Published : 22 Dec 2025, 12:46 AM
বিজ্ঞানের মূল আত্মা হলো পদ্ধতি, প্রমাণ এবং পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ কোনো দাবিকে সত্য বলে মানতে হলে সেটা পরীক্ষা করতে হয়, যাচাই করতে হয় এবং পুনরায় ওই ফলাফল পাওয়া যায় কিনা তা দেখতে হয়। এটাই বিজ্ঞানের ভিত্তি। কিন্তু আজকের যুগে আমরা বিজ্ঞানের ফলাফল দেখি, তার পদ্ধতি দেখি না; বিজ্ঞানের প্রচার শুনি, কিন্তু তার অনুশীলন বুঝি না। ফলে বিজ্ঞানও ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে একধরনের প্রচারণায়, যেখানে যুক্তি নয়, বিশ্বাসই মুখ্য।
‘বিজ্ঞানীরা বলেছেন’–এই বাক্যটি অনেকের কাছে চূড়ান্ত সত্যের প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান নিজেই শেখায়, কোনো সত্যই চূড়ান্ত নয়; প্রত্যেক সত্যই পরীক্ষাযোগ্য, পরিবর্তনযোগ্য এবং প্রশ্নযোগ্যও। এই প্রশ্ন করার স্বাধীনতাই বিজ্ঞানকে মুক্ত ও মানবিক রাখে। যখন আমরা ওই স্বাধীনতাকে ত্যাগ করি, তখন বিজ্ঞান আর অনুসন্ধানের পদ্ধতি থাকে না, হয়ে যায় একধরনের মতবাদ বা বিশ্বাস।
গ্যালিলিও, ডারউইন ও মেরি কুরির মতো বিজ্ঞানীরা আমাদের শিখিয়েছেন সত্য কোনো ক্ষমতার দান নয়, এটি অর্জনের ফল। গ্যালিলিও যখন বলেছিলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন চার্চ তাকে শাস্তি দিয়েছিল। চার্চ বলেছিল, এটি ঈশ্বরের বাণীর বিরোধিতা। কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে সত্য মানে ঈশ্বর নয়, প্রমাণ। গ্যালিলিও প্রমাণ করেছিলেন পর্যবেক্ষণ ও যুক্তির মাধ্যমে। এই পার্থক্যই বিজ্ঞানের মুক্ত আত্মা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, ওই আত্মাই রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রভাবে কলুষিত হয়েছে।
আজ বিজ্ঞানের ফলাফল অনেক সময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও আমরা দেখি, প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দল ও করপোরেট স্বার্থ তথ্য বিকৃত করে। কেউ বলে ‘এটি মানবসৃষ্ট’, কেউ বলে ‘প্রকৃতির চক্র’। কিন্তু এই বিতর্কের পেছনে লুকিয়ে থাকে তেল কোম্পানির অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা। একইভাবে, কোভিড-১৯ মহামারীর সময়েও দেখা গেছে গবেষণা নয় বরং প্রশাসনিক অনুমোদনই নির্ধারণ করেছে কোন ভ্যাকসিন ‘বৈজ্ঞানিকভাবে’ গ্রহণযোগ্য হবে। বিজ্ঞান যখন এমনভাবে ক্ষমতার হাতে আটকে পড়ে, তখন তা সত্যের নয়, স্বার্থের যন্ত্রে পরিণত হয়।
এই প্রবণতা নতুন নয়। ডারউইনের যুগেও আমরা এর প্রতিচ্ছবি দেখি। চার্লস ডারউইন নিজে ছিলেন এক নম্র ও সতর্ক বিজ্ঞানী, যিনি প্রকৃতির পর্যবেক্ষণ থেকে ন্যাচারাল সিলেকশন ধারণাটি উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তার তত্ত্বকে রাজনীতি ও সমাজ যেভাবে বিকৃত করেছিল, তা আজও আমাদের শেখায় বিজ্ঞানকে মতাদর্শে রূপ দিলে তার মর্ম নষ্ট হয়। থমাস হেনরি হাক্সলি ও হারবার্ট স্পেন্সারের হাত ধরে জন্ম নেয় সোশ্যাল ডারউইনিজম, যেখানে ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ সমাজের বর্ণভেদ, শ্রেণিভেদ ও উপনিবেশবাদকে বৈধতা দেওয়ার যুক্তি হয়ে ওঠে। ডারউইনের প্রমাণভিত্তিক তত্ত্বকে রাজনীতি ব্যবহার করেছিল নৈতিক কর্তৃত্বের হাতিয়ার হিসেবে। ফলস্বরূপ, বিজ্ঞানের ভাষা হয়ে গেল শক্তির ভাষা।
অতএব দেখা যায়, বিজ্ঞান যখন স্বাধীন থাকে, তখন তা মুক্ত চিন্তার আশ্রয়; কিন্তু যখন ক্ষমতার সেবা করে, তখন তা হয়ে ওঠে প্রচারণা। রাজনীতি, ধর্ম বা অর্থনীতি যে কোনো প্রভাবই বিজ্ঞানের স্বচ্ছতাকে নষ্ট করে। তাই যেমন রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করা হয়েছিল গণতন্ত্রের জন্য, তেমনি বিজ্ঞানকেও রাজনীতি থেকে পৃথক করা জরুরি। রাজনীতি সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানকে প্রমাণের স্বাধীনতা দিতে হবে। বিজ্ঞান সত্যের অনুসন্ধান, তা কোনো দলীয় ঘোষণা নয়।
তবে এই সমস্যা কেবল রাজনীতি বা করপোরেশনের নয়; এটি আমাদের সমাজের ভেতরেও গভীরভাবে প্রোথিত। আজ বিজ্ঞানের নামেই জন্ম নিচ্ছে নতুন ধরনের অজ্ঞ প্রচারক। যেমন ধর্মে যারা ধর্মের মূল চেতনা না বুঝে কেবল আচার ও মুখস্থ বচনে বিশ্বাস করে, তারা হয়ে ওঠে ধর্মের বড় ‘রক্ষক’; তেমনি আজকের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সভ্যতায় যারা বিজ্ঞান চর্চা না করে কেবল বিজ্ঞানের ‘মুখপাত্র’ হয়ে ওঠে, তারাও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে।
ধর্মের প্রচারক যখন ঈশ্বরের ভাবনা না বুঝে কেবল বচনের বাহার দেখায়, তখন ধর্ম প্রাণ হারায়। বৈজ্ঞানিক প্রচারকও একই ভুল করেন যখন গবেষণার জটিলতা না বুঝে কেবল ‘ডেটা’ আর ‘তথ্য’-এর নামে মতবাদ চালান। এই দুই ক্ষেত্রেই বোঝার বদলে পুনরাবৃত্তি চলে, অনুসন্ধানের বদলে ঘোষণা হয়। ফলে মানুষ শেখে বিশ্বাস করতে, কিন্তু যাচাই করতে শেখে না।
এই ধরনের ‘বিজ্ঞান প্রচারক’ হয়তো সদিচ্ছাপ্রসূত, কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে অজ্ঞ বিশ্বাস প্রচারকের মতোই সমস্যাজনক। কারণ তারা অর্ধসত্যকে পূর্ণ সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা বিজ্ঞানের অথরিটি প্রচার করে, কিন্তু তার মেথড শেখায় না। এর ফলে গড়ে ওঠে এক বৈজ্ঞানিক কুসংস্কার, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করে, কিন্তু বোঝে না।
এই অন্ধ বিশ্বাসের ফলেই আজ বিজ্ঞানের নামেও দেখা যাচ্ছে প্রচারণা। করপোরেট প্রতিষ্ঠান নিজের পণ্য বিক্রির জন্য ‘গবেষণা’ দেখায়, রাষ্ট্র নিজের নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ‘পরিসংখ্যান’ তুলে ধরে এবং মানুষ তা মেনে নেয় যাচাই না করেই। ফলে বিজ্ঞান হারায় তার প্রমাণনির্ভর স্বরূপ, আর সমাজ হারায় যুক্তির পরিসর।
বিজ্ঞানকে তার আসল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে, প্রথমে বুঝতে হবে যে বিজ্ঞান কোনো ‘বিশ্বাসের পদ্ধতি’ নয়, এটি ‘যাচাইয়ের প্রক্রিয়া’। যেমন দার্শনিক কার্ল পপ্পার বলেছিলেন, বিজ্ঞানের শক্তি তার পরীক্ষণযোগ্যতায়, সত্যের দাবিতে নয়। প্রতিটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বই যতক্ষণ না পর্যন্ত খণ্ডিত হয়, ততক্ষণ টিকে থাকে; খণ্ডনই তার বিকাশের ভিত্তি।
বিজ্ঞানকে তাই কোনো ধ্রুব সত্যের আসনে বসানো উচিত নয়, বরং প্রশ্নের চর্চা করা জরুরি। কারণ বিজ্ঞান হলো প্রশ্নের সংস্কৃতি—যেখানে অন্ধ বিশ্বাস নয়, যুক্তির আলোই পথ দেখায়। যখন আমরা এই সংস্কৃতিকে ভুলে যাই, তখন বিজ্ঞানও বিশ্বাসে পরিণত হয়, আর সমাজ হারায় চিন্তার স্বাধীনতা।
আজকের এই বিভ্রান্ত সময়, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে জলবায়ু নীতি সব কিছুতেই প্রচারণা ও তথ্যের বিকৃতি চলছে, সেখানে সবচেয়ে জরুরি হলো যাচাইয়ের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা। যে সমাজ প্রশ্ন করে না, ওই সমাজ কখনো সত্যকে খুঁজে পায় না।
বিজ্ঞানকে মুক্ত করতে হবে তার মূল জায়গায় ফিরিয়ে—ল্যাবরেটরির নয়, যুক্তির মাটিতে। কারণ সত্য মানে পরীক্ষা করা, শুধু বলা নয়।