পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি: বাস্তবায়ন নাকি নিরাপত্তার চশমায় চক্ষু গোপন

পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুমিয়া মানুষের অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে তার অনন্য বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ ও বিকাশের কাজটি এখনো অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।

দীপায়ন খীসাদীপায়ন খীসা
Published : 1 Dec 2023, 06:07 PM
Updated : 1 Dec 2023, 06:07 PM

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সশস্ত্র সংঘাতের অবসানে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ঐতিহাসিক এই ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। সাধারণ্যে পার্বত্য শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত চুক্তিটি ২৫ বছর পেরিয়ে ২৬ বছরে পা দিয়েছে।

বাস্তবতা হলো, পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এই চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুমিয়া মানুষের অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে তার অনন্য বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ ও বিকাশের কাজটি এখনো অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে এখনো ঔপনিবেশিক কায়দায় পাহাড়ি মানুষের উপর শাসন ও শোষণ অব্যাহত রয়েছে।

এটা একটা খুবই আশ্চর্য ঘটনা। চুক্তির আয়ুষ্কাল বাড়ছে আর বাড়ছে। ১, ২, ৩ করে এখন ২৬ বছরে। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার যে গতি সেটা মন্থর থেকে মন্থরতর পর্যায়ে গিয়ে থমকে পড়ে আছে। বরং চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না, সেটা স্বীকার না করে সরকার সংশ্লিষ্টরা চুক্তির অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে— এই ধরনের তথ্য প্রচার করে চলেছে। আমরা প্রায়ই শুনি শাসকমহল বলে থাকেন জনসংহতি সমিতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিবাসীদের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার অসহযোগিতার কারণে চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

এখন তাহলে আসল বিষয়টা কি? যারা দীর্ঘ ২৪ বছরের অধিক সময় সশস্ত্র লড়াই করলেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে একটা চুক্তিতে উপনীত হলেন। শাসকগোষ্ঠী অভিযোগ করছে সেই জনসংহতি সমিতি এবং দলটির নেতা চুক্তি বাস্তবায়নে সহযেগিতা করছেন না। যারা জীবনবাজি রেখে সর্বোচ্চ ত্যাগ করে একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করলেন। দুই যুগের অধিক কঠিন এক গেরিলা জীবন কাটালেন। সেই সংগ্রামী জীবন পেরিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন। চুক্তি স্বাক্ষরের পর আবার দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে নিরলস সংগ্রাম করছেন, সেই তারা চুক্তি বাস্তবায়নে অসহযোগিতা করছেন। এই ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করাটাই একটা বড়সড় অপরাধ বলে আমাদের মনে হয়।

চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল দুটি পক্ষের মধ্যে। একটি পক্ষ হচ্ছে জনসংহতি সমিতি এবং অন্যপক্ষ হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তিটি ক), খ,) গ ও ঘ) এইভাবে ৪ টি খণ্ডে বিভক্ত। ক) খণ্ড সাধারণ, খ) খণ্ড পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ/ পার্বত্য জেলা পরিষদ গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ঘ) পুনর্বসান, সাধারণ ক্ষমা ও অন্যান্য বিষয়াবলী। ক) খণ্ডে ৪ টি খ) খণ্ডে ৩৫ টি গ) খণ্ডে ১৪টি এবং ঘ) খণ্ডে ১৯ টি ধারা আছে। এসবের আবার অনেকগুলো ধারার বিভিন্ন উপধারা রয়েছে। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। তারপর তৎকালীন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহকে আহ্বায়ক করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। এই জাতীয় কমিটি জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বেশ কয়েক দফা বেঠকে মিলিত হয়। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে উভয় পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করে।

২ ডিসেম্বর ২০২৩ এই চুক্তিটি ২৬ বছরে পাদার্পণ করছে। চুক্তির এই ২৬ বছরের প্রথম ৩ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। মাঝখানে বিএনপি এবং মঈনউদ্দিন-ফকরউদ্দিন সরকার বাদে আবার টানা ৩ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। আর চুক্তি স্বাক্ষরের পর সবচয়ে বেশি মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। আর এই চুক্তি করার কারণেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা ইউনেস্কো শান্তি পুরষ্কারও অর্জন করেছিলেন। বর্তমান যে টানা ৩ মেয়াদে আওয়মী লীগ সরকার ক্ষতমায় আছে, সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রীও কিন্তু শেখ হাসিনা।

আমরা নিয়মিত শুনছি আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজন বলে বেড়ান তারা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। সুতরাং তারাই চুক্তি বাস্তবায়ন করবেন। আরও মজার বিষয় হচ্ছে ১৯৯৭ সালের পর যতগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রতিটি নির্বাচনি ইশতেহারে আওয়ামী লীগ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলটির নির্বাচনি ইশতেহারে চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ছিল। চলতি সরকারের মেয়াদ ফুরিয়েছে। দেশে আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন সে যেন এক দূর অস্ত।

আমরা ধরে নিলাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়নি। কিন্তু ২০০৯ থেকে টানা ১৫ বছর দলটি আরও অধিক দাপট নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন। আওয়ামী লীগের এমন দাপুটে ক্ষমতার সময়ে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থমকে থাকল। বিষয়টি তাহলে কি?

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ ঘটা করে বলেছিলেন, “বিএনপি-জামায়ত সরকার চুক্তিটি ডিপ ফ্রিজে রেখেছিল, আওয়ামী লীগ সেই ডিপ ফ্রিজ থেকে চুক্তিটি বের করে এনেছে। দীর্ঘ সময় ডিপ ফ্রিজে রাখার কারণে চুক্তিতে বরফের পুরু আস্তর জমেছে। বরফের আস্তর কেটে যেতে একটু সময় দরকার।”

কিন্তু চুক্তিটি ডিপ ফ্রিজ থেকে বের করে তারা কি করেছিলেন? সেটা কর্তৃপক্ষ ভালোই জানবেন।

সেই ডিপ ফ্রিজ তত্ত্বের বাস্তবিক কোনো ধরনের কার্যকারিতা আমরা দেখতে পাইনি। বরং টানা ১৫ বছরের মেয়াদকালে আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের পথেই হাঁটল না। ইদানিং চুক্তি সংশ্লিষ্ট সরকারের দায়িত্বশীলমহল বলা শুরু করেছে, চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। একটা ছোট অংশ অবাস্তবায়িত আছে এবং সেটাও হয়ে যাবে। চুক্তি বাস্তবায়ন না করে অসত্য তথ্য প্রচার করা যেন একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে। সেটা তারা বিগত ১৫ বছর ধরে একটানা করেই চলেছেন।

ক্রমাগত মিথ্যাচারের বিষয়ে জনসংহতি সমিতির সূত্র জানাচ্ছে— “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটিকে পাশ কাটিয়ে তথা পার্বত্য চুক্তি লঙ্ঘন করে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পর্যালোচনা মূল্যায়ন ও পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি মূল্যায়ন, অগ্রগতি ও পরিবীক্ষণ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছে এবং এই কমিটি একটা প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে। সরকার (গত এপ্রিলে নিউইয়র্কস্থ জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত আদিবাসী বিষয়ক পার্মানেন্ট ফোরামের ২২তম অধিবেশনে) ওই আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রস্তুত করা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই মর্মে অসত্য ও একতরফা তথ্য প্রচার করছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। অথচ পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৮টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে; অবশিষ্ট ২৯টি ধারা সম্পূর্ণভাবে অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো হয় আংশিক বাস্তবায়ন করে অথর্ব অবস্থায় রেখে দেয়া হয়েছে, নয় তো সম্পূর্ণ অবাস্তবায়িত অবস্থায় রাখা হয়েছে।” পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৬ বছরে দাঁড়িয়ে এটাই হচ্ছে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার আসল চিত্র।

চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বাজারে আরেকটি তথ্য বেশ জোরেশোরে প্রচারিত হয়ে আসছে। সেটা হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চুক্তি বাস্তবায়নে খুবই আন্তরিক। কিন্তু নানান পারিপার্শ্বিক বাধার কারণে তিনি চুক্তিটি বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। বাজারে প্রচারিত এই তথ্যটি অনেকেই আবার বিশ্বাসও করেন। একথা ঠিক যে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার সময় আগ পর্যন্ত সেই সময়কার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে বেশ আন্তরিকতা দেখিয়েছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরের নানান বাধাকে উপেক্ষা করে তাঁর সরকার ১৯৯৭ সালে আন্তরিকতার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পথে এগিয়েছিলেন। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পর চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তিনি কতটুকু আন্তরিক সেটার প্রতিফলন আমরা জনসংহতি সমিতির প্রদত্ত তথ্যে দেখতে পাচ্ছি।

চুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা বেশ কিছুদিন ধরেই বলছেন, “চুক্তি তো বাস্তবায়ন হচ্ছেই না, বরং শাসকগোষ্ঠী চুক্তিকে ভুলিয়ে দেওয়ার নানান কলাকৌশল চালিয়ে যাচ্ছেন।”

সন্তু লারমার এই বক্তব্যেই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর আসল চরিত্র ফুটে উঠে। চুক্তির ২৬ বছরে আমরা বরং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর উল্টো যাত্রা দেখতে পাচ্ছি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির স্বাক্ষরের অন্যতম দর্শন ছিল পাহাড়ের সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। নিরাপত্তার চশমা দিয়ে এই সমস্যাকে চিহ্নিত করা যাবে না। নিরাপত্তার ওই চশমা দিয়ে দেখার ভুল শুধরে রাষ্ট্র ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরে এক ঐতিহাসিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

কিন্তু চুক্তির ২৬ বছরে এসে রাষ্ট্র এবং শাসকগোষ্ঠী আবারও ভুল পথেই হাঁটছে। পাহাড়কে সেই পুরোনো নিরাপত্তার চশমা দিয়েই দেখার চল ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সেই কারণে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থমকে গেছে। বরং চুক্তি অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে গোয়েবলসীয় প্রচারে অতি উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

আসল সত্যি হচ্ছে চুক্তিকে ভুলিয়ে দেওয়ার এক ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা চলছে। চুক্তি বাস্তবায়ন না করে উল্টো চুক্তি ভুলিয়ে দেওয়ার তৎপরতা বেশি দৃশ্যমান। সেই কারণে চুক্তি বাস্তবায়ন না করে নিরাপত্তার চশমা নিয়ে পাহাড়কে দেখার ভুল দর্শন শাসকগোষ্ঠীর জন্য বুমেরাং হয়ে ফিরে আসার আশঙ্কা একবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।