Published : 31 Jul 2026, 01:22 PM
রাত তখন প্রায় দুইটা। গুজরাটের আনন্দ শহর ঘুমিয়ে, চারদিকে নিস্তব্ধতা। হঠাৎ দরজায় জোরে ধাক্কা— "দরজা খুলুন! পুলিশ!"
চমকে ওঠেন তরুণ প্যাটেল। পাশে ঘুমিয়ে থাকা স্ত্রী কাজলও ভয়ে কেঁপে ওঠেন। পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে তাদের ছোট ছোট দুই ছেলে।
পুলিশ ঘরে ঢুকেই মোবাইল ফোন বের করতে বলে। কললিস্ট ঘেঁটে একটি নম্বর দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে, "এটি কার?"
কাজলের বুক ধড়ফড় করতে থাকে। কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি বাংলাদেশে থাকা মাকে ফোন করেছিলেন। তার মায়ের শরীর ভালো নেই; শুধু একটু খবর নিতে চেয়েছিলেন। কে জানত, সেই ফোনকলই হয়তো তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে! বারো বছরের সংসার, কত হাসি-কান্না, কত স্বপ্ন—এক মুহূর্তে সবকিছু অচেনা হয়ে যাবে!
বারো বছর আগে গল্পটা শুরু হয়েছিল ফেইসবুকে।
ভারতের গুজরাটের তরুণ প্যাটেল আর বাংলাদেশের সাতক্ষীরার মেয়ে কাজল—দুই দেশের দুই মানুষ। ধর্ম, ভাষা, সীমান্ত সব আলাদা হওয়া সত্ত্বেও একটি জিনিস তাদের কাছে বড় হয়ে উঠেছিল, সেটি ভালোবাসা।
ফেইসবুকে পরিচয়; প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হতো। এর মধ্যে কাজলের মা-বাবা মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন এবং পাত্র দেখতে থাকেন। কিন্তু কাজল ও তরুণ সিদ্ধান্ত নেন, তারা একসঙ্গে বাঁচবেন।
কিন্তু বললেই তো আর হয় না! কাজলের তখন পাসপোর্টটাও ছিল না। এক দালালকে পাসপোর্টের জন্য টাকা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই টাকা মেরে দেয় ওই দালাল। তাই বলে ভালোবাসা তো আর অপেক্ষা করে থাকে না। নানা বাধা পেরিয়ে প্রথমে কলকাতায় পৌঁছান কাজল; সেখান থেকে চলে যান গুজরাটের আনন্দ শহরে। তরুণ প্যাটেলের হাত ধরে শুরু হয় নতুন জীবন।
তারপর গত বারো বছরে তাদের জীবনে আসে দুই সন্তান।
কাজল ধীরে ধীরে প্যাটেল পরিবারেরই একজন হয়ে ওঠেন। হিন্দু ধর্ম পালন করতে শুরু করেন। সে। শাশুড়ি তাকে কখনো পুত্রবধূ ভাবেননি, নিজের মেয়ের মতোই আগলে রেখেছিলেন; পুত্রবধূ হয়ে উঠেছিলেন তার প্রতিদিনের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী।
কাজলের বাংলাদেশি পরিচয় জানার পর, সেদিন রাতে গুজরাট পুলিশ কাজলকে তুলে একটা নারী সুরক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তখন থেকে কাজল সেই সুরক্ষা কেন্দ্রেই আছেন—গোটা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তার দুই ছেলে এখন তাদের বাবা ও দাদির কাছে।
কাজল ও তরুণের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার গল্প নিয়ে বিবিসি রিপোর্ট করেছে। তরুণ প্যাটেল এখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের কাছে দৌড়াচ্ছেন। তার একমাত্র লক্ষ্য—যেকোনোভাবে তার স্ত্রীকে কাছে রাখা, অন্তত ভারতে রাখা। তার ধারণা, একবার যদি কাজলকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আর কখনো ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন না স্ত্রীকে।
বিবিসির কাছে সেই আক্ষেপটাই করেছেন তরুণ—"আমার একটাই ভুল—সময়মতো সব আইনি কাগজপত্র করিনি। কারণ কোনোদিন ভাবিনি এমন একটা দিন আসবে। যদি জানতাম, তাহলে পৃথিবীর যেকোনো মূল্য দিয়ে হলেও সব নথি ঠিক করতাম।" তার কণ্ঠ ভেঙে আসে, "আমার স্ত্রীকে যদি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, ও বাঁচবে না। শুধু ও নয়, আমাদের দুই ছেলেও সারাজীবন মাকে ছাড়া বড় হবে।"
এটি শুধু তরুণ আর কাজলের গল্প নয়; বাংলাদেশ ও ভারত—এই দুই দেশের সীমান্তের মাঝখানে গড়ে ওঠা কাঁটাতারে আটকে পড়া হাজারো মানুষের গল্প। যেখানে দুজন মানুষের তীব্র প্রেম, বারো বছর ধরে একটু একটু করে সাজানো সংসার, দুটো জলজ্যান্ত সন্তান—রাজনীতির কাঁটাতারের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে।
২.
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষ ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটো দেশ বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব র্যাডক্লিফ নামের যে ব্যক্তিটিকে দেওয়া হয়েছিল, তিনি এর আগে কখনও ভারতে আসেননি। ফলে ভারতবর্ষের ভূগোল, সমাজ, সম্পর্ক বা সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা সম্পর্কে কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল না তার।
মাত্র প্রায় পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে পাঞ্জাব ও বাংলার সীমান্ত নির্ধারণ করে ফেলেছিলেন তিনি। তার কলমের একটা মাত্র টানে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাতারাতি সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে; দেড় কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। বাস্তুচ্যুত মানে শুধু ঘরবাড়ি হারানো নয়; আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, গবাদি পশু, ফসলের জমি, কুমড়ো ফুলের মাচা, সম্পর্ক—সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। সেই বিচ্ছিন্নতায় সিলমোহর পড়েছিল সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অন্তত ১০ লাখ মানুষ একে অপরকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে।
৩.
দিন যত গড়াচ্ছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ রাজনীতি, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য কিংবা কূটনীতি দিয়ে মাপা হচ্ছে। কিন্তু এটা কী করে ভুলে যাই যে, এসবের আগেও এই দুই দেশের মানুষের ভেতর আরেকটি সম্পর্ক আছে, সেটি মানবিক সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের জন্ম কোনো রাষ্ট্র সৃষ্টি করেনি; ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি, মাটি-পানি-বাতাস একটু একটু করে সে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ের অসংখ্য মানুষের আত্মীয়-স্বজন আজও বাংলাদেশের কোনো না কোনো জেলায় বাস করেন। একইভাবে বাংলাদেশের বহু পরিবারে এখনো গল্প শোনা যায় ওপারের তাদের মামাবাড়ি, দাদাবাড়ি কিংবা শৈশবে ফেলে আসা গ্রামের কথা।
অমর্ত্য সেন তার ‘জগৎ কূটীর’ বইয়ে পুরাণ ঢাকার ওয়ারিতে ফেলে যাওয়া প্রথম স্কুলের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। নদীপথে মানিকগঞ্জে তার দাদাবাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার গল্প পড়লে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হতে হয়।
মনে আছে, আমার সবচেয়ে বড় মামাতো বোনের বিয়ে হয়েছিল ত্রিপুরার গোমতী জেলায়। চৌদ্দগ্রাম সীমান্ত দিয়ে পায়ে হেঁটে ওবাড়িতে চলে যেতাম আমরা। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া রূপবান আপার সঙ্গে আমার মামি কিংবা তার বাকি বোনদের চিরস্থায়ী স্থানিক বিচ্ছেদ তৈরি করেছে বটে; কিন্তু স্মৃতি থেকে কি বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে?
৪.
১৯৭১ সালের কথাই ধরা যাক না। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ছিল এক রক্তাক্ত জনপদ। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন এবং ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে প্রায় এক কোটি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেদিন কোথাও কোনো কাঁটাতার ছিল না, মানুষের জীবনের দাম বড় হয়ে উঠেছিল। আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের নানা স্থানে শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছিল; যুদ্ধাহত মানুষ পেয়েছিল খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসা।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর, আজ সেই একই সীমান্তের চিত্র অনেকখানি পাল্টে গেছে। অবাধ যাতায়াতের স্থলে জায়গা করে নিয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে কাঁটাতার, কঠোর নজরদারি, দুই দেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা এবং মাঝেমধ্যে প্রাণহানি।
সীমান্তে যে নিরস্ত্র মানুষের প্রাণহানি ঘটে, তার পেছনে আছে বহু বছর ধরে চলে আসা বাণিজ্য ও ভূমির একই ধরনের ব্যবহার; জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবিকা। সেই জীবিকা মানুষকে অনুপ্রবেশে বাধ্য করে। ঘাস খেতে খেতে এপাড় থেকে যে গরুটা ওপাড়ে চলে যায়, তার কাছে কাঁটাতারের অর্থ কী? কোরবানি ঈদে কাঁটাতারের ওপার থেকে গরু না এলে এ দেশের ক্রেতাদের পকেটে চাপ পড়ে বটে; কিন্তু ওপারের হাজারো খামারির স্বপ্নও যে ভেঙে যায়। তখন কিন্তু ক্ষতির বেদনা দুপাশেই সমান।
৫.
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত সীমান্তগুলোর একটি। প্রতিদিন নানা কারণে হাজারো মানুষ বৈধ পথে এ সীমান্ত পারাপার করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ—কী নেই সেখানে?
আবার অবৈধ পারাপার, মধ্যরাতের চোরাচলন এবং সীমান্তজুড়ে নানা অপরাধও ঘটে। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পারস্পরিক সহযোগিতা, তথ্যের আদান-প্রদান এবং সীমান্তে বসবাসকারী মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা। এসব চ্যালেঞ্জের সমাধান হতে হবে কূটনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে, কঠোরতা দিয়ে নয়।
দুই দেশের সীমান্তজুড়ে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক মানুষের ভাষা বাংলা। তাদের ঈদ-পূজা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন—সবকিছু মধ্যেই রয়েছে অসংখ্য মিল। একই প্লে লিস্টে বাজে হেমন্ত আর ভূপেনের গান, একই ভাষায় সিনেমা দেখে; ভাত-মাছ-মাংস তাদের প্রধান খাবার। পারস্পরিক সম্মান ও আস্থা ছাড়া শুধু কঠোরতা দিয়ে কী করে এই দুই জনপদের মানুষের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব? কাঁটাতার দিয়ে যাতায়াত থামানো যেতে পারে, কিন্তু প্লে লিস্ট থেকে অনুপম রায়ের গান মুছে ফেলবে কী করে?
কাঁটাতার রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণ করে, তরুণ ও কাজলকে আলাদা করতে পারে, সীমান্তে টহল বসাতে পারে, পাসপোর্ট-ভিসার আনুষ্ঠানিকতাও তৈরি করা যায়; কিন্তু মানুষের হৃদয়ের সীমানা যে বিপুল! একই শিকড়ে প্রোথিত দুই জনপদের মানুষের হৃদয়কে আলাদা করবে কী দিয়ে?
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ। সোমালিয়া সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাডভাইজার। যোগাযোগ: raju_norul@yahoo.com