Published : 14 May 2026, 08:53 AM
ইউনিসেফের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি যে কতটা নড়বড়ে তা যেন আরও একবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার তথাকথিত উন্নয়নের খোলসটি অত্যন্ত নির্মমভাবে খুলে দিয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পা রাখা ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থীর সাধারণ গণিতে আটকে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ চিত্র দেখার পর একে স্রেফ শিক্ষার্থীর মেধার অভাব বলে চালিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি আসলে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল। গবেষণাটি একটি রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে, যা থেকে আমরা জানতে পারি, আমাদের শিক্ষকরা আর মানুষ গড়ার কারিগর নন, বরং সিলেবাস শেষ করার অমানবিক যন্ত্রে পরিণত হয়েছেন।
যখন পাঠদানের চেয়ে 'কাগজে-কলমে অধ্যায় শেষ করা' বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষার গুণগত মান এমন তলানিতে গিয়ে ঠেকাই স্বাভাবিক। সিলেবাস শেষ করার এই শিক্ষা-সংস্কৃতি আমাদের শিশুদেরও স্রেফ নম্বর পাওয়ার যন্ত্রে রূপান্তর করছে, মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে না। পড়ালেখার এই প্রচণ্ড চাপে তারা জীবনের অন্য কোনো দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে না। তারা নিজের কাজ নিজে করা, পরিবারকে সাহায্য করা বা নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার সময় পাচ্ছে না। সিলেবাস শেষ করা এবং ভালো ফলাফলের অমানবিক প্রতিযোগিতায় ওরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে বড় হচ্ছে। এই অমানবিক প্রতিযোগিতার ফল হচ্ছে ভয়াবহ—আমরা হয়তো কাগজে-কলমে 'জিপিএ ৫' পাওয়া, কিন্তু সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত প্রজন্ম পাচ্ছি।
এরকম একটা স্থবির অবস্থায় ‘প্রত্যাশিত ফল কোথায়?’, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে কোনো লাভ নেই। এর থেকে মুক্তি পেতে হলে পেছনে হেঁটে গিয়ে পুরনো ব্যবস্থা নিয়ে টানাটানি করা কেবল সময়ের অপচয়। বরং নতুন প্রজন্মকে প্রকৃত অর্থেই বিদ্যালয়মুখী করতে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘স্লো এডুকেশন মুভমেন্ট’ (‘সহজিয়া শিক্ষা পদ্ধতি’) বা ‘রিল্যাক্সড এডুকেশন’ (‘ভারমুক্ত শিক্ষা’) ব্যবস্থা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।
স্লো এডুকেশন আন্দোলনের মূল দর্শন হলো—শিক্ষার গভীরতা বাড়ানো, গতি নয়। ‘ফাস্ট ফুড’-এর বিপরীতে যেমন গুণগত মানের জন্য ‘স্লো ফুড’ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা তাই। এই আন্দোলনের সারকথা হলো, প্রতিটি শিশুর শেখার গতি আলাদা। নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার মেনে জোর করে মাথায় তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়া শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না। শিক্ষার্থী যেন কোনো বিষয়কে সময় নিয়ে বুঝতে পারে এবং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে, সেটিই এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য।
বিশ্বের সবচেয়ে সফল শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে আমরা এই ‘রিল্যাক্সড’ দর্শনের প্রতিফলন দেখতে পাই।
ফিনল্যান্ডে সাত বছরের আগে কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় না এবং ১৬ বছর বয়সের আগে কোনো বাধ্যতামূলক পাবলিক পরীক্ষা নেই। তারা প্রমাণ করেছে যে, প্রতিযোগিতার চাপ কমিয়েও মেধার শীর্ষে থাকা সম্ভব। এস্তোনিয়াতে খেলার ছলে প্রযুক্তি ও কোডিং শিখিয়ে তারা বর্তমানে ইউরোপের ডিজিটাল শিক্ষায় শীর্ষস্থানে রয়েছে। জাপানে ২০০২ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে ‘রিল্যাক্সড এডুকেশন’ বা ‘ইউতোরি’ ব্যবস্থা চালু হয়। তারা পাঠ্যবইয়ের ৩০ শতাংশ ভার কমিয়ে দিয়ে ‘ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ’ চালু করেছে। জাপানের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্য গিলিয়ে দেওয়া নয়, বরং তাদের বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। যদিও জাপানে এটি নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে, তবে বৈশ্বিক সূচকে দেখা যায়, রিল্যাক্সড এডুকেশনে শিক্ষা গ্রহণের ফলে জাপানি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণের হার এবং দলগত কাজের দক্ষতা আশাতীতভাবে বেড়েছে। এর ফলে জাপানি শিক্ষার্থীরা মুখস্থবিদ্যার বদলে সামাজিক সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীল কাজে অবিশ্বাস্য দক্ষতা অর্জন করেছে।
বর্তমানে আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ একাডেমিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো ‘বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাব’ এবং ‘ডিজিটাল রিওয়ার্ড সিস্টেম’। শিক্ষার্থীরা মনে করছে, অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং বা দক্ষতা উন্নয়ন করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার খুব একটা প্রয়োজন নেই। এই ‘একাডেমিক ডিটাচমেন্ট’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ দূর করতে রিল্যাক্সড এডুকেশন অপরিহার্য।
যখন একজন শিক্ষার্থী দেখবে যে স্কুলে সে তার ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা বা আইটি স্কিলকে প্রজেক্ট হিসেবে জমা দিতে পারছে, সে তার বিজনেস প্ল্যান নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারছে, তখন সে একাডেমিক পড়াশোনাকে আর অর্থহীন মনে করবে না। বরং সে একাডেমিক জ্ঞানের মাধ্যমে প্রতিকূলতা জয় করতে শিখবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের নতুন শিক্ষাক্রম রিল্যাক্সড এডুকেশনের মূল সুরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। তবে এটি সফল করতে হলে শুধু কাগজে-কলমে পরিবর্তন আনলে হবে না; প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক এবং উপযুক্ত অবকাঠামো। শিক্ষা হতে হবে এমন, যা শিক্ষার্থীকে কেবল ভালো ‘পরীক্ষার্থী’ বানাবে না, বরং একজন সচেতন ও সংবেদনশীল ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তুলবে। প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা যেমন সমস্যা সমাধান, সহানুভূতি, মানসিক দৃঢ়তা, পরার্থপরতা, আবেগ ও রাগ নিয়ন্ত্রণ—এগুলো শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে এই পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল নীতিমালাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কিছু মৌলিক পরিবর্তন:
১. সিলেবাস সংকোচন ও মডুলার পদ্ধতি: অপ্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক তথ্য কমিয়ে ভাষা, গণিত এবং জীবনমুখী দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিজ্ঞান বা ইতিহাসের জটিল তথ্য মুখস্থ না করিয়ে যেগুলো প্রাত্যহিক জীবনে কাজে লাগে, সেসব প্রজেক্ট বা ল্যাব-ভিত্তিক শিক্ষার হার বাড়াতে হবে।
২. মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন: বছরের শেষে একটি বড় পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে ফলাফল না দিয়ে সারা বছর ক্লাসের পারফরম্যান্স ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে ‘ধারাবাহিক মূল্যায়ন’ চালু করতে হবে। জিপিএ-৫ পাওয়ার উন্মাদনা কমিয়ে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত উন্নতির ওপর জোর দিতে হবে। প্রতিযোগিতা না বাড়িয়ে দলগত পারফরম্যান্সের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একা এগিয়ে গেলেই চলবে না বরং সবাই মিলে এগিয়ে যেতে হবে, এই মূল্যবোধ আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে।
৩. শিক্ষক-শিক্ষার্থী বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ: শিক্ষকদের কেবল ‘লেকচারার’ নয়, বরং একজন ‘মেন্টর’ বা মোটিভেশনাল গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ভয়হীন পরিবেশে শিক্ষার্থীর সহজাত কৌতূহলকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
৪. অবকাঠামো ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি: বদ্ধ চার দেয়ালের বাইরে প্রকৃতি ও সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের বোঝাতে হবে যে, সন্তানকে সারাক্ষণ বইয়ের মধ্যে ডুবিয়ে রাখলেই সে মেধাবী হয় না; বরং সৃজনশীল চিন্তার অবসরই প্রকৃত মেধা বিকাশের সহায়ক।
ইউনিসেফের সতর্কবার্তাটি আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ। এই সতর্কবার্তাটিকে আমলে নিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে করে তুলতে হবে ‘শিক্ষার্থীবান্ধব’, ‘সিলেবাসকেন্দ্রিক’ নয়। শৈশবকে পরীক্ষার যাঁতাকল থেকে মুক্ত করে শেখার আনন্দ ফিরিয়ে দিলেই কেবল আমরা একটি দক্ষ, মননশীল এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম প্রজন্ম আশা করতে পারি।
দ্রুত বদলে যাওয়া এই পৃথিবীতে খণ্ডিত তথ্যের চেয়ে গভীর জীবনবোধ ও অভিযোজন ক্ষমতা বেশি জরুরি। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘স্লো এডুকেশন’ বা ‘রিল্যাক্সড মেথড’ প্রবর্তন কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মানসিক ও মেধাবিকাশের একমাত্র টেকসই পথ।