Published : 24 Jul 2025, 07:23 PM
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপের নাম বিগ আইল্যান্ড। সুপ্ত আগ্নেয়গিরি আর সোনালি কচ্ছপ দেখার উদ্দেশ্যে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই রাজ্যের রাজধানী হনলুলু থেকে প্রায় এক ঘণ্টার বিমানযাত্রা। যাবার সময় নিচে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি দেখে মন ভরে যাচ্ছিল। কিন্তু ফেরার সময় বদলে গিয়েছিল সবকিছু।
এক ঘণ্টার ফ্লাইটে সাধারণত জুস আর বাদাম ছাড়া কিছু দেওয়া হয় না। সেদিনও জুস ও বাদাম দিতে এসেছিলেন এক বিমানসেবিকা। হঠাৎ করে বিমান এমন দুলুনিতে পড়ল যে মনে হচ্ছিল ছিটকে পড়ে যাব নিচে। জুস-বাদাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বিমানসেবিকা ভদ্রমহিলাও টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলেন দুই সিটের মাঝখানে।
আমাদের মাথায় তখন সর্বনাশের ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। ভাবছিলাম—আমি আর দীপা, দুজনই যদি চলে যাই, তবে আমাদের ছেলেটি তো পৃথিবীতে একেবারে একা হয়ে যাবে! ঈশ্বরকে স্মরণ করতে করতে, সেই সঙ্গে মাকেও মনে করছিলাম। আমাদের সময় যেন আর শেষই হতে চাইছিল না। নিচে তাকিয়ে দেখলাম সেই একই নীল জলরাশি।
হনলুলু থেকে বিগ আইল্যান্ডে যাবার পথে যে জলরাশি ছিল স্নিগ্ধ, শান্ত, ফেরার এই দুর্যোগের সময়ে তাকেই মনে হচ্ছিল ফণা তোলা রুদ্র সাপের মতো। পাইলট যদি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারতেন, তাহলে সেদিনই হয়তো হতো আমাদের শেষ যাত্রা।
বিমান দুর্ঘটনা তো কখনো বলে-কয়ে আসে না, আর একবার এলে—বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
রকমভেদে বিমান ভূপাতিত হবার নানা কারণ থাকে। আমি বলছি ঢাকার মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির কথা। নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি যুদ্ধবিমান এসে আছড়ে পড়েছিল মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে। সে ঘটনা সবারই জানা।
ঘটনার তিন দিন পর দেওয়া স্কুল সেকশনের এক ছাত্রের কথা তুলে ধরছি। দুর্ঘটনার পরের দুদিনের তুলনায়, তৃতীয় দিন বুধবার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাস ও তার চারপাশ ছিল তুলনামূলক শান্ত। উৎসুক মানুষের ভিড় কিছুটা কমেছে। যারা আসছেন, তারা বাইরে থেকেই যতটুকু পারছেন, ভেতরের অবস্থা দেখার চেষ্টা করছেন। তবে শিক্ষকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্কুলে এসেছেন। সেই সঙ্গে হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থী ও অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরাও ক্যাম্পাসে এসেছে। অনেকের সঙ্গে অভিভাবকও এসেছেন।
তেমনই একজন শিক্ষার্থী রামিম তাসকিন আহমেদের কথা শুনলাম দূর দেশ থেকে, সংবাদমাধ্যমের বরাতে। রামিম স্কুলের ইংরেজি ভার্সনের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ঘটনার দিন, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট আগুনের আঁচে তার এক কান পুড়ে যায়। শরীরের সেই পোড়া ক্ষত ছাপিয়ে, বন্ধু হারানোর বেদনা তাকে আরও বেশি কাতর করেছে।
তার সঙ্গে দেখা হয় স্কুলের চার নম্বর ভবনের সামনে। রামিম এসেছিল সেদিন ফেলে যাওয়া বইয়ের ব্যাগ নিতে। ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সে বলে, “আমাদের ছুটি হয়ে গিয়েছিল। ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়ায়, সবাইকে বের করে দেওয়ার পর আমি বের হই। সেদিনও তাই করছিলাম। খুব বেশি জন তখন ওখানে ছিল না। ছুটির পর যারা কোচিং করে, এমন চার-পাঁচজন ছিল। এমন সময় টিনের ওপর আমরা একটা শব্দ শুনতে পাই। এরপর আরও একটা বিকট শব্দ।
“তৃতীয় ধাপে হয় আরও বিকট শব্দ। দ্বিতীয় শব্দের পর মিনিটখানেকের মধ্যেই কালো ধোঁয়ায় সব অন্ধকার হয়ে যায়। তৃতীয় শব্দের সঙ্গেই আগুন লেগে যায়। আমি দূরে ছিলাম, সেই আগুনের আঁচেই আমার কান পুড়ে গেছে। চোখের সামনেই আমার তিন বন্ধু আগুনে পুড়ে মারা যায়। সেই দৃশ্য আর মনে করতে চাই না!”
রামিমের পাশে দাঁড়ানো তার বাবা, রুবেল আহমেদ, ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “ও ভীষণ ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। রাতে ঘুম থেকে লাফ দিয়ে ওঠে। আমরা ওকে ঘটনার দিন থেকেই একা থাকতে দিচ্ছি না।”
রামিমের সঙ্গে আরেক শিক্ষার্থীও ক্যাম্পাসে এসেছিল—তার নাম জাহিদ মোল্লা। জাহিদ মাইলস্টোনের বাংলা ভার্সনের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সেও বাবার সঙ্গে এসেছিল রেখে যাওয়া বই-খাতা ও সাইকেল নিতে। জাহিদ শোনায় অলৌকিকভাবে তার বেঁচে ফেরার গল্প। প্রতিদিন ছুটির সময় সে ঠিক ওই জায়গাটিতে গিয়ে এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করত—যেখানে গত সোমবার বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে।
আতঙ্কভরা অভিব্যক্তিতে জাহিদ বলে, “প্রতিদিনের মতো আমি ঠিক ওই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। এক বন্ধু এসে বলল, চল ক্যান্টিনে যাই। আমিও কিছু না ভেবেই ওর সঙ্গে রওনা দিলাম ক্যান্টিনের দিকে। রওনা দেওয়ার বিশ-পঁচিশ সেকেন্ডের মধ্যেই বিমানটি এসে ওখানে পড়ে। আমি যে বেঁচে ফিরেছি, সেটা এখনো বিশ্বাস হয় না।”
এই অবিশ্বাস্য বেঁচে ফেরার গল্পগুলো আমাদের দুটি বড় শিক্ষা দেয়—এক) বিপদের সময় মিথ্যা ও গুজব না ছড়ানো; দুই) নিহত ও আহতদের নিয়ে রাজনীতি না করা।
কিন্তু আমরা তা মানি না। দেশ-বিদেশে আপনি এমন বহু দুর্ঘটনার খবর পাবেন। উন্নত দেশে হলে এতদিনে মন্ত্রীর পদত্যাগ, এমনকি সরকারেরও অস্তিত্ব নিয়ে টান পড়ত। কে জেলে যেত, কে বাইরে থাকত—বলা মুশকিল।
আমাদের আশপাশের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায়—হয়তো কিছু বিষয় চাপা পড়ে যায়, হয়তো সব সত্য বেরিয়ে আসে না, কিন্তু মোটামুটি একটি চিত্র পাওয়া যায়। সেই তথ্য বা চিত্রে বিশ্বাস রাখা যায়। কিন্তু আমাদের সমাজে তার বালাই নেই।
আজকাল চাইলেও সত্য বলা যায় না। গেলেও তার দায় কেউ নেয় না। ভয়ে ভয়েই বলছি—সরকার তো এই অপঘটনা ঘটায়নি, কোনো উপদেষ্টা বা কর্তাব্যক্তি এর মাস্টারমাইন্ডও নন। তাহলে এত লুকোছাপা কেন?
কেন মানুষ মৃতের সংখ্যা, আহতের পরিমাণ নিয়ে নানান কথা বলা হচ্ছে? কেন বাচ্চারা আবার রাস্তায় নেমে মার খাচ্ছে? কী এক আজব সমাজ!
ক’দিন আগেই যারা এই শিশুদের ভবিষ্যতের কথা বলে আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিল, আজ তারাই পুলিশের লাঠির শিকার। চোখ বন্ধ রাখলে তো সত্য গায়েব হয়ে যায় না।
মানুষ আরও বেশি বিস্মিত হয়েছে রাজনৈতিক দল ও দলগুলোর জ্যেষ্ঠ নেতাদের দন্তবিকশিত সমঝোতার বৈঠক দেখে। তখন কিন্তু দেশে-বিদেশে বাংলাদেশিদের চোখে ছিল জল, হৃদয়ে ছিল দীর্ঘশ্বাস। সেই মুহূর্তে এমন ফটোসেশন নেতাদের দায়িত্বহীনতা ও সংবেদনশীলতার অভাব স্পষ্ট করে দিয়েছে।
জানি না, আমাদের ভবিষ্যৎ আসলে কোথায়? তরুণ ও নতুন প্রজন্মের ওপর যে সব দায় ও আগাছা আমরা চাপিয়ে দিচ্ছি—তারা কি তা থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে?
সব নেতিবাচকতার মধ্যেও কিছু ইতিবাচকতা থাকে। এই দুর্ঘটনার পর জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের মানুষ এক হয়ে গিয়েছিল। রক্তদান থেকে শুরু করে চোখের পানিতে গড়ে উঠেছিল এক ঐক্য।
এই ঐক্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। অন্তত বিপদের সময় যে ঐক্যবোধ—তার ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।