Published : 25 Dec 2025, 07:42 PM
বাংলাদেশে 'বলির পাঁঠা' খোঁজার ইতিহাস বেশ পুরনো, তবে এবারের চিত্রনাট্য কিছুটা ভিন্ন। যখন একের পর এক 'মব' গোলপোস্ট ছাড়াই গোল দিয়ে যাচ্ছে, তখন গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকরা ভাবছিলেন—মাঠের আসল খেলোয়াড় কারা? হুট করে বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরীর পদত্যাগে দর্শকদের দোষ দেওয়ার মতো একজন 'নন্দ ঘোষ' দেখিয়ে দেওয়া হলো।
খোদাবকশ চৌধুরী ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)। তার ওপরে ছিলেন এবং এখনো আছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এই চৌধুরীদের মধ্যে দ্বিতীয় জনকে মন্ত্রী বলা যায়, আর তিনি মন্ত্রী প্রথম জন ছিলেন তার প্রতিমন্ত্রী। বাংলাদেশে সবসময় দেখা যায় মন্ত্রী যিনি, তিনিই ছড়ি ঘোরান; আর প্রতিমন্ত্রীরা হন তল্পিবাহক। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে।
সর্বশেষ বিএনপি সরকারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবর। তাকে বলা হতো একজন দাপুটে মন্ত্রী। কারণটা ছিল তার ওপর কোনো পূর্ণমন্ত্রী ছিলেন না, তাই ছড়িটা সবসময় ছিল বাবরের হাতেই। অপরদিকে আওয়ামী লীগ আমলে সাহারা খাতুন যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন, তখন সোহেল তাজকে করা হলো স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সোহেল তাজ তল্পিবাহক হয়ে প্রতিমন্ত্রিত্ব বেশিদিন চালাতে পারেননি, তাই মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন।
খোদাবকশ যে সোহেল তাজের মতো স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেননি, সেটা নিশ্চিত। দেশে নিরাপত্তাহীনতার জন্য কাকে করা হবে বলির পাঁঠা, তা নিয়ে দেশের সংবাদপত্রগুলোতে বেশ কয়দিন ধরে লেখালেখি হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সম্ভবত খোদা বকশকেই করা হয়েছে সেই বলির পাঁঠা—যত দোষ নন্দ ঘোষ।
অথচ মানুষ চেয়েছিল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ। এই উপদেষ্টা মহোদয়ের প্রশাসন চালানোর ধরণটি বেশ অভিনব। যখন জনতা লালমাটিয়ায় নারী নিপীড়নের মতো গুরুতর ঘটনায় রাজপথে নেমে তার অপসারণ চাইছিল, তখন তিনি যেমন অদ্ভুত ধ্যানমগ্নতায় বিভোর ছিলেন, তেমনি উদাসীন ছিলেন তার নিয়োগকর্তাও। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির হালহকিকত জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যেভাবে উত্তর দেন, তাতে মনে হয় তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বদলে কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের 'ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর' হিসেবে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
সাংবাদিকরা যখন অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে প্রশ্ন করেন, উপদেষ্টা মহোদয় তখন সম্ভবত পকেটে রাখা বাজারের ফর্দ চেক করেন। তার কাছে আইন-শৃঙ্খলা আর পেঁয়াজের দাম যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। অপরাধ দমনের ফর্মুলা খুঁজতে গিয়ে তিনি বারবার পেঁয়াজের ঝাঁঝালো তত্ত্বে ফিরে যান। তার এই অদ্ভূত 'ঔদাসীন্য' দেখে বিক্ষুব্ধ জনতা শুধু স্লোগান দিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি, তার কুশপুত্তলিকা দাহ করে আগুনের আঁচ দিয়ে তাকে সজাগ করার চেষ্টা করেছে।

আসলে যখন রাষ্ট্র সংস্কারের উত্তাল সময়ে জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন ‘পেঁয়াজের দাম কমছে কি না’ সেই আলাপ পাড়াটা উচ্চমার্গীয় কৌতুক ছাড়া আর কী হতে পারে? এই 'পেঁয়াজু' কৌশলে খোদা বকশকে বিদায় নিতে হলো, নাকি এর পেছনে ডিপ স্টেটের কোনো কারসাজি আছে, সেই উত্তর খোঁজা দুরূহ।
শরীফ ওসমান বিন হাদি নিহত হওয়ার পর অবশ্য জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে খোদা বকশ চৌধুরীর পদত্যাগের দাবিও সামনে এসেছিল। হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটি ২০ ডিসেম্বর শাহবাগের সমাবেশ থেকে ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে অগ্রগতি জানাতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) খোদা বকশ চৌধুরীকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে জবাব দিতে না পারলে তাদের পদত্যাগ দাবি করে ইনকিলাব মঞ্চ।
ওসমান হাদির হত্যার ফলে দেশে যে ক্রোধ ও শোকের প্রবাহ বয়ে যাচ্ছিল, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ভাবছিলেন 'অপারেশন ডেভিল হান্ট'-এর মাত্রা আরেক ডিগ্রি বাড়িয়ে কিছু আওয়ামী 'ডেভিলকে' জেলে ভরে দিলে দেশে পূর্ণ মাত্রায় শান্তি ফিরে আসবে।
আওয়ামী লীগের বাইরেও যে ‘ডেভিল’ আছে, এই সরকার প্রথম থেকেই তা অস্বীকার করে আসছে। সরকার ভাবছিল, ৩২ নম্বর বাড়িটা যখন উগ্রপন্থীদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা ভেঙে-চুরে উগ্রপন্থীরা তাদের ক্রোধ মেটাবে; তারা আর অন্য কোনো বড় টার্গেটে হাত বাড়াবে না। তার সঙ্গে উগ্রপন্থীরা লালনের গানের আসর ভাঙার অধিকার পেল, ভাঙল মাজার ও দরগাহ, লাইব্রেরি থেকে রবীন্দ্রনাথের বই সরাল, একুশের বইমেলায় দোকান ভাঙচুর করল, শিক্ষকদের হেনস্তা করল, আর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাকে কাজে লাগিয়ে চরম সব কাজ করল—এই সবকিছুই জন্ম দিয়েছে এ দেশে এক নতুন উগ্র 'মব' সংস্কৃতির, যার কাছে আইন ও বিবেচনা দুই-ই অকেজো হয়ে পড়েছে।
সরকারের আসকারা পেয়ে উগ্রপন্থীরা এর মধ্যে আরও নাদুস-নুদুস হয়ে উঠেছে এবং নিত্য নতুন মবের বিস্তার ঘটাচ্ছে। এইবার চরম বিশৃঙ্খলা ছড়াল ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর অফিস দুটিতে আগুন জ্বালিয়ে এবং দেশের সাংবাদিকদের একটা অংশের জীবন বিপন্ন করে। ভাঙচুর করল ও আগুন দিল ছায়ানট আর উদীচীতে। ৩২ নম্বর রোডের বাড়িকে খেলার মাঠ বানাবার প্রকল্পও পূর্ণোদ্যমে চলল। এর সবই উগ্রবাদীরা করেছিল আগেভাগে জানান দিয়ে। সেদিন কোথায় ছিল সরকার? সেই উত্তর এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কেউ দিতে পারেনি।
হয়তো খোদা বকশের পদত্যাগের মাধ্যমে সরকার একটা উত্তর দিতে চেষ্টা করছে এখন। হয়তো যত দোষ নন্দ ঘোষ খোদা বকশ। প্রশ্ন উঠবে, জুলাই সনদ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ‘সভ্যতা’ আনার যে দাবি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস করেছিলেন, তার একক দায়িত্ব কি ছিল একজন বিশেষ সহকারী উপদেষ্টার?
অথচ বিশেষ সহকারী খোদা বকশ—তাকে তেমন দেখা যেত না টেলিভিশনে, সংবাদ সম্মেলনে বা সরকারে পরিকল্পনা নীতি নিয়ে কথা বলতে। হয়তো খোদা বকশের কাজেও গলদ ছিল, নাহলে তাকে পদত্যাগ করতে হলো কেন? তবে আবার প্রশ্নও আছে—পলিসি কার? ‘ডেভিল হান্ট’ কার? মবদের সব আবদার মেনে নিয়েছিলেন কারা? কারা মবকে প্রেশার গ্রুপ নাম দিয়ে উৎসাহ দিয়েছিলেন?
যাহোক, খোদা বকশ পদত্যাগ করেছেন। আশা করা যায় এর পর সব শান্ত হয়ে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো হয়ে উঠবে। তাহলে আমরাও ভাবব—যত দোষ ছিল ‘নন্দ ঘোষ’ খোদা বকশের। সরকারকে ভাবতে হবে আরেকজন বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র) উপদেষ্টা অনতিবিলম্বে নিয়োগ দেওয়ার কথা। এত কিছুর পরও যদি দেশে নিরাপত্তা ও শান্তি ফিরে না আসে, তাহলে নতুন সহকারী উপদেষ্টাকে এরপর আবার বলির পাঁঠা বানানো যাবে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক