Published : 24 Aug 2026, 08:11 AM
একটি আঙুলের স্পর্শে যে পরিমাণ তথ্য এখন আমাদের চোখের সামনে দিয়ে বয়ে যায়, তা হয়তো এক শতাব্দী আগের একজন মানুষ তার পুরো জীবনে গ্রহণ করা তথ্যের চেয়েও বেশি। তথ্য এখন আর আমাদের খুঁজতে হয় না, তথ্যই এসে আমাদের খুঁজে নেয়। সকালে ঘুম ভাঙার আগেই স্মার্টফোনের স্ক্রিনে জমে থাকে অসংখ্য নোটিফিকেশন।
কোনোটি সংবাদমাধ্যমের ব্রেকিং নিউজ, কোনোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন, কোনোটি বন্ধুর পাঠানো ভিডিও, কিংবা কোনোটি বিজ্ঞাপন। ফেইসবুকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত বা রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের খবরের পাশেই বিরিয়ানি রান্নার রেসিপি। এর পরেই কোনো ইনফ্লুয়েন্সারের ব্রেকআপের গল্প, আবার তারপরই হয়তো জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ গ্রাফ! যুদ্ধ, রান্নাঘরের রেসিপি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের নাটক আর মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ, সবকিছু একই স্ক্রিনে পাশাপাশি বসে আছে।
আমরা নিরন্তর স্ক্রল করি, দেখি, রিঅ্যাক্ট করি এবং শেয়ার করি। আমাদের মনে হয়, আমরা অনেক কিছু জানছি। কিন্তু দিনশেষে যদি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, আজ সত্যিই কী বুঝলাম? উত্তরটা প্রায়ই খুব ছোট, কখনো কখনো শূন্য। প্রযুক্তি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে তথ্যের অসীম সমুদ্র। কিন্তু এই সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে আমরা কি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি, নাকি কেবল তথ্যের ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছি?
ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা এক অদৃশ্য তথ্যবন্যার মধ্যে বসবাস করি। কিন্তু ওই বন্যার পানি আমাদের চিন্তার জমিতে খুব বেশি ফসল ফলায় না। তৈরি হয়েছে আমাদের সময়ের এক অদ্ভুত প্যারাডক্স; তথ্যের বন্যা, কিন্তু বোঝাপড়ায় খরা।
২.
একদিকে তথ্যের প্রাচুর্য, অন্যদিকে জ্ঞানের দারিদ্র্য। এই বৈপরীত্যই আজকের যুগের বড় বিড়ম্বনাগুলোর একটি। একটি বিষয়ে হাজারও নিবন্ধ, ভিডিও, পডকাস্ট, গবেষণা ও বিশেষজ্ঞের মতামত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাওয়া যায়। অথচ ওই তথ্যগুলো পড়া, যাচাই করা, পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সময়, ধৈর্য ও আগ্রহ ক্রমেই কমে আসছে।
আমরা ভুলতে বসেছি যে তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। তথ্য হলো কাঁচামাল, আর ওই কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত হয় জ্ঞান, যা তৈরি করে বোঝাপড়ার দক্ষতা। ট্রাক বোঝাই করে ইট, বালি, সিমেন্ট এনে উঠানে ফেলে রাখলেই ঘর তৈরি হয় না। ঘরের জন্য দরকার নকশা, সময়, শ্রম এবং নির্মাণের দক্ষতা। আমাদের মস্তিষ্ক ওই নির্মাতা, কিন্তু আমরা তাকে নির্মাণের সময়টাই দিচ্ছি না।
একটি খবর পড়ার পর সেটি নিয়ে ভাবার, তার পেছনের কারণ খোঁজার, তথ্যের উৎস যাচাই করার কিংবা বিপরীত মতামত শোনার আগেই পরের দশটি তথ্য এসে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে। একটি তথ্যকে আমরা বুঝে ওঠার আগেই আরেকটি তথ্য আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। ফলে তথ্য জমে, কিন্তু তা প্রক্রিয়াজাত হয়ে জ্ঞানে পরিণত হয় না। আমরা হয়ে উঠছি তথ্যের গুদাম, কিন্তু বোঝাপড়ার দিক থেকে ক্রমেই দরিদ্র।
এখানে সমস্যাটা শুধু তথ্যের পরিমাণে নয়, তথ্যের গতিতেও। মানুষের চিন্তার একটি নিজস্ব গতি আছে, কিন্তু ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহের কোনো স্বাভাবিক গতি নেই। একটি খবর, একটি ভিডিও বা একটি মতামত আমাদের সামনে আসতে যত সময় লাগে, সেটি বোঝার জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি সময় প্রয়োজন। ফলে তথ্যের প্রবাহ আমাদের চিন্তার সক্ষমতাকে ক্রমাগত পেছনে ফেলে যাচ্ছে।
৩.
তথ্যের এই বন্যা পুরোপুরি প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে আছে একটি অর্থনৈতিক কাঠামো। মানুষের মনোযোগ এখন ব্যবসার অন্যতম বড় পুঁজি। ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম আমাদের সামনে কেবল তথ্য হাজির করে না; বরং আমাদের মনোযোগকে ধরে রাখার জন্য তথ্য বাছাইও করে। যে কনটেন্ট আমাদের বেশি সময় আটকে রাখে, যেটিতে আমরা বেশি প্রতিক্রিয়া জানাই, সেটিই আবার আমাদের সামনে আসার সম্ভাবনা বাড়ায়।
মানুষের মনোযোগ আটকে রাখার জন্য রাগ, ভয়, বিস্ময়, উত্তেজনা কিংবা কৌতূহলের চেয়ে কার্যকর অস্ত্র খুব বেশি নেই। ফলে গভীর, ধীর, স্থির ও বিশ্লেষণধর্মী কোনো লেখা যতটাই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, সেটি সবসময় অ্যালগরিদমিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারে না। এগিয়ে যায় ওই কনটেন্ট, যা দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। অনেক সময় অর্ধসত্যে ভরা একটি চটকদার শিরোনাম একটি দীর্ঘ গবেষণার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
এখানেই তথ্যের সঙ্গে মনোযোগের রাজনীতি যুক্ত হয়ে যায়। আমরা যা ভাবি বা দেখতে চাই, সেটিই আমরা দেখছি। অ্যালগরিদম আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করে, আমাদের পছন্দ-অপছন্দের একটি মডেল তৈরি করে এবং ওই অনুযায়ী আমাদের সামনে নতুন নতুন কনটেন্ট সাজায়। ফলে আমরা ধীরে ধীরে এমন এক তথ্য-পরিবেশে ঢুকে পড়ি, যেখানে আমাদের আগের বিশ্বাসগুলোই বারবার ফিরে আসে।
এটাই ইকো চেম্বার বা প্রতিধ্বনি প্রকোষ্ঠ। সেখানে আমরা নতুন কিছু শোনার চেয়ে নিজের বিশ্বাসের প্রতিধ্বনিটাই বেশি শুনি। এর বিপদ হলো, আমরা মনে করতে শুরু করি যে আমাদের দেখা তথ্যই পুরো বাস্তবতা। অথচ বাস্তবতা কখনো একমুখী নয়। একটি ঘটনার একাধিক কারণ থাকতে পারে, একাধিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে, এমনকি একই তথ্য থেকে ভিন্ন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো সম্ভব।
কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দ্রুতগতির পরিবেশ আমাদের ওই জটিলতার জন্য খুব বেশি সময় দেয় না। ত্রিশ সেকেন্ডের ভিডিও, দুই লাইনের ক্যাপশন কিংবা শুধু একটি শিরোনাম পড়ে মতামত তৈরি করার অভ্যাস কেবল মনোযোগের সময়কালই কমাচ্ছে না, চিন্তার পরিসরও ছোট করে দিচ্ছে। জটিল কোনো বিষয়কে দীর্ঘ সময় ধরে পড়া, প্রশ্ন করা, সন্দেহ করা, বিপরীত মত শোনা এবং নিজের অবস্থান প্রয়োজন হলে সংশোধন করার অভ্যাস ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে।
৪.
তথ্যের এই বন্যায় মানুষ সাধারণত দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। একদল সবকিছু জানার চেষ্টা করে। তারা একের পর এক খবর পড়ে, ভিডিও দেখে, লিংক খোলে ও পোস্ট সংরক্ষণ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এত বেশি তথ্যের মধ্যে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি সত্য, কোনটি প্রাসঙ্গিক আর কোনটি অপ্রয়োজনীয়, তা আলাদা করতে না পেরে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
অন্যদল তথ্যের এই অবিরাম প্রবাহে ক্লান্ত হয়ে যায়। নতুন কিছু দেখলেই তাদের বিরক্তি আসে। আরও একটি খবর, আরও একটি মতামত বা আরও একটি ভিডিও দেখার আগ্রহ থাকে না। তৈরি হয় এক ধরনের ইনফরমেশন ফ্যাটিগ বা তথ্য-ক্লান্তি।
দুই অবস্থাই শেষ পর্যন্ত একই সমস্যার দিকে নিয়ে যায়; তথ্য বাড়ে, কিন্তু বোঝাপড়া বাড়ে না। এই সমস্যাকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও গভীর।
গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়, আর অসম্পূর্ণ তথ্য থেকেই তৈরি হয়ে যায় দৃঢ় মতামত। এমনকি মানুষ কখনো কখনো কোনো বিষয় সম্পর্কে যত বেশি কনটেন্ট দেখে, ওই বিষয় সম্পর্কে তার অন্ধ বিশ্বাস তত বেশি বাড়ে। যদিও তার জ্ঞান বা বোঝাপড়ার গভীরতা আদৌ বাড়েনি।
৫.
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে অজ্ঞতার নতুন রূপ দেখা দিয়েছে; আর তা হলো অতিরিক্ত তথ্যের মধ্যেও কিছু না বোঝা। তথ্যের অভাবে এখন আমাদের ভুগতে হয় না, বরং তথ্যের বন্যায় ভেসে যাওয়াই আমাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমস্যাটা তথ্যের উপস্থিতিতে নয়; সমস্যা তথ্যকে অর্থবহ জ্ঞানে এবং ওই জ্ঞানকে গভীর বোঝাপড়ায় রূপান্তর করার সক্ষমতার অভাবে।
তথ্যের অপরিকল্পিত প্রবাহ বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, তবে তথ্য নিজে শত্রু নয়। প্রয়োজন তথ্যের প্রবাহ বন্ধ করা নয়, বরং তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ধরন বদলানো। আমাদের শিখতে হবে কখন তথ্য গ্রহণ করতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন প্রশ্ন করতে হবে, কখন উৎস যাচাই করতে হবে এবং কখন কোনো একটি বিষয় নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে ভাবতে হবে।
তথ্যের বন্যা থামবে না, বরং এটি আরও বাড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদমিক কনটেন্ট এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল যোগাযোগ ওই প্রবাহকে আরও তীব্র করবে। তাই ভবিষ্যতের বড় সংকট তথ্য পাওয়া নিয়ে হবে না; সংকট তৈরি হবে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের দক্ষতার অভাবে এবং প্রাপ্ত তথ্য থেকে কীভাবে অর্থ তৈরি করব, তা নিয়ে।
তথ্যের বন্যাকে থামানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়, আর সেটা হয়তো উচিতও হবে না। কিন্তু আমাদের বোঝাপড়ার খরা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে জরুরি বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ।
জয় প্রকাশ সরকার লেখক ও সাংবাদিক। ইমেইল: jps.news.bd@gmail.com