পিজি হাসপাতালে যান। তিনি মওলানা সাহেবের শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন এবং তাঁর সাথে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। রাষ্ট্রপতি পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকেও দেখতে যান এবং তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। (দৈনিক বাংলা, ২২ অগাস্ট ১৯৭৫)

সংবাদপত্রে প্রকাশিত মওলানা ভাসানীর সাথে খন্দকার মোশতাকের ছবিটি বিশেষভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ছবিতে দেখা যায়, মোশতাক ভাসানীর হাত ধরে আছেন; এটি একধরনের সমর্থন ও সম্মতিসূচক সংবাদচিত্র। এর আগে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরপরই মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নতুন সরকারকে সমর্থন দিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। যদিও মওলানা ভাসানী সত্যিই সেই সমর্থন দিয়েছিলেন কি না, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ কথা সবার জানা—রাজনৈতিক মতাদর্শ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নিয়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের মতপার্থক্য থাকলেও তাদের মধ্যকার সম্পর্কটা ছিল অনেকটা পিতা-পুত্রের মতো। এ বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও অনেক সাক্ষ্য রয়েছে, তবে সে আলোচনা দীর্ঘ।

একটু খেয়াল করা প্রয়োজন, ২২ অগাস্ট ১৯৭৫ খন্দকার মোশতাক পিজি হাসপাতালে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকেও দেখতে গেলেও তার সঙ্গে কোনো ছবি সংবাদপত্রের পাতায় ঠাঁই পায়নি। মোশতাকের চেষ্টা ছিল মওলানা ভাসানীর হাতে হাত রেখে বাঙালির আস্থা অর্জন করার, জাতীয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার। চতুর মোশতাকের সেই চেষ্টা যে সফল হয়নি, তা মনে হয় নতুন করে বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। শুধু এটুকু জানিয়ে শেষ করি—মোশতাকের শাসন স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৮২ দিন। আর ইতিহাসে তিনি আজও খুনি ও বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর নামেই বেশি পরিচিত।

রাহাত মিনহাজ সহকারী অধ্যাপকগণযোগাযোগ  সাংবাদিকতা বিভাগজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: minhaz_uddin_du@yahoo.com