Published : 02 May 2026, 04:31 PM
আলোকচিত্র-সাংবাদিকরা ধারণ করেন চলমান মুহূর্তের ছবি। বিশেষ মুহূর্তের একটি ছবি কীভাবে অনেক কথা বলতে পারে, সেটি সব সময় থাকে অভীষ্ট। সেই বিচারে খ্যাতিমান আলোকচিত্রগ্রাহক রঘু রাইয়ের মুক্তিযুদ্ধের চিত্রমালা অর্জন করেছে অনন্য মর্যাদা, পেয়েছে ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি। মুহূর্ত কীভাবে হয়ে উঠতে পারে চিরন্তন, সেটি তো সব চিত্রসাংবাদিকের উদ্দিষ্ট; তবে সেজন্য যেমন ভাগ্যের দরকার, তেমনি এর পেছনে থাকে অনেক প্রস্তুতি ও একান্ত সাধনা। এসবের উদাহরণ হয়ে আছে রঘু রাইয়ের একাত্তরের চিত্রমালা। যদি শত বছর পরেও কোনো ঐতিহাসিককে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দশটি সেরা ছবি বাছাই করতে বলা হয়, তবে নিঃসন্দেহে সেখানে স্থান পাবেন রঘু রাই (১৯৪২-২০২৬)।

স্টেট্সম্যান পত্রিকার তরুণ ফটোসাংবাদিক হিসেবে একাত্তরের অগাস্ট মাসে তিনি কলকাতার সল্টলেট ও বনগাঁ সীমান্তের শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে দেখেছেন, পরে ডিসেম্বরের যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর সাথে যশোর-খুলনা মুক্ত অভিযানে শরিক হয়েছেন। ইতিমধ্যে আলোকচিত্রী হিসেবে তিনি স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন, প্যারিসস্থ ম্যাগনাম ফটো এজেন্সির সদস্য হিসেব তাদের দলভুক্ত হয়েছিলেন। ফলে স্টেট্সম্যান পত্রিকায় যেমন তাঁর তোলা ছবি ছাপা হয়েছিল, তেমনি ম্যাগনামের মাধ্যমে পেয়েছিল বিশ্বব্যাপী প্রচার। রঘু রাইয়ের সেই ছবিগুলো বাংলাদেশের মানবিক বিপর্যয় ও শরণার্থীদের দুর্গতির বাস্তবতা বহু মানুষের অন্তরে গেঁথে দিতে পেরেছিল।

মনে পড়ে ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরুর পর আমরা হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছিলাম একাত্তরের স্মৃতিস্মারক, দলিলপত্র, ছবি, নথি ইত্যাদি। এমনিভাবে, কার সূত্রে কীভাবে স্মরণে নেই, আমি দিল্লিতে এক সম্মেলনে যোগদান শেষে পৌঁছেছিলাম রঘু রাইয়ের কাছে। তিনি তখন থাকতেন খান মার্কেটের কাছে আর. এন. টেগোর কলোনির দোতলার বাসায়। খান মার্কেট আমার এবং আমার মতো অন্যদের বিশেষ পরিচিত দুটি বইয়ের দোকানের জন্য, একটি বাহরিসন্স বুকসেলার্স এবং অন্যটি ফকির চান্দ অ্যান্ড সন্স, উভয়েই দেশভাগের শিকার, লাহোর থেকে আগত উদ্বাস্তু এবং অসাধারণ তাদের গ্রন্থসংগ্রহ। কাছাকাছি রঘু রাইয়ের বাসায় পৌঁছতে তাই আমার কোনো বেগ পেতে হয়নি। অমায়িক ও বিনয়ী এই মানুষটির সঙ্গে আলাপে মুগ্ধ হতে হয়, তবে হতাশ হতে হলো যখন তিনি জানালেন একাত্তরের ছবি ও নেগেটিভ তাঁর কাছে বিশেষ নেই, তিনি তা খুঁজে পাচ্ছেন না, মূল যেসব কাজ স্টেট্সম্যান-এর আর্কাইভে ছিল সেটাও রক্ষিত হয়নি বলে তিনি জেনেছেন। তাঁর সূত্র ধরেই বড় খাম্বা রোডে স্টেট্সম্যান অফিসে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছিলাম মানস ঘোষের সঙ্গে। মূল ভবনে তখন নির্মাণ-কাজ চলছে, পত্রিকা অফিস পাশের ভবনে ছোট আকারে স্থানান্তরিত হয়েছে। তিনি জানালেন যে, আর্থিক কারণে শত বছরের পুরনো স্টেট্সম্যান ভবন বিল্ডারদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে, তারা সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে, পরে সেখানকার একাংশে পত্রিকার ঠাঁই হবে। পত্রিকার আর্কাইভ ও ছবির সংগ্রহ বলতে কিছু আর নেই, সব এলোমেলো ও পরিত্যক্ত হয়েছে।

পরের বছর রঘু রাই এসেছিলেন বাংলাদেশে এবং ঘুরে দেখেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ইচ্ছে ছিল তাঁর সংগ্রহে যা কিছু রয়েছে তা দিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করা। সেগুনবাগিচার সেই অপরিসর জাদুঘরে ব্যবস্থাদি ছিল অপ্রতুল, অস্থায়ী যে প্রদর্শশালা সেটা তো বস্তুত টিনের চালা দেয়া পূর্বতন গুদামঘর। তাঁর হাতে ছবিও বেশি নেই, জাদুঘরের ব্যবস্থাদিও যথার্থ প্রদর্শনী করার মতো নয়, যে ধরনের পরিসর ও আলোক-ব্যবস্থা দরকার তা সেখানে অনুপস্থিত। তিনি মৃদু হেসে বললেন, আই অ্যাম নট এক্সাইটেড। তবে সৌভাগ্যের বিষয়, রঘু রাই এবং বাংলাদেশ উভয়ের জন্য যে ঘটনা শুভকর হয়েছে তা হলো দীর্ঘকাল পর বাড়ি বদলের সময় পুরনো এক সুটকেসে রঘু রাই খুঁজে পেলেন তার একাত্তরের ছবি ও নেগেটিভ। এর যৎসামান্য অংশই পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, অধিকাংশই অদেখা অজানা। ইতিমধ্যে বেঙ্গল গ্যালারির আবুল খায়ের লিটু ও সুবীর চৌধুরী যোগাযোগ করেছিলেন রঘু রাইয়ের সঙ্গে এবং বিশালাকারে যথোচিতভাবে বাংলাদেশে আয়োজিত হলো রঘু রাইয়ের একাত্তরের চিত্রমালার প্রদর্শনী। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর পাশাপাশি বক্তব্য প্রদানের, তাঁর প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের।
রঘু রাই এভাবেই ফিরে এলেন বাংলাদেশে। এই প্রত্যাবর্তন স্থায়ী রূপ পেল পরবর্তী প্রজন্মের তরুণ উদ্যোক্তা দুর্জয় রহমানের চিত্তপ্রসারী পদক্ষেপে। তিনি চারুকলা ইন্সটিটিউটে আয়োজন করলেন কিউরেটেড প্রদর্শনীর। এরপর বিগত বছর যথোপযুক্তভাবে দামি কাগজে, বিদেশে ছেপে প্রকাশ করলেন প্রামাণ্য আকারের কফিটেবিল বই ‘দি রাইজ অব এ নেশন’, রঘু রাইয়ের অজস্র ছবি নিয়ে প্রামাণ্যদলিল ও শৈল্পিক উপস্থাপনা।
উপরোক্ত দুই প্রদর্শনী ও গ্রন্থপ্রকাশের মধ্য দিয়ে রঘু রাইয়ের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন হয়েছিল। তবে এর সার্থকতা অর্জনের জন্য আরাধ্য কর্তব্য অনেকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। তার এক বড় দিক রঘু রাইয়ের আলোকচিত্র অধ্যয়ন, চিত্রসাংবাদিকের দায়বদ্ধতা বিষয়ে তাঁর জীবনকর্ম ও জীবনদৃষ্টি থেকে উপাদান আহরণ, নবীন প্রজন্মের জন্য যা হতে পারে শিক্ষার বিশাল পরিসর। ফটো সাংবাদিকতা ও মানবজীবনের প্রতি সংবেদনশীলতা, মানুষের দুঃখ-বেদনা অনুভবের শক্তি–সব মিলিয়ে বিশ শতকের দ্বিতীয় পর্বে এক্ষেত্রে যে সদর্থক বিকাশ আমরা লক্ষ্য করি তার সাথে রঘু রাইয়ের সম্পৃক্তি হয়েছিল তাঁর নিজ জীবন পরিক্রমণ থেকে। তিনি যে তরুণ বয়সে ম্যাগনাম দলভুক্ত হতে পেরেছিলেন সেটা উভয়ের জন্য লাভবান হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ফটোসাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সমন্বয় সমিতি হিসেবে ম্যাগনামের প্রতিষ্ঠা ঘটে দুই দিকপাল আলোকচিত্রী রবার্ট কাপা ও অরি কার্তিয়ে ব্রেসোঁর হাতে। তাঁদের তোলা যুদ্ধ, সংঘাত কিংবা শান্তির ছবি আইকনিক হয়ে আছে।

আলোকচিত্রের মাধ্যমে যেন মানুষের কথা, তাদের কাহিনি বলা যায় এটা ছিল ম্যাগনামের উদ্দেশ্য। ক্যামেরা ছোট হওয়া দরকার, যেন তা বহনযোগ্য হয়, তবে ক্যামেরা হাতে মানুষটার হৃদয় হতে হবে অনেক বড়। একটি সমবায়ী সংস্থা হিসাবে গড়ে ওঠে ম্যাগনাম ফটো এজেন্সি। এই আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন রঘু রাই, আর তাই একাত্তরে শরণার্থীদের দুর্গতির ছবিতে তিনি নিবিড় দরদ ও সংবেদনশীলতা যোগ করতে পেরেছিলেন, যোগ করেছিলেন গভীর মানবিক মাত্রা, তার একেকটি ছবি যেন হয়ে উঠেছিল জীবনের কাহিনি, একক ছবির মধ্য দিয়ে অনেকের কথা। অজস্র আঁকিঝুঁকি চিহ্নিত বৃদ্ধার মুখাবয়ব, তাঁর শূন্য দৃষ্টি আমাদের বুঝিয়ে দেয় কোন শোকসাগর অতিক্রম করে তিনি হয়েছেন দেশান্তরী, শরণার্থী। রঘু রাইয়ের প্রতিটি ছবি নীরবে কথা বলে দর্শকের সাথে, সেই ছবির সামনে থমকে যেতে হয়, নিস্তব্ধতা যেন গ্রাস করে দর্শকদের।

উপর্যুপরি ধর্ষণের শিকার যে কিশোরী আশ্রয় নিয়েছে শরণার্থী শিবিরে, জীবনের সমস্ত উদ্যম হারিয়ে, যে গা এলিয়ে দিয়েছে মাটিতে, ভাতের থালা পানির গেলাশ তার সামনে, তবে সব ছাপিয়ে আছে কিশোরীর নিবিড় বেদনাবহ ফাঁকা দৃষ্টি। রঘু রাই জেনেছিলেন এই কিশোরীর কাহিনি, তার কাছে গিয়ে ছবি তোলার মানসিকতা তিনি অর্জন করতে পারেননি। দূর থেকে টেলিলেন্সে তুলেছিলেন ছবি, সাদা কালো যে ছবি কেবল কিশোরীর ট্রমা প্রকাশ করে না, আমাদেরও মুখোমুখি দাঁড় করায় যুদ্ধ ও গণহত্যার নির্মমতার সামনে।

রঘু রাই নিজেও ছিলেন উদ্বাস্তু, ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময় পাঁচ বছরের এই বালক পরিবারের সাথে লাহোর থেকে শত কিলোমিটার দূরে জং শহর ছেড়ে এসেছিলেন পাঞ্জাবের অমৃতসরে। জ্বলন্ত সূর্যের নীচে দীর্ঘ পদযাত্রায় দুঃখ-কষ্টের অনেক কিছু বুঝতে পারেনি এই বালক। তবে স্মৃতি থেকেও মুছে যায়নি অনেক কিছু। একাত্তরের উদ্বাস্তুদের কাছে তাই তিনি পৌঁছতে পেরেছিলেন হৃদয়ের প্রশস্ততা ও সমব্যথী মন নিয়ে। আর তাই রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় কথা বলেছে একাত্তর, লেন্স থেকে যেন ঝরে পড়েছে দু’ফোটা অশ্রু। বাংলাদেশের কাছে তিনি থাকবেন চিরস্মরণীয়, চিরপ্রণম্য।