Published : 31 Mar 2026, 08:55 PM
দেশ আক্রমণ কোনো পুতুলখেলা নয়। কেউ শুরু করল, থুক্কু বলল, আবার শুরু করল—এভাবে যুদ্ধ চলে না। আর যেকোনো খেলা মাত্রই সবার জানা যে, হার-জিত বড় কথা নয়, অংশগ্রহণই বড়। কিন্তু যুদ্ধটা ওরকম মজার জিনিস নয়; বরং অত্যন্ত মর্মান্তিক, অমানবিক ও হিংস্র। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের মানসিক সংকটাপন্ন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে আগুন ছোটানো আর রক্ত ঝরানো যুদ্ধকে একটা খেলা মনে হয়েছে মাত্র। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মধ্যরাতে সফল অপহরণের পর এবং সমস্ত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশ দিয়ে নিজের পা চাটানোর পর তার অহমিকা স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার অতিক্রম করে যায়। দেশটির শাসকদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা বৈঠক ও পারমাণবিক চুক্তির নামে ধাপ্পাবাজি করার পর, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ইরান আক্রমণ করে বসেন। আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করলেন এবং ‘সম্রাট’ ট্রাম্প ইরানের শাসকদের আত্মসমর্পণের আদেশ দিলেন।
ইরান আক্রমণকে বলা যায় ট্রাম্পের ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’। এই মডেল তিনি কিউবার জন্যও স্থির করে রেখেছেন। পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে খেলা মনে হয়েছে। ডাকাতির স্টাইলে মাদুরোকে অপহরণের লাইভ ভিডিও দেখেছেন এবং কার্টুন দেখার আনন্দে লাফিয়েছেন। কিন্তু ভেনেজুয়েলা মডেল ইরানে কেবল মুখ থুবড়েই পড়েনি, ট্রাম্প নিজেই এখন এক হাস্যকর কার্টুন ক্যারেক্টারে পরিণত হয়েছেন। কয়েক দিন ধরে তিনি বলে চলছেন—ইরান ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করতে কান্নাকাটি শুরু করেছে; আর ইরানের শাসকরা বলছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেননি, বরং ট্রাম্প নাকি নিজেই নিজের সঙ্গে বকবক করে চলেছেন।
ট্রাম্প, যার কাছে অর্থ ও ক্ষমতা ছাড়া পৃথিবীতে আর কিছুর কোনো মূল্য নেই, যুদ্ধ তার কাছে খেলাই। নির্বাচনের আগে তিনিই আমেরিকার ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণের টানা সমালোচনা করে গেছেন। বলেছিলেন, এসব বৈদেশিক আক্রমণ ও অন্য দেশের শাসক পরিবর্তনে বা ‘রেজিম চেঞ্জে’ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্বার্থ নেই। আর এখন দেখা যাচ্ছে সেই ট্রাম্পই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধবাজ—যুদ্ধ নিয়ে কোনো অভিজ্ঞতা কিংবা ইরান আক্রমণের ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই। আত্মঅহমিকায় উন্মাদ লোকটি নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেয়ে মারিয়া কোরিনা মাচাদোর পুরস্কারটাই তার হাত থেকে কেড়ে নিলেন। আর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে বোঝালেন যে, ইরান জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে অতীতের সবাইকে ছাড়িয়ে যাবেন। তার নিজের চারপাশে ইসরায়েলি লবিস্ট ও গোঁড়া খ্রিস্টানরা তো আছেই।
অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো বৈদেশিক আক্রমণ বা যুদ্ধে জড়িয়েছে, সেগুলোতে কিছু সত্য-মিথ্যা কারণ উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। এবার ট্রাম্প নিজ দেশের জনগণ কিংবা আন্তর্জাতিক বন্ধুরাষ্ট্র—কারও কাছেই ইরান আক্রমণের যুক্তিসঙ্গত কারণ তুলে ধরতে পারেননি। তবে একটি ব্যক্তিগত স্বার্থ হচ্ছে ‘এপস্টেইন ফাইলে’ প্রকাশিত তার যৌন কেলেঙ্কারি থেকে মানুষের দৃষ্টিকে যুদ্ধের ডামাডোলে সরিয়ে দেওয়া। এছাড়া তিনি যা করেছেন তা হলো নেতানিয়াহুর হুকুম পালন। নেতানিয়াহুর ইরান হামলার পরিকল্পনা চল্লিশ বছরের পুরোনো। কিন্তু তার একার মুরোদ নেই, তাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রয়োজন। আর সেক্ষেত্রে তার সহায়ক হয়েছে ট্রাম্প নামের এক সাইকোপ্যাথের আমেরিকার ক্ষমতায় আরোহন।
ঠিক এ কারণেই ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জো কেন্ট পদত্যাগ করলেন ন্যাশনাল কাউন্টারটেরোরিজম সেন্টারের পরিচালকের পদ থেকে। তিনি তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে যা উল্লেখ করেছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, “বিবেক থাকতে আমি চলমান ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারি না।” কারণ, “ইরান আমাদের দেশের জন্য কোনো আশু হুমকি নয় এবং এটা পরিষ্কার যে, আমরা এ যুদ্ধ শুরু করেছি ইসরায়েলের ও শক্তিশালী আমেরিকান লবির চাপে পড়ে।”
ট্রাম্পের উত্থাপিত কারণটি যেমন উদ্ভট, তেমনি অসৎ। কারণটি হচ্ছে: ইরান পারমাণবিক শক্তির উপকরণসমূহ জোগাড় করছে, তাতে ইসরায়েল (মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন দেশ) ভীষণ ভয় পাচ্ছে। এই ভয় থেকে ইসরায়েল ভবিষ্যতে যদি ইরানকে আক্রমণ করে বসে, তবে প্রতিশোধ নিতে ইরানও আমেরিকার ওপর হামলা করতে পারে! আর সেটা বন্ধ করতেই ইরানের ওপর আমেরিকার এই হামলা। এই যুক্তিতে পৃথিবীর যেকোনো শক্তিশালী দেশ যেকোনো দুর্বল দেশকে যখন-তখন আক্রমণ করতে পারবে! আক্রমণের যুক্তিটা হলো—‘খ’ মনে করছে ‘ক’ তাকে আক্রমণ করতে পারে, ফলে ‘খ’ আগেই ‘ক’-কে আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে পারে; তখন ‘ক’ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ‘ক’ ও ‘খ’ উভয়ের চেয়ে অনেক দূরবর্তী ও অনেক বেশি শক্তিশালী ‘খ’-এর বন্ধু ‘গ’-কে আক্রমণ করতে পারে; সেটি ঠেকাতে ‘গ’ এখনই ‘ক’-কে আক্রমণ করে বসল! এমন ওকালতি প্যাঁচ ট্রাম্প ছাড়া পৃথিবীর আর কারও জানা নেই।
ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বের সেরা ‘ডিলমেকার’ হিসেবে বলে বেড়ান। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সব চুক্তি ছিঁড়ে ফেলতেই তিনি বেশি পারঙ্গম। আর চুক্তির নামে আলোচনা বৈঠক যে তার কাছে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালানোর ফাঁদ, সেটা এখন সবাই জানে। চুক্তিতে অঙ্গীকার রক্ষা করা ও পারস্পরিক বিশ্বাস বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যার ধারেকাছেও ট্রাম্প নেই। ইরানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা বৈঠকে তিনি বারবার একই দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। এবারও তার আলোচনার জন্য উঠেপড়ে লাগার পেছনে তেমনই উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু নাকি ইরানের মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। অথচ তারা দুজনই মোল্লাদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি এখন ধর্মকে ব্যবহার করছেন। গোঁড়া খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের ডেকে এনে তিনি তাদের আশীর্বাদ গ্রহণ করেছেন, যাতে ভয় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধ তার মনের মতো চলছে না। সে কারণে এখন প্রায়ই অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন।
একবার হুমকি দিচ্ছেন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পদাতিক বাহিনী পাঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ খার্ক দ্বীপ দখল করবেন ও হরমুজ প্রণালি ইরানের কবজা থেকে মুক্ত করবেন। কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছে না, তাই বারবার আক্রমণের তারিখ পিছিয়ে দিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে দুর্বল ইরানের প্রতিরোধ যুদ্ধ অনেক বেশি পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত; তার বিপরীতে শক্তিমান আমেরিকা বারবার দোদুল্যমানতার শিকার। এর কারণ ইরান লড়ছে বাঁচার জন্য যা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল-আমেরিকা চালাচ্ছে একটি অন্যায় হত্যাযজ্ঞ, যাতে আবার ট্রাম্পের চেয়ে নেতানিয়াহুর স্বার্থই বেশি।

যুদ্ধকৌশলেও আমেরিকা পিছিয়ে। ইরান যুদ্ধকে অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং আরও দেবে। বিশ্ববাণিজ্যে আমেরিকার অবস্থানকে আঘাত করছে ইরান। আমেরিকা-ইসরায়েল চক্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বিশ্বসমাজ থেকে। ইরান যতদিন যুদ্ধে টিকে থাকবে, আমেরিকা ততই কাদায় আটকে যেতে থাকবে। যুদ্ধে ইরানের জন্য জেতার কিছু নেই, কেবল আমেরিকাকে হারানোই তার মূল পরিকল্পনা—যা ট্রাম্পের গেমপ্ল্যানে অনুপস্থিত ছিল।
ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ট্রাম্পের সব আশাই ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করে সেখানে একটি বশংবদ সরকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তার এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত। বুশের ইরাক আক্রমণের মতো করে সহজেই ইরান দখল করে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। যুদ্ধ ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ধারণার বাইরে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এই দুই যুদ্ধবাজ এখন শেষ অবলম্বন হিসেবে হয়তো ভয়ঙ্কর কোনো বর্বরতম পদক্ষেপ নিতে পারে। যুদ্ধ এখন যে পথেই যাক, যুক্তরাষ্ট্র যে তার বৈশ্বিক মোড়লগিরি হারাচ্ছে তা স্পষ্ট হচ্ছে। আবার এক বহুকেন্দ্রিক বিশ্বের সম্ভাবনা কড়া নাড়ছে ইতিহাসের দরজায়। তারই ফয়সালা হতে পারে সাম্রাজ্যবাদী-জায়োনবাদী চক্রের এই ইরান আক্রমণকে ঘিরে।
মোল্লা খামেনি যে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর চেয়ে ভালো ইতিহাস পড়েছেন, তা বোঝা যায় মৃত্যুর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি বলা তার এই বিখ্যাত মন্তব্যে: “পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও মাঝে মাঝে এমন থাপ্পড় খায় যে সে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।”
এখন বিশ্বের চোখের সামনে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর গাল লাল হচ্ছে প্রতিদিন।