Published : 06 Jul 2020, 10:44 PM
মূল্যবোধ মানুষের মনস্তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত। মূল্যবোধ নানারূপ হয়ে থাকে যেমন- সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ। মূল্যবোধের কারণে একজন মানুষ কোন বস্তু, ব্যক্তি ও বিষয়ে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে থাকে এবং তার সঠিক মূল্যমান বুঝতে পারে। একটি সমাজে মানুষের মূল্যবোধ গড়ে উঠে সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ায়। কোনো সমাজের মানুষের মূল্যবোধের আদর্শ মান রক্ষিত হলে সমাজে শান্তি বিরজিত থাকে। কিন্তু কোনো সমাজে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটলে সে সমাজে অস্থিরতা শুরু হয়। মানুষের সামাজিক শান্তি বিনষ্ট হয়। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা ইত্যাদি নেতিবাচক প্রভাবকের কারণের সমাজের মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হয়। মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হলে মানুষ কোনো বস্তু, ব্যক্তি ও বিষয়কে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে না। তখন অনৈতিক বিষয়ও স্বাভাবিক মনে হয়।
বাংলাদেশেও জনগণের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে যে কারণে বাংলাদেশের সমাজে অস্থিরতা রয়েছে। অর্থসম্পদ থাকা সত্ত্বেও সমাজে এক ধরনের চাপা অশান্তি রয়েছে। মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটার অন্যতম কারণ হলো অপরিকল্পিত ও ভুল শিক্ষাব্যবস্থা। এছাড়া আরেকটি কারণ হলো- নিয়ন্ত্রণহীন ও উন্মুক্ত গণমাধ্যম। শৈশবে সামাজিকীকরণের মাধ্যমে মানুষের যে মূল্যবোধ গঠিত হয়, অবক্ষয়িত শিক্ষা ব্যবস্থাধীনে তা আবার পুনর্গঠিত হয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হলো মূলত নৈতিক অবক্ষয় সৃজনের চারণ ক্ষেত্র বিশেষ। যেমন- দেশের বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু ব্যতিক্রম বাদে কোনো ব্যবহারিক পরীক্ষণের অনুশীলন হয় না এবং তার কোনো পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয় না। অথচ বিদ্যালয় পর্যায়ের বিজ্ঞান শিক্ষাব্যবস্থায় হাতে-কলমে ব্যবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক রয়েছে। বাস্তবে ব্যবহারিক পরীক্ষা না নিয়ে সারা দেশে যে বিজ্ঞান শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে তা মূলত শিক্ষা বিষয়ে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বহির্প্রকাশ বিশেষ। ফলত বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ফাঁকিবাজিটি শিক্ষা প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই রপ্ত করা শুরু করে।
আমাদের দেশে অন্যান্য মূল্যবোধের সাথে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও শুরু হয়েছে। সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের যে মূল্যবোধ তাই হলো-আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ। সাংস্কৃতিক উপাদানের মধ্যে রয়েছে ভাষা, খাবার-দাবার ও পোশাক-আশাক। সমস্ত সাংস্কৃতিক উপাদানের মধ্যে ভাষা হলো- অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উপাদান। কারণ একজন মানুষ একটি ভাষা অন্য মানুষের সহায়তায় জন্ম থেকে অবিরত চেষ্টায় আয়ত্ত্ব করে থাকে। এবং এই ভাষা মানুষের প্রাণের সাথে মিশে থাকে। শয়নে-স্বপনে ও সচেতন-অচেতনভাবে এই ভাষার মাধ্যেমে সে জীবনীশক্তি পায়। একটি ভাষা ক্ষেত্রভেদে নানা মূল্যমান লাভ করে থাকে। দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী ভাষার প্রতি মানুষের মূল্যবোধ ভিন্ন হয়ে থাকে। একদিকে, জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা হলো―ক) বৃহত্তর জাতীয় সমাজে আত্তীকরণের মাধ্যম, খ) সামাজিকীকরণের মাধ্যম, গ) জাতীয়তাবাদের প্রতীক, ঘ) সভ্যতার বাহন, ঙ) সামাজিক সম্পদ ও চ) সাংস্কৃতিক সম্পদ। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা হলো―ক) সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার, খ) ভিন সংস্কৃতিকে কলুষিত করার হাতিয়ার, গ) অন্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে পরাধীন করার হাতিয়ার বিশেষ। কিন্তু বর্তমানে ভাষার প্রতি বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যে মূলবোধ গড়ে উঠেছে, সে অনুযায়ী ভাষা হলো―ক) উচ্চশিক্ষার মাধ্যম, খ) আভিজাত্যের প্রতীক, গ) জ্ঞান-গর্বের প্রতীক, ঘ) পাশ্চাত্যে অভিবাসনের সুযোগ ও ঙ) সামাজিক গতিশীলতার সিঁড়ি বিশেষ। অর্থ্যাৎ বাংলাদেশের মানুষের ভাষার প্রতি এই যে মূল্যবোধ তা অবক্ষয়িত মূল্যবোধের বহি:প্রকাশ বিশেষ।
ভাষার প্রতি এই অবক্ষয়িত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আমাদের প্রচলিত ভাষা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। আমাদের দেশের ভাষা শিক্ষাব্যবস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০০ সাল ও ২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতির আলোকে। এই শিক্ষানীতির সাথে দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় অধ্যাপকরা জড়িত ছিলেন। এই শিক্ষানীতিতে স্বাক্ষরতা বাংলা ও ইংরেজি ভাষা পাঠ্যক্রম চালু রয়েছে। তাছাড়া শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলা ও ইংরেজিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অধিকন্তু ইংলিশ মিডিয়াম নামে ইংরেজি মাধ্যমে বিত্তশালী ও প্রভাবশালীদের জন্য ভিন্নতর এক শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। অথচ কোন দেশে দ্বি-ভাষিকতা বিরাজিত না থাকলে, সে দেশের শিক্ষানীতিতে দ্বি-স্বাক্ষরতা (bi-literacy) শিক্ষা চালুকরণ একটি শিক্ষাদর্শন বহির্ভূত অপকর্ম বিশেষ। কিন্তু বাংলাদেশে নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল ব্যতিরেকে কোথাও কোন দ্বিভাষিক পরিস্থিতি বিরাজিত নেই। তা সত্ত্বেও আমাদের শিক্ষানীতিতে দ্বি-স্বাক্ষরতা ও দ্বি-ভাষিক শিক্ষার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সেই অনুসারে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যার ফলস্বরূপ: দেশে ভাষার প্রতি মানুষের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। সে জন্য দেশের মানুষ নিজের ভাষার প্রতি সঠিক মূল্যমান আরোপ না করে, ইংরেজি ভাষার প্রতি অধিকতর মূল্যমান আরোপ করছে।
বাংলাদেশের মানুষের ভাষা সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বা অন্য কথায় ভাষা-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় শুরু হয়েছে, তার ফলে নানা রকম ভাষিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ভাষা-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে সৃষ্ট ভাষিক এই সমস্যা বহুমাত্রিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং দেশের একজন বাংলা ভাষী অন্য একজন বাংলা ভাষীকে ইংরেজিতে চিঠি লেখাকে গর্বের বিষয় মনে করছে। প্রতিটি অফিস-আদালত ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত হচ্ছে। বাংলা-ইংরেজি মিশেলে কথা বলাকে মানুষ গর্বের বিষয় হিসেবে ভাবছে। ইংরেজি ভাষার এই ইচ্ছামাফিক ব্যবহার ব্যক্তিক, পারিবারিক বা বাণিজ্যিক পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা বয়ে আনলেও, বৃহত্তর ক্ষেত্রে তা জাতীয় দেউলিয়াত্বকেই প্রকাশ করে। কারণ, বাংলা ও ইংরেজি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা মাধ্যমে শিক্ষাহগ্রণের ফলে, দেশের মানুষের ভিন্ন ভিন্ন ধারায় সামাজিকীকরণ সংঘটিত হচ্ছে। ফলে ভাষার ভিত্তিতে সামাজিক শ্রেণিবিভাগের সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের স্কুল-কলেজ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার ফলে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ ও সভ্যতার প্রতীক বাংলা ভাষা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। দেশের জ্ঞানভাণ্ডার বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে লিপিবদ্ধায়িত হওয়ার ফলে, বাঙ্গালি সভ্যতায় শুন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে ভাষা- সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে দেশের বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের আদর্শগত শুন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। ভাষা-ভিত্তিক সামাজিক শ্রেণিভেদের সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে ইংরেজি গর্বের কিছু হলেও, জাতিগতভাবে বাংলা ভাষাকে নিয়ে গর্ব করার মতো কোনকিছু অবশিষ্ট থাকছে না। দেশে ভাষা-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের এই যে অবক্ষয় ঘটছে, তা থেকেই ভাষিক-সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এই ভাষিক সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে নি:সন্দেহে জাতীয় সংহতিতে ছেদ ধরাবে।