Published : 31 Jan 2026, 06:52 AM
ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট আবুলহাসান বনি-সদর তার মৃত্যুর আড়াই বছর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠ ভার্সাইতে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে বনি-সদরকে খুব বিষণ্ণ দেখায়। ওই সাক্ষাৎকারে বনি-সদরের বর্ণনায় উঠে আসে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতা দখলের পর কীভাবে বিপ্লবের নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। বনি-সদর মনে করেন, নির্বাসিত জীবন শেষে বিদেশ থেকে আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে তেহরানে ফিরে আনা হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে তিনি যে ধোঁকা দিয়েছেন, তা বিপ্লবীদের মাঝে ‘খুব কটু’ স্বাদ রেখে গেছে।
বিপ্লবের আগে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ও বনি-সদর দুজনই প্যারিসে নির্বাসনে ছিলেন। শাহ রাজবংশের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি খোমেনি ইরান ত্যাগ করেন। প্রথমে তুরস্কে যান; সেখান থেকে ইরাক। শেষ পর্যন্ত তিনি প্যারিসের বাইরের একটি গ্রামের সাধারণ বাড়িতে স্থায়ী হন। সেখান থেকেই তিনি ইরানের ইসলামপন্থী বিপ্লবের ভিত্তি গড়েন। ইরানের তৎকালীন একজন শিয়া ধর্মগুরুর ছেলে বনি-সদর তখন প্যারিসে অর্থনীতির ছাত্র। ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্কের কারণে বনি-সদর খোমেনিকে কেবল ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে সহযোগিতাই করেননি, পরবর্তীকালে তিনি খোমেনির একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ও সহকর্মী হয়ে ওঠেন।

প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের উপমন্ত্রী, পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন বনি-সদর। এরপর ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে খোমেনির আশীর্বাদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় খোমেনিই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। রয়টার্সের সঙ্গে ওই সাক্ষাৎকারে বনি-সদর বলেন, “ফ্রান্সে অবস্থানকালে খোমেনি সবসময় মুক্ত গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন। পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের কাছে খোমেনি এমন একটি আধুনিক ইসলামের ব্যাখ্যা সমর্থন করছেন বলে মনে হচ্ছিল, যেখানে ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা রাখা হয়।” কিন্তু বিমান থেকে ইরানে নামার পরপরই খোমেনি বদলে যান। হাজার বছরের ঐতিহ্যে গড়া সেক্যুলার ইরানে জেঁকে বসে মোল্লাতন্ত্র।
বাংলাদেশ কি একই ধরনের ঐতিহাসিক পরিণতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে? ঘরপোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ মনে করে—ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বিজয়ী হলে তাদের ভাগ্যে জুটবে ঘোর অমানিশা। জামায়াত নেতৃত্বাধীন কোনো জোট যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশ একটি ইসলামপন্থী শক্তির নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত কি না—সে প্রশ্ন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এমন নেতৃত্ব শরিয়াহ আইন প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারে, যেখানে নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে বাধ্য।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামী রীতিমতন ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে জামায়াত দ্রুত নিজেকে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যদি ঘটনাচক্রে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়ে যায়, তবে এটি হবে দলটির জন্য নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, যে দলটি বাংলাদেশের জন্মের কেবল বিরোধিতাই করেনি, ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সঙ্গী হয়েছে।
অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ওই চারটি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পেয়েছিল ৩০.০৮ শতাংশ, ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৭.৪৪ শতাংশ, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০.১৩ শতাংশ ও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৮.০৪ শতাংশ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ভোট পায় ৩০.৮১ শতাংশ, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৩৩.৬১ শতাংশ, ২০০১ সালের নির্বাচনে ৪০.৯৭ শতাংশ আর ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৩৩.২০ শতাংশ। পক্ষান্তরে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ভোট পেয়েছিল ১২.১৩ শতাংশ, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৮.৬১ শতাংশ, ২০০১ সালের নির্বাচনে ৪.২৮ শতাংশ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৪.৬০ শতাংশ। এ যাবৎ অনুষ্ঠিত ১২টি নির্বাচনে জামায়াত কখনোই ১৮টির বেশি সংসদীয় আসনে জয়ী হতে পারেনি।
তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামী দলটি যেন নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি জনসমর্থনের নতুন জোয়ার তৈরি করছে, যা মধ্যপন্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট’ (IRI)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির জনসমর্থন যেখানে ৩৩ শতাংশ, সেখানে জামায়াত ২৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। অন্য একটি জরিপেও একই ধরনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে; সেখানে ৩৪.৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বিএনপি শীর্ষে থাকলেও জামায়াতের অবস্থান ছিল ৩৩.৬ শতাংশে।
এসব জরিপ সত্যি হয়ে থাকলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশের ভোটাররা কি আগের তুলনায় জামায়াতে ইসলামীকে আরও বেশি ইসলামী দল বলে ভাবছেন? সন্দেহ নেই, বাংলাদেশি সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলামপন্থী ধারার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দেশজুড়ে ধর্মভীরুতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামের রক্ষণশীল ব্যাখ্যা অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে জামায়াতে ইসলাম, ইসলাম নয়, এমনটাই অধিকাংশ মানুষ মনে করেন। বাস্তবতা এই যে, একটি আন্তঃআঞ্চলিক ইসলামপন্থী আন্দোলন থেকে বিকশিত হয়ে জামায়াত বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। জামায়াতের একজন শীর্ষ নেতা সম্প্রতি আল জাজিরাকে বলছিলেন, তাদের আনুমানিক দুই কোটি সমর্থক রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার নিবন্ধিত সদস্য আছেন, যাদের ‘রুকন’ বলা হয়।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বারবার বলছেন যে, তারা নির্বাচিত হলে বাংলাদেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা নয়, বরং কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। তার এই কথায় অনেকেই আশ্বস্ত হতে পারছেন না। কারণ ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি প্যান-ইসলামিস্ট আন্দোলনে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতো ভারতে রয়েছে জামাত-ই-ইসলামী হিন্দ, পাকিস্তানে আছে জামায়াত-ই-ইসলামী পাকিস্তান আর আফগানিস্তানে সক্রিয় জামিয়াত-ই-ইসলামী। সবগুলো দলই এক সূত্রে গাঁথা। এই দলগুলোর সব সদস্য বিশ্বাস করেন, “ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য যারা কাজ করে তারা কেবল বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানে থামবে না। ইসলামের বিপ্লবী ধারণার ওপর ভিত্তি করে সারা মানবজাতির মধ্যে ব্যাপক বিপ্লবকে তারা প্রভাবিত করবে।”
জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করে সমগ্র ভারতকে ‘দারুল ইসলামে’ রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করা প্রথম মুসলমানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মওদূদী ইসলামিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন। কয়েকদিন আগে শফিকুর রহমানও বলেছেন যে, তারা প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র মদিনার আদলে বাংলাদেশে ইসলামী নীতির ভিত্তিতে একটি সমাজ গঠন করতে চান। এ কথা মনে রাখা দরকার, শফিকুর রহমান কিন্তু দলের সভাপতি বা চেয়ারপারসন নন; তিনি ‘আমির’, যার প্রতিশব্দ ‘কমান্ডার’।

আবার ফিরে যাই ইরানের বিপ্লবের দিকে। বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার দুই মাস পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে তার রাজনৈতিক দর্শনের কিছু দিক তুলে ধরেন। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে পশ্চিমাদের ‘ভণ্ডামির’ সমালোচনা করে তিনি ঘোষণা দেন, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সন্নিকটে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত ইরানের নতুন ব্যবস্থা প্রমাণ করবে যে, ‘একমাত্র ইসলামী গণতন্ত্রই সঠিক’, এবং পূর্ব ও পশ্চিমের বিপরীতে ‘ইসলামে কোনো দমন-পীড়ন নেই’ ও ‘ইসলামী সরকার অন্যায় করে না’। তিনি ঘোষণা দেন, ‘আজ ইরানে যা কিছু আছে, সবই পরিবর্তন করতে হবে’। ভাষণের শেষে খোমেনি অন্য ইসলামী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা ‘নিজেদের দেশ থেকে শয়তানদের হাত কেটে ফেলে’।
তার এই ভাষণের ৪৭ বছর পর আজকের ইরানের দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে চলছে ভয়ঙ্কর স্বৈরশাসন। মত প্রকাশের কোন স্বাধীনতা নেই। হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীকে খুন করা হচ্ছে। অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয়। নারীদের কোন সন্মান নেই। আগামী নির্বাচনের পর বাংলাদেশ বর্তমান ইরানের পথে যাত্রা করে কিনা, এ নিয়ে অনেকেই আতঙ্কিত।
ড. মো. আবু নাসের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন