Published : 17 Jan 2026, 12:58 AM
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন এক ধরনের দ্বন্দ্বময় মুহূর্তে আটকে আছে। একদিকে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনে সমাজে প্রত্যাশার ঢেউ উঠেছে, অন্যদিকে সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতিদানকারী রাজনৈতিক পরিসর প্রতিনিয়ত ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। মানে, এখানে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তার এ লক্ষ্যে দরকারি দিকনির্দেশনা নেই। পরিবর্তনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা থাকলেও সেই পরিবর্তন বহন করার মতো কাঠামো নেই। এ সত্ত্বেও এই শূন্যতার মধ্যে একের পর এক নতুন প্ল্যাটফর্ম, জোট ও নাগরিক উদ্যোগের আবির্ভাব ঘটছে। ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ বা এনপিএ এর সাম্প্রতিক উদাহরণ।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, এনপিএ নিজেকে বাম, মধ্যপন্থী বা ডানপন্থী কোনো পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করতে চায়নি। তারা দলও নয়, আবার কেবল আন্দোলন বা এনজিও-ধাঁচের নাগরিক ফোরামও নয়। তাদের দাবি মতে, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, ক্ষমতা ও জবাবদিহির কাঠামো এবং রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি নতুন করে ভাবনাচিন্তার দাবি নিয়েই তারা সামনে এসেছে। এবং নতুন এই রাজনৈতিক অনুসন্ধানকে বুঝতে গেলে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা ও স্মৃতির ভারও আমাদের আমলে নিতে হবে।
এই ভারের বড় অংশই তৈরি হয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক ধারাগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতা থেকে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে নৈতিক প্রশ্ন তোলার দায়িত্ব যাদের ওপর ছিল, তারাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। জনগণের জীবনের সঙ্গে সংযোগ না রেখে কেবল তাত্ত্বিক ভাষায় কথা বলা, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার লোভ সামলাতে না পারা এবং বাস্তব সংকটে স্পষ্ট অবস্থান নিতে ব্যর্থ হওয়া এইসব ধারাকে ধীরে ধীরে প্রান্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। ফলে রাজনীতি মানুষের কাছে মুক্তির ভাষার পরিবর্তে সন্দেহের বিষয়ে উপনীত হয়েছে। এই হতাশাই নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
কারণ, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ধারাগুলোর সংকটকে নগ্নভাবে উন্মোচন করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ও প্রথাগত নেতৃত্বের প্রভাব বা প্রয়াস ছাড়াই সাধারণ মানুষ তাদের অধিকারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে; রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানে একত্র হয়েছে এবং ভয়কে জয় করে রাজপথ দখল করেছে। আবার, এই ঘটনায় একই সঙ্গে আরেকটি গভীর সত্যও উন্মোচিত হয়েছে। আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের মুহূর্তে যে বিপুল শক্তি জন্ম নেয়, তা নিজে নিজে রাজনৈতিক পরিসরে রূপ নেয় না। সেই শক্তিকে ধারণ করার মতো বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি কল্পনা ও সংগঠিত দায়িত্ববোধ না থাকলে সম্মিলিত সেই শক্তি ইতিহাসের পাতায় স্মৃতি হয়ে থাকে শুধু, রাজনীতির ভাষায় ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাই একদিকে যেমন সংগঠিত জনতার সম্ভাবনার প্রমাণ, অন্যদিকে তাদের সীমাবদ্ধতারও স্বীকারোক্তি। এই দ্বন্দ্ব থেকেই নতুন নাগরিক উদ্যোগগুলোর উত্থান ঘটেছে। তারা জুলাইকে সমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে না নিয়ে রাষ্ট্র, নাগরিক ও ক্ষমতার সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক অসমাপ্ত রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখতে চেষ্টা করছে।
নতুন এই প্ল্যাটফর্মগুলো তাই নিজেদের পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্নে সচেতনভাবে সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। কারণ তারা ভালো করেই জানে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক লেবেল এখন আর বিতর্কের বাইরে নয়; প্রতিটি পরিচয়ের সঙ্গেই দীর্ঘ ইতিহাস, আস্থাহীন ব্যর্থতার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এনপিএ নেতৃবৃন্দ তাই নামের রাজনীতিতে না গিয়ে পদ্ধতির রাজনীতির কথা বলছে; আদর্শের ঘোষণার বদলে রাজনৈতিক আচরণ ও প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছে। আর এ জন্যই গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার কিংবা পরিবেশ সুরক্ষার মতো ধারণাগুলোকে নিছক দলীয় স্লোগান হিসেবে না রেখে এগুলোকে এমন এক ন্যূনতম রাজনৈতিক নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে–যেন এখানে ভিন্ন মত ও ভিন্ন পটভূমির মানুষ অন্তত কিছু মৌলিক প্রশ্নে একমত হতে পারে।
অবশ্য এই প্রচেষ্টার ভেতরেও পুরোনো অভিজ্ঞতার ছায়া অস্বীকার করা যায় না। যারা এই নতুন রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণে যুক্ত, তাদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন বিভিন্ন আন্দোলন, সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রশ্নে তীক্ষ্ণভাবে সংবেদনশীল করে তোলার পাশাপাশি ক্ষমতার সঙ্গে অতিরিক্ত নৈকট্য কত দ্রুত রাজনীতিকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে ফেলে–এই অভিজ্ঞতাও তাই তাদের আছে। তারা নিজেদের কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক পরিচয়ে আটকে রাখতে না চাইলেও ন্যায়, সাম্য ও শোষণবিরোধী চিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্য তাদের রাজনৈতিক বোধের পরিচায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখবে আশা করা যাচ্ছে।
বলাবাহুল্য, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান এই নতুন নাগরিক উদ্যোগগুলোর সামনে আরও জটিল প্রশ্ন হাজির করেছে। একদিকে বাংলাদেশে ধর্ম মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাকে অস্বীকার করলে রাজনীতি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারী অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা প্রশ্নে আপস করলে রাজনীতি খোদ মানবিক ভিত্তিই হারিয়ে ফেলে। পুরোনো রাজনৈতিক ধারাগুলোকে এই দ্বন্দ্বে প্রায়ই চরমপন্থা বা নীরবতার পথ বেছে নিতে দেখা যায়। নতুন এই প্ল্যাটফর্ম আশা করা যায় এখানে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণের চেষ্টা করবে। যেখানে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও আইন প্রণয়নে কোনো একক পরিচয়ের আধিপত্য প্রশ্নহীন হয়ে উঠবে না।
এই কারণেই নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলোর গুরুত্ব তাদের ঘোষণাপত্রের শব্দচয়নের চাইতেও, তাদের দৈনন্দিন রাজনৈতিক আচরণে স্পষ্ট করার দাবি রাখে। তারা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, ভিন্নমতকে কতটা জায়গা দেয়, কে কথা বলবে আর কে উপেক্ষিত থাকবে, ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে নিজেদের সীমা কোথায় টানবে–এইসব সূক্ষ্ম প্রশ্নই তাদের রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণ করবে। কারণ আকর্ষণীয় ভাষ্য দিয়ে শুরু করে ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে ভেঙে পড়ার নজির বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিয়মিত ঘটনা। আশা করা যায় যে, এই ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন থেকে নতুন এই উদ্যোগ তড়িঘড়ি করে দৌড়াতে না চেয়ে, বরং নিজেদের ভেতরের কাঠামো ও নৈতিকতা নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করবে।
তবে এত কিছুর পরও নতুন এই উদ্যোগকে ঘিরে সন্দেহ থেকেই যায়, এবং এই সন্দেহকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেই এসে ঠেকে যায়। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে নৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগ ক্ষমতার বাস্তবতায় এসে ধীরে ধীরে নিজস্ব ঘোষণার বিপরীত পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এর অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ আমরা দেখেছি, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনি জোট গঠনের মধ্যে। প্রকৃতপক্ষে পুরোনো ব্যর্থতার ধারাই নীরব সতর্কবার্তা হয়ে নতুন এই উদ্যোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এই অভিজ্ঞতাগুলো যদি দায় বা ভয় হিসেবে না নিয়ে সচেতন রাজনৈতিক শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তাহলে এই নতুন পরিসরের টিকে থাকার একটি বাস্তব ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটেই এনপিএর ভেতরের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এখানে বাম রাজনীতির দীর্ঘদিনের সংগঠক ও কর্মীরা আছেন, আবার আছেন নাগরিক আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, ধর্মীয় সংগঠন ও সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষ, যারা নিজেদের আগের পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিসরের প্রয়োজন অনুভব করেছেন। এই বৈচিত্র্য এনপিএকে সম্ভাবনাময় করে তোলে, যেহেতু এটি একক চিন্তা বা একরৈখিক আদর্শে সীমাবদ্ধ নয়। আবার একই সঙ্গে এটি এক ধরনের জটিলতাও তৈরি করে; যেহেতু এখানে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক স্মৃতি, সংগ্রামের অভিজ্ঞতা এবং ব্যর্থতার ইতিহাস একই জায়গায় এসে জমা হচ্ছে। এই বৈচিত্র্যকে যদি সংলাপ ও সহাবস্থানের শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তবে তা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে; আর যদি তা ভেতরের টানাপোড়েনে রূপ নেয়, তবে সেটাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
এই জটিলতার ভেতরেই তথাকথিত বাম রাজনীতির ভূত নতুন করে হাজির হওয়ার চেষ্টা করে। এই ভূত মানে অতীতের নৈতিক আপসের স্মৃতি, জনগণের দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ব্যর্থতা এবং ক্ষমতার মোহে পথ হারানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। এনপিএ যদি সত্যিই নাগরিক অধিকারকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ করতে চায়, তাহলে তাকে এই ভূতকে এড়িয়ে না গিয়ে তার মুখোমুখি হয়েই সামনে এগোতে হবে। তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, এটি আরেকটি আদর্শিক গোষ্ঠী বা বুদ্ধিবৃত্তিক বৃত্ত নয়, বরং বাস্তব মানুষের বাস্তব সমস্যাকে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে রেখে গড়ে উঠা একটি দায়িত্বশীল উদ্যোগ।
আর, এই কারণেই এনপিএ কী দাবি করছে, কী ভাষায় কথা বলছে বা নিজেদের কী নামে পরিচয় দিচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তারা কীভাবে তাদের রাজনৈতিক চিন্তা ও চর্চা করছে। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা স্বচ্ছ, ভিন্নমত ও প্রান্তিক কণ্ঠকে কতটা গুরুত্ব দেয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপের মুখে সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায় কতটা দৃঢ় থাকে এবং ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে নিজেদের সীমা কতটা সচেতনভাবে টানে–এইসব প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই তাদের ভবিষ্যৎ নিহিত থাকবে। যদি তারা আদর্শিক লেবেলের বদলে নাগরিক জীবনের প্রশ্নকে রাজনীতির কেন্দ্রে রাখতে পারে, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলে যেতে পারে।