২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

মেট্রোরেলে প্রবীণের মৃত্যু: একটু বসার জায়গা ছাড়েনি কেউ

একটু বসার জায়গার আকুতি বুকে নিয়ে চলে যাওয়া শিক্ষক মুহাম্মদ নজীবুর রহমান; আধুনিক নগরীতে মুখ থুবড়ে পড়া আমাদের মানবিকতার করুণ প্রতিচ্ছবি।

মেট্রোরেলে প্রবীণের মৃত্যু: একটু বসার জায়গা ছাড়েনি কেউ

একটি আসনের হাহাকার আর পাথর হয়ে যাওয়া সমাজ—মেট্রোরেলে প্রাণ হারানো শিক্ষক মুহাম্মদ নজীবুর রহমান।

সাজ্জাদ সাব্বির সাজ্জাদ সাব্বির

Published : 29 Oct 2026, 03:20 PM

Updated : 29 Oct 2026, 03:20 PM

৬৪ বছর বয়সী শিক্ষক মুহাম্মদ নজীবুর রহমানের মৃত্যু আমাকে ব্যক্তিগতভাবে মর্মাহত করেছে। তার বড় ছেলে নাকিবুর রহমান আমার বন্ধুবর, আমাদের পরিচিত পরিসরের বড় ভাই। নাকিব ভাইয়ের সঙ্গে বহু সময় কাটিয়েছি। গত ২৪ অক্টোবর মেট্রোরেলে অসুস্থ হয়ে তার বাবার মৃত্যুর খবর শুনে শোকাহত হয়েছিলাম। কিন্তু ২৭ অক্টোবর নাকিব ভাইয়ের ফেইসবুক পোস্টে মৃত্যুর আগের মুহূর্তগুলোর বিবরণ পড়ার পর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভীর অস্বস্তি, ক্ষোভ ও অসংখ্য প্রশ্ন।

নাকিবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহবাগ থেকে উত্তরা ফেরার পথে শেওড়াপাড়া স্টেশনের কাছাকাছি তার বাবা অসুস্থ বোধ করেন। আশপাশের যাত্রীদের কাছে বসার জায়গা চান। কেউ তাকে বসবার মতো একটুখানি জায়গা ছেড়ে দেননি। কিছুক্ষণের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি মেঝেতে পড়ে মারা যান।

Image

নজীবুর রহমানের ছেলে নাকিবুর রহমানের ফেইসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

একটু বসার জায়গা—এই সামান্য প্রয়োজনটুকু পূরণ করা গেলে হয়তো মৃত্যুর পরিণতি বদলাত, হয়তো বদলাত না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে একটি আসন পেলে তিনি বেঁচে যেতেন কিনা। কিন্তু অসুস্থতার মুহূর্তে সহায়তা চাওয়া এক প্রবীণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি—সেটিই আমাদের বিবেকের সামনে বড় প্রশ্ন।

আমি বারবার ভাবছি, আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি? কোন সামাজিক অভ্যাস আমাদের এমন করে তুলছে, যেখানে পাশে দাঁড়ানো মানুষটির কষ্ট চোখে পড়লেও নিজের আরাম থেকে সামান্য সরে আসতে অনীহা তৈরি হয়? আমাদের শিক্ষার হার বেড়েছে, শহরে আধুনিক পরিবহন এসেছে, প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু অন্য মানুষের বিপদের মুহূর্তে সাড়া দেওয়ার মানসিকতা কি সেই গতিতে বেড়েছে? বাড়েনি, বরং কমেছে?

সমাজবিজ্ঞানে সোশ্যাল সলিডারিটি বা সামাজিক সংহতি বলতে মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা, দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার সম্পর্ক বোঝায়। সভ্য সমাজের শক্তি কেবল তার প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক সামর্থ্যে মাপা যায় না। সংকটে মানুষ পরস্পরের পাশে কতটা দাঁড়ায়, অপরিচিত মানুষের কষ্টকে কতটা নিজের বলে অনুভব করে—তার মধ্যেও সভ্যতার পরিচয় প্রকাশ পায়।

নজীবুর রহমানের ঘটনাটি এই সংহতির জায়গাতেই আমাদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মেট্রোরেলের কামরায় যারা ছিলেন, তাদের প্রত্যেকের পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা জানি না। কেউ হয়তো ঘটনাটি বুঝতে পারেননি, কেউ হয়তো অসুস্থতার লক্ষণ চিনতে পারেননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের পূর্ণ বিবরণ ছাড়া সবার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। তবু পরিবারের বক্তব্য সত্য হলে, বসার অনুরোধের পরও কেউ জায়গা না দেওয়ার ঘটনা আমাদের সামাজিক আচরণ আর মূল্যবোধকে কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

আমাদের সমাজে ব্যক্তিগত সাফল্যকে অনেক সময় নিজের অবস্থান, আয়, পদবি ও সুবিধার ভিত্তিতে বিচার করা হয়। অন্য মানুষের প্রয়োজনের প্রতি সাড়া দেওয়ার দায়িত্বটি যেন ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ জনপরিসরে বসবাস মানে আমরা পরস্পরের সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্কেও যুক্ত। মেট্রোরেলের কামরায় বসে থাকা মানুষটি হয়তো নিজের কর্মদিবস শেষে ক্লান্ত ছিলেন। তার ক্লান্তির মূল্য আছে। কিন্তু অসুস্থ প্রবীণ মানুষের জরুরি প্রয়োজনের মুখে সেই ক্লান্তি কি একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হতে পারে?

সহানুভূতি চেয়েও প্রয়োজন পরিকল্পনা

নজীবুর রহমানের মৃত্যু নিয়ে আলোচনা কেবল যাত্রীদের আচরণে আটকে থাকলে চলবে না। এখানে গণপরিবহনের ব্যবস্থাপনা, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা ও প্রবীণ যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্নও রয়েছে।

ঢাকার মেট্রোরেল আধুনিক গণপরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। কিন্তু আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার মূল্যায়ন কেবল দ্রুত যাত্রা, পরিচ্ছন্ন স্টেশন কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়ে করা যায় না। অসুস্থ যাত্রীকে দ্রুত শনাক্ত করা, কর্মীদের জরুরি পরিস্থিতি সামলানোর প্রশিক্ষণ, সহায়তার সহজ ব্যবস্থা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা সহায়তার সমন্বয়ও জরুরি।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের প্রকাশিত নীতিমালা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

প্রবীণ নাগরিকদের জন্য অগ্রাধিকার আসনগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, যাত্রীরা নিয়মটি মানছেন কি না এবং জরুরি মুহূর্তে কর্মীরা কীভাবে এগিয়ে আসবেন—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। স্টেশন ও ট্রেনের কর্মীদের প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি যোগাযোগ ও অসুস্থ যাত্রীকে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। প্রয়োজনে ট্রেনের ভেতর জরুরি সহায়তার স্পষ্ট সংকেত ও যোগাযোগব্যবস্থা আরও দৃশ্যমান করতে হবে।

এই মৃত্যু থেকে আমরা কী শিখব?

নাকিবুর রহমান তার বাবার মৃত্যুর পর কারও প্রতি রাগ বা অভিমান নেই বলে জানিয়েছেন। প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। শোকের এমন মুহূর্তে তার এই বক্তব্য আমাদের আরও বেশি ভাবায়। যে পরিবারের কাছে বাবার শেষ মুহূর্তের স্মৃতি আজীবনের কষ্ট হয়ে থাকবে, সেই পরিবারই সমাজের প্রতি সহানুভূতির আহ্বান জানাচ্ছে।

ঘটনাটিকে কয়েক দিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ায় পরিণত করে ভুলে গেলে চলবে না। যাত্রীদের মানবিক আচরণ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রবীণদের জন্য অগ্রাধিকার আসন ব্যবহারের সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা জনপরিসরে শেখাতে হবে। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের উচিত ঘটনাটির প্রাসঙ্গিক তথ্য পর্যালোচনা করে জরুরি সহায়তার ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা।

নজীবুর রহমানের মৃত্যু আমাদের সামনে এমন একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছে, যেখানে শুধু অন্য যাত্রীদের আচরণ ফুটে উঠছে না; দেখা যাচ্ছে আমাদের প্রত্যেকের সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রকৃত অবস্থাও।

আজ তার জায়গায় আমার বাবা থাকতে পারতেন, আপনার বাবাও থাকতে পারতেন। আগামীকাল হয়তো আমরা নিজেরাই অসুস্থ হয়ে কোনো অপরিচিত মানুষের কাছে একটু বসার জায়গা চাইব।

সেদিন আমাদের পাশে কেউ দাঁড়াক—এই প্রত্যাশা যদি থাকে, তবে আজ অন্যের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও নিতে হবে।

সাজ্জাদ সাব্বির: এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ই-মেইল: sajjadsabbir24@gmail.com