Published : 19 Apr 2026, 04:18 PM
কামানের মতোই ক্যালেন্ডারও প্রতিটা সংঘাতের ভাগ্য নির্ধারণ করে। উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে চলা মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধও এর ব্যতিক্রম নয়। মূল ফ্রন্টের বাইরে প্রতিটি মুখ্য চরিত্র যেন সময়ের সঙ্গেই লড়ছে, তবে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা, পৃথক ও কখনো প্রাণঘাতী সময়সূচির মুখোমুখি হয়ে।
ওয়াশিংটন: মধ্যবর্তী নির্বাচনি ঘড়ি
যুদ্ধের পথ ছেড়ে সমঝোতা কৌশলকে অগ্রাধিকারের ওয়াদা নিয়ে, রকেটগতির কূটনীতি দর্শন সামনে রেখে, ডনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে পুনর্বার হোয়াইট হাউসে বসেন। তিনি উইটকফকে ৬০ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে ওমানে পাঠান। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি শাণিত ও নিশ্চিত অভিঘাত ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে। এই চোরাবালিতে তাকে উসকেছিল মোসাদ ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যা আদতে ঘটেনি।
দ্রুত ইরান জয় তত্ত্ব বাস্তবে রূপ পেতে ব্যর্থ হয়, যুদ্ধের পাশা ইরানের দিকে হেলে যায়, আর আমেরিকা নিজেকে হারের পিঁড়িতে খুঁজে পায়। জন মিয়ারশাইমার স্পষ্ট ছিলেন: “ট্রাম্প সাংঘাতিক ভুল করতে মরিয়া হয়ে উঠছিল।”
মূল সমস্যাটা আসলে কাঠামোগত। হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরান বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এক ধরনের শক্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষার নিয়মিত ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম হয়। এ কারণে পরিস্থিতি এমন দিকে গড়ায়, যেখানে মার্কিনিদের যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সোজা পথ খোলা থাকে না।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষতি ইতিমধ্যেই গুরুতর। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন যেখানে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৬৭ ডলার, এখন তা ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মার্চে মুদ্রাস্ফীতি বার্ষিক ৩.৩ শতাংশ হারে বেড়েছে; গ্যাসোলিনের দাম ২১.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর ভোক্তা মূল্য সূচকের মাসিক বৃদ্ধির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এসেছে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে। অর্থনীতিতে ডনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নেমে এসেছে সর্বকালের সর্বনিম্ন ২৯ শতাংশে; এমনকি ৪০ শতাংশ রিপাবলিকানও মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় তার ভূমিকাকে সমর্থন করেন না।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের সাত মাস আগে প্রেসিডেন্ট এখন অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বন্দি। সর্বনিম্ন জনপ্রিয়তা এবং একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধ, দুইয়ের মুখোমুখি। সংঘাত দ্রুত শেষ হলেও ভোটারদের হৃদয়ে জমে থাকা পেট্রোল পাম্পের ভোগান্তি নির্বাচনের মাঠে প্রভাব ফেলবে। পরিস্থিতি আরও জটিল লাগে, যখন দেখি কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা অতি সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে লড়াই করছে।
নির্মম পরিহাস হলো, যিনি দ্রব্যমূল্য কমাবেন বলে কথা দিয়েছিলেন, তিনি নিজেই একটি প্রজন্মের ওপর সবচেয়ে বড় জ্বালানি অভিঘাত ফেললেন। এক রিপাবলিকান কৌশলবিদ সতর্ক করে বলছেন, “এসব জিনিসই তো জো বাইডেনকে ডুবিয়েছিল, আর এখন ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ডুবাতে হুমকি সৃষ্টি করছে।”
তেহরান: যুদ্ধ দীর্ঘ করা
ইরানের হিসাব সমভাবে সময় সংবেদনশীল কিন্তু বিপরীতমুখী। যেখানে ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে দ্রুত বের হওয়া দরকার, সেখানে তেহরানের টিকে থাকার কৌশল সহনশীলতার ওপর নির্ভর করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেখানে ইরান অপূরণীয় ক্ষতির শিকার: শীর্ষ নেতা আলি খামেনি এবং জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতাদের মৃত্যু, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিঘাত। এরপরেও শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেনি।
জন মিয়ারশাইমার যুক্তি দিয়েছিলেন, ইরানের বিশাল ভূখণ্ড এবং ছড়ানো সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত হামলার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে দুর্বল করা কঠিন; এমনকি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানও এর সক্ষমতা ভেঙে দিতে পারবে না। ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক মিলিয়ে ইরানের তাৎপর্যবাহী প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে, যা তাকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চালিয়ে যেতে সুযোগ দেয়।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ এবং এই যুদ্ধের কট্টর সমালোচক জেফরি স্যাক্স বলেছিলেন, এই সংঘাত শুরু থেকেই কৌশলগতভাবে মূর্খতাপূর্ণ। তার মতে, ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার জন্য “পূর্বের বিদ্যমান চুক্তিটি ছিঁড়ে ফেলেন।” এরপর দীর্ঘদিন ধরে, পারমাণবিক অস্ত্রকে ইসলাম বিরোধী হিসাবে ঘোষণাকারী ইরানি ধর্মীয় নেতাকে হত্যা করেন এবং এমনভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, যা এখন আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
ইরান বুকে পাথর চাপা দিয়ে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করবে, অসহ্য কষ্ট হলেও হাল ছাড়বে না। কৌশলটা সোজা, দীর্ঘ সময় ধরে শাস্তি শুষে নিয়ে ওয়াশিংটনের ঘড়ির সময় ফুরিয়ে ফেলা। যদি তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১৫০ ডলারে পৌঁছায়, তাহলে জ্বালানির বাড়তি খরচ বড় চাপ তৈরি করবে। এতে ডনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ সমর্থন ভেঙে পড়তে পারে, তার চুক্তি করার সক্ষমতাও ক্ষয়ে যেতে পারে।
তাই জেফরি স্যাক্স সতর্ক করেছিলেন, হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিকভাবে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল এবং ৩০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করে। দীর্ঘ সময়ের জন্য এই প্রণালি বন্ধ থাকলে তা অপ্রত্যাশিত অভিঘাত তৈরি করবে।
তেল আবিব: এক অন্তহীন যুদ্ধ
ইসরায়েলের অস্থায়ী স্বার্থ ওয়াশিংটনের স্বার্থেরই প্রতিনিধি। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য সামনের কয়েক মাসে আইনি জটিলতা ও নির্বাচনি চাপ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে, তিনি অবিরাম যুদ্ধ করে লাভের গুড় নিজের ঘরে তুলবেন। এজন্য তার কাছে যুদ্ধ করা অর্থ সমালোচনাকে কোণঠাসা করা, ভোটারদের একই পতাকার নিচে একত্র করা এবং লোভনীয় হচ্ছে, লেবাননসহ আশপাশের অঞ্চলে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করা। এ কারণেই মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও নেতানিয়াহুর দপ্তর স্পষ্ট করে জানায়, এই যুদ্ধবিরতিতে “লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।”
হারেৎজ পত্রিকার অভিজ্ঞ কলামনিস্ট এবং ইসরায়েলি রাজনীতির কট্টর সমালোচক গিডিয়ন লেভি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে, সামরিকবাদ নেতানিয়াহুর শুধু রাজনৈতিক অস্ত্র নয়, এই পথই তার বিশ্ববীক্ষা। লেভি, ক্রিস হেজেসকে বলেন, “যুদ্ধ সবসময়ই ইসরায়েলের প্রথম পছন্দ, শেষ নয়” এবং তিনি ইসরায়েলের এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা তুলে ধরেন যা কূটনীতিকে উপেক্ষা করে ধারাবাহিকভাবে সামরিক সমাধানের পথ বেছে নেয়।
গিডিয়ন লেভি দেখেন, ইসরাইলের ভেতরে “এই যুদ্ধ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ করা বা প্রশ্ন তোলার সুযোগ নাই।” জরিপগুলো দেখায় ইহুদি সমাজ যুদ্ধকে প্রবলভাবে সমর্থন করে, যা ইঙ্গিত করে “ইসরায়েল যুদ্ধজ্বরে আচ্ছন্ন একটি রাষ্ট্র।”
নেতানিয়াহুর দীর্ঘমেয়াদী কৌশল সম্পর্কে সাবেক ইসরায়েলি শান্তিস্থাপক ড্যানিয়েল লেভির মূল্যায়ন হলো, আঞ্চলিক আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রসারে এক কদম করে পা বাড়ানো। ‘ব্যবহার করো, নইলে হারাবে’, এই যুক্তিতে তিনি এগিয়ে চলছেন। মার্কিন পতন ত্বরান্বিত হোক কিংবা ঐতিহ্যবাহী সমর্থনের ভিত্তি নষ্ট হোক, নেতানিয়াহু সামরিক কর্তৃত্ব রক্ষায় পিছপা হবেন না।
তিনটি ঘড়ি, তিন দিকে টিকটিক করছে
এই সংঘাতকে যা সর্বনাশী করে তুলছে, তা হলো তিনটি দেশ একে অপরের সাংঘর্ষিক সময়সূচির মধ্যে জড়িয়ে গেছে। ডনাল্ড ট্রাম্পের দরকার নভেম্বরের আগেই যুদ্ধের সমাধান টানা; ইরানের করণীয় ট্রাম্পকে নভেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধে আটকে রাখা। আর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চান যতদিন সম্ভব যুদ্ধ চলুক অথবা লেবাননের মানচিত্র বদলে দেওয়া পর্যন্ত টেনে নেয়া হোক। যাতে হিজবুল্লাকে একবারে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা যায় এবং সামনে জাতীয় নির্বাচনে দেশ রক্ষার ধুয়া তুলে রাজনৈতিক পথ সুগম করা যায়।
যুদ্ধের ফলাফল চুলচেরা পরীক্ষা করে মিয়ারশাইমার দরাজ কণ্ঠে বলেন, শুরুর আক্রমণে টিকে থাকা, শাসনব্যবস্থার পতন এড়ানো এবং ওয়াশিংটনকে রাস্তা মাপতে বাধ্য করার মতো পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি ধরে রেখে ইরানই যুদ্ধে জিতেছে। তার দাবি, চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতেও এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যাবে। জেফরি স্যাক্স আরও এক কদম এগিয়ে বলেন, ট্রাম্প জনসম্মুখে দাবি করছিলেন ইরান যুদ্ধবিরতিতে মরিয়া অথচ বাস্তবে হোয়াইট হাউসকেই যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য কাছা খুলতে দেখা গেছে।
শেষ পর্যন্ত, ইরান যুদ্ধে সময় নিজেই হয়তো মস্তবড় এক শত্রু; যাকে বোমা মেরে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আটকে রাখা যায় না অথবা যাকে প্রতারিত করা অতটা সহজ নয়। নতুন ভোর তারাই আনবে, যারা এই সত্য হারে হারে অনুভব করবে এবং যার কাছে যেকোনো পরিণতি সহ্য করার রাজনৈতিক পুঁজি আছে। এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, ওয়াশিংটনই একমাত্র রাজধানী, যার ঘড়ির সময় ফুরিয়ে আসছে।
লেখাটি আল-জাজিরা থেকে অনূদিত; এর লেখক জসিম আল আজ্জাভি প্রখ্যাত ইরাকি সাংবাদিক এবং জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, যিনি বিশেষ করে আল জাজিরা এবং আবু ধাবি টিভিতে কাজের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর গভীর বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। আল জাজিরা ইংলিশের অন্যতম জনপ্রিয় শো ‘ইনসাইড ইরাক’ সঞ্চালনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। স্পষ্টভাষী এবং নিরপেক্ষ উপস্থাপনার জন্য পরিচিত আজ্জাভি মূলত জটিল ভূ-রাজনীতিকে সহজভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।