Published : 18 Sep 2012, 08:09 PM
গ্রহণ হোক বর্জন হোক, মন্ত্রিত্বই রাজনীতির মূল কথা নয়; যদি সে রাজনীতি আত্মকল্যাণ না হয়ে জনকল্যাণের জন্যে নিবেদিত হয়ে থাকে। তাই জনস্বার্থে দীক্ষিত যে কোনো রাজনীতিক মন্ত্রিত্ব গ্রহণ, প্রত্যাখ্যান বা ত্যাগের সৎসাহস রাখেন। এর ব্যত্যয় হলে আমাদের মতো দেশে সেটা একটা বিশাল খবর হয়ে মিডিয়ায় ঢি-ঢি পড়ে যায়। আসলে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ আর যে কোনো প্রকারে তাতে অবস্থানের আত্মনীতি ছাড়া অন্য কোনো সামষ্টিক মঙ্গলের স্বার্থে ভিন্ন কোনো ত্যাগের সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে সহজদৃষ্ট নয়। তবে এটি যে একবারে নেই এমন নয়। এই বিরল উদাহরণ যারা সৃষ্টি করেছেন তাদের মধ্যে আছেন আমাদের কালের শীর্ষতম রাজনীতিকের নাম। তিনি আর কেউ নন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। তিনি যদি বৃহত্তর বাঙালির স্বাধীনতার দাবিটিকে পাশ কাটিয়ে সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রিত্বের পদ গ্রহণের চেষ্টা করতেন, তাহলে আজকের ইতিহাসটাই অন্যরকম হতো। আত্মকল্যাণের স্বার্থ এড়িয়ে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে এই সামষ্টিক কল্যাণের নীতি বেছে নিয়েছিলেন বলেই তিনি বাঙালির মুক্তি ত্বরান্বিত করতে পেরেছিলেন। তাইতো তিনি জাতির জনক। যারা বাঙালি ও বাঙালিত্বের শত্রু, যারা পাকিস্তানী ঘাতকদের ঘৃণ্য দোসর, তারাই স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেছে; আর সময় ও সুযোগমতো তাকে নির্মমভাকে হত্যা করেছে। আসলে সামষ্টিক কল্যাণের ঝুঁকি চরম পর্যায়ে জীবনেরও ঝুঁকি। এমন ঝুঁকি যারা নিয়েছেন তাদের উদাহরণ সর্বকালে সর্বদেশে বিরল।
কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এদেশে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ বা ত্যাগ বা প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারটি অনুরূপ বলে মনে হয় না। কেননা ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিসভায় যোগদানের আমন্ত্রণ গ্রহণ না করার কোনো নজির এদেশে নেই বললেই চলে। বরং মন্ত্রিত্ব গ্রহণের জন্যে তদবিরের ঘটনা আছে ভুরি ভুরি। অর্থাৎ বাংলাদেশের যে কোনো দলের যে কোনো রাজনীতিক মন্ত্রিত্ব গ্রহণের জন্যে সদাপ্রস্তুত। এমনকি সংসদ সদস্য না হলেও ক্ষতি নেই। এর ইতিবাচক দিকটি এই যে, আমাদের রাজনীতিবিদরা অন্তত আত্মবিশ্বাসী। আর এর নেতিবাচক দিকটি হতে পারে, অতিমাত্রিক আত্মমূল্যায়ন। তাই নিজেকে নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করে মন্ত্রিত্বের জন্যে আরো অপেক্ষা করার কোনো দৃষ্টান্ত আমরা দেখিনি বললেই চলে। উপরন্তু একবার মন্ত্রিত্ব পেলে তো ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। এমনকি চরম অসুস্থতার মুহূর্তেও সহজে কেউ পদ ছাড়তে চান না। আবার কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে, কিংবা দৃশ্যমানভাবে সুস্পষ্ট ব্যর্থতার দায়ভাগ কাঁধে নিয়েও তেমন কোনো মন্ত্রীকে পদ ছাড়তে দেখা যায়নি। তবে হালে একজন প্রতিমন্ত্রী সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণ প্রদর্শন করে পদত্যাগ করেছেন, যাকে সাধারণ প্রবণতার ব্যতিক্রম ধরা যেতে পারে। সুস্পষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী বা সমপর্যায়ের ব্যক্তিদের ছুটি গ্রহণ বা প্রদানও সহজপথে সম্পন্ন হয় না। সম্প্রতি একজন চৌকশ রাজনীতিক একটি অভিযোগের মুখে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করলেও আবার জনগণের অবোধ্য কারণে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী পদে বিরাজ করছেন। আর এ-কথাও প্রায় সত্য যে, একবার যারা যে কোনে পর্যায়ের মন্ত্রী হন, তারা বার বার সেই স্তরে বা উচ্চতর স্তরে মন্ত্রী হওয়ার বাসনা পোষণ করেন। আসলে দৃশ্যত গণতান্ত্রিক পথে হোক বা অন্য কোনো অদৃশ্য পথে হোক, সারাজীবন পদে ও ক্ষমতায় আসীন থাকাটা আমাদের বর্তমান রাজনীতিকের অধিকাংশেরই লক্ষ্য। তাইতো নীতি-আদর্শ ইত্যাদি জলাঞ্জলি দিয়ে যখন-তখন দল-বদলেও আমাদের অনেক রাজনীতিবিদের কোনো আপত্তি থাকে না। ক্ষমতার প্রতি এই বাছবিচারহীন মমতাই আমাদের অধিকাংশ রাজনীতিককে স্বার্থান্ধ করে রেখেছে। আর এর ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও ক্ষমতাবদলের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হয়েছে ও হচ্ছে। এই মানসিকতাই গণতান্ত্রিক ক্ষমতাবদলের পদ্ধতি হিসেবে তত্ত্বাবধায়কসহ নানা রকম অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইত্যাদির জন্ম দিচ্ছে। কেননা পরির্পূণভাবে আস্থাশীল ও জনকল্যাণমূলক রাজনীতিতে নিবেদিত একটি সমাজে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে অগণতান্ত্রিক কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। তার উদাহরণ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্ব ছাড়াও আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতবর্ষে বিরাজমান। সহজ কথা, রাজনীতিতে আস্থাশীলতা, পারস্পরিক বিশ্বাস, প্রতিশোধহীনতা, স্বার্থহীন সামষ্টিক কল্যাণ, সততা ও সামাজিক সৌজন্যবেধের বিস্তার ঘটলে গণতান্ত্রিক সদাচার সুপতিষ্ঠিত হতে বাধ্য। ফলে তেমন একটি সমাজে কারো মন্ত্রিত্ব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান বা ত্যাগ একটি অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে না।
আমরা অতি-সম্প্রতি আমাদের প্রবীণ দুই রাজনীতিবিদের মন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যানের ঘটনাটিও এভাবেই বিশ্লেষণ করতে পারি। তাদের একজন জনাব তোফায়েল আহমদ, অন্যজন জনাব রাশেদ খান মেনন। দুইজনই মুক্তিযোদ্ধা, দুইজনই সংগ্রামী, তবে রাজনৈকিত মতাদর্শের দিক থেকে ভিন্ন দলের সদস্য। তাদের মধ্যে ন্যূনতম রাজনৈতিক মিল রয়েছে বলেই তারা একই মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত।
আর মজার ব্যাপর হলো এই যে, তাদের দুজনেরই মন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যানের প্রেক্ষাপট দুরকমের। জনাব তোফায়েল আহমদ দৃশ্যমান কোনো কারণ না দেখিয়ে এবং সম্ভাব্য বিতর্ক এড়িয়ে তার সিদ্ধান্ত জানাতে চেয়েছেন। তিনি তার এলাকায় আরো মনোনিবেশ দেয়াটাই জরুরি মনে করেছেন। সরকারের শেষ সময়ে মাত্র বছরখানেকের মধ্যে তার পক্ষে তেমন কিছু করা সম্ভব হবে কিনা, এই প্রশ্নও তার মনে থাকতে পারে। ইতিমধ্যে তিনি গাজীপুরে দলের নির্বাচনী প্রচারণায়ও অংশ নিয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেছেন। যদি তাই হয়, তাহলে সময়ের কথা বিবেচনা না করে শেষসময়ে সরকারকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করাটাই ছিলো তার জন্যে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে তিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধও বিবেচনা করেননি। এর ফলে তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের বিরাগভাজন হয়েছেন। এই অভিযোগও এসেছে যে, তিনি তৃতীয় শক্তির গোপন উত্থানের সঙ্গে জড়িত। আর তার এই প্রত্যাখ্যানের ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে বিরোধী দল, যারা তাকে প্রকাশ্যে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। আসলে এটি ঝানু রাজনীতিবিদ জনাব তোফায়েল আহমদের অভিমান নয়, অচিন্তিত কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি কূশলী চাল বিশেষ। এই চাল কতোটা সময়োচিত ও যথার্থ, কেবল সময়েই তা প্রমাণিত হবে। তবে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়, আওয়ামী লীগের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের আস্থা ফিরে পেতে তাকে যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
অন্যদিকে, জনাব রাশেদ খান মেননের প্রেক্ষাপটটি কিঞ্চিৎ ভিন্নরূপ। মুক্তিযুদ্ধ, প্রাজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও দলীয় নীতির প্রশ্নে তিনিও উত্তীর্ণ। তবে তিনি যে সব কারণের কথা বলেছেন সেগুলো একেকবার একেক রকম। প্রথমে তিনি যে দলীয় সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন তা বেশ গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছিলো। তার সিদ্ধান্তটি কিছুটা হলেও পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতিবিদ স্বর্গত জ্যোতি বসুর সিদ্ধান্তের মতো মনে হচ্ছিলো। কিন্তু গোল বেধেছে তার পরবর্তী মন্তব্যে। তিনি বলেছেন, মন্ত্রিপরিষদের সচিবের মাধ্যমে তার কাছে যে প্রস্তাব এসেছে তা অবমাননাকর। পরে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ও ভারতের উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন যে, মন্ত্রিত্ব গ্রহণের প্রস্তাব এভাবেই যায়। তখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তর্কে না জড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে রাজনৈতিক রীতিনীতির কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে এটি মোটামুটি পরিষ্কার যে, তার মনোমতো পদ্ধতিতে প্রস্তাব এলে মন্ত্রিত্ব গ্রহণে তার আপত্তি ছিলো না। যা-হোক, তিনিও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আস্থা স্থাপন করেছেন এবং মহাজোটে থাকার কথা বলেছেন। এসব সত্বেও তার প্রত্যাখ্যান যে সরকারের বর্তমান অবস্থান দুর্বল করেছে আর বিরোধী দলকে সমালোচনার একটি মোক্ষম অস্ত্র দিযেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা যতই জল্পনা-কল্পনা করুক না কেন, তার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতাও সময়ে প্রমাণিত হবে।
তবে সময়টা যে খুব বেশিদিন নেই, এতো জানা কথা। অন্তবর্তীকালীন সরকার (তত্ত্বাবধায়ক হোক বা অন্য কোনো ধরনেরই হোক) গঠিত হলেই নির্বাচনের অব্যবহিত আগে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নের মুহূর্তে বরাবরের মতো আত্মকল্যাণপ্রিয় ও সামষ্টিক কল্যাণপ্রিয় রাজনীতিবিদদের মেরুকরণ দৃশ্যগোচর হয়ে উঠবে। তার পূর্ব পর্যন্ত কার উদ্দেশ্য কী, কিংবা তথাকথিত তৃতীয় কোনো শক্তির অবস্থান কোথায়, এসব জানার সহজ কোনো উপায় নেই। অতএব আমাদের মতো আম-জনতার জন্যে কেবল অপেক্ষা আর অপেক্ষা। আমরা চাই সেই অপেক্ষার পর টানেলের শেষে যেন আলোর রেখা দেখা যায়।
১৮.০৯.২০১২
মুহম্মদ নূরুল হুদা:কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।