Published : 11 Apr 2026, 12:37 PM
বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির গভীরে তাকালে অস্বস্তিকর, কিন্তু অস্বীকার করা যায় না এমন এক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আমাদের মানসিক কাঠামোর ভেতরে যেন এক ধরনের স্ববিরোধী প্রবণতা স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে আছে। এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে আছে আমাদের চিন্তা, বিচারবোধ এবং সামাজিক আচরণের নানা স্তরে। আমরা যখন কাউকে সমর্থন করি, তখন তাকে এমনভাবে মহিমান্বিত করি যেন তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন, যেন ত্রুটিহীন এক অতিমানব। আবার যখন কাউকে অপছন্দ করি, তখন তাকে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করি যেন তিনিই যাবতীয় ষড়যন্ত্রের উৎস এবং সমস্ত সমস্যার মূল কারণ।
এই প্রবণতা নতুন নয়। ইতিহাসের নানা সময়ে আমরা এর পুনরাবৃত্তি দেখেছি। পূর্ব ইতিহাস বিবেচনায় না নিলেও, দেড় বছর আগে পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ঘিরে অনেক মানুষের মধ্যে এক ধরনের দেবতুল্য ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চাওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, যা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী ছিল। সেই সময়ে রাজনৈতিক পরিবেশ তাকে কেবল একজন নেতা হিসেবে নয়, দেশের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার একমাত্র নিশ্চয়তা হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য যেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল। কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে অজ্ঞ, দেশবিরোধী বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হতো।
অথচ রাজনৈতিক পরিস্থিতির পট পরিবর্তনের পর একই সমাজ যখন নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করল, সেই সমাজের অন্য অংশ তখন আরেকজনকেও একইভাবে মহিমান্বিত করতে শুরু করল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে অনেকের মধ্যে সেই একই ধরনের অন্ধ ভক্তি লক্ষ্য করা গেছে। তিনি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন ব্যক্তিত্ব, একজন নোবেল বিজয়ী ও একজন অর্থনীতিবিদ। কিন্তু তার ক্ষেত্রেও যে সমালোচনাহীন এক পূজার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা আমাদের সমাজের এই স্ববিরোধী প্রবণতাকেই নতুনভাবে তুলে ধরে।
এখন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাদের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েও একই প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ভিন্ন একটি গোষ্ঠী আবারও এমনভাবে নেতৃত্বকে ঘিরে ফেলতে চাইছে, যেখানে যুক্তি, সমালোচনা এবং বাস্তবতার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে আর তার জায়গা দখল করে নেয় অন্ধ আনুগত্য।
এই চক্রটি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক সমস্যা। আমরা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের মধ্যে যেন একটি প্রবণতা কাজ করে—হয় পুরোপুরি গ্রহণ, নয় পুরোপুরি বর্জন। মাঝামাঝি কোনো অবস্থান আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। আমরা ভুলে যাই যে একজন মানুষ যত বড় নেতা বা চিন্তাবিদই হোন না কেন, তিনি ত্রুটিমুক্ত নন। তার যেমন ভালো কাজ আছে, তেমনি ভুলও থাকতে পারে। কিন্তু আমরা সেই জটিলতাকে স্বীকার করতে চাই না।
এই মানসিকতার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তিপূজার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আমরা রাজনৈতিক দল বা নীতির চেয়ে ব্যক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিই। ফলে একজন নেতার প্রতি আনুগত্য ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বিশ্বাসে রূপ নেয় এবং সেই বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা মানে নিজের পরিচয়কে প্রশ্ন করা—এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজে সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা খুব সীমিত। আমরা তথ্য বিশ্লেষণ, যুক্তি খোঁজা কিংবা ভিন্নমতকে গ্রহণ করার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। সেখানে তথ্যের চেয়ে আবেগ এবং যুক্তির চেয়ে প্রচার বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যখন কোনো ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করে, তখন তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এক ধরনের গণ-মনস্তত্ত্ব তৈরি করে।
তৃতীয়ত, আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মানুষ অনেক সময় একটি শক্তিশালী নেতৃত্বের মধ্যে নিরাপত্তা খোঁজে। তারা বিশ্বাস করতে চায় যে একজন ব্যক্তি থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। এই মানসিকতা থেকে জন্ম নেয় সেই পরিচিত স্লোগান—‘আপনি যতদিন আছেন, ততদিন দেশ নিরাপদ।’ এই বাক্যটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নেতাকে কেন্দ্র করে উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু এর ভেতরের মানসিকতা একই থেকেছে।
এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, এটি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা, সমালোচনা এবং অংশগ্রহণ। কিন্তু যখন কোনো নেতাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়, তখন তার কার্যক্রমের ওপর কোনো কার্যকর নজরদারি থাকে না। ভুল সিদ্ধান্তগুলোও তখন প্রশংসিত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে অস্বাস্থ্যকর রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়।
অন্যদিকে, যখন কাউকে অন্ধভাবে ঘৃণা করা হয়, তখনও সমস্যা তৈরি হয়। কারণ তখন আমরা তার ভালো কাজগুলোও দেখতে চাই না। আমরা বাস্তবতা নয়, আবেগ অনুযায়ী বিচার করতে শুরু করি। ফলে সমাজে বিভাজন বাড়ে, সংলাপের সুযোগ কমে যায় এবং একটি সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক দলগুলো যেন এই প্রবণতার ফাঁদে না পড়ে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল ও তার জোটের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ তাদের চারপাশে এমন একটি গোষ্ঠী তৈরি হয় যারা সবসময় স্তুতি করতে প্রস্তুত থাকে এবং কোনো সমালোচনা করতে চায় না। এই তোষামোদকারীদের প্রথমে সুবিধাজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন কোনো সরকার নিজের সমর্থকদের কাছ থেকে সমালোচনা শুনতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা মনে করতে শুরু করে যে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, যদিও বাস্তবে সমস্যাগুলো জমতে থাকে। একসময় সেই সমস্যাগুলো বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে এবং তখন আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না।
এই কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে ভিন্নমতকে সম্মান করা হবে, সমালোচনাকে গ্রহণ করা হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্তি ও তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একইভাবে সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে নিজেদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনার। আমাদের শিখতে হবে যে কাউকে সমর্থন করা মানে তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা নয়, বরং তার ভালো কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ভুলগুলোকে চিহ্নিত করা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই মানসিক পরিবর্তনের ওপর। আমরা যদি আমাদের এই স্ববিরোধী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি, তাহলে একটি সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যথায় আমরা একই চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকব—কখনো অন্ধ ভক্তিতে, কখনো অন্ধ ঘৃণায়।