Published : 26 Aug 2025, 04:50 PM
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অস্পষ্ট বিভেদ রয়েছে, পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। এই বিভাজন শুধু অবকাঠামো বা টিউশন ফির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, চাকরির বাজার, এমনকি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বিচার করার মনোভাবেও ছড়িয়ে পড়েছে।
অনেকে এখনো বিশ্বাস করেন যে ভালো শিক্ষার্থী মানেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন তাদের ‘ব্যর্থতা’র প্রতীক। কিন্তু এই বিশ্বাস কি আজকের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে? মেধা কি শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একচেটিয়া সম্পদ?
আমাদের দেশে একটি গভীরভাবে প্রোথিত ধারণা রয়েছে যে, শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীরাই দক্ষ ও মেধাবী। এই শিক্ষার্থীরাই দেশের নেতৃত্ব ও অগ্রগতিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে, এমনটাই অনেকের বিশ্বাস। কিন্তু ২০১৮ সালের সড়ক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে আমরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখেছি। এর মধ্য দিয়ে মানুষের মনোভাবে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসার কথা।
এটা অস্বীকার করা যায় না যে, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র, কারণ প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে ভর্তির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, যেখানে আসন সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অনেক সময় বিভিন্ন কারণে কেউ কেউ ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না বা কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু শুধু ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই কি একজন শিক্ষার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণ করা যায়? একেবারেই না।
একজন শিক্ষার্থীর জীবন ও ভবিষ্যৎ শুধু একটি ভর্তি পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে না। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও অনেক মানসম্পন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে, যেখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া, বর্তমানে অনলাইন শিক্ষা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশে কিছু খ্যাতনামা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেমন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, এআইইউবি, ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার মান, পাঠদানের পদ্ধতি ও অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদান করছে।
তবুও, এত উন্নয়নের পরও এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘পাবলিক-প্রাইভেট বৈষম্য’ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। এখনো অনেকের মধ্যে এই ধারণা প্রচলিত যে, কেবল অর্থ থাকলেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা যায়। অথচ এই ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
নিঃসন্দেহে, অতীতে কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে সনদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এটাও স্বীকার করতে হবে যে, কিছু প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো পিছিয়ে রয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকেও দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যেন কেউ এই অভিযোগ আর তুলতে না পারে যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট কেনা যায়।
বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নতুন নির্দেশনা ও তদারকির ফলে অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশাসনিক নীতি ও একাডেমিক পরিবেশ উন্নত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক মানোন্নয়ন লক্ষণীয়। ইউজিসির সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১০০টির বেশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যাদের অনেকেরই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, গবেষণার সুযোগ এবং আধুনিক কারিকুলাম রয়েছে।
খ্যাতনামা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে তা বহন করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেকেই অপেক্ষাকৃত কম খরচের অন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য কম খরচে পড়াশোনার সুযোগ এবং সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা রাখে। সাধারণত ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা প্রতি সেমিস্টারে আংশিক বা পূর্ণ বৃত্তির সুযোগ পায়, যা তাদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করে।
এছাড়া, অনেক শিক্ষার্থী নিজের খরচ নিজে চালাচ্ছেন—কখনো টিউশনি করে, কখনো খণ্ডকালীন চাকরি করে। অনেকে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। কেউ কেউ গ্রামীণ অঞ্চল থেকে এসে ঢাকাকেন্দ্রিক ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ পাননি। আবার অনেক মা-বাবা সন্তানকে সামাজিক বা নিরাপত্তার কারণে ঢাকার বাইরে পাঠাতে চান না। এসব বাস্তবতা সমাজের বিবেচনায় প্রায়ই আসে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়ার পর পারিবারিক বা সামাজিক কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং পরে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে ভর্তি হন। এ ধরনের শিক্ষার্থীদের জীবনসংগ্রাম ও অধ্যবসায়কে সম্মান না করে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের লেবেল দিয়ে তাদের বিচার করা এক প্রকার সামাজিক অবিচার।
প্রশ্নটি এখানে, বৈষম্য নিয়ে। সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দক্ষতায় পিছিয়ে। কিন্তু দক্ষতা কি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দিয়ে পরিমাপ করা যায়? প্রকৃতপক্ষে, দক্ষতা নির্ভর করে শিক্ষার্থীর অধ্যবসায়, আগ্রহ, আত্মোন্নয়নের প্রচেষ্টা এবং পরিশ্রমের ওপর।
বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী নিজেকে দক্ষ করে তুলতে সচেষ্ট। কেউ পেশাগত কোর্স করছেন, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন নিচ্ছেন, সফট স্কিল ও টেকনিক্যাল স্কিল অর্জন করছেন। এই প্রচেষ্টাকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেখে অবজ্ঞা করা কি ন্যায়সঙ্গত?
যদি চাকরির বাজারে শুধু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে কাউকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় না নেওয়া হয় বা আবেদনের সুযোগই না দেওয়া হয়, তাহলে তিনি নিজের দক্ষতা প্রমাণ করবেন কীভাবে? তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা পরিশ্রমের কোনো মূল্যই কি থাকবে না?
এই মানসিকতা শুধু ব্যক্তিগতভাবে বৈষম্য সৃষ্টি করে না, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ, এতে প্রকৃত প্রতিভা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি বাধাগ্রস্ত হয়। দক্ষতা ও মেধার মূল্যায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়, বরং ব্যক্তির কাজ, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।
এছাড়া, অনেক সময় দেখা যায়, কেউ যোগ্যতার ভিত্তিতে ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেলেও, শুধু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ার কারণে তাকে সহকর্মী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অবহেলা, কটূক্তি বা হেয়-প্রতিপন্নতার শিকার হতে হয়। এই ধরনের মানসিক নির্যাতন একজন মেধাবী ও পরিশ্রমী ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস ও ইচ্ছাশক্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
দৃষ্টিভঙ্গি যে একেবারেই বদলাচ্ছে না, তা নয়। তবে তা কতটুকু বদলেছে, ওটাই প্রশ্ন! করপোরেট প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, এমনকি এনজিওগুলো এখন দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, নেতৃত্বগুণ এবং যোগাযোগ দক্ষতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বাস্তব দক্ষতা ও প্রফেশনালিজম দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে এবং প্রমাণ করছে যে, যোগ্যতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড়। কিন্তু তবুও, অনেক চাকরির প্রতিষ্ঠানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয় না।
এই প্রথাগত মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। যারা ডিপ্লোমা বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন, তাদেরও অনেক সময় কটু কথার ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। কিন্তু কার কতটুকু দক্ষতা আছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এই বৈষম্য বেশি লক্ষণীয়। সরকারি চাকরির মতো, সব ক্ষেত্রে সকল প্রার্থীর প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত। সবাইকে পরীক্ষার সমান সুযোগ দিতে হবে। এরপর যোগ্যতার ভিত্তিতে যিনি সফল হবেন, তিনি চাকরি পাবেন, তা তিনি যে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীই হোন; তা প্রাইভেট, পাবলিক বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হোক।
সময় এসেছে প্রতিষ্ঠান-নির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত অগ্রগতিকে গুরুত্ব দেওয়ার। এজন্য শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজে দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। নিয়োগকর্তাদের আরও সচেতন হতে হবে, এবং শিক্ষার্থীদেরও নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতা গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকেও তাদের মানোন্নয়নে সচেতন হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
এর মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য কমবে এবং যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত যোগ্য শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে, শিক্ষার্থীদের উচিত নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়া—বিশেষ করে প্রশিক্ষণ, সফট স্কিল, ইন্টার্নশিপ এবং বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা অর্জনে গুরুত্ব দেওয়া। তাহলেই বৈষম্য দূর হবে, এবং যোগ্য মানুষ যথাযোগ্য সম্মান পাবে।