Published : 02 Aug 2025, 08:44 PM
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পাল্টা শুল্ক নীতিকে ঘিরে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ২০২৫ সালের ৭ অগাস্ট থেকে বাংলাদেশের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে যাচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের ‘সাফল্য’ বলে মনে করছেন।
সত্যিই কি এটি সাফল্য, না কি এর পেছনে আছে জটিল অর্থনৈতিক হিসাব ও কৌশলগত ভারসাম্য? গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, বিষয়টি আসলে অনেক বেশি জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট—যা কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক আদায় করেছে। এখন নতুন করে ঘোষিত ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক যুক্ত হলে এই গড় শুল্কহার দাঁড়াবে প্রায় ৩৫ শতাংশে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে পোশাক খাতে, যা বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে গত বছর গড় শুল্কহার ছিল ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। নতুন পাল্টা শুল্ক যুক্ত হলে এই হার বেড়ে দাঁড়াবে ৩৬ দশমিক ৭৭ শতাংশে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর চাপ সৃষ্টিকারী পরিবর্তন।
পোশাক খাতে পণ্যভেদে শুল্কহার ভিন্ন ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, মানবতন্তু বা সিনথেটিক ফাইবার দিয়ে তৈরি সোয়েটারের ওপর বর্তমানে ৩২ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে, যা পাল্টা শুল্ক যুক্ত হয়ে দাঁড়াবে ৫২ শতাংশে। তুলার সুতা দিয়ে তৈরি সোয়েটারের ক্ষেত্রে বর্তমানে শুল্কহার ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩৬ দশমিক ৫০ শতাংশে। সুতার কাপড়ে তৈরি ছেলেদের আন্ডারপ্যান্টের বর্তমান শুল্ক ৬ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়াবে ২৬ শতাংশে। কিছু পোশাকে বর্তমানে মাত্র ১ শতাংশ শুল্ক আছে, সেগুলোর ওপর এখন ২১ শতাংশ গুনতে হবে। অর্থাৎ, পণ্যের ধরন অনুসারে শুল্কের গতি-প্রকৃতি নানা মাত্রায় পরিবর্তিত হচ্ছে, যা সরাসরি বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
শুধু পোশাক নয়, জুতা, হ্যাটস ও হেডগিয়ার, চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে জুতা রপ্তানিতে আগের কার্যকর গড় শুল্কহার ছিল সাড়ে ৮ শতাংশ, এখন তা দাঁড়াতে পারে ২৮ দশমিক ৫০ শতাংশে। হ্যাটস ও হেডগিয়ারে শুল্ক ছিল সাড়ে ৭ শতাংশ, এখন তা হয়ে যাবে প্রায় ২৭ শতাংশ। চামড়াজাত পণ্যে আগে গড় শুল্কহার ছিল ১২ দশমিক ২০ শতাংশ, যা এখন ৩২ শতাংশের ওপরে উঠতে পারে। যেমন, চামড়ার হাতব্যাগে আগে শুল্ক ছিল ৯ শতাংশ, এখন তা ৩১ শতাংশে দাঁড়াবে। এর অর্থ, বাংলাদেশ যেসব খাতে রপ্তানিতে নির্ভরশীল, তার প্রায় প্রতিটিতেই বড় ধরনের শুল্ক চাপ আসছে।
এই উচ্চ শুল্কহার বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য যে বিপুল প্রতিযোগিতাহীনতা তৈরি করবে তা সহজেই অনুমেয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বাংলাদেশি জিন্স আমেরিকান ব্যবসায়ী যদি ২০ ডলারে আমদানি করতেন, তাহলে এখন নতুন শুল্কসহ সেটা পড়বে ২৭.১০ ডলার। অথচ একই ধরনের প্যান্ট যদি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ, যেমন—ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড—যেখানে শুল্ক তুলনামূলক কম বা চুক্তি অনুযায়ী ছাড় রয়েছে, সেখান থেকে আমদানি করা যায়, তাহলে সেই ব্যবসায়ী আর বাংলাদেশের পণ্যের দিকে ফিরেও তাকাবেন না।
এ অবস্থায় প্রশ্ন আসে—অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে কি একই ধরনের শুল্ক আরোপ করা হয়েছে? উত্তর হচ্ছে, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়ার ওপরেও প্রায় ২০ শতাংশ শুল্ক থাকলেও, এসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা এফটিএ রয়েছে, যার ফলে অনেক পণ্যে শুল্ক ছাড় পায় তারা। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও, অনেক পণ্য তাদের জন্য ছাড়প্রাপ্ত। ভারতের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশের ওপরে উঠলেও, তারা আমেরিকায় বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। চীনের ক্ষেত্রে এ হার ৩০ শতাংশের ওপরে, কিন্তু তাদের বার্ষিক রপ্তানি ৫২৫ বিলিয়ন ডলার। বড় অর্থনীতির দেশগুলো বাজার দখলের ক্ষমতা রাখে, তাই যুক্তরাষ্ট্র এদের ওপর বেশি শুল্ক চাপিয়ে নিজের বাজারকে রক্ষা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো মাঝারি বা ছোট রপ্তানিকারক দেশের ওপর একই ধরনের শুল্ক আরোপ কতটা যুক্তিসঙ্গত?
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলছেন, বাংলাদেশ যদি কয়েক বিলিয়ন ডলারের আমেরিকান পণ্য আমদানি করে, তাহলে ২০ শতাংশ ট্যারিফ পাওয়া সম্ভব হতো এবং সরকার তা-ই করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ঠিক কী কী আমদানি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ?
প্রথমত, বাংলাদেশ প্রায় ৯ লাখ টন ভুট্টা আমদানি করতে চায়, যার বাজার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, প্রতিটির দাম ১৫০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে। এর মানে, কেবল বিমান কেনাতেই ব্যয় হবে ৪ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার। এখনও পর্যন্ত বোয়িং বিমানগুলোর মডেল বা কনফিগারেশন নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তৃতীয়ত, আরও কিছু অপ্রকাশিত পণ্য আমদানি বা চুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও, সেগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশ ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকান পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই ব্যয় হবে কয়েক বছরের ব্যবধানে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর ২ বিলিয়ন ডলার করে আমেরিকান পণ্য আমদানি করা হবে।
এ পর্যায়ে খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠে—এই আমদানি কি অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক? বোয়িং বিমান কেনার ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশ বিমানে প্রায়ই লোকসান হয়, দুর্নীতির কারণে অপারেটিং খরচ বেড়ে যায়। যদি সেই বিমানের সদ্ব্যবহার না হয়, তাহলে এর ফলাফল কেবল নতুন ঋণের বোঝা বা বাজেট ঘাটতি হতে পারে। এর পরিবর্তে এলএনজি, তুলা, সয়াবিন বা প্রযুক্তি খাতে আমদানি করলে দেশের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো, অর্থনীতিতে টেকসই সুবিধা আসত।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যদি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জিএসপি বা এফটিএ সুবিধা পেত, তাহলে তো এই ধরনের আমদানি প্রতিশ্রুতি না দিয়েও শুল্কমুক্ত বা হ্রাসকৃত শুল্কে রপ্তানির সুযোগ থাকত। আফ্রিকান এলডিসিগুলো এখনও অনেক ক্ষেত্রে এমন সুবিধা পায়, অথচ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও বাংলাদেশ এমন সুবিধা অর্জনে ব্যর্থ। এটি আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারই প্রতিচ্ছবি।
এই প্রেক্ষাপটে ২০ শতাংশ ট্যারিফকে ‘সাফল্য’ বলাটা আসলে কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অপ্রাসঙ্গিক নয়। আগে থেকেই যদি ১৫.৫ শতাংশ শুল্ক থাকত, আর এখন নতুন করে ২০ শতাংশ যুক্ত হয়ে সেটি দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে, তাহলে এ তো আসলে একধরনের অর্থনৈতিক চাপ, যাকে সাফল্য বলে উদযাপন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট এফটিএ চুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং রপ্তানি পোর্টফোলিও প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। শুধু পোশাকনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একইসঙ্গে আমদানি নীতিতেও সমন্বয় আনতে হবে। গভীরভাবে ট্যারিফ বিশ্লেষণ, কস্ট-বেনিফিট স্টাডি এবং রপ্তানি-বান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষত মার্কিন কংগ্রেস ও বাণিজ্য কমিশনে বাংলাদেশের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম লবিস্ট দল গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যেসব গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বা আমদানির কথা হচ্ছে—যেমন বোয়িং বিমানের ক্ষেত্র—সেগুলোতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থ রক্ষা অপরিহার্য।
২০ শতাংশ আমেরিকান পাল্টা শুল্ক পেয়ে বাংলাদেশ আপাতত কিছুটা স্বস্তি পেলেও এটি কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি বিজয় নয়। বরং কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি সাময়িক ভারসাম্য রক্ষা। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কছাড়, ট্যারিফ-মুক্ত প্রবেশাধিকার এবং চুক্তিভিত্তিক স্থিতিশীল বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে—যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।