Published : 07 Jul 2020, 11:45 PM
করোনাভাইরাসের দাপট কমছে না। ৬ জুলাই পর্যন্ত পৃথিবী জুড়ে ১ কোটি ১৬ লাখের মতো মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুবরণ করেছেন ৫ লাখ ৩৮ হাজারের মতো। সংক্রমিত এবং মৃত মানুষের সংখ্যা না কমে প্রতিদিনই বাড়ছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। ২৯ লাখ ৮৬ হাজারের মতো আক্রান্ত। মৃত ১ লাখ ৩৩ হাজার। চীনে শুরু হলেও চীন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে, সম্ভবত তার কর্তৃত্ববাদী দমনমূলক শাসনের কারণে। চীনের নাগরিকরা সরকারের নির্দেশ বিনাবাক্য ব্যয়ে মানতে বাধ্য। গণতন্ত্র করোনাভাইরাস মোকাবিলায় অসফল।
তাহলে আগামী পৃথিবী কি চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকবে? এখনই আমাদের গনকের ভূমিকায় যাওয়ার দরকার নেই। পরিস্থিতি আরো কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করাই সমীচীন হবে। তাৎক্ষণিকভাবে যারা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তাদের অনুমান প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়। তবে কয়েকটি খবরের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। এগুলো তথ্য। এ থেকে যার যার মতো মতামত গঠন করা যেতে পারে, ভাবা যেতে পারে আমরা কোন নতুন দিনের দিকে যাচ্ছি। তবে, আমার উদ্দেশ্য হতাশা ছড়ানো নয়, তথ্য জানানো।
প্রথম খবরটি আবারও চীন থেকে। দেখা যাচ্ছে বড় ও অর্থনেতিকভাবে শক্তিশালী চীন এখন খবর তৈরিতেও এগিয়ে থাকছে। খবরটি হলো- গত ৪ জুলাই চীনের ইনার মঙ্গোলিয়া অঞ্চলের একটি শহরের হাসপাতালে বিউবোনিক প্লেগ রোগ ধরা পড়েছে। এই রোগ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে লক্ষ্যে সেখানকার স্বাস্থ্য কমিটি সতর্কতা জারি করেছে। শহরবাসীকে বন্য পশু শিকার ও এর মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্লেগ বা স্পষ্ট কারণ ছাড়াই কোনো জ্বরের ঘটনা ঘটলে ও কোনো অসুস্থ বা মৃত কাঠবিড়াল জাতীয় প্রাণীর দেখা মিললে সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
বিউবোনিক প্লেগ ১১০০ থেকে ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত সময়ে 'ব্ল্যাক ডেথ' নামে পরিচিত ছিল। এটা ইঁদুর, কাঠবিড়ালের মতো তীক্ষ্ণ দাঁতের প্রাণীর মাধ্যমে ছড়াতে পারে এবং প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ২০১৮ সালেও এই রোগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
তাহলে চীনা নাগরিকদের খাদ্যাভাস কি প্রাণঘাতী রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখে? কঠোরভাবে তথ্য নিয়ন্ত্রণের কারণে চীনের সব খবর সব সময় বাইরের দুনিয়া জানতে পারে না, জানতে দেওয়া হয় না।
মনে রাখা প্রয়োজন যে, চীনের উহান শহরে গত বছরের শেষ দিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং দ্রুত দুনিয়াজুড়ে এর বিস্তার ঘটে। চীন যখন করোনাভাইরাসের সংকট কাটিয়ে উঠছে, যখন স্থানীয় সংক্রমণ প্রায় শূন্যের কোঠায়, তখন এই বিউবোনিক প্লেগের খবর জানা গেল। দেখা যাক, এর ধাক্কা কোথায় গিয়ে লাগে।
দ্বিতীয় খবরটি হলো, করোনাভাইরাসের মহামারির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এককোষী এ অণুজীবগুলো মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটায়। বিবিসি জানিয়েছে, এই অণুজীবটির বৈজ্ঞানিক নাম নিগলেরিয়া ফোলেরি। এগুলো মস্তিষ্কখেকো নামে পরিচিত। এগুলো নাক দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। তারপর মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটায় । এ অণুজীবের সংক্রমণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।
মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবায় সংক্রমিত হলে জ্বর, বমিভাব ও বমির উপসর্গ দেখা দেয়। সংক্রমণের এক সপ্তাহের মধ্যে বেশির ভাগ রোগীর মৃত্যু ঘটে। ফ্লোরিডা ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ এক বিবৃতিতে বলেছে, 'মনে রাখবেন, এটি একটি বিরল রোগ। কার্যকর প্রতিরোধমূলক কৌশলই পারে এটি প্রতিহত করতে'।
কী মনে হচ্ছে, চীনা রোগ বিশ্বব্যাপী ছড়ালেও আমেরিকান অ্যামিবা আমেরিকার বাইরে যাবে না? চীনের সম্প্রসারণবাদী ধারা প্রবল হলেও আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী নখরের থাবা বহু ব্যবহারে এখন কিছুটা ভোতা? মানব সভ্যতা কি বিরল সব রোগে এক নিউ নরমাল পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? অপেক্ষা করতে হবে এবং দেখতে হবে।
তৃতীয় খবরটি হলো, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিন পিং সারা জীবনের জন্য ক্ষমতায় থাকার পথ পাকাপোক্ত করেছেন। এই দুই নেতা আমেরিকার চোখের সামনে আগামী বিশ্ব ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পুনর্নির্মাণ করছেন বলে ভূরাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন। পুতিন এবং সি একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে এটা করছেন তা নয়। ট্রাম্পের তৈরি করা অনিশ্চয়তা ও অপরিণামদর্শিতা পুতিন এবং সি'র জন্য সহায়ক পরিস্থিতি তৈরি করছে।
নভেম্বর মাসে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাইডেন নির্বাচিত হলেও তিনি বিশ্বকে আর আগের অবস্থায় নিতে সক্ষম হবেন বলে অনেকেই আর আশা করেন না। পুতিন ও শি জিন পিং নিজ নিজ দেশের ক্ষমতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দুনিয়া জুড়ে ছড়ি ঘোরাবেন বলে কেউ মনে করতেই পারেন। তারা তাদের লক্ষ্যে দৃঢ়। ট্রাম্প দোদুল্যমান, নিজের দলের ভেতর থেকেও সব সময় সহযোগিতা পান না। নতুন কেউ প্রেসিডেন্ট হলেও পরিস্থিতি আমেরিকার জন্য আকাশ-পাতাল পরিবর্তন হবে না। আমেরিকার শাসন ব্যবস্থা চীন এবং রাশিয়ার মতো নয়। চীন এবং রাশিয়া আলাদা আলাদাভাবে যে প্রভাব-প্রতিপত্তি গড়ে তুলছে, তা প্রতিহত করার সক্ষমতা ও দৃঢ়তা আমেরিকার বর্তমানে নেই, ভবিষ্যতে হবে বলেও মনে হয় না।
আমেরিকা নিয়ে পুতিন এবং সি'র ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন রাগ-ক্ষোভ থাকাই স্বাভাবিক। এক সময় এই দুই দেশকেই লেজে ধরে নাচিয়ে মজা পেয়েছে আমেরিকা। পুতিনের সাবেক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস করেছে আমেরিকা। একটু বদলা নেওয়ার সাধ যদি পুতিনের হয়, তা বড় দোষের হবে কেন? আমেরিকার সঙ্গে চীনের পিংপং কূটনীতি গত শতকের সত্তরের দশকে শুরু হয়েছে। তবে চীন এখন বিশ্বপরিমণ্ডলে নিজেকে প্রধান হিসেবে দেখতে চাওয়ায় আমেরিকার সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত দেখা দিয়েছে। শি-ও তাই আমেরিকাকে ভোগাতে চান।
তাহলে কী দাঁড়াবে আগামীর বিশ্ব রাজনীতি? এক দিকে করোনাভাইরাস মহামারী বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কোটি কোটি মানুষ বেকার হচ্ছে। খাদ্য সংকট প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা– সবকিছুই ঝুঁকিতে। মন্দার বড় শিকার হবে নারী এবং কিশোরীরা। বৈষম্য বাড়বে। সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেবে।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব দখলের রাজনীতিতে কোন শক্তি, কীভাবে, কোন দেশের সহযোগিতায় এগিয়ে থাকবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বিশ্বরাজনীতির নতুন মেরুকরণ শুরু হয়নি। কোন দেশ, কোন স্বার্থে চীনপন্থি, রাশিশাপন্থি কিংবা আমেরিকাপন্থি হবে, কেউ আবার নতুন প্রেক্ষাপটে জোট নিরপেক্ষ বলয় তৈরিতে এগিয়ে আসে কিনা– এসবই এখন দেখার ব্যাপার।