আমরা কি চেয়েছিলাম আমলের বদল ঘটলেও, আদলের বদল না ঘটুক? ব্যবস্থা ও বন্দোবস্তের বদল না ঘটুক? বদল না ঘটুক রুচির, সংস্কৃতির ও সংহতির? ক্ষমতার চর্চা ও অপব্যবহারই যদি শেষ গন্তব্য হয়, তাহলে মানুষের মুক্তি ও মুক্তচিন্তার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে কীভাবে?
Published : 14 Feb 2025, 09:40 AM
সত্য এই যে, কোনো রাষ্ট্র রাজনৈতিক সরকার ব্যতীত খুব শক্তপোক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন সেই পেন্ডুলামের ওপর ঝুলছে। রাজনৈতিক সরকারের মোহ আমাদের হয়তো কাটছে এ বেলায়, নানা কারণেই; কিন্তু রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া রাষ্ট্র কতটা টলমলে হয়ে যেতে পারে, তার উদাহরণও গত কয়েকদিনে বেশ ভালোই দেখা গেছে।
এমন এক ‘মব ইনজাস্টিস’ তৈরি হয়েছে যে, যেসব রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তি অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও লম্বা সময় ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন, তাদের সুর এখন নরম হয়ে এসেছে। তাদের কথার সারমর্ম হলো, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিয়ে এই সরকারের বিদায় নেয়া উচিত। বিশেষ করে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় সবচেয়ে বড় দল বিএনপি স্পষ্ট করেই নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়ে পড়েছে। কিন্তু, সরকার কী চায়, কেন চায়—তা বুঝা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।
২.
অভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে প্রতি-অভ্যুত্থানের সুযোগ ও ‘সম্ভাবনা’ (পড়ুন আশঙ্কা) তো থাকেই। কিন্তু, সেই প্রতি-অভ্যুত্থান যদি অভ্যুত্থানের অংশীজনদের হাতে ঘটে, সেটা হজম করা ও সামলে ওঠা বেশ মুশকিল।
৫ অগাস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রতি-অভ্যুত্থান ঘটেছে, এমন দাবি জোরালো নয়। কিন্তু, এর আশঙ্কাকেও অমূলক বলা যাবে না। বিশেষত, কালচারাল ফ্রন্টে অভ্যুত্থান-পরবর্তী লড়াই যে এখনও উন্মুক্ত আছে, তার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে অমর একুশে বইমেলা-২০২৫। দামাল তারুণ্যের রক্তে রঞ্জিত ফেব্রুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির বইমেলা যেন এক ‘রণভূমি’তে রূপান্তরিত হয়েছে এবার!
বিস্তারিত বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে স্মরণ করা ভালো, রাজনীতি ও ইতিহাস সচেতন স্পর্ধিত মানুষের কাছে ফেব্রুয়ারি মানে শুধু বায়ান্নর অমর একুশে ফেব্রুয়ারি নয়, কিংবা তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গ্রন্থমেলাও মাত্র নয়। ফেব্রুয়ারি মানে বাহাত্তরের ৮ ফেব্রুয়ারি, স্বাধীন দেশে দামাল-দ্রোহের অগ্নিশিখার অনুপ্রেরণায় ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠা ভালোবাসার গ্রন্থমেলা ও একজন চিত্তরঞ্জন সাহার ‘মুক্তধারা’, এটা সত্য। কিন্তু, সত্যাধিক সত্য আরও আছে।
ফেব্রুয়ারি মানে তিরাশির ১৪ ফেব্রুয়ারি, স্বৈরাচার এরশাদশাহীর বিরুদ্ধে জেগে ওঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে চালানো রাষ্ট্রীয়-গুলি আর জাফর-জয়নাল-দীপালি-কাঞ্চনের রক্তে রঞ্জিত ঢাকার রাজপথ। ১৪ ফেব্রুয়ারি মানে তাই 'স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। ফেব্রুয়ারি মানে চুরাশির ২৮ ফেব্রুয়ারি, ফুলবাড়িয়ায় মিছিলরত সেলিম-দেলোয়ারের ওপর নির্মমভাবে উঠিয়ে দেয়া ‘লেফট্যানেন্ট জেনারেল ট্রাক’।
ফেব্রুয়ারি মানে সাধু ভ্যালেন্টাইনের বিদ্রোহের আগুনে জ্বলে ওঠা ‘ভালোবাসা দিবস’। ফেব্রুয়ারি মানে ‘আজ হাসল আগুন, শ্বসল ফাগুন.../ পলাশ অশোক শিমুল ঘায়েল.../ আজ রঙন এল রক্ত-প্রাণের অঙ্গনে মোর চারপাশে/ আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!’ ফেব্রুয়ারি মানে কৃষ্ণচূড়ার লাল-দ্রোহে সাজানো ‘আহা, আজি এ বসন্তে...’।
ফেব্রুয়ারি মানে কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তার ফেসবুকীয় বার্তায় ভালোবাসাকে ‘তামাশা’ সাব্যস্ত করতে চাওয়ার বিরুদ্ধে জাগ্রত প্রতিবাদ। ফেব্রুয়ারি মানে তাই ‘ভালোবাসার ফুল দিও শহীদেরও চরণে’, যে বার্তাটিতে স্পষ্টতই তারুণ্যের প্রেম ও দামাল-দ্রোহ মিলেমিশে একাকার। ফেব্রুয়ারি এমনই; ফেব্রুয়ারি তাই ‘জাগ্রত শহীদ মিনার’, দোর্দণ্ড-দ্রোহী জুলাইয়ের অভূতপূর্ব পূর্বজ।
৩.
বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি হলো তারুণ্যের এক স্পর্ধিত সিগনেচার ও সিম্বল। যার যূথবদ্ধ শক্তিটির নাম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’, যেখানে মিশে যায় মানুষের স্রোত আর মিছিলের মুখ। অথচ, এ বছরের গ্রন্থমেলার সঙ্গে আমাদের চেনা-পরিচিত ঐতিহ্যবাহী মেলার কী এক আশ্চর্য ব্যবধান দেখা যাচ্ছে!
এ কথা অনস্বীকার্য যে, বিগত ১৭ বছরে কিংবা তার আগেও গ্রন্থমেলার গায়ে দলীয়করণের চাপ-তাপ-উত্তাপ লাগিয়ে মেলাকে জেরবার করে দেয়া হয়েছে। এবারের গ্রন্থমেলায় জুলাইয়ের প্রতিরোধ ও সংগ্রামের ছাপ থাকবে, এটা স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাই ছিল। হয়েছেও তাই, জুলাই অভ্যুত্থানই এবারের প্রতিপাদ্য হয়েছে। কিন্তু, যাদের স্মরণে এই গ্রন্থমেলা, তাদের স্মৃতি যথাযথভাবে বলা হবে না, এমনটা হতে পারে না। ‘বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশে’র গায়ে এমন মেরুকরণ কেন ঘটবে? অথচ, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পরিবারের প্রতি অঙ্গীকার ছিল অর্থ ও চিকিৎসা সহযোগিতার, সেসবের কোনো আশাবাদই আমরা শুনতে পাচ্ছি না। শুধু স্মরণে কীইবা যায় আসে!
মেলার শুরুর দিনই ডাস্টবিন-কাণ্ড এবং তা নিয়ে নেটিজেনদের দ্বিধাবিভক্তি গ্রন্থমেলার স্বকীয় শক্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। এমনকি ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন এই ডাস্টবিন-কাণ্ডের সমালোচনা করেছেন।
৪.
এটুকু বাদ দিলে, এবারের গ্রন্থমেলার নেতিবাচক দামামা মেলা শুরু হতে না হতেই বেজে গিয়েছিল। সেটা শেষ পর্যন্ত পুরস্কার নিয়ে ডামাডোলে রূপ নেয়। ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’কে কেন্দ্র করে যে লেজে-গোবরে অবস্থা হলো, তার দায় একাডেমি কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এড়াতে পারেন না সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাও।
পুরস্কৃতদের নাম বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশের পর যেভাবে তিনজনকে ‘ফ্যাসিবাদের দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তালিকা থেকে বাদ দিয়ে পুনরায় হালনাগাদ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত অপমানজনক ও অদূরদর্শী হয়েছে বলা যায়। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বাজে দৃষ্টান্তের উদাহরণ হয়ে রইল। এর চেয়ে কি ভালো হতো না এ বছরের জন্য পুরস্কারের পুরো প্রক্রিয়াটিই স্থগিত রাখা কিংবা পুরো তালিকাই বাতিল ঘোষণা করা?
এর পরে বিতর্কের ডানায় নতুন পালক হিসেবে যুক্ত হলো পুরস্কারের মঞ্চে পুরস্কার গ্রহীতারদের অতিথিদের পেছনে দাঁড় করিয়ে রেখে ফটোসেশন করানো। পদাধিকারে কর্তৃপক্ষ হলেও, অনেকেই পুরস্কার গ্রহীতাদের তুলনায় অভিজ্ঞতা ও বয়সে কনিষ্ঠ। সে কারণে মুরুব্বিদের দাঁড় করিয়ে রাখার সমালোচনা অনেকেই করেছেন।
তবে, প্রশ্নটি বয়োজ্যেষ্ঠ বা বয়োকনিষ্ঠের নয়, প্রশ্নটি রুচি ও সংস্কৃতির। কর্তৃপক্ষ হওয়ার আধিকারিক বলে কেউ বসে থাকবেন, আর গ্রহীতা হিসেবে বাকিরা দাঁড়িয়ে থাকবেন, এটি একটি রুচিহীন সংস্কৃতি। আগেও এমনটা হয়েছে, দৃষ্টিকটূ লেগেছে। কিন্তু, ‘বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশে’র স্বপ্নে বিভোর অন্তর্বর্তী দায়িত্বরতরাও ক্ষমতাবাদী চর্চার ন্যাক্কারজনক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখলে, তা স্বভাবতই সমালোচনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেবেই। শুধু আমল বদলালে তাই হয় না, চিন্তার আদলেও বদল না আনতে পারলে আমরা সেই গড্ডলেই পড়ে থাকব।
‘বাংলা একাডেমি পুরস্কারে’র পর রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ‘একুশে পদক’ নিয়েও বিতর্ক এড়ানো যায়নি। মোটাদাগে এবারের পদকপ্রাপ্তদের নিয়ে প্রায় সবাই উচ্ছ্বসিত থাকলেও, একটি পুরস্কার নিয়ে বহুবিতর্ক হয়েছে, হচ্ছে এখনও।
৫.
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অরাজনৈতিক সরকারের আমলেও বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদক বিতর্কিত হলে, তা অভ্যুত্থানের অংশীজনদের বেদনাহত করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, পুরস্কারের চেয়েও বেশি মর্মাহত হবার মতো বিষয়, মেলার সার্বিক পরিস্থিতি।
বিগত সময়ের মতো এবারও একাডেমি স্টল বরাদ্দ নিয়ে বিতর্ক এড়াতে পারেনি। কয়েকটি প্রকাশনীর তরফে বইমেলা বর্জনও করা হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থ পছন্দ না হওয়ায় ‘সব্যসাচী’ প্রকাশনীতে সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ চালিয়ে স্টল বন্ধ করে দিয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয় এমন একটি গোষ্ঠী, যা বইমেলার ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা।
তার আগেই অবশ্য এমন ঘটনা ঘটানোর প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় দিয়ে রেখেছে পুলিশ। বাংলা একাডেমিকে পাণ্ডুলিপি যাচাই করে তারপর বই প্রকাশের অনুমতি দেয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, যা নিয়েও নিন্দার ঝড় উঠেছে। এবার সেটা না করা গেলেও, ‘ঝামেলা এড়াতে’ আগামী বছর থেকে একাডেমি এই ‘উদ্যোগ’ নেবে বলে পুলিশের বড় কর্তারা আশা ব্যক্ত করেছেন। বই নিষিদ্ধ হওয়াই যেখানে অগণতান্ত্রিক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সেখানে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন ‘মোরাল পুলিশিংয়ে’র উদ্ভব ঘটবে, তা কে কবে ভেবেছিল!
বিগত সরকারের রেজিমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকার সমালোচনা আমরা করেছি। এমনকি হা-হুতাশও করেছি। অগণতান্ত্রিকতাসহ সব কিছুর মিলিত ক্ষোভের গর্ভ থেকেই তো জুলাই-অগাস্টের সৃষ্টি। ফলে, অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও চিন্তার স্বাধীনতায় কোনো কর্তৃপক্ষ, খোদ রাষ্ট্র কিংবা কোনো শক্তিশালী সংক্ষুব্ধ গোষ্ঠী হস্তক্ষেপ করবে না, এটাই ছিল আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু, এবারের মেলাকে কেন্দ্র করে যেসব ডামাডোল পদে পদে সৃষ্টি হচ্ছে, তা আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতাকে দুটি ভিন্ন মেরুতে ঠেলে দিয়েছে।
‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম?’ আমরা কি চেয়েছিলাম আমলের বদল ঘটলেও, আদলের বদল না ঘটুক? ব্যবস্থা ও বন্দোবস্তের বদল না ঘটুক? বদল না ঘটুক রুচির, সংস্কৃতির ও সংহতির? ক্ষমতার চর্চা ও অপব্যবহারই যদি শেষ গন্তব্য হয়, তাহলে মানুষের মুক্তি ও মুক্তচিন্তার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে কীভাবে? দামাল-দ্রোহী ফেব্রুয়ারি কি আমাদের এমন নতজানু নীতিবান এবং ক্ষমতাবানের যা ইচ্ছে করতে চাওয়ার বিলাসিতার শিক্ষা দেয়? সে শিক্ষা কি দেয় জুলাইও?
জুলাইয়ের অভ্যুত্থান প্রতি-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়নি, কিন্তু এমনটা চলতে থাকলে প্রতি-অভ্যুত্থান ঘটতে কতদূর!