Published : 09 May 2026, 06:26 PM
বাংলাদেশে বহুদিন ধরে একটি আরামদায়ক ধারণা চালু ছিল যে, মন্ত্রী হওয়া মানেই সম্মান, এসকর্ট, আর মাঝেমধ্যে দায়িত্বশীল মুখভঙ্গি। কাজ থাকে, তবে সেটি দূর থেকে অনুভব করা যায়, কাছ থেকে দেখা যায় না। সেই সুখকর ভুলটিকে নির্দ্বিধায় ভেঙে দিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন। সম্প্রতি তিনি অকপটে জানিয়েছেন, ‘মন্ত্রিত্ব এত কঠিন জানলে দায়িত্ব নিতাম না।’ কথাটা শুনে বোঝা যায়, বাস্তবতা কখনো কখনো বক্তৃতার চেয়েও বেশি সোজাসাপ্টা।
এরপর তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে এমন একটি তথ্য দিয়েছেন, যা প্রায় দার্শনিক পর্যায়ে পড়ে। সারা জীবনে তিনি এক ঘণ্টার জন্যও চাকরি করেননি, আর ৭৩ বছর বয়সে এসে সেই অভিজ্ঞতায় প্রবেশ করেছেন। সাধারণত এই বয়সে মানুষ অবসরের স্বাদ নেন; তিনি উল্টো প্রথমবার কর্মজীবনের স্বাদ নিচ্ছেন—তাও সরাসরি মন্ত্রীর চেয়ারে বসে। এটিকে ক্যারিয়ারের ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ বললেও কম বলা হয়। বাক্যটি তিনি শেষ করেছিলেন, “সকাল ৭টায় উঠতে হয়, রাত ১১টায়...”। এর পরের অংশটি অজানা রয়ে গেছে, ছোটগল্পের মতো ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ—হয়তো বাস্তবতার ভারে বাক্য থেমে গেছে, অথবা বাকিটা শ্রোতাদের কল্পনার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এই বক্তব্যের পর জাতি কিছুটা থমকে গেছে, তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের ভুল বুঝতে শুরু করেছে। এতদিন আমরা মন্ত্রীদের জীবনকে সহজ ভেবে হালকা করে নিয়েছি; সমালোচনা করেছি, ব্যঙ্গ করেছি, মিম বানিয়েছি। অথচ এই কঠিন বাস্তবতার দিকটি আমাদের নজরেই আসেনি। ভেবে দেখুন, ৭৩ বছর বয়সে কেউ প্রথমবার চাকরিতে ঢুকছেন, তাও এমন এক চাকরি যেখানে সকাল ৭টায় উঠতে হয়। এই সময়টি নিছক সময় নয়, এটি মানুষের সঙ্গে অ্যালার্মের এক নীরব যুদ্ধের মুহূর্ত। এখানে প্রতিদিন একটাই প্রশ্ন ঘোরে: ‘আর পাঁচ মিনিট কি খুব বেশি?’
সেই লড়াইয়ে প্রতিদিন জিততে হয় একজন মানুষকে; এটাকে নিছক দায়িত্ব বলা যায় না, এতে আত্মত্যাগের মহিমা আছে। এতদিন যার সকাল হয়তো একটু দেরিতে শুরু হতো, চা-নাস্তা আর পত্রিকার পাতা উল্টে দিনের পরিকল্পনা হতো, তার জন্য হঠাৎ সকাল ৭টা একেবারেই নতুন বাস্তবতা। এই পরিবর্তনকে সহজ বলা কঠিন; বরং এটাকে এক ধরনের জীবনযাত্রার ধাক্কা বলা যায়। আর সেই ধাক্কার মধ্যেই তিনি এখন দেশ-জাতির কল্যাণে দায়িত্ব পালন করছেন! এটাই আশ্চর্য গল্প।
ইয়াছিন সাহেবের আরেকটি স্বীকারোক্তি আরও বেশি চিন্তার খোরাক জোগায়—তিনি নাকি জীবনে এক ঘণ্টার জন্যও চাকরি করেননি। কথাটা শোনার পর দেশের লাখো চাকরিজীবী মানুষ যেন হালকা ধাক্কা খেয়েছেন। এতদিন তারা ভেবেছিলেন সকালবেলার অ্যালার্ম, অফিসের চাপ, বসের ধমক, ডেডলাইন আর ট্রাফিক—এসবই বুঝি কঠিন জীবনের চূড়া। এখন মনে হচ্ছে, তারা হয়তো ভুল বই পড়ছিলেন। কারণ প্রায় ৭২ বছর ধরে টানা ‘চাকরিবিহীন’ জীবন কাটিয়ে হঠাৎ মন্ত্রী হওয়া—এ এক ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা, যা সাধারণ কর্মজীবনের তুলনায় অনেক বেশি ‘গভীর’।
হিসাবটা করলে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হয়। প্রায় ছয় লক্ষ ঘণ্টা কর্মজীবন থেকে দূরে থেকে সরাসরি মন্ত্রিত্বে প্রবেশ—এটাকে কেউ কেউ ‘ক্যারিয়ার জাম্প’ বলতেই পারেন। তবে এখানেই ছোট একটি সংশোধনী দরকার। কাজ না করেও মন্ত্রী হওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়; এর জন্য অন্য ধরনের পুঁজি লাগে, যা সিভিতে লেখা থাকে না, কিন্তু সিদ্ধান্তে কাজ করে। ফলে বেকার যুবকদের জন্য এটি কোনো মোটিভেশনাল গল্প নয়, বরং একটি বাস্তব উদাহরণ।
আমরা যারা প্রতিদিন একই রুটিনে চলি—সকালে উঠি, কাজে যাই, সন্ধ্যায় ফিরি—তারা আসলে কষ্টকে অভ্যাসে পরিণত করেছি। তাই সেটিকে আর ‘কঠিন’ মনে হয় না। কিন্তু যিনি দীর্ঘ সময় সেই অভিজ্ঞতার বাইরে ছিলেন, তার কাছে এটি স্বাভাবিকভাবেই এক সাংস্কৃতিক ধাক্কা। বিষয়ট অনেকটা এমন: সারাজীবন নদীর পাড়ে বসে থেকে হঠাৎ একদিন মাঝনদীতে নামিয়ে দেওয়া হলো আর বলা হলো, ‘এই নাও, সাঁতার কাটো।’ তখন যদি তিনি বলেন পানি গভীর, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না।
এবার আসি রাত ১১টার প্রসঙ্গে। মন্ত্রী সাহেব বাক্যটি শেষ করেননি, কিন্তু কল্পনার জায়গা রেখে গেছেন। রাত ১১টায় তিনি কী করেন? টিভি দেখেন? হতে পারে। তবে মনে হয় তিনি হয়তো গভীর চিন্তায় ডুবে থাকেন—মন্ত্রিত্ব চালিয়ে যাবেন, নাকি জীবনের এই নতুন ‘চাকরি’ থেকে অবসর নেবেন। অথবা হয়তো ডায়েরিতে লিখেন, “আজ বুঝলাম, প্রতিদিন অফিস করা মানুষগুলো আসলে নীরব যোদ্ধা।”
রাত ১১টা এমন একটি সময়, যখন কেউ সিরিজ দেখে, কেউ দ্বিতীয়বার খাবারের কথা ভাবে, আর কেউ জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে বিচার করে। সেই সময়েও যদি কেউ দায়িত্ব পালন করেন, সেটি নিঃসন্দেহে পরিশ্রমের বিষয়। দৃশ্যটা কল্পনা করলে সত্যিই সিনেমাটিক লাগে: টেবিলে ফাইলের স্তূপ, ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে, চারপাশ নিস্তব্ধ, আর একজন মন্ত্রী নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। পাশে রাখা চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু দায়িত্বের তাপ এখনো কমেনি।
এমন দৃশ্যের জন্য অন্তত একটি প্রতীকী স্বীকৃতি প্রাপ্য। কারণ এটি শুধু কাজের গল্প নয়, এটি হঠাৎ করে কাজের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার গল্প। আর সেই গল্পে যেমন আছে পরিশ্রম, তেমনি আছে এক ধরনের দেরিতে পাওয়া উপলব্ধির রস।
আমাদের দেশে মন্ত্রীদের মূল কাজ হলো সরকারের নীতিনির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন করা। তারা নিজেদের মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা খাত, যেমন—কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অর্থনীতি সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নেন, পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন এবং প্রশাসনকে সেই অনুযায়ী কাজ করতে নির্দেশ দেন। সংসদে আইন প্রণয়ন, বাজেট পাস এবং বিভিন্ন নীতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা তাদের দায়িত্বের অংশ। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি জানা, সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াও তাদের কাজের মধ্যে পড়ে। কাজগুলো অবশ্যই কঠিন।
আমাদের সমাজে ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রায়ই একসঙ্গে আসে না। অনেকেই দায়িত্বের জায়গায় পৌঁছে প্রথমবার সেই দায়িত্বের বাস্তবতা অনুভব করেন। তখন সেটি ‘কঠিন’ বলে মনে হয়। কিন্তু যারা শুরু থেকেই এই বাস্তবতার মধ্যে ছিলেন, তাদের জন্য এটি জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
মন্ত্রিত্ব যে সহজ নয়, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়া, চাপ সামলানো, নানা পক্ষের প্রত্যাশা মেটানো—এসবই কঠিন কাজ। কিন্তু এই কঠিনতার বর্ণনা যখন এমনভাবে আসে, যেখানে সকাল ৭টায় ওঠা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন জন্ম নেয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রস্তাব রাখা যেতে পারে; মন্ত্রীদের জন্য বিশেষ ভাতা চালু করা যেতে পারে, যেমন—‘সকালে ওঠার ভাতা’ বা ‘রাত জাগা প্রণোদনা’। এতে অন্তত তাদের কষ্টের একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষও বুঝতে পারবে এই পেশাটি কতটা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’।
তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি এই কাজ এত কঠিন হয়, তাহলে এত মানুষ কেন এই দায়িত্ব নিতে এত আগ্রহী? এর উত্তর খুব জটিল নয়। কঠিন কাজ তখনই সহনীয় হয়ে ওঠে, যখন তার সঙ্গে সম্মান, প্রভাব এবং সুযোগ যুক্ত থাকে। তখন কষ্টটিও এক ধরনের বিনিয়োগ হয়ে যায়।
তারপরও আমরা মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে একমত যে মন্ত্রিত্ব একটা কঠিন চাকরি। আমরা বাইরে থেকে কেবল ফাইল সাইন, প্রকল্প উদ্বোধন, বড় বড় ঘোষণা দেখি; ভেতরের গল্পটা দেখি না—সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠে রাত ১১টা পর্যন্ত ছোটাছুটি।
হ্যাঁ, মন্ত্রিত্ব কঠিন চাকরি হতে পারে, কিন্তু ভোটার হওয়াটা তার চেয়েও কঠিন। ভোটার লাইনে দাঁড়ায়, রোদে পুড়ে আশা নিয়ে ভোট দেয়। তারপর সেই আশার ফল কী হয়, সেটা আবার অন্য গল্প। আপনি সেই প্রক্রিয়ার শেষে এসে দায়িত্ব পেয়েছেন—এটুকু পার্থক্য মনে রাখলে কথাটার ওজন বদলে যায়।
তবুও মন্ত্রী মহোদয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা যে তিনি সকাল ৭টায় উঠছেন, রাত ১১টা পর্যন্ত জেগে থাকছেন। দেশ চালাতে এমন শ্রম লাগে, সেটাও সবার জানা দরকার। এই কঠিন পরিশ্রমের জন্য করতালি থাকল, সঙ্গে এক কাপ গরম চা। তবে এটাও মনে রাখা দরকার, মন্ত্রীদের ‘কঠিন’ যদি হয় সকালে ওঠা আর রাত জাগা, আমাদের ‘কঠিন’ অনেক সময় পেটে ভাত জোগাড় করা। পার্থক্য হলো, মন্ত্রীরা সমস্যার কথা শুনছেন; আমরা সেই সমস্যার ভেতরেই থাকি। এই পার্থক্যটাই আসল গল্প। এটিই বাস্তব। এটিই আমাদের দেশ।