ভাষা নিয়ে আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল কিন্তু সরকারি চাকরিতে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষি ছাত্ররা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়ে যায় কি না সেই আশঙ্কা থেকে। এটা ছিল বৈষম্য; আঞ্চলিক ও ভাষিক বৈষম্য। আর এই আন্দোলনের ছিল সুদূরপ্রসারী প্রভাব, যা জুলাই অভ্যুত্থানেও দেখতে পাই।
Published : 20 Feb 2025, 05:54 PM
ফেব্রুয়ারি বললেই সবার আগে একুশে ফেব্রুয়ারির কথা মনে আসে। তবে রাজনীতি ও ইতিহাস সচেতন মানুষের কাছে ফেব্রুয়ারি মানে শুধু বায়ান্নর অমর একুশে ফেব্রুয়ারি নয়। বরং ইতিহাসের নানা বাঁকে, নানাভাবে ফেব্রুয়ারি মাস হয়ে উঠেছে প্রাসঙ্গিক। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত এই মাসের ইতিহাস বিপ্লবী আর বিদ্রোহীদের নতুন করে নানা সময়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে৷
ফেব্রুয়ারি ছিল আমাদের জন্য যেমন ভাষা আন্দোলনের মাস, তেমনি যুগপৎ এই আন্দোলন আমাদের স্বাধিকারের বীজও বুনে দিয়েছিল। অনিবার্যভাবে যা রূপ নিয়েছিল স্বাধীনতার যুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশেও বারবার ফেব্রুয়ারি ফিরে এসেছে নবরূপে, নব প্রেরণা হয়ে। ফেব্রুয়ারির ইতিহাস আর চেতনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা গণতন্ত্রের প্রশ্নে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বারবার বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে রাজপথে৷
এই ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় আন্দোলনটি ঘটেছে ১৯৫২ সালে। সে বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি (৮ই ফালগুন) পূর্ব বাংলায়, অর্থাৎ মাত্র বছর চারেক আগে পাকিস্তান নামে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, তার পূর্বাংশ পূ্র্ব পাকিস্তানে, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদের বিস্ফোরণ হয়েছে।
যদিও এই আন্দোলনের পটভূমি আগেই তৈরি হয়েছিল, পাকিস্তানের জন্মের পরপরেই, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতার মধ্যে। পাকিস্তানের যারা সরকারি চাকরি করতেন, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব তাদের উপরই পড়ত। তাদের এখানে পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়ার একটা আশঙ্কা ছিল। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা ছাত্র, তাদের অধিকাংশই সেসময় সরকারি চাকরিতে যেত।
সেজন্য তারা এ ঘটনায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাল। তাদের সঙ্গে সেসময় দেশের জনগণও পাকিস্তানি শাসকদের এ অঞ্চলের জনগণের প্রতি যে তাচ্ছিল্যের মনোভাব এবং শোষণ করার অভিপ্রায় ছিল, সেটা বুঝতে পেরে গিয়েছিল। জনগণ বুঝতে পারল যে, কেবল ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। ব্রিটিশদের পরিবর্তে মুসলিম লীগের শাসন এসেছে। কিন্তু, জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়নি। বৈষম্য দূর হয়নি। এসব মিলিয়ে ছাত্ররা যখন ভাষার জন্য প্রতিবাদ শুরু করল, জনগণও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। এবং একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র-জনতার একটা গণঅভ্যুত্থান হল।
ভাষা নিয়ে আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল কিন্তু সরকারি চাকরিতে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষি ছাত্ররা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়ে যায় কি না সেই আশঙ্কা থেকে। এটা ছিল বৈষম্য; আঞ্চলিক ও ভাষিক বৈষম্য। আর এই আন্দোলনের ছিল সুদূরপ্রসারী প্রভাব, যা জুলাই অভ্যুত্থানেও দেখতে পাই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন শুধুমাত্র রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতেই সীমাবদ্ধ থাকল না, কিছুকালের মধ্যে স্বাধিকারের লড়াইয়ে পরিণত হলো এবং গড়াল মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত।
বাঙালি জাতির গৌরব, ঐতিহ্যকে ধর্মীয় আবরণে-আভরণে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা। তারা বলত– ‘তারা উৎকৃষ্ট মুসলমান, আর পূর্ব বাংলার মুসলমানরা নিকৃষ্ট মুসলমান।’ এইভাবে নানাভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছিল। তখন আর যে ভ্রাতৃত্ববোধের কথা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বলছিল না, সেটি ছিল না। ছিল প্রভু এবং মালিকের সম্পর্ক।
ইতিহাসের নানা সময়ে জাতি হিসেবে আমাদের সংগ্রাম, আমাদের জাতীয়তাবোধ, আমাদের ভাষা, আমাদের সঙ্গীত, আমাদের সাহিত্য, আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রমাণ করেছিল বাংলাদেশের মানুষের কোনো অংশেই নিকৃষ্ট নয়। বরং আমরা নিজেদের পৃথিবীকে উদাহরণ হিসেবে দেখাতে পারি। এই যে জাগ্রত জাতীয়তাবোধ, সেটার উন্মেষ ঘটেছিল বায়ান্নতে।
এবং তখন স্বাধিকারের আন্দোলন শুরু হল। পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরেই একটা পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসন দাবি করা হল। সেই আন্দোলনসহ যে কোনো আন্দোলনকে পাকিস্তানিরা মুক্তিযুদ্ধের আগপর্যন্ত দেশকে বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ তুলে দমন করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এরপর ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনও শুরু হয় কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসেই। ১৯৬৯-এর গণ আন্দোলনও তীব্রতা পায় ফেব্রুয়ারিতে। সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারিতে। ১৮ ফেব্রুয়ারি হত্যা করা হয়েছিল অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহাকে।
এই সব অত্যাচার-নিপীড়নের প্রতিবাদে মানুষ ফুঁসে উঠেছিল। তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। সেই সময় ফার্মগেটের আনোয়ারা উদ্যান যার নামে, সেই আনোয়ারাও সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যার প্রতিবাদে হরতাল চলাকালীন নাখালপাড়া এলাকায় গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন ফেব্রুয়ারি মাসে।
সেই গণবিক্ষোভে বাধ্য হয়েই ২২ ফেব্রুয়ারি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ অনেককে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আইয়ুব খান। তার পতনের পর আরেক সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানকে চাপিয়ে দিয়েছিল গোটা পাকিস্তানের ঘাড়ে৷
আইয়ুব খান 'এক ব্যক্তি এক ভোট' নিয়মটি বাতিল করেছিলেন। পাকিস্তানের যে পার্লামেন্ট ছিল সেখানে পূর্ব পাকিস্তানে থাকবে ১৫০টি আসন, পশ্চিম পাকিস্তানেও থাকবে ১৫০টি আসন। কিন্তু, জনসংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানে ছিল বেশি। তাহলে তো সংসদে জনসংখ্যার ওপরে ভিত্তি করে যে আসন ব্যবস্থা হওয়ার কথা সেটির ব্যত্যয় ঘটে। আমাদের বেশি আসন পাওয়ার কথা।
আইয়ুব খানের ওই নিয়মটা করা হয়েছিল যেন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত না হয়। জনগণের ভোটে হবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। সেই চেয়ারম্যানরা ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য বানাবে। অর্থাৎ, পরোক্ষ গণতন্ত্র থাকবে।
যুক্তি হিসেবে তারা বলেছিল, পাকিস্তানের জনগণ গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করার যোগ্য নয়। তারা অশিক্ষিত, তারা মূর্খ। তারা বুঝবে না কি করা যায়। আদতে এই ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন কারণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে প্রভাবিত করা খুব সহজ ছিল। তারা সেটা করেছেনও।
এরপর ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হল। সেই যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করে দিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের কি চোখে দেখে। সেই যুদ্ধে বাংলাদেশে পাকিস্তানের বড় কোনো সামরিক ঘাঁটি বা বড় কোনো স্থাপনা ছিল না।
বঙ্গবন্ধু এই বিষয়টি সামনে এনে যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, ভারত চাইলেই বাংলাদেশ দখল করে নিতে পারত৷ কারণ, এখানে বড় কোনো সামরিক ঘাঁটি নেই। পূর্ব পাকিস্তানকে ভারতের দয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল৷ এমনকি এখানে অর্থনৈতিক কোনো কাঠামোও ছিল না। কাজেই আমরা কীভাবে এক পাকিস্তানের অধীনে থাকব?
সেই যুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় ‘তাসখন্দ চুক্তি’ হয়েছিল। সেই চুক্তির সমর্থন জোগাতে আইয়ুব খান তখন সব রাজনৈতিক দলকে ডেকেছিলেন। সেই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুও অংশ নিয়েছিলেন।
অংশগ্রহণ শেষে লাহোরে সংবাদ সম্মেলন করে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ছয় দফার ঘোষণা দিলেন। সেটাও ফেব্রুয়ারি মাসে, ৫ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ, বাঙালির স্বাধীনতার সেই বীজটিও বপণের পর নিপীড়ন শুরু হয়ে গেল।
৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয় পাওয়ার পর ইয়াহিয়া খান ১৪ জানুয়ারি ১৯৭১ বাংলাদেশে এসে করাচিতে ফিরে যাবার পথে ঢাকা বিমান বন্দরে মিষ্টি করে বলেছিলেন, শেখ মুজিব পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। দেশে ফিরে গিয়েই তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
এরপর ভুট্টো হুঙ্কার দিয়েছিলেন যদি মুজিব এবং আওয়ামী লীগ ছয় দফা পরিত্যাগ না করে, তাহলে আমরা জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যাব না। সেই অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ। ঢাকায় এখন যেখানে জাতীয় সংসদ ভবন, সেখানে।
এরপর পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য বিরোধী দল যারা ছিল, তারা বলেছিল, আমরা সংসদ অধিবেশনে যাব। আলোচনা করব। যদি ৬ দফার বিষয়ে মীমাংসা না হয়, আমরাও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একসঙ্গে মিলে প্রতিবাদ করব। কিন্তু সংসদ অধিবেশন বন্ধ করা যাবে না। কারণ, বহুদিন পর পাকিস্তানে গণতন্ত্র বাস্তবায়নের সুযোগ এসেছে।
ভুট্টো ছাড়া বাকি প্রায় সবাই বুঝতে পেরেছিলেন অধিবেশনে না গেলে গণতন্ত্রে উত্তরণের সুযোগ আবারও হাতছাড়া হয়ে যাবে। সামরিক শাসন তো তখনও চলছে। কেবল নির্বাচনের জন্য কিছুটা ঢিলেঢালাভাবে চলছিল। নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা পেলে শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হবেন। তখন তিনিই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ভালো হয় এমন সিদ্ধান্ত নেবেন।
কিন্তু, এটা ভুট্টোর মতো সামরিকজান্তাও মানতে পারেনি। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি। উলটো পশ্চিম পাকিস্তানিরা ভারি অস্ত্র আর সৈন্য এনে বাংলাদেশে জমা করতে লাগল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে বোঝা যাচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তান এবার চূড়ান্ত দমনের পথ বেছে নেবে।
এভাবেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত আগে ফেব্রুয়ারি মাসটাও খুবই উত্তাল ছিল। আমি তখন ছাত্রলীগের গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের সহ-সম্পাদক ছিলাম। এসএসসি পরিক্ষার্থী। তখন, পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভা ছিল ছাত্রলীগ ও ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে।
আমার মনে আছে, সেখানে ছাত্ররা একদম টগবগ করে ফুটছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল যে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না। এরপর সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর জাতি আরও ঐক্যবদ্ধ হল। এক পর্যায়ে শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হল। বঙ্গবন্ধু হলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে।
এরপর একের পর এক নানা দৃশ্যপট আসতে লাগল৷ ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ক্ষমতার পালাবদল হল। খন্দকার মোশতাক এলেন। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ৮১ দিন। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতাচ্যুত হবার পরে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি। তিনি রাষ্ট্রপতি হলেও তখন রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল কার্যত সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জিয়াউর রহমান উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপি গঠন করেন। ১৯৭৯ সালের সেই ফেব্রুয়ারি মাসেই জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় বসেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করলেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা দেন।
সেসময় আমরা প্রথম দিনই প্রতিবাদ করেছি। ২৪ মার্চ মধুর ক্যান্টিন থেকে আমরা মিছিল নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম– যে সামরিক শাসন আমরা মানি না। আমরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন, টিএসসি প্রদক্ষিণ করেছি। আমরা আমাদের সংগঠন জাসদ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনকেও প্রতিবাদে সামিল হতে বলেছি।
এরপর ১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৪টি ছাত্র সংগঠন এক হয়ে আমরা মৌন মিছিল করলাম। এর আগে প্রকাশ্যে আমরা ঝটিকা মিছিল করেছিলাম। পুলিশ চলে এসেছিল ক্যাম্পাসে। সে বছর ৩ নভেম্বর আওয়ামী ছাত্রলীগ মিছিল করেছিল ক্যাম্পাসের ভেতরে জেল হত্যা দিবসের প্রতিবাদে। পুলিশ তাদের তাড়া করে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল।
৮ নভেম্বর আমরা বড় প্রতিবাদ মিছিল করেছি আমাদের ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে। আমাদের মিছিলে পুলিশ যখন আক্রমণ করল, আমরা পাল্টা পুলিশকে তাড়া করলাম। তখন সব ছাত্র নেমে আসল। পুলিশ পিছু হটল। তখন, ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকবে না; এটা আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা হল। সেটা ছিল আমাদের একটা বিরাট বিজয়।
তখন আমরা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনের একটা কর্মসূচি নিলাম। ১৪ সংগঠনের সঙ্গে আরও সংগঠন আসল। প্রথমবার সিদ্ধান্ত হল আমরা ১৯৮৩ সালের ১১ জানুয়ারি রাজপথে মিছিল করব; সামরিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে।
তখন, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ আমাদের অনুরোধ করল যে আমরা সবেমাত্র বৈঠক করছি। আমরা এখনও নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হইনি। তোমরা একটু সময় নাও। আমরা এক মাস পিছিয়ে দিলাম। যদিও এই পেছানো নিয়ে মতবিভেদ ছিল।
এরশাদ কর্তৃক নিয়োজিত ড. মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল, বন্দি ছাত্রদের মুক্তি এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আমরা একটা বিশাল মিছিল বের করলাম। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও সেই মিছিলে এসেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, তিতুমীর কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও আরো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা এসেছিল।
দোয়েল চত্বরের কাছে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙ্গে শিক্ষা ভবনের সামনে এসে আমরা দ্বিতীয় ব্যারিকেডে গিয়ে আটকে গেলাম। এরপর আমরা সবাই সেখানেই অবস্থান নিলাম। ছাত্রীরাও সেখানে অবস্থান নিয়েছিল। হঠাৎ করে বলা নেই, কওয়া নেই তারা আমাদের ছাত্রী বোনদের ওপর জলকামান থেকে রঙিন পানি ছিটানো শুরু করল। এর মধ্যেই টিয়ারগ্যাস ছোঁড়া শুরু করল। হঠাৎ শুনি গুলির শব্দ। আমরা একটা লাশই পেয়েছিলাম। জয়নালের লাশ।
তারপর ছবিতে দেখেছি শিশু একাডেমি চত্বরে অনেকগুলো লাশ স্তূপ করে রাখা ছিল। সেদিন আমি গ্রেপ্তার হয়ে যাই। রাতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্লক করে তারা টিয়ারগ্যাসে কাদের চোখ লাল ছিল, সেটা দেখে-দেখে গ্রেপ্তার করল।সেই কায়দায় তারা আমাকেও গ্রেপ্তার করে। এরপর আমাদের নেওয়া হল প্রথমে পুলিশ কন্ট্রোল রুম, তারপর সেনাবাহিনীর হাতে, সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত প্রাঙ্গন, হেয়ার রোডে নেয়া হল। এই ঘটনার প্রতিবাদে ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হরতাল। দিনভর আন্দোলনে আহত হয়েছে, এমন আরও অনেক ছাত্রকেও সেখানে নেওয়া হল। ওখান থেকে আমাদেরকে হজ্জ্ব ক্যাম্পে সেনা অফিসে, সেখান থেকে এসএন্ডটি ব্যাটালিয়ন হয়ে সেনা গোয়েন্দা ‘সেফ হাউজ’ তথা বন্দিশালায়।
তখনও ‘আয়নাঘর’ ছিল। আয়নাঘর তো গোয়েন্দা সংস্থার কোড নেম। এটা আসলে টর্চার সেল। এই টর্চার সেল তখনও ছিল। সামরিক গোয়েন্দার প্রধান কার্যালয়ে। আমাকে ১৯৭৬ সালে মার্চ থেকে প্রায় ৯০ দিন সেখানে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয়বার ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে আবার আনা হল।
১৫ ফেব্রুয়ারি হরতালে জগন্নাথ কলেজের ছাত্র মোজাম্মেল আইয়ুব পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল। চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র মোজাম্মেল কাঞ্চন মারা গিয়েছিল। তার লাশ নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। সে বছর গোটা ফেব্রুয়ারি জুড়েই বিক্ষোভ ছিল।
এরপর ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাচন বাতিলের দাবিতে আমরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রাজনৈতিক দলগুলোর হরতালের সমর্থনে মিছিল নিয়ে বেরিয়েছিলাম। এরশাদ সরকার তার নিজের দল গঠন করার জন্য একটি প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সেই নির্বাচনের মাধ্যমে। কাজেই আমরা এটার বিরোধিতা করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম সর্বাগ্রে সংসদ নির্বাচন দিতে হবে।
১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিলাম। মিছিলটা যখন ফুলবাড়িয়ায় এগিয়ে গেল, তখন পেছন থেকে একটা পুলিশের গাড়ি মিছিলকে চাপা দিল। সেলিম এবং দেলোয়ার তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায়। সেটাও ফেব্রুয়ারি এবং ওই বছর ছিল লিপ ইয়ার। ২৯ ফেব্রুয়ারি বিশাল মিছিল হল ঢাকা শহরে।
সেদিন রাতে একদিন পরে আদমজী শ্রমিক এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিলে শ্রমিক নেতা তাজুলকে হত্যা করেছিল এরশাদের সমর্থক শ্রমিক সংগঠনের লোকেরা। নেত্রকোণায় তিতাস নামে একটি ছেলেও সেদিন মারা গিয়েছিল। এভাবেই ৮৪-এর ফেব্রুয়ারিটা কাটল।
৮৩ সালের পর থেকে প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি আমরা ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস' পালন করে আসছি। ৮৫ সালেও আমরা এভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ততদিনে এরশাদ তার ছাত্র সংগঠন গঠন করে ফেলেছে। ‘নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ’ তাদের দলের নাম ছিল। তারা এফ রহমান হলকে ঘাঁটি করেছিল। পাশেই ছিল পুলিশ ফাঁড়ি। সেই ছত্রছায়ায় থাকত এরশাদের ছাত্রসমাজ।
আমাদের কর্মীরাও যেত সেখানে। সেখান থেকে বের হয়ে তারা মিছিল করত। ১৩ ফেব্রুয়ারি আমাদের কর্মীরা সব মহসীন হলে জড়ো হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রচার মিছিল করবে।
পরের দিনের ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের কর্মসূচির পরিকল্পনা ছিল কার্জন হলে। সেখানে ৮৩ সালে যারা জীবন দিয়েছিলেন তাদের স্মরণ করব।
প্রচার মিছিলে শফি আহমেদ, মোস্তফা ফারুক, আখতার সোবহান মাশরুর ছিলেন। ছিলেন রাউফুন বসুনিয়া। বসুনিয়া তখন বাকশাল ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।মিছিল নিয়ে মহসীন হলের সামনে প্রধান সড়কে আসার পরই জহুরুল হকের দিকে বন্দুক নিয়ে বসে থাকা নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের নেতারা বাধা দিল। তারা মিছিল নিয়ে বেরুতে দেবে না। তারা গুলি শুরু করল। ছাত্ররা ভেবেছিল, গুলি কি আর গায়ে করবে। তারা ভয় দেখাচ্ছে।
বসুনিয়া তখন রাস্তায় গিয়ে বললেন, গুলি করলে কর। শহীদদের স্মরণ করতে গিয়ে যদি শহীদ হতে হয়, তাহলে শহীদ হব। তারপর গুলি করল ওরা।গুলিতে তিনি লুটিয়ে পড়লেন। তখন ছাত্ররা বসুনিয়ার লাশ টেনে এনে মহসীন হলের ডাইনিং টেবিলের ওখানে রেখে দিয়েছিল।
পরে আমি হলে পৌঁছে তার পালস চেক করে দেখি তিনি মৃত। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলে মৃত ঘোষণা করা হয়। সেই অ্যাম্বুলেন্সেও গুলি চালানো হয়েছিল। এর প্রতিবাদে ১৫ ফেব্রুয়ারি হরতালের মিছিল থেকে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যদিও বিকেলে পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে আমাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এভাবেই এরপর প্রতিটি ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখে বসুনিয়াকে আমরা স্মরণ করেছি, ১৪ তারিখে পালন করেছি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি তো বহুদিন ধরেই পালন করে যাচ্ছি আমরা।
ইতিহাসের এই ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ফেব্রুয়ারি মাস কতভাবেই না আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ইতিহাসে একুশের ইতিহাস আর চেতনা বয়ে যাবে নদীর মতোই।