Published : 13 Mar 2026, 04:54 AM
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ এক অচলাবস্থার পর আবারও যেন নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বহু বিতর্ক, সংঘাত এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচন এবং তার পরপরই নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন—দুটি ঘটনাই দেশজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ‘একতরফা নির্বাচন’, ‘রাতের ভোট’ কিংবা ‘আমি ও ডামির নির্বাচন’—এই ধরনের অভিধায় চিহ্নিত নির্বাচনি বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যাওয়া একটি দেশের জন্য নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন তাই স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠেছে ঘটনার ঘনঘটা, বিতর্ক এবং নাটকীয়তায় ভরা।
তবে শুরুতেই একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হয়—এই সংসদও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। অতীতে যেমন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এবারের নির্বাচনেও অনুরূপ এক বাস্তবতা দেখা গেছে। আগে আওয়ামী লীগ নানা রাজনৈতিক কৌশলে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের নির্বাচনের বাইরে রেখেছিল; এবার নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগীদের। ফলে নির্বাচন ও সংসদ নিয়ে সমালোচনা রয়েই গেছে।
এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহফুজ আলমও নির্বাচন নিয়ে তীব্র মন্তব্য করেছেন। তিনি নির্বাচনকে ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ বা ‘বাটোয়ারার’ নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করেন। নিজের ফেইসবুক পোস্টে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ আসন ভাগাভাগি বা সমঝোতার প্রতি ইঙ্গিত করে এবং এনসিপির সমালোচনা করে তিনি লিখেছেন, “নির্বাচনি বাটোয়ারা মেনে নিয়ে এখন বিরোধিতার নাটক করা বন্ধ করেন। বাটোয়ারা করে দেওয়া আর মেনে নেওয়া একপক্ষ, আর জনগণ অন্যপক্ষে।”
২০২৪ সালের জুলাই–অগাস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার হিসেবে পরিচিত এই উপদেষ্টার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ছাত্রদের আবেগ ও হতাশা। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে লিখেছেন, “দুঃখ লাগে ছাত্রদের জন্য। কত কম দামে তাঁদেরকে বিক্রি করে দেওয়া হলো।”
শুধু মাহফুজ আলমের বক্তব্যেই নয়, নির্বাচনে এক ধরনের আসন ভাগাভাগি হয়েছে—এমন আলোচনা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত। যাহোক, প্রথম দিনে সবার দৃষ্টি ছিল নতুন এই জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিকে। সংসদে দুই শতাধিক আসনে জয়লাভকারী বিএনপির আপাতত ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা। তারা একদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে একইসঙ্গে ‘জুলাই সনদ’ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে। এখানেই তৈরি হচ্ছে এক ধরনের রাজনৈতিক দ্বিচারিতা বা উভয়সঙ্কট।
কারণ অনেকের মতে, ‘জুলাই চেতনা’ নামক রাজনৈতিক ধারণাটি মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার একটি প্রয়াস—কেউ কেউ তো সরাসরি বলেন, এটি মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক চেতনাকে নস্যাৎ করার আয়োজন। ফলে বিএনপির এই দ্বৈত অবস্থান অনেকটা ‘সবাইকে খুশি রাখার কৌশল’ বলে মনে হচ্ছে। রাজনীতিতে অবশ্য এমন কৌশল নতুন কিছু নয়—বাংলাদেশে তো নয়ই। বিএনপি চাইছে জুলাইয়ের যোদ্ধাদেরও খুশি রাখতে, একইসঙ্গে নিজেদের পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীকেও খুশি রাখতে। এই সাংঘর্ষিক অবস্থানকে রাজনৈতিক ভাষায় বলে ‘কৌশল’ আর কবিতার ভাষায় বলে ‘ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি!’

সংসদের প্রথম অধিবেশনে জামায়াত এবং তাদের মিত্র এনসিপির ভূমিকাও ছিল বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। তারা সংসদে উপস্থিত থেকেছে, স্পিকার নির্বাচনে বিএনপির প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে; কিন্তু একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং ওয়াকআউট করেছে। রাজনীতির ভাষায় একে বলা যায়—‘সমর্থনও আছে, আপত্তিও আছে।’ যেন এক ধরনের সংসদীয় যোগব্যায়াম!
তবে হতাশাজনক দিক হচ্ছে, স্বাধীনতার মাস মার্চে শুরু হওয়া জাতীয় সংসদের এই অধিবেশনে দেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তেমনভাবে উঠে আসেনি। অধিবেশন শুরু হয়েছে কোরান তেলাওয়াতের মাধ্যমে; অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়নি। অধিবেশন শুরুর আগের দিন স্পিকারের চেয়ারের ওপরে ইসলামের মূল ভিত্তি কালেমা তাইয়্যেবার লেখাচিত্রও স্থাপন করা হয়েছে, এতে রাষ্ট্রের ইসলামধর্মীয় পরিচয় আরও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো—যেমনটা এরশাদের সময় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম দিয়ে শুরু হয়েছিল। এর ফলে নির্বাচনি প্রচারের সময় তারেক রহমানের মুখ নিঃসৃত ‘বাংলাদেশ হবে সব ধর্মের মানুষের দেশ’ কথাটা কথার কথায় পরিণত হয়েছে।

জাতীয় সংগীতের প্রতি জামায়াতের বরাবরের অস্বস্তি বা অনীহার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সংসদেও। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় তাদের পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়ানোর ঘটনা দেখা যায়নি। যেমন একুশের প্রথম প্রহরে এবার প্রথমবারের মতো দলটি শহীদ মিনারে গিয়েছিল রাষ্ট্রীয় আচার পালন করতে, তেমন করেই তাদের সংসদ সদস্যরা সংসদে জাতীয় সংগীতকেও সম্মান দিয়েছেন।
এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। অথচ উপদেষ্টা হিসেবে তিনি এই রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথ নিয়েছিলেন। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—তখন কি রাষ্ট্রপতি গ্রহণযোগ্য ছিলেন, আর এখন সংসদে এসে তিনি অগ্রহণযোগ্য হয়ে গেলেন?
আরেক সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া তো আরও এক ধাপ এগিয়ে সংসদের সামনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা করে মানববন্ধন করেছেন। সেই সমাবেশে তিনি বলেছেন, “রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সময় আমরা দেখতে চাই, কারা সংসদে বসে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শুনছেন। এখান থেকেই বাংলাদেশ দুই ভাগে বিভক্ত হবে—এক ভাগ ফ্যাসিবাদের পক্ষে, আরেক ভাগ ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে।”

সংসদের ভেতরে প্রতিবাদ এবং সংসদের বাইরে মানববন্ধন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সংসদে প্রবেশ করলেও আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে আসতে তারা এখনও প্রস্তুত নয়।
তবে এই অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি আগে বলেছিলেন—সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে তিনি এতদিন পদত্যাগ করেননি। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঝড়ের মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন ‘সাংবিধানিক প্রয়োজনের’ যুক্তিতে।
এরপর একটি দৈনিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের প্রশংসা করেন। তখনই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক অবস্থান কি পরিবর্তিত হচ্ছে?
সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া তার ভাষণ সেই জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে তিনি প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে জনগণের সরাসরি ভোটে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলা।
যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, সেই দলটির বিরুদ্ধে এমন কঠোর সমালোচনা অনেককেই বিস্মিত করেছে। রাষ্ট্রপতি এমন মন্তব্যও করেন যে, আওয়ামী লীগের আমলে দেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
এর আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—নতুন সরকার গঠনের পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চান। কিন্তু সংসদে তার ভাষণ শুনে অনেকের মনে হয়েছে, তিনি হয়তো এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন। মনে হচ্ছে, অন্তত মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির পদে থাকতে আগ্রহী। সমালোচকরা অবশ্য আরও সরাসরি বলছেন—রাষ্ট্রপতি এখন এমন ভাষা ব্যবহার করছেন, যা তার পদে টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। ফলে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করতেও তিনি দ্বিধা করছেন না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবশ্য এই দৃশ্য নতুন নয়। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালে রাজনৈতিক ভাষাও বদলে যায়—এ যেন এক পুরোনো নিয়ম।

এই অধিবেশনে বিএনপির অবস্থানও বেশ নাটকীয়। তারা একদিকে জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানিয়েছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও দিয়েছে—সংসদীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে।
এখানেই শেষ নয়। ষোড়শ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তোলা শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করা হয়েছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন নেতা এবং বিএনপির এক নেতার নাম। তারা হলেন—জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, শুরা সদস্য মীর কাসেম আলী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং বিএনপির সাবেক এমপি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
বিএনপি আপাতত রাজনৈতিক সহযোগীদের না চটানোর লাইন নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একক শক্তি হিসেবে কঠোর অবস্থান নেওয়ার চেয়ে বিভিন্ন শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে চলাই কার্যকর কৌশল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সমন্বয়ের রাজনীতি কত দিন টিকবে? জামায়াত ও এনসিপি ইতিমধ্যেই নানা ধরনের দাবি উত্থাপন করছে। তারা জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। অন্যদিকে বিএনপি আবার মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গেও নিজেদের সম্পৃক্ত রাখতে চাইছে। এই দুই অবস্থান দীর্ঘ সময় একসঙ্গে ধরে রাখা সহজ নয়। ফলে সামনে রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশন তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অধিবেশন নয়—এটি যেন ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি ট্রেলার। এখানে আমরা দেখেছি সহযোগিতা ও বিরোধিতা পাশাপাশি চলছে; নীতি ও কৌশল একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে; আর রাজনৈতিক বক্তব্য অনেক সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশন নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। তবে রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনও সামনে দাঁড়িয়ে আছে—এর পর কী? বিএনপি কি শেষ পর্যন্ত জামায়াত ও এনসিপির দাবির কাছে নতি স্বীকার করবে? নাকি তারা এমন এক সমন্বয়বাদী পথ বেছে নেবে, যেখানে সবাইকে আংশিক সন্তুষ্ট রেখে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হবে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সমন্বয়বাদী পথের একটি লোকপ্রিয় উপমা আছে—‘সর্বঘটের কাঁঠালি কলা’। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন সেই কাঁঠালি কলার স্বাদই পরীক্ষা করে দেখছে।
ভবিষ্যৎই বলবে—এই স্বাদ শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।