Published : 22 Jan 2026, 08:09 PM
আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। অধীর অপেক্ষায় ছিলাম যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে ক্রিকেটারদের বৈঠকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু হায়! আবারও দীর্ঘশ্বাস। আশাভঙ্গ। জানি না, বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ না নিয়ে বাংলাদেশের সম্মান কোন দিক দিয়ে বাড়বে, কীভাবে আমাদের জাতীয় মর্যাদা রক্ষিত হবে? তবে ক্রিকেটের যে সমূহ ক্ষতি হতে যাচ্ছে, এটা বুঝবার জন্য রকেট সায়েন্স বোঝা তো দূরের কথা, ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ হওয়ারও দরকার নেই।
শীর্ষ ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠক শেষে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের সামনে খুব কম কথা বললেন। বোঝাতে চাইলেন ভারতের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধাবস্থা জারি আছে। তাই ওই দেশে খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। এ যেন মাঠের লড়াই বাদ দিয়ে কূটনীতির ক্যাচ ধরার মতো হলো।
আসিফ নজরুলের নিজের ভাষায়, “কিন্তু, আমাদের যে নিরাপত্তা ঝুঁকি ভারতে খেলার ক্ষেত্রে, সেই নিরাপত্তা ঝুঁকি পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটে নাই। আমাদের যেই নিরাপত্তা ঝুঁকির যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এটা কোনো বায়বীয় বিশ্লেষণ বা ধারণা থেকে হয় নাই। এটা একটা সত্যিকারের ঘটনার থেকে হয়েছে। যেখানে আমাদের দেশের একজন সেরা প্লেয়ারকে, উগ্রবাদীদের কাছে মাথা নত করে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড তাকে ভারত থেকে বের করে দিয়েছে—সোজা কথা, বের করে দিতে বলেছে।”
মোস্তাফিজুর রহমানকে ভারতে খেলতে ডেকে, খেলতে না দেওয়া সন্দেহাতীতভাবে অত্যন্ত নিন্দার কাজ হয়েছে। তাই বলে ভারতে খেলতে না যাওয়ার দাবিতে করে বিশ্বকাপ থেকে দলের বিরত থাকা স্বয়ং মোস্তাফিজও সমর্থন করবেন বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ এবার আর খেলতে যাচ্ছে না, এটা পরিষ্কার। কী হতাশার কথা টি টোয়েন্টির অধিনায়ক লিটন কুমার দাসের জন্য। কী ভয়াবহ ঘোষণা স্কোয়াডের ১৫ জন ক্রিকেটারের জন্য।
বৈঠক শেষে বিসিবি প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল হাজির হলেন বিধ্বস্ত চোহারায়। চোখে-মুখে অন্ধকার। যদিও আত্মবিশ্বাসের ভাব দেখানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেউ জানুক আর না বুঝুক আমিনুল ইসলাম বুলবুলের এটা বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য কত বড় দুর্দিন আর অন্ধকার সামনে অপেক্ষা করছে। তিনিও পুরাতন কথাগুলো নতুন করে বলে জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশ ভারতে যাচ্ছে না। যতদূর জানা যায়, মঙ্গলবারই শেষ সময়ে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তরফ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। বুলবুল সাহেব আরও চেষ্টার কথা বললেন। আমি ঠিক জানি না তিনি আর কী চেষ্টা করবেন! আর তাতে ফলাফল কি হবে?
ছোট্ট করে জানিয়ে রাখি এই বিশ্বকাপে না গেলে বাংলাদেশের ক্ষতি কী কী? ইএসপিএন ক্রিকইনফোর তথ্য মতে, অংশগ্রণকারী দেশ হিসেবে যে পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার পাওয়ার কথা তা থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। এরপর বঞ্চিত হবে ম্যাচ ফির ২ লাখ ডলার থেকে। যদি ম্যাচের সংখ্যা বেশি হয় এবং বাংলাদেশ বেশি সংখ্যক ম্যাচে জিততে পারে তাহলে এই অঙ্ক আরও বড় হবে। এছাড়া ক্রিকেটাররা বঞ্চিত হবেন বিসিবি থেকে প্রাপ্ত প্রতি ম্যাচ খেলার টাকা। যতদূর জানি বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা প্রতিটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে প্রায় আড়াই লাখ টাকা পান। এছাড়া ক্রিকেট ব্যাটে ব্যবহার করা ব্যক্তিগত স্পন্সরের টাকা থেকেও বঞ্চিত হবেন ক্রিকেটাররা। এর সঙ্গে আছে টুর্নামেন্টের প্রতি দিনের হাত খরচ (ডিএ)। এর বাইরেও খুব সম্ভবত ক্রিকেটারদের কিছু আয়ের খাত থাকে–সেগুলোরও সব বন্ধ হয়ে যাবে। একজন অভিজ্ঞ ক্রীড়া সাংবাদিক আমাকে বলছিলে, টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের প্রত্যেক খেলোয়াড় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা আয় করতে পারতেন। সেটা বন্ধ হলো। আর সবচেয়ে বড় কথা, অনেক ক্রিকেটারের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে গেল চিরতরে। এই স্কোয়াডের খেলোয়াড়রা পরের কোন বিশ্বকাপে আবার দলে জায়গা নাও পেতে পারেন। ফলে এই বিশ্বকাপ তাদের জন্য সারাজীবন হয়ে থাকবে এক গভীর নীল বেদনার দীর্ঘশ্বাস।
গণমাধ্যমে অনেকেই হাইপ তুলেছিলেন, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না গেলে পাকিস্তানও যাবে না! আমার কাছে বিষয়টি চূড়ান্ত রকমের হাস্যকর বলে মনে হয়। বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তান বিশ্বকাপ বয়কট করবে? যে দেশ বিশ্বকাপ জয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তারা কোনো বিবেচনায় এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে যাবে। তবু মন্দের ভালো ভ্যেনু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আয়োজিত ভোটাভুটিতে আমরা পাকিস্তানের ভোটটা পেয়েছি। একবার ভাবুন, জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড এবং আফগানিস্তানও বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এই দলগুলোর এমন অবস্থানের কারণ কি, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের মিত্রতা নাকি ভারতের বৈরিতা? বিশ্ব রাজীতিতে একটা কথা প্রচলিত আছে–মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু তার আর শত্রুর দরকার হয় না। এখন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে–ক্রিকেট বিশ্বে পাকিস্তান কারোর বন্ধু হলে তারও শত্রুর প্রয়োজন হবে না।
ভারত মোস্তাফিজকে আইপিএল দল থেকে বাদ দিয়ে অবশ্যই খারাপ কাজ করেছে, এ নিয়ে আগেও লিখেছি, আবারও লিখব। এটা অন্যায়। কিন্তু ঘরোয়া আইপিএল ইস্যু সামনে রেখে বৈশ্বিক টুর্নাামেন্ট বর্জনের যে অন্ধকার পথে আমরা হাঁটলাম তা রীতিমত বিস্ময়কর গোয়ার্তুমি, অকল্পনীয় মুর্খতা। অযাচিত শত্রুতা। এই শত্রুতার মাশুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ও বাংলাদেশকে কীভাবে দিতে হবে তা একমাত্র ভবিষ্যতৎ বলতে পারে।
বাংলা অভিধান অনুযায়ী অবিমৃষ্যকারী শব্দের অর্থ অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে যে ব্যক্তি চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। আজ ২২ জানুয়ারি ২০২৬ আমার মনে হচ্ছে কতিপয় অবিমৃষ্যকারী ব্যক্তি, যারা বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিরোধিতা পুঁজি করে নিজেদের শাসনকালকে কণ্টকমুক্ত রাখতে চান, তারা নিজেদের স্বার্থ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অন্ধকার চোরাগলিতে ঢুকিয়ে দিলেন। এখান থেকে বের হতে দেশের ক্রিকেটকে যে কত মূল্য হতে হবে তা একমাত্র ভবিষ্যৎ বলতে পারে।
ক্রিকেট কেবল মাঠের লড়াই নয়, জাতীয় আবেগ ও কূটনীতির মাঠও। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারত থেকে বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি আমদানি করেছে। ভালোবেসে ইলিশ রপ্তানিরও রেকর্ড গড়েছে। ভাবছে, আমরা আমজনতা সেই সব দেখতে পাচ্ছি না। এবার আমাদেরকে দেখাবার মতো একটা কাজ হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ বর্জনের মধ্য দিয়ে।