Published : 04 Feb 2026, 05:58 PM
“রাম বড় সুবোধ।... সে কখনও কানাকে কানা, বা খোঁড়াকে খোঁড়া বলিয়া ডাকে না। কানাকে কানা বা খোঁড়াকে খোঁড়া বলিলে, তাহারা বড় দুঃখিত হয়।” ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বর্ণপরিচয়ের দ্বিতীয়ভাগে লিখে গেছেন। ছোটবেলায় আমাদের এ ধরনের নীতিকথা শিক্ষক ও অভিভাবকরা শেখাতেন।
ছোটবেলায় আমাদের এ ধরনের সংবেদনশীলতার পাঠ কেন দেওয়া হতো? কারণ খুব স্পষ্ট। মানুষ কেবল একটি জীব নয়, সে সৃষ্টির সেরা জীব বলে দাবি করে থাকে। সেরা হতে হলে তার প্রথম দায়িত্বই অন্যকে আঘাত না দেওয়া। তাই কষ্ট দেওয়া উচিত নয় কাউকেই; সে মানুষ হোক, পশুপাখি হোক কিংবা জন্তু-জানোয়ার। শ্রেষ্ঠত্বের মানে কখনোই নিষ্ঠুরতা নয়, বরং সহমর্মিতা।
এই বোধ থেকেই আধুনিক পৃথিবীতে ভাষার রূপ বদলেছে। ইংরেজিতে এখন আর ‘disabled’ বলা হয় না, বলা হয় ‘differently abled’; ‘problem child’ নয়, বলা হয় ‘special child’ বা ‘child with special needs’। শব্দ বদলায়, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলায় এমন বিশ্বাস থেকেই এই ইতিবাচক শব্দচর্চা। ভাষা যে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ক্ষমতারও একটি রূপ—এ কথা সভ্য সমাজ বহু আগেই বুঝে গেছে। আনন্দের ব্যাপার হলো, আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারও তা বুঝেছে।
ঠিক সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের সদাশয় সরকার পশুপাখি ও জন্তু-জানোয়ারদের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক শব্দ ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করেছে। ‘পশু’ নামক একটি বহনযোগ্য অপমানকে সরিয়ে দিয়ে তাদের ‘প্রাণী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই: কাউকে কষ্ট না দেওয়া, অন্তত শব্দ দিয়ে তো নয়ই। কারণ শাসন যতটা আইন দিয়ে হয়, তার চেয়েও বেশি হয় ভাষা দিয়ে।
রাষ্ট্র চালানো যে কতটা কঠিন কাজ, তা বোঝা যায় মূলত তখনই, যখন সরকার মানুষের দুঃখ-কষ্টের বাইরে গিয়ে জন্তু-জানোয়ারের অনুভূতির দিকেও নজর দেয়। আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার ঠিক সেটাই করেছে। গত ১৭ মাসে তারা এমন সব যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অতীতে কেউ ভাবেনি। কেউ কেউ বলেন, সরকার সাহসী। কেউ বলেন, সরকার দূরদর্শী। আবার কেউ কেউ বলেন, বারে বারে দরকার, এমন সদাশয় সরকার। তারা শুধু মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্রকাঠামো নয়, জীবজগৎ নিয়েও গভীর ভাবনা ভাবছেন। এই ভাবনার ফসল হিসেবেই জন্ম নিয়েছে ‘প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ অধ্যাদেশ–২০২৬’। নামটা শুনেই বোঝা যায়, এটা কোনো হালকা আইন নয়। ভারী, দায়িত্বশীল এবং সর্বোপরি ভাষাবান্ধব। এই আইনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, এতে গৃহপালিত বা উপকারী পশুকে আর ‘পশু’ বলা হবে না। এখন থেকে তারা হবে ‘প্রাণী’।
সরকারের যুক্তি অত্যন্ত মানবিক। ‘পশু’ শব্দটি সত্যি শ্রুতিকটু। শুনতে খারাপ লাগে।
শব্দটি উচ্চারণ করলেই যেন একটা অপমান লুকিয়ে থাকে। অতএব, বহু বছরের পুরোনো আইন রহিত করে সেখানে ‘প্রাণী’ শব্দ বসানো হয়েছে। শব্দ বদলালে মন বদলায়, মন বদলালে সমাজ বদলায়—এই তত্ত্বে বিশ্বাস রাখে সরকার।
এমন প্রাণীবান্ধব সরকার কবে কে কোথায় দেখেছে? যে সরকার মানুষের মন জিততে না পারলেও প্রাণীদের মন জয়ের চেষ্টা করে ওই সরকার নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম ও শ্রেষ্ঠ। যে সরকার মানুষের দুঃখ কমাতে না পারলেও অন্তত শব্দের দুঃখ দূর করতে পারে ওই সরকারকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
মনে পড়ছে পুরনো এক রাজার কাহিনি। এই রাজা খুব সাধারণ নন। জনদরদী, মানবতাবাদী রাজা। যিনি জন্তু-জানোয়ারের দুঃখেও বিচলিত হন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, তার রাজত্বে কেউ দুঃখী থাকবে না। মানুষ না, পশু না, পাখি না, জানোয়ার না; কারও কোনো দুঃখ থাকবে না। সবাই শুধু আনন্দ করবে। কেউ কাঁদবে না, কেউ অভিযোগ করবে না, কেউ হাহাকার করবে না। রাজ্য হবে এক বিশাল সুখের কারখানা।
ঘোষণার দিন প্রজারা হাততালি দিল। দরবারে তোষামোদকারীরা বলল, “মহারাজ, ইতিহাসে এমন মানবিক রাজা আর আসেনি।” রাজা খুশি হলেন। কারণ রাজারা সাধারণত প্রশংসা ভালোবাসেন, বাস্তবতা নয়।
কিন্তু সমস্যা শুরু হলো সন্ধ্যার পর থেকে। তখন ছিল শীতকাল। রাত যত গভীর হতে থাকল, রাজপ্রাসাদের জানালা দিয়ে হঠাৎ ভেসে এলো সমবেত কণ্ঠে ‘হুক্কা-হুয়া… হুক্কা-হুয়া…’ শেয়ালের ডাক।
রাজা থমকে গেলেন। তিনি তো ঘোষণা দিয়েছেন, রাজ্যে কেউ দুঃখী থাকবে না! তাহলে এই শেয়ালগুলো চিৎকার করছে কেন? রাতেই তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন।
মন্ত্রী এলেন, মাথা নিচু করে দাঁড়ালেন। রাজা প্রশ্ন করলেন, “শেয়ালগুলো এমন চিৎকার করছে কেন?”
মন্ত্রী জানতেন, রাজাকে সত্য বললে বিপদ। আবার না বুঝিয়ে বললেও বিপদ। তাই তিনি কূটনৈতিক উত্তর দিলেন, “মহারাজ, শীতের কারণে শেয়ালগুলো কষ্ট পাচ্ছে। তাই এমন শব্দ করছে।”
রাজা সঙ্গে সঙ্গে মানবিক হয়ে উঠলেন। “তা হলে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ কর। আমার রাজ্যে কেউ শীতে কাঁপবে না।”
মন্ত্রী মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। মনে মনে ভাবলেন, বনের শেয়ালের শীত নিবারণ করার প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছে বলে তো জানা নাই!
পরদিন রাত। আবার সেই শব্দ ‘হুক্কা-হুয়া… হুক্কা-হুয়া…’
রাজা এবার একটু বিরক্ত। আবার মন্ত্রীর ডাক। “শেয়ালগুলোর শীত নিবারণের ব্যবস্থা কি হয়েছে?”
মন্ত্রী থতমত খেয়ে গেলেন। কী বলবেন? বনের শেয়ালের জন্য কম্বল? গরম কাপড়? হিটার? তবু সাহস করে বললেন, “জ্বি মহারাজ, ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
রাজা প্রশ্ন করলেন, “তাহলে তারা আজও চিৎকার করছে কেন?”
মন্ত্রী এবার বুদ্ধি খাটালেন। “মহারাজ, তারা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।”
রাজা সন্তুষ্ট হলেন। “বাহ! পশুরাও কৃতজ্ঞতা বোঝে!”
তৃতীয় রাত। আবারও সেই ডাক।
এবার রাজা একটু চিন্তিত। আবার মন্ত্রীর তলব। “এরা কতদিন আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে?”
মন্ত্রী নির্ভীক কণ্ঠে উত্তর দিলেন, “যতদিন আপনি জীবিত থাকবেন, মহারাজ! পশুরা কারও উপকার কখনও ভোলে না।”
এই গল্প তাই শুধু শেয়ালের নয়, শুধু পশু বা প্রাণীর নয়। এ গল্প রাষ্ট্রের, ক্ষমতার, শব্দের রাজনীতির। নাম পরিবর্তনের রাজনীতি যখন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার প্রকৃত সদিচ্ছাকে ছাপিয়ে যায়, তখন তা কেবল একটি অন্তঃসারশূন্য সংস্কারে পরিণত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি ও দর্শনে যদি প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি প্রকৃত সহমর্মিতা থাকত, তবে কেবল তাত্ত্বিক বা সংজ্ঞাগত পরিবর্তন নয়, বরং মাঠপর্যায়েও তার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যেত। কিন্তু বিদ্যমান উন্নয়ন মডেলে প্রকৃতিকে এখনো গৌণ হিসেবে বিবেচনা করার চিরাচরিত প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যার প্রকট উদাহরণ হলো এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের অজুহাতে রাজধানীর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত পান্থকুঞ্জ পার্কের বৃক্ষরাজি ও সবুজ ধ্বংস করা। এই ধরনের কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দেয় যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও উন্নয়নের ওই পুরনো ও প্রকৃতি-বিদ্বেষী আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।