Published : 20 Feb 2026, 04:38 PM
রোজার মাস শুরু হয়ে গেছে। অফিস শেষে বের হতে গিয়ে দেখলাম, ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা পেরিয়ে গেছে। একে একে সহকর্মীদের কাছে বিদায় নেব, এমন সময় ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠল। গৃহকর্ত্রীর বার্তা–‘বাসায় ফেরার পথে বাজার থেকে ইফতারের জন্য লেবু আর ডিম নিয়ে এসো।’ সঙ্গে সঙ্গে রওনা দিলাম সাহেব বাজারের দিকে। রাজশাহী শহরের সবচেয়ে বড় বাজার এটি। কিন্তু ঢুকতেই দেখি মানুষের ভিড় আর দাম সব আকাশছোঁয়া। মাঝারি আকারের লেবুর পিস ৩০ টাকা। রোজার আগে যে লেবুর হালি ছিল ২০ টাকা, সেটি বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা হালি। দেশি মুরগি ৭৫০ টাকা, লাল লেয়ার মুরগি ৩৩০ টাকা। ইচ্ছে ছিল প্রথম রোজায় বেগুনি খাব, কিন্তু বেগুন কিনতে গিয়ে দেখি এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা এবং এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা করে কেজি। মন খারাপ করে অর্ধেক ব্যাগ ভরে বাজার করে বাসায় ফিরলাম।
এই অনুভূতিটা কেবল আমার একার নয়। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এই একই অসহায়ত্ব বুকে নিয়ে বাজার থেকে ফেরেন। রমজান সংযমের মাস। কিন্তু বাজারে গেলে মনে হয়, সংযমটা শুধু ক্রেতার জন্য। দ্রব্যমূল্যের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কেন হচ্ছে, আর এর থেকে মুক্তির পথ কী, এ প্রশ্নগুলো এখন শুধু অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিটি ঘরের চুলায় আগুনের মতো জ্বলছে।
এই বৃদ্ধির পেছনে একটি বড় কারণ হলো সরবরাহ চেইনের বিশৃঙ্খলা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হলেও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এটি ৯.৫৮ শতাংশ। এর মূলে রয়েছে আমদানি নির্ভরতা। উদাহরণস্বরূপ, পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৫ লাখ টন, যার মধ্যে রমজানে চাহিদা চার থেকে সাড়ে চার লাখ টন। কিন্তু ভারত থেকে রপ্তানি বন্ধ হলে দাম হু হু করে বাড়ে। এই চিত্রটি কেবল পেঁয়াজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষক মাঠে ফসল ফলান, কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের স্তরের পর স্তর পেরিয়ে সেই পণ্য যখন ক্রেতার হাতে পৌঁছায়, তখন দাম হয়ে যায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। উৎপাদক পান না ন্যায্য মূল্য, ক্রেতা দেন বাড়তি দাম। লাভের পুরোটা চলে যায় মাঝখানের দালাল শ্রেণির পকেটে।
আরেকটি কারণ হলো ডলার সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়ন। বাংলাদেশে ডলারের দাম গত এক বছরে ৮০ টাকা থেকে ১২০ টাকায় উঠেছে। এর ফলে আমদানি খরচ অনেক বেড়েছে।
ভোজ্যতেলের বাজারেও প্রভাব পড়েছে। চাহিদা ২০ লাখ টন হলেও আমদানি এখন মাত্র ১৮ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই পরিস্থিতি সরাসরি মধ্যবিত্তের পকেটে লাগে। ঢাকার একটি পরিবার গত বছর ১০ হাজার টাকার বাজার খরচ করলেও, এখন তা ১৫ হাজার টাকার বেশি। পরিবারের প্রধান জানান, এই বৃদ্ধির কারণে সন্তানের পড়াশোনার খরচও কমাতে হয়েছে। এই অবমূল্যায়ন শুধু আমদানি পণ্য নয়, দেশীয় উৎপাদনকেও প্রভাবিত করছে, কারণ কাঁচামালের দাম বেড়েছে।
এছাড়া, সিন্ডিকেটের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। অর্থনীতিবিদদের মতে, গুটিকয়েক বড় আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ী পুরো বাজার জিম্মি করে রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, ছোলার বার্ষিক চাহিদা এক লাখ টন, যার রমজানে ৮০ হাজার টন লাগে। কিন্তু গত মাসে দাম ১০০ থেকে ১১০ টাকায় উঠেছে, যা ভ্যাট কমানোর পরও কমেনি। চট্টগ্রামের একটি গুদামে গত বছর এক ব্যবসায়ী ৫০ হাজার টন ছোলা মজুত করে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিলেন, যা পরে অভিযানে ধরা পড়ে। এমন ঘটনা বারবার ঘটছে, কারণ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণায় দেখা যায়, এই সিন্ডিকেটের কারণে বছরে ৩০ শতাংশ খাদ্যপণ্য নষ্ট হয়, যা দাম বৃদ্ধি ঘটিয়েছে।
এই বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর। বিবিএসের তথ্যে, গত বছর মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯.৯৪ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা এখনও স্থিতিশীল হয়নি। বাড়ি ভাড়া বেড়েছে, যাতায়াতের খরচও বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। রমজানে ইফতারের থালায় একটু ফল দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন অনেক মা, কিন্তু তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় না। ইফতারের সময় ফলের দামও মধ্যবিত্তের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
টমেটো কেজি ৯০ টাকা, কলা ৪০ টাকা, পেয়ারা ১৫০ টাকা এবং দেশি পেঁপে ১০০ টাকা।
বিদেশি ফল যেমন আঙুর, আপেল বা মালটার দাম জানলেই মনে হয়, এটি সাধারণ পরিবারের পক্ষে কেনা অসম্ভব।
এখন প্রশ্ন, সমাধানের পথ কী? সরকারের কাছে তিনটি হাতিয়ার রয়েছে: শুল্ক-কর কমানো, খোলা বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য বিক্রি এবং ডলার মজুত বাড়ানো। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখতে চান, তাই রমজানে আমদানি সহজ করতে ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামবে। কিন্তু এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর? গত বছরের অভিজ্ঞতা বলে, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোরতা ছিল না। বাংলাদেশেও যে স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে, আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব, তার প্রমাণ আমাদের কৃষি খাতেই আছে। দরকার শুধু উৎপাদন ব্যয় কমাতে উন্নত প্রযুক্তি সহজলভ্য করা।
আরেকটি পথ হলো মুদ্রানীতির সঠিক ব্যবহার। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার বাড়িয়ে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। গত ৫০ বছরে শুধু চাল উৎপাদনে জোর দেওয়ায় অন্য খাদ্যপণ্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে চাল উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ১৩ লাখ টন, যা ২০২২-২৩-এ বেড়ে ৪ কোটি ১ লাখ টন হয়েছে — এটি বড় অর্জন। কিন্তু ভুট্টা উৎপাদন ৭ লাখ টন থেকে ৬৪ লাখ টনে উন্নীত হলেও, কৃষক বাজারে পৌঁছাতে গিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ন্যায্য মূল্য পান না। এখানে সাপ্লাই চেইনের আধুনিকীকরণ অপরিহার্য।
সরকারের নতুন পরিকল্পনা যেমন ৩৩৩ নম্বরে অভিযোগের সুবিধা বা নতুন ওয়েবসাইট এগুলো ভালো উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে কতটা কার্যকর? গত বছর ১৬ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত থাকলেও বাজারে দাম কমেনি। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সুপারিশ অনুযায়ী উপজেলাভিত্তিক হিমাগার স্থাপন করলে ৩০ শতাংশ পণ্যের অপচয় রোধ করা সম্ভব। এছাড়া স্বল্প সুদে ঋণ ও অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার। ঢাকার অনেক নিম্নবিত্ত পরিবার টিসিবির সুলভ পণ্যের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও প্রায়ই খালি হাতে ফেরে। টিসিবির পরিধি বাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছানো এখন সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে রমজান এলেই ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছায় পণ্যের দাম কমান পুণ্যের আশায়। লিবিয়ায় সরকার নিয়মিত গুদাম তদারকি করে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তাহলে বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ কেন দৃশ্যমান নয়? এখানে দরকার দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যাতে উৎপাদক, সরবরাহকারী ও ভোক্তার মধ্যকার অস্বচ্ছ ব্যবধান কমানো যায়। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন এবং সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে আনতে পারলে বাজারে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এত সতর্কতা আর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়তেই থাকে কেন? এর পেছনে একটি বড় কাঠামোগত কারণ আমাদের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা। বাংলাদেশের এলসি অনেক উন্নত দেশের রপ্তানিকারক সহজে গ্রহণ করে না। ফলে সরাসরি লেনদেনের বদলে মধ্যস্বত্বভোগীদের শরণাপন্ন হতে হয়, আর তাতেই ব্যয় বেড়ে যায়। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ভোক্তার কাঁধে। এই সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্যাংকিং সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি, যাতে বিদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন করা যায় এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী ব্যয় এড়ানো সম্ভব হয়।
উৎপাদন না বাড়ালে শুধু বাজার তদারকি করে লাভ হবে না, আমাদের মাঠে ফলন বাড়াতেই হবে।। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ কোটি ৪ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারিত, যা আধুনিক প্রযুক্তির ফল। কিন্তু মাছের উৎপাদন ৪৪.৮৮ লাখ টন হলেও কেজিতে দাম ৭০০ টাকা। কারণ একটাই, সরবরাহ ব্যবস্থা গুটিকয়েকের নিয়ন্ত্রণে।
হাদিসে মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, জঘন্য অপরাধী ছাড়া কেউ মজুদ করে না। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা কি এ শিক্ষা ভুলে গেছেন? ক্যাবের সুপারিশ অনুযায়ী সারাদেশে খাদ্য পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করা, কর সুবিধা দেওয়া এবং নগদবিহীন কেনাবেচা উৎসাহিত করলে বাজারে একটি স্বাস্থ্যকর শৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে।
শেষ কথা হলো, দ্রব্যমূল্যের এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে সরকার, ব্যবসায়ী আর সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে বদলাতে হবে। সরকারের পদক্ষেপ যেমন টাস্কফোর্স গঠন, গুদাম অভিযান, এলসি সুবিধা—এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা এবং জনগণের সচেতনতা ছাড়া শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে উৎপাদন বৃদ্ধি, সাপ্লাই চেইন আধুনিকীকরণ এবং নৈতিক ব্যবসায়িক মানসিকতা গড়ে তুলে এই আগুন নেভাতে হবে।