Published : 23 Apr 2026, 10:59 AM
ইরান যুদ্ধের শুরুতে ডনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুতে অন্ধ ছিলেন। মূলত নেতানিয়াহুর উসকানিতে পড়েই তিনি ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন। হামলার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে বলেন যে, বর্তমান কট্টরপন্থী শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার এটাই সেরা সুযোগ। ট্রাম্প চেয়েছিলেন হামলার মাধ্যমে ইরানের সরকার ফেলে দিতে। কিন্তু ইরান এই যুদ্ধকে দেখছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে। ফলে সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, যদি তাদের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তবে ইরানের দৃষ্টিতে সেটিই হবে তাদের বড় বিজয়।
মার্কিন-ইসরায়েলি এই হামলাতে ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা এবং আরও অনেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। তবে তৎক্ষণাৎ আরেকটি বাধা তৈরি হয়, তিনি মোজতবা খামেনি। এই যুদ্ধে মোজতবা তার স্ত্রী ও কিশোর পুত্রকে হারিয়েছেন, যে বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে।
মোজতবা খামেনি এমনই এক নেতা, যার সঙ্গে ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী ও অতলস্পর্শী সম্পর্ক ছিল। নেতৃত্বে তার আসীন হওয়ার অর্থ হলো, ইরান আরও সামরিক নির্ভর, আগ্রাসী এবং পশ্চিমা বিরোধী মনোভাব গ্রহণ করে।
অদ্ভুত হলেও সত্য ট্রাম্প একেই বলছেন শাসন পরিবর্তন। তার সংজ্ঞা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে অ্যাডলফ হিটলারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে অ্যাডমিরাল কার্ল ডনিৎসের জার্মান রাষ্ট্রপ্রধান হওয়াটাও একটি শাসন পরিবর্তন ছিল।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরানে শাসন ব্যবস্থা বহাল তবিয়তে টিকে আছে এবং তা আরও কঠিন রূপ ধারন করছে।
ফলাফল, ইরানের স্কোর এক, ট্রাম্প শূন্য।
ইরানের হরমুজ অবরোধ
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধ ইরানের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা সীমিত করবে। তিনি বলেন, “আমরা ধীরে ধীরে আমেরিকাকে ইরানের হুমকি দেয়ার সাহস অথবা শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতাকে ধ্বংস করব।”
এরপর তিনি বারবার দম্ভভরে দাবি করতে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের নৌবাহিনী, আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দিচ্ছে, এগুলোই তাদের কৌশলগত সাফল্য। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের কৌশলগত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
ইরানের পাল্টা নিশানায় ছিল উপসাগরীয় দেশগুলো। এমনকি আরও কঠিন সমস্যা হলো, ইরান এক শক্তিশালী ও নতুন ফ্রন্ট খুলেছিল এবং তা সুচারুভাবে ব্যবহার করছে। সেই ফ্রন্ট ছিল হরমুজ প্রণালি। এই গুটি খেলে, নৌবাহিনী বিধ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও ইরান এখন বিশ্ব অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।
নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বারবার আশ্বস্ত করেছিলেন, মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণে ইরানি শাসনব্যবস্থা এতটাই ভঙ্গুর হবে যে দেশটা হরমুজ প্রণালি অবরোধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু বেকুব নেতানিয়াহু বুঝে ওঠতে পারেননি, পৃথিবীর পাঁচ ভাগের এক ভাগ জ্বালানি এই পথ দিয়ে যায়। আর সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকাতে গেলে সাপের কামড় খাওয়া অনিবার্য।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন, যুদ্ধকালে প্রণালিটির সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিকঠাক রাখা যাবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। হরমুজ বন্ধে ইরান যে বড় ঝুঁকি, সে কথা তিনি ভুলেননি। ট্রাম্প সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দেন এই ভেবে যে, তেমনটা ঘটার আগেই ইরানের বর্তমান সরকার তার পায়ে লুটিয়ে পড়বে। তখন ইরানকে বাধ্য করা হবে সব শর্ত মানতে। ইরান কোনো ঘটনাই না, ধ্বজভঙ্গ দেশ। এভাবে উন্মাদের মতো ট্রাম্প হিসাব কষেন।
কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টা দিকে মোড় নেয়। তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে এবং ট্রাম্প নিজেই এমন এক সংকট বিশ্বজুড়ে তৈরি করেন, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একই সঙ্গে ইরানের জন্য তৈরি হয় নতুন দর কষাকষির সুযোগ।
ফলাফল হল ইরানের স্কোর দুই, ট্রাম্প এখনও শূন্য।
কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়
ট্রাম্প ২০২৫ সালের জুন অভিযানে দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পিট হেগসেথ আরও এক কাঠি সরেস। শুধু পারমাণবিক স্থাপনাই নয়, ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষাও ধূলিসাৎ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ট্রাম্প এই অভিযানের সাফল্য নিয়ে কোনো দ্বিধা ছাড়াই বারবার নিজের জয়ের প্রতিধ্বনি করতে থাকেন। তার বক্তব্যে বারবার একই দাবি ঘুরে ফিরে আসে,
“এই হামলা তাদের সম্পূর্ণ সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতাকে অকার্যকর করে দিয়েছে।” (১৬ জুলাই)
“আমরা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি … ইরানের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক সক্ষমতা।” (১৮ আগস্ট)
“সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে আমি ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষাও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।” (২০ সেপ্টেম্বর)
“আসলে তাদের কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি নেই। এটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।” (১৩ অক্টোবর)
“ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা আমরা খুব দ্রুত, জোরালো এবং শক্তিশালীভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।” (১৯ নভেম্বর)
“আমরা তাদের পারমাণবিক সক্ষমতাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।” (১১ ডিসেম্বর)
“আমরা ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে অকার্যকর করে দিয়েছি এবং এটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।” (৮ জানুয়ারি)
“…ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।” (২০ জানুয়ারি)
কিন্তু অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ইরান যুদ্ধ শুরু করার যুক্তি হিসাবে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখনও ধ্বংস করা যায়নি। ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির দোরগোড়ায়। তাদের পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে দেয়া যাবে না। তাদের আটকাতে হবে, আমরা ইরানে অভিযান পরিচালনা করব।
অন্যদিকে, বোমা মারা কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে ঘোরতর প্রশ্ন আছে। অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা, যেখানে কিছু ইউরেনিয়াম মজুত থাকতে পারে। তবে এই স্থাপনাটি ভূগর্ভে এতই গভীরে অবস্থিত যে আমেরিকার ৩০,০০০ পাউন্ডের বাঙ্কার-বাস্টার বোমাও সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম না।
অবশ্য ট্রাম্প দাবি করেন, প্রয়োজনে বাঙ্কারের ভেতরে ঢুকে পারমাণবিক সরঞ্জাম বের করে আনব। বাস্তবতা হলো, স্থলপথে এমন অভিযান চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে অংশ নেয়া সেনাদের জন্য বিপদের মাত্রা হবে অত্যন্ত উচ্চ এবং সফলতার কোনো নিশ্চয়তা নাই। বরং ফলাফলের অনিশ্চিত মডেলকে সমর্থন করে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পারমাণবিক হুমকি সত্যিই এড়ানো যাচ্ছে না।
চূড়ান্ত ফলাফল ইরান তিন, ট্রাম্প ডাহা শূন্য।
বিজয়ের ঘোষণা অথচ পরাজয়
ইরানি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আস্ফালন বৃথা। ইরানের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর হামলার হুমকি সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন তুললেও, এসব ইরানি নেতাদের ওপর সামান্যই প্রভাব রাখে। বরং এই হুমকিগুলো ইঙ্গিত দেয়, নিজের তৈরি ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে ট্রাম্প কতটা মরিয়া। আলোচনার কৌশল হিসেবে এই পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হয়।
ট্রাম্প ইরানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত কৌশলগত বিজয়ের দম্ভোক্তি করেন। কিন্তু তিনি একটি মৌলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করেন যে, ইরান যুদ্ধে তিনি কার্যত পরাজিতই হয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং ট্রাম্পের আনকোরা চেলা চামুন্ডাদের দ্বারা কোনো চুক্তি হলে, তা গভীর ঝুঁকির জন্ম দেবে। এর পরিণতি হিসাবে শুধু আমেরিকা নয়, গোটা বিশ্বকেই চরম মূল্য চুকাতে হতে পারে।
লেখাটি এশিয়া টাইমস থেকে অনূদিত; এর লেখক স্টিভেন জে. হার্পার একজন আইনজীবী এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি আইন স্কুলের খণ্ডকালীন শিক্ষক। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থের লেখক, যার মধ্যে ‘Crossing Hoffa: A Teamster's Story’ এবং ‘The Lawyer Bubble: A Profession in Crisis’ অন্যতম। তিনি ‘The American Lawyer’-এর একজন নিয়মিত কলামনিস্ট।