১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আত্মহত্যা প্রতিরোধ: মৃত্যুর পর আক্ষেপ নয়, বেঁচে থাকতেই পাশে থাকা

মৃত্যুর পর কারণ না খুঁজে, বেঁচে থাকতে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সমাজ আমরা কীভাবে গড়ব?

আত্মহত্যা প্রতিরোধ: মৃত্যুর পর আক্ষেপ নয়, বেঁচে থাকতেই পাশে থাকা
বিচার নয়, প্রয়োজন সহানুভূতি— এটি সমাজের মানবিক দায়বদ্ধতা। ছবি: এআই

মাহমুদা মাহমুদা মাহমুদা মাহমুদা

Published : 11 Sep 2026, 01:41 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:58 AM

একজন মানুষ আত্মহত্যা করার পর আমাদের চারপাশে হঠাৎ অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়। কেন এমন হলো? কী ঘটেছিল? পরিবার কি কিছু বুঝতে পারেনি? সম্পর্কের কোনো সমস্যা ছিল কি? অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক বিরোধ, প্রেম, পরীক্ষায় ব্যর্থতা—কোন কারণটি তাকে শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে গেল?

অথচ প্রশ্নটি হয়তো অন্য জায়গায় করা দরকার ছিল। মানুষটি যখন বেঁচে ছিলেন, তখন তার কষ্টটুকু আমরা কতটা দেখতে পেয়েছিলাম?

আত্মহত্যার ঘটনা ঘটার পর কারণ খোঁজা সহজ। কঠিন হলো এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ ভেঙে পড়ার আগেই তার পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধের আলোচনায় এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার প্রবণতা আমাদের সমস্যাটিকে সংকুচিত করে ফেলে। একজন মানুষ কেন আত্মহত্যার কথা ভাবছেন, তার উত্তর অনেক সময় শুধু একটি ঘটনায় পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক বা সামাজিক চাপ, নির্যাতন, আর্থিক অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা—বিভিন্ন অভিজ্ঞতা একসঙ্গে একজন মানুষকে অসহনীয় অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এই কারণেই আত্মহত্যা প্রতিরোধকে শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্রীয় নীতির বিষয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেন। বাংলাদেশেও বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন আত্মহত্যার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্ক—বিভিন্ন বয়স ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা ও আচরণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

কিন্তু এখানে বাংলাদেশের একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি। দেশে আত্মহত্যার প্রকৃত সংখ্যা কত, কোন বয়স বা অঞ্চলে ঝুঁকি বেশি, কী ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমাদের আরও শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। যে সমস্যাকে আমরা পরিমাপ করতে পারি না, তার জন্য কার্যকর নীতি তৈরি করাও কঠিন।

এই জায়গায় প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় আত্মহত্যা নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার প্রচেষ্টার তথ্য শুধু থানার মামলা বা হাসপাতালের নথিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থা, হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক, থানা ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। কোথায় কত ঘটনা ঘটছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে, আত্মহত্যার প্রচেষ্টার পর কতজন চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন—এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় আত্মহত্যা ও আত্মক্ষতির কমিউনিটি পর্যায়ের নজরদারি শুরু করেছে; এখন প্রয়োজন সেটিকে জাতীয় ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়া।

এরপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে হাসপাতালের দেয়াল থেকে কমিউনিটিতে নিয়ে যাওয়া। একজন মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে পড়লে তাকে ঢাকায় বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রাখা যাবে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত রেফারেল নিশ্চিত করতে হবে। ডব্লিউএইচও (WHO)-এর সহায়তায় বাংলাদেশে ইতোমধ্যে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে এ ধরনের সেবা সম্প্রসারণ এবং অ-বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের কাজ হচ্ছে। এখন প্রয়োজন এর ধারাবাহিকতা, জনবল ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

এছাড়া, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়কে আত্মহত্যা প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে দেখতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং নয়, শিক্ষার্থীদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, চাপ মোকাবিলা, সাহায্য চাওয়া এবং সহপাঠীর সংকটের সংকেত বোঝার দক্ষতা শেখাতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত একটি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীকে ঝুঁকিতে দেখলে কোথায় পাঠাবেন, সেটি স্পষ্ট থাকে। বাংলাদেশে সামাজিক ও আবেগিক শিক্ষা নিয়ে কিছু পরীক্ষামূলক কাজ ইতোমধ্যে হয়েছে; সেগুলোকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি, আত্মহত্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি—সহজে প্রাণঘাতী উপকরণের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ নিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এলাকায় উচ্চঝুঁকির কীটনাশকের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিক্রয়ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপের সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, বিক্রেতা এবং কৃষকদের যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনাতেও ক্ষতিকর কীটনাশকের প্রাপ্যতা নিয়ন্ত্রণকে আত্মহত্যা কমানোর একটি ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য একটি কার্যকর জাতীয় সহায়তা ও রেফারেল ব্যবস্থা দরকার। হেল্পলাইন থাকলেই হবে না; প্রশিক্ষিত কর্মীকে কল গ্রহণ করতে হবে, ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা বা জরুরি সহায়তার সঙ্গে সংযোগ করিয়ে দিতে হবে। জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনাতেও বিদ্যমান সরকারি হেল্পলাইন ও কল সেন্টারকে শক্তিশালী করার এবং অপারেটরদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রশিক্ষিত করার কথা বলা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমের জন্য আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের একটি বাধ্যতামূলক ও ব্যবহারযোগ্য জাতীয় নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন। কী ধরনের ছবি ব্যবহার করা যাবে না, ঘটনার পদ্ধতি কতটা প্রকাশ করা যাবে, কী ধরনের শিরোনাম এড়িয়ে চলতে হবে এবং প্রতিটি প্রতিবেদনে কোথায় সাহায্য পাওয়া যায়, এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে; এটিকে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে।

সবশেষে, আত্মহত্যা প্রতিরোধকে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সমাজকল্যাণ, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষকে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনাতেও আত্মহত্যা প্রতিরোধকে বহুখাতভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

তার চেয়েও বড় পরিবর্তন দরকার আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। ‘কেন এমন করল?’ প্রশ্নটির পাশাপাশি আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘সে কতদিন ধরে কষ্টে ছিল?’ ‘তার কথা কেউ শুনেছিল কি?’ ‘সাহায্য চাওয়ার সুযোগ তার ছিল কি?’ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ‘সেই সাহায্য কি সময়মতো তার কাছে পৌঁছেছিল?’

বাংলাদেশে আমরা যদি সত্যিই আত্মহত্যার হার কমাতে চাই, তাহলে মৃত্যুর পর কারণ খোঁজার সংস্কৃতি থেকে জীবিত অবস্থায় মানুষকে সহায়তা করার সংস্কৃতিতে যেতে হবে। নীতি থাকতে হবে, কিন্তু তার সঙ্গে বাস্তবায়নের জবাবদিহিও থাকতে হবে। পরিকল্পনা থাকতে হবে, কিন্তু সেই পরিকল্পনার জন্য বাজেট, জনবল ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যও থাকতে হবে।

একজন মানুষ যখন বলে, ‘আমি ভালো নেই’, তখন তার কথাটি গুরুত্ব দিয়ে শোনা, প্রয়োজনীয় সেবা পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দেওয়া এবং সংকটের আগেই পাশে দাঁড়ানো—আত্মহত্যা প্রতিরোধের বাস্তব রাজনীতি ও মানবিকতা সম্ভবত এখানেই।

একটি জীবন বাঁচানো মানে শুধু একটি মৃত্যু ঠেকানো নয়; একটি পরিবারকে শোক থেকে রক্ষা করা, একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে টিকিয়ে রাখা এবং সমাজকে আরও মানবিক করে তোলা।

মাহমুদা মাহমুদা  মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা (এমএইচপিএসএস) বিশেষজ্ঞ। ই-মেইল: mahmuda101@gmail.com