Published : 26 Jan 2026, 08:21 AM
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র যখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল, তখন সেটাকে কেউ অতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখত না। আর এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। রাষ্ট্র-ক্ষমতার এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠান তখন দেশজুড়ে গ্রন্থসুহৃদ সমিতি গড়ে তুলেছিল। পাঠক তৈরির মধ্য দিয়ে বইপড়ার একটা নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়াস ছিল তার। আর, এইসব ঘটেছে পত্রিকাগুলোর বন্ধুসভা গড়ে তোলার অনেক আগে। এমনকি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আগে এই গ্রন্থকেন্দ্র দেশজুড়ে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিও করেছিল।
এরপর রাষ্ট্র একদিন ঠিক করল, এইসব কাজে আসলে শিক্ষার চাইতে সংস্কৃতির সম্পৃক্ততা বেশি। যুক্তি হিসেবে মন্দ না যদিও। জ্ঞান, মনন, সাহিত্য, পাঠাভ্যাস—এসব তো সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয় মন্ত্রণালয় কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকাকালে গ্রন্থকেন্দ্রকে দেখা হতো একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রকল্প হিসেবে, যার কাজ পাঠক তৈরি করা, গ্রন্থাগার ছড়ানো, লেখক-পাঠক-প্রকাশকের মধ্যে একটা জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তোলা। কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে যাওয়ার পর বই ধীরে ধীরে পরিণত হলো অনুষ্ঠান, অনুদান আর প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার প্রান্তিক উপকরণে। এই বদলের সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থকেন্দ্রও ঢুকে পড়ল দেশের পরিচিত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতার ভেতরে, যেখানে বইয়ের চেয়ে ফাইল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় গ্রন্থাগারের কাছে গ্রন্থ তখন আর মননচর্চার অবকাঠামো না থেকে হয়ে উঠল প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি অনুষঙ্গ, যেখানে বইয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াল কে লিখেছে, কার সুপারিশ আছে, আর কোন কোটা থেকে কত কপি যাবে।
আসলে, আমাদের আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠান কখনোই আসল বিষয় নয়। এখানে পদটাই আসল। চেয়ার থাকলে কাজ ধরে নেওয়া হয়, কিন্তু কাজ থাকলে তার ফলাফল আমলে নেওয়ার শর্ত থাকে না। সকাল-সন্ধ্যা অফিসে বসে থাকা মানেই দায়িত্ব পালন—এমন এক বিশ্বাসে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কোন কাজের ফল কী হলো, তা পরে দেখা যাবে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রও এই বাস্তবতার বাইরে থাকতে পারেনি, থাকবার কথাও নয়। এখানে যারা দায়িত্বে আসেন, তারা অফিস করেন। ফাইল নড়াচড়া সভা হয়, নোট তৈরি হয়, কিন্তু বই নিয়ে ভাবা তাদের দৈনন্দিন চিন্তার কেন্দ্রে থাকে না, থাকার সুযোগই থাকে না। অবশ্য কোনো বই যদি কোনভাবে কোনো সুপারিশ, প্রভাব বা সুবিধার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তার হিসাব আলাদা।
গ্রন্থকেন্দ্রের বাজেট এমনিতেই যৎসামান্য। এই সামান্য বাজেট দিয়েই দেশের হাজারো গ্রন্থাগারের টিকে থাকার কথা, পাঠাভ্যাস বিস্তারের কথা, লেখক ও পাঠকের সম্পর্ক একটু হলেও নিবিড় হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই সামান্য বাজেটই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বের জায়গা। এখানে প্রশ্ন ওঠে না কোন বই পাঠকের প্রয়োজন, কোন বই পাঠরুচি তৈরি করবে বা চিন্তার পরিসর বাড়াবে; প্রশ্ন ওঠে কেবল কার বই কত কপি যাবে, কার নাম কতটা জোরে তালিকায় ঢুকবে। প্রয়োজন নয়, বই নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড হয়ে গেছে সম্পর্ক, সুপারিশ আর সুবিধা। অন্যদিকে, যে হাজারখানেক লাইব্রেরিকে টিকিয়ে রাখার কথা বলে প্রতিবছর এই বরাদ্দের যুক্তি দাঁড় করানো হয়, তাদের বড় একটি অংশই কাজীর গরু, কাগজে-কলমে অস্তিত্বশীল, বাস্তবে নেই।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই দেশের সবচেয়ে কম গুরুত্ব পাওয়া মন্ত্রণালয়গুলোর একটি, এটা কারও অজানা নয়। এখানে বড় প্রকল্প নেই। উদ্বোধন বিশাল আড়ম্বর নেই। উন্নয়নের গল্প বানানোর সুযোগ খুবই কম। ফলে রাজনৈতিক আগ্রহও সীমিত। বরাদ্দ কম, নজর কম। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে গিয়ে তাই ধীরে ধীরে এক ধরনের অবহেলিত দপ্তরে পরিণত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র এক জায়গায় এসে থামে না। অবহেলার মধ্যেও সে রেখে দেয় একটি অদ্ভুত ক্ষমতা—সরকারি অর্থে বই কেনার ক্ষমতা। এই ক্ষমতাই গ্রন্থকেন্দ্রকে একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ও প্রয়োজনীয় করে তুলেছে।
এই ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে বই ক্রয়ের ২০ শতাংশ মন্ত্রী–সচিব কোটা। এটা শুনতে বিশ্ববিরল মনে হলেও এটা আসলে হঠাৎ শুনে বিস্মিত হওয়ার মতো কোনো কিংবদন্তীতুল্য কিছু নয়। এটা অনেক বছর ধরে চলে আসা এখানকার একটা লিখিত ও স্বীকৃত ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে মান যাচাইয়ের কোনো বাধ্যবাধকতা, ক্যাটালগ, পরিদর্শন প্রতিবেদন, পাঠক চাহিদা—কিছুই লাগে না। দরকার শুধু সুপারিশের। বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে কে লিখেছে বা কী লিখেছে তা গৌণ হয়ে মুখ্য হয় কে বলেছে। আর, এই ‘কে বলেছে’ সংস্কৃতিই ক্ষমতার প্রচলিত দর্শনকে নগ্নভাবে দেখিয়ে দেয়। ফলাফলও তাই অনুমেয় এবং বাস্তবে স্পষ্ট। যে দেশে একজন প্রকৃত চিন্তাশীল লেখকের বই বছরে দুই–তিনশ কপি বিক্রি হলেই তা আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, সেই দেশেই একজন অতিরিক্ত আমলার লেখা ‘আমার স্ত্রীর জন্মদিনে লেখা ৫০ কবিতা’ নামক পারিবারিক কবিতার বই রাষ্ট্রীয় অর্থে হাজার কপি করে কেনা হয়। মানে, ক্ষমতা নিজেকেই পাঠক বানিয়ে নিজেরই প্রশংসা ছাপিয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছে। এই যে আমলারা রাষ্ট্রীয় সম্পদকে আত্মপ্রদর্শনের মাধ্যম আর সংস্কৃতিকে আনুগত্যের পুরস্কারে পরিণত করেছে। মোটকথা, এখানে জ্ঞান বা শিল্পের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই; মূল্য নির্ধারিত হয় ক্ষমতার নৈকট্যে। এতে করে বই চিন্তার বাহন হওয়ার বদলে ক্ষমতার স্মারক হয়ে উঠেছে।

এই জায়গায় এসে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সদ্যবিদায়ী পরিচালক আফসানা বেগম যে কথাটি বলেছিলেন, সেটি এই ব্যবস্থার ভেতরে থেকে খুব কম মানুষই বলেন। কারণ, কথাটি শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটাই বিপজ্জনক। না, এ জন্যে তিনি কোনো বিপ্লবী ভাষা ব্যবহার করেননি, মবীয় চিৎকার বা চরমপন্থার আশ্রয় নেননি। শুধু বলেছিলেন, কোটা বাতিল করা হোক, বই নির্বাচন হোক একটি স্বচ্ছ নির্বাচন কমিটির মাধ্যমে, যেখানে লেখার মান, গবেষণার গভীরতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানই হবে প্রধান বিবেচ্য। যুক্তির বিচারে অত্যন্ত নিরীহ ধরণের কথা এইগুলা। এই নিরীহ কথাটাই আমলাতান্ত্রিক অহমের কেন্দ্রে সরাসরি আঘাত করেছে। কারণ, এতে অন্যায় সুবিধাভোগের দীর্ঘকালীন নিশ্চুপ কাঠামোকে প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।
ফলাফলও তাই দ্রষ্টব্য: অল্পতেই গল্পের উপসংহার টেনে কোটা বাতিলের প্রস্তাব নিজেই বাতিল হয়ে গেছে। অবশ্য বাংলাদেশে বাস্তবতা এতটা সোজাসাপ্টা নয়; এখানে শব্দ বদলে বাস্তবতা টিকিয়ে রাখার পুরনো কৌশল আছে। ‘কোটা’ শব্দটি বাদ দিয়ে তাকে ‘সংরক্ষিত সুবিধা’ বলা যেতে পারে। এই শব্দ আগেরটার চাইতে কিছুটা মার্জিত, কিছুটা গ্রহণযোগ্য শোনায়। এই শব্দ-রাজনীতির মাধ্যমেই এখানে ফ্যাসিবাদ শক্তিশালী নেতৃত্বে রূপ নেয়, দুর্নীতি হয়ে ওঠে প্রশাসনিক জটিলতা, আর সাহিত্য নির্বাচনের অনৈতিকতা নাম পায় নীতিগত সমন্বয় নামে। এটা ক্ষমতার ভাষাগত হেজেমনির উদাহরণ, যেখানে ভাষা আর সত্য প্রকাশের মাধ্যম থাকে না, বরং সত্য আড়াল করার দক্ষ যন্ত্রে পরিণত হয়। এবং মানুষ যখন সেই ভাষাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তখন এই অন্যায় নীতির ছদ্মবেশও পেয়ে যায়।
আফসানা বেগম যে ‘জি স্যার’ সংস্কৃতির কথা বলেছেন, এটা তার ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভের প্রকাশ হওয়ার কিছু নেই। এটাই এই জনপদের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বাস্তবতা। এখানে প্রশ্ন করা মানে নিজেকে অস্বস্তিকর ও অপ্রিয় করে তোলা। সবচেয়ে নিরাপদ সুযোগ বুঝে মাথা নাড়ানো অথবা চুপ থাকা। যারা এই নীরবতা ভাঙেন, মাথা উঁচু রেখে যুক্তি ও নৈতিকতা দিয়ে কথা বলেন, তারা সাধারণত বেশিদিন টিকতে পারেন না। আফসানা বেগমের সঙ্গেও শেষপর্যন্ত সেটাই হয়েছে। কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ বাতিল হতে পারে, তবে ‘সংস্কারপ্রিয়’ সরকারের সময়ে খোদ সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী আমলাতন্ত্রের হয়ে বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সংস্কার নিয়ে কথা বললে ‘থোতা মুখ ভোঁতা’ করে দেওয়া হবে। সরকারে কাজ করার প্রধান শর্ত—প্রশ্নহীন আনুগত্য। চলমান ব্যবস্থাকে চালিয়ে নেওয়াই নিরাপদ এখানে, এর অন্যথা অধিকারবহির্ভূত।
প্রশ্নটা তাই একজন আফসানা বেগমকে সরিয়ে দেওয়া নয়, প্রশ্নটা হচ্ছে—জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কি তার ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে, নাকি ক্ষমতার সুবিধাজনক এই ভাষাই থেকে যাবে জ্ঞানের বিকল্প। এই সিদ্ধান্ত নিতে না পারার মধ্যেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক নীরব অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিহিত।