Published : 23 Mar 2026, 09:22 AM
ঈদের ছুটিতে ইট-পাথরের যান্ত্রিক ঢাকা যখন জনশূন্য হতে শুরু করে, তখন প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এক গভীর বৈপরীত্য—প্রতিবারই ঘরে ফেরার আনন্দযাত্রা পরিণত হয় কষ্ট, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তায়। প্রতিবছরের মতো এবারও রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গেছেন লাখো মানুষ, কিন্তু তাদের যাত্রাপথ বরাবরের মতো অনিবার্য দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। এই দুর্ভোগ কেবল অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ফল নয়; বরং আমাদের নীতিনির্ধারণ, ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ঘাটতির একটি বহুমাত্রিক প্রতিফলন।
প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই ছোট্ট ব-দ্বীপে যখন তিন-চার দিনে কয়েক কোটি মানুষ স্থানান্তরিত হয়, তখন আমাদের পরিবহন খাতের কঙ্কালসার চেহারাটা প্রকটভাবে বেরিয়ে আসে। শুরু হয় অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, টিকিট সংকট, অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তাহীনতা দিয়ে এবং ঈদশেষে দেখতে পাই রক্তভেজা এক মানচিত্র। এবারের ঈদযাত্রাও তার ব্যতিক্রম ছিল না; বরং রেল, সড়ক ও নৌ—তিন পথেই অব্যবস্থাপনার এক ত্রিভুজ সংকট আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
ঈদযাত্রার এই মানবিক সংকটের প্রারম্ভিক দৃশ্য ধরা পড়ে কুমিল্লার একটি লেভেল ক্রসিংয়ে, যেখানে ঈদের রাতে একটি বাস ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নিহত হন এবং আরও ৮ জন আহত হন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী 'ঢাকা মেইল' ট্রেনটি লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। লক্ষ্মীপুরগামী 'মামুন স্পেশাল' বাসটিকে ট্রেনটি ধাক্কা দেয় এবং সংঘর্ষের পর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিটকে যায়। এই দুর্ঘটনা ঘটেছে এমন জায়গায় যা মূল সড়কের অংশ এবং এখানে কমপক্ষে একজন গেটম্যানের থাকার কথা ছিল। তার দায়িত্ব ছিল সিগন্যাল দিয়ে রাস্তা বন্ধ করা। যদি তিনি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেন, তবে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটত না। এটি আমাদের রেল ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যবস্থারই প্রতিফলন।
রেলপথকে সাধারণত সবচেয়ে নিরাপদ এবং আরামদায়ক যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এবারের ঈদযাত্রায় রেল নিজেই যেন সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঈদের আগে বগুড়ার সান্তাহার এলাকায় ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ লাইনচ্যুত হওয়া কেবল সিগন্যাল অমান্য করার ঘটনা নয়; এটি আমাদের রেলওয়ের পরিচালনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এবং অদক্ষতার দৃষ্টান্ত। ট্রেনের ৯টি কোচ লাইনচ্যুত হয়ে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
এই দীর্ঘ সময়ে কমলাপুরসহ বিভিন্ন স্টেশনে হাজার হাজার মানুষের হতাশা, উৎকণ্ঠা ও হাহাকার যে দৃশ্য তৈরি করেছিল, তা কোনো সভ্য দেশে কল্পনা করা কঠিন। ছাদজুড়ে বসে যাত্রীরা যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন, তা আমাদের উন্নয়নের প্রলেপের আড়ালে থাকা দারিদ্র্য এবং সীমাহীন অসহায়ত্বকে স্পষ্টভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। রেল কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকার্যে যে মন্থর মনোভাব দেখিয়েছে, তা যাত্রীদের ভোগান্তিকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি রুটে দুর্ঘটনা ঘটলে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকাটা আমাদের রেল খাতের আধুনিকীকরণের দাবিকেই সামনে আনে।
নৌপথেও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র ভয়ঙ্কর। সদরঘাটে দুই লঞ্চের মাঝে চাপা পড়ে নৌকায় থাকা যাত্রীর মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নিরাপত্তা বিধির প্রয়োগ এখনো কতটা শিথিল। লঞ্চগুলোর মধ্যে যাত্রী ধরার অসুস্থ প্রতিযোগিতা, বিশৃঙ্খলা, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং যাত্রী নিরাপত্তার প্রতি উদাসীনতা—সব মিলিয়ে নৌপথ এখনও এক অনিশ্চিত ঝুঁকির নাম হয়ে উঠেছে।
সড়কপথের চিত্র তো চিরকালই রক্তভেজা। রাজশাহী, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম ও ঝিনাইদহ, হবিগঞ্জ, ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি যেন কেবলই পরিসংখ্যান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, নিয়মনীতি না মানা, গতির দৌরাত্ম্য আর অদক্ষ চালকদের দাপটে মহাসড়কগুলো এখন মৃত্যুপুরী। সাত দিনের দীর্ঘ ছুটি সত্ত্বেও মানুষ কেন শান্তিতে বাড়ি ফিরতে পারল না, সেই উত্তর খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে প্রশাসনের অদক্ষতা ও উদাসীনতা।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো নীতিনির্ধারকদের কণ্ঠস্বরে বাস্তবতার অনুপস্থিতি। রেল ও সড়কমন্ত্রী মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তিনি যখন দাবি করেন যে ঈদযাত্রায় ভাড়া বাড়েনি বরং কমেছে, তখন তা সাধারণ মানুষের ক্ষতস্থানে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো শোনায়। পরিবহন নেতাদের শিখিয়ে দেওয়া বুলি যখন একজন মন্ত্রীর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—তিনি কার স্বার্থ রক্ষা করছেন? সাধারণ জনগণের নাকি শক্তিশালী পরিবহন সিন্ডিকেটের?
তিনি আরও বলেন, পরিবহনের আসনের চেয়ে যাত্রী বেশি, তাই যাত্রীরা নিজেরাই ভাড়া বেশি দিয়ে যেতে চাচ্ছেন। মন্ত্রীর যুক্তি ছিল—চাহিদা বেশি হওয়ায় যাত্রীরা স্বেচ্ছায় বেশি ভাড়া দিচ্ছেন। এটি একটি অদ্ভুত ও অমানবিক যুক্তি। মানুষ যখন জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন সে যেকোনো মূল্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়। এই নিরুপায় অবস্থাকে ‘স্বেচ্ছা’ বলাটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকার অপচেষ্টা মাত্র। অবশ্য এর আগেই তিনি ‘সমঝোতার চাঁদার সংজ্ঞা’ শিখিয়ে ব্যাপক আলোচিত হয়েছেন দেশের মানুষের কাছে। সরকারকে বিব্রত করার জন্য এমন দুয়েকজন মন্ত্রীই যথেষ্ট।
বাস্তবতা হলো, মন্ত্রী যখন সরকারি প্রটোকলে টার্মিনাল পরিদর্শন করেন, তখন তার চারপাশে একটি কৃত্রিম পর্দা তৈরি করা হয়। সেই পর্দার ওপারে যে হাহাকার, কালোবাজারি এবং অতিরিক্ত ভাড়ার উৎসব চলে, তা দেখার চোখ বা সদিচ্ছা কোনোটিই হয়তো তার নেই। দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসেই তাকে সফল হতে হবে এমন নয়, কিন্তু ব্যর্থতা স্বীকার না করার যে গোঁয়ার্তুমি, তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। আমাদের দেশে সমস্যাকে স্বীকার করার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। অথচ সমস্যার স্বীকৃতি ছাড়া কোনো সমাধান সম্ভব নয়। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর প্রথম কাজ হওয়া উচিত বাস্তবতা মেনে নেওয়া, তারপর সমাধানের রূপরেখা দেওয়া। কিন্তু যখন দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তখন মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।
ঈদযাত্রার এই সংকটের একটি প্রতীকী উদাহরণ হলো চন্দ্রা মোড়। উত্তরবঙ্গগামী ২১ জেলার মানুষের জন্য এটি যেন এক বিভীষিকা, এক আতঙ্কের নাম। প্রতি বছর এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে মানুষের ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে যায়। কালিয়াকৈর অংশে রাস্তা সরু হওয়া, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং এবং শিল্পাঞ্চলের হাজার হাজার শ্রমিক একসঙ্গে রাস্তায় নেমে আসা—এই জটলার মূল কারণ। প্রশাসন প্রতি বছর আশার বাণী শোনায়, কিন্তু বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসে না। চন্দ্রার এই বিশৃঙ্খলা আসলে আমাদের ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের সামগ্রিক ব্যর্থতার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ মাত্র।
ঈদ শেষে মানুষের নিরাপদে কর্মস্থলে ফেরা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ঘরে ফেরার পথে যে অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা ও অতিরিক্ত ভোগান্তি দেখা গেছে, ফেরার যাত্রায় তা যেন পুনরাবৃত্তি না হয়—এটি নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য আগাম পরিকল্পনা, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে চন্দ্রা মোড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বিকল্প রুট, সময়ভিত্তিক যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি—অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ না করা এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা।
পরিবহন খাতকে জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করতে হলে কেবল গৎবাঁধা পরিকল্পনা দিয়ে হবে না। এর জন্য প্রয়োজন আমূল সংস্কার। সবার আগে দরকার সিন্ডিকেট ভাঙা: রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা পরিবহন সিন্ডিকেটগুলো ভাঙতে না পারলে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। অবকাঠামো ও বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে। কেবল বড় বড় ফ্লাইওভার নয়, বরং লোকাল বাস স্টপেজ এবং টার্মিনালগুলোর আধুনিকায়ন জরুরি। চন্দ্রার মতো পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী বিকল্প রুট তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ট্রেনের টিকিটের মতো বাসের টিকিটকেও শতভাগ ডিজিটাল এবং এনআইডি নির্ভর করতে হবে যাতে কালোবাজারি বন্ধ হয়। আর দায়িত্ববান ব্যক্তিদের জবাবদিহি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। মন্ত্রী বা সচিব—যিনিই দায়িত্বে থাকুন না কেন, ব্যর্থতার দায় নিতে শিখতে হবে। ভুল স্বীকার করলেই সংশোধনের পথ খুলে যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—মানুষের জীবনের মূল্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। আমরা যেন ভুলে না যাই, প্রতিটি যাত্রী একটি পরিবার, একটি গল্প, একটি জীবনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সড়কপথে যারা যাতায়াত করেন, তারা কেউই মরতে চান না। প্রত্যেকেই চান একটি সুন্দর আগামীর আশায় পরিশ্রম করতে। সাধারণ মানুষ মন্ত্রীদের কাছ থেকে কেবল আশ্বাস নয়, দায়িত্বশীল আচরণ আর সমস্যার সত্য রূপটি স্বীকার করে নেওয়ার সাহস দেখতে চায়। ঈদযাত্রা কেবল বছরের দুই সময়ের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের জাতীয় সক্ষমতা আর শৃঙ্খলার পরীক্ষা। ঈদযাত্রার এই দুর্ভোগ কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; এটি পরিবর্তনযোগ্য। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের দক্ষতা। আমরা যদি এখনই শিক্ষা না নিই, তবে প্রতি বছরের মতো আগামী ঈদেও একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আর সেই পুনরাবৃত্তি কেবল মানুষের কষ্টই বাড়াবে না, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এখন সময় এসেছে—সমস্যা স্বীকার করে, সমাধানের পথে হাঁটার।