Published : 21 Sep 2025, 08:32 PM
গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে তথ্যের যথার্থতার ওপর। পরিকল্পিতভাবে ভ্রান্ত তথ্য ও প্রতারণাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা বাংলাদেশের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যখন দেশটি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভোটারদের বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি, এই ধরনের মিথ্যা প্রচার যা দেশে সাধারণত ‘গুজব’ নামে পরিচিত–স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ণ করে, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় জনআস্থাকে নষ্ট করে। ইতিহাস সাক্ষী যে, এটি বাস্তবে বিশৃঙ্খলা, ঘৃণাজনিত অপরাধ ও হত্যার পথও খুলে দিতে পারে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির আগে যদি আমরা তথ্যমাধ্যমকে সুরক্ষিত না করি, তাহলে আবারও ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের ঝুঁকি থাকবে। দেশের দীর্ঘদিনের দলীয় বিভাজন আর নির্বাচনি সুষ্ঠুতা নিয়ে যে উদ্বেগ আছে, সেটাও বাড়বে। তাই আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই শক্তিশালী ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, যাতে ভুয়া তথ্যের ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায়।
বাংলাদেশে তথ্য বিকৃতির ধারা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণ থেকে, যেখানে বিরোধী দল ভোট কারচুপির আশঙ্কার মুখোমুখি হয় ক্ষমতায় থাকা দলের ক্ষমতা ধরে রাখার তাড়নার কারণে, যা অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। বিগত দিনে দেখেছি এই দ্বন্দ্বের কারণে উভয় প্রধান দলই নিজেদের অবস্থান রক্ষায় ও প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্রমণ করতে ভুয়া খবর প্রচারে সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে, সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসার আগেও দেখা গেছে।
২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচন, যে নির্বাচনে প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, অংশ নিয়েছিল, সে নির্বাচন দেখিয়েছে কিভাবে বিদ্যমান গণমাধ্যম কাঠামো রাজনৈতিক মত তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় সব পর্যালোচিত সংবাদমাধ্যমে ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর পক্ষে বয়ান ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং শাসক জোটের প্রতি কথ্য ও কৌশলগত পক্ষপাত লক্ষ্য করা গেছে তাদের। যখন মানুষ মূলধারার সংবাদকে কলুষিত মনে করে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই কম নির্ভরযোগ্য উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ওই নির্বাচনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া স্ক্রিনশট ও রাজনৈতিক নেতাদের নকল প্রোফাইলসহ বিভিন্ন প্রাথমিক কৌশল ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে দেশের ১২তম জাতীয় নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছিল। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে যেখানে ৩২টি ঘটনা চিহ্নিত হয়েছিল, সেপ্টেম্বর নাগাদ তা বেড়ে অন্তত ৮৪টিতে দাঁড়ায়, যা তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব রিপোর্ট করেছে। জানুয়ারি ২০২৪-এ, নির্বাচনের মাসে, সব ভ্রান্ত তথ্যের মধ্যে ৪৮ শতাংশ ছিল রাজনৈতিক। সাধারণ ছবির বিকৃতি থেকে শুরু করে জটিল ডিজিটাল জালিয়াতি পর্যন্ত ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। নির্বাচনের সময় অন্তত দুটি ডিপফেক ভিডিওও প্রচারিত হয়েছিল, যেখানে নারীদের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ভুয়া তথ্য দেখানো হয়েছিল। যা নির্বাচনিপরিবেশে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।
নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকেরা বলেছিলেন যে নির্বাচন গণতান্ত্রিক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, যেখানে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ভোট কারচুপির আশঙ্কায় অংশ নেয়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, নির্বাচন ছিল ‘একপেশে এবং প্রতিযোগিতার ছদ্মবেশে সাজানো’, যা সুষ্ঠুতা ও অংশগ্রহণের শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়ে সরাসরি গণতন্ত্রকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।
এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং তথ্য প্রচারের প্রায় ৭০ শতাংশ এখান থেকেই ছড়ানো হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হলো ফেইসবুক। এসব প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার গুরুতর নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে, যেমন প্রোপাগান্ডা, ভুয়া খবর ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, যা দ্রুত জনরোষ ও সহিংসতা ডেকে আনে।
দলীয় সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও এই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজনৈতিক ভ্রান্ত তথ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রায়ই দেখা যায়, তবে তা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কিভাবে প্রকাশিত হয় তা প্রায়শই নির্ভর করে সংবাদমাধ্যম মালিকের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কিছু সংবাদমাধ্যমের এমন খ্যাতি আছে যে, তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ভ্রান্ত তথ্য প্রচার করে থাকে।
বিদেশি প্রভাব ও সংশ্লিষ্টতার বাড়তি ভূমিকা ২০২৬ সালের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ডিসমিসল্যাবের ২০২৪ সালের তথ্য যাচাই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভুয়া তথ্যের শিরোনামে সবচেয়ে বেশি উঠে আসে ভারতের নাম। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা কিংবা বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে এমন অতিরঞ্জিত ও ভ্রান্ত তথ্য ছড়িয়েছে কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী, বিশেষত ৫ অগাস্টের পরিবর্তনের সময়। একইভাবে, ১২তম নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র নিয়েও ষড়যন্ত্র ছড়ানো হয়েছিল—যেমন সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত নিয়েও সেনা টহল ও অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে গুজব ছড়ায়। এই বহুপাক্ষিক বিদেশি ফ্যাক্টর ২০২৬ সালের তথ্য পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ভ্রান্ত তথ্য ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যেমন বাংলাদেশ পুলিশ ও সরকারি সংস্থা সাইবার নজরদারি চালায়। তবে সরকার প্রায়শই ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) ব্যবহার করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়। সাধারণত ভ্রান্ত তথ্যকে বিচার করা হয় তার সম্ভাব্য ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে, যেমন অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, বা শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ, ঘৃণা বা শত্রুতা উসকে দেওয়া। তবে এর প্রভাবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে: সংজ্ঞার অস্পষ্টতা। যেহেতু ভ্রান্ত তথ্যের কোনও সুনির্দিষ্ট আইনগত সংজ্ঞা নেই, তাই কনটেন্টকে এই রকম তথ্য হিসেবে চিহ্নিত করা প্রায়ই ব্যক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা ও মতামতের ওপর নির্ভর করে, যা স্বাধীনতা ও সেন্সরশিপ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে।
তথ্য যাচাইকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক অনীহাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমস্যা। কিছু সাংবাদিকের মতে, অনলাইনে পাওয়া কনটেন্ট যাচাই করা তাদের কাজের অংশ নয় এবং এটি তাদের সামর্থ্যের বাইরে। তবে জনসাধারণ দৃঢ়ভাবে চায় সংবাদমাধ্যম এই তথ্য যাচাই করুক। ছোট স্বেচ্ছাসেবী তথ্য যাচাই সংস্থাগুলোও যথেষ্ট সমর্থন পান না, ফলে এই চাহিদা পূরণে তারা ব্যর্থ। এই পেশাগত ফাঁক প্রতিদিনই ভুয়া তথ্য ছড়ানোর উদ্যোগীদের জন্য মারাত্মক সুযোগ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত দৃঢ়তা এবং সাংবাদিকদের সংহতি, বিশেষ করে যখন রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক কৌশলী প্রতারণার মুখোমুখি হতে হয় যেমনটি রাশিয়া-ইউক্রেইন সংকটে দেখা গেছে। এই সেরা চর্চাগুলো সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও স্বচ্ছতা বাংলাদেশেও কার্যকর করা জরুরি।
২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে আমাদের শুধু প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা নয়, প্রোঅ্যাকটিভ কাঠামোগত সংস্কারও চালু করতে হবে, যা গণতন্ত্রকে ডিজিটাল হামলা থেকে রক্ষা করবে। বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবেলায় তথ্য যাচাইকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাই তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। সাংবাদিকদের দৈনন্দিন পেশাগত কাজেরও একটি অংশ হিসেবে তথ্য যাচাই সংযুক্ত করা প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যম সচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য, কারণ সমাজের বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সরকারি উদ্যোগ যেমন 'আসল চিনি' (Know the Real) প্রচারণা এবং বেসরকারি উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলো সম্প্রসারিত করে সমালোচনামূলক চিন্তা উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে, সরকারকে ডিএসএ-এর মতো আইনি কাঠামো সংশোধন করে ভ্রান্ত তথ্য স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনকে খোলামেলা যোগাযোগের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সক্রিয় সহযোগিতা করতে হবে, যাতে সময়মতো যাচাই করা তথ্য পৌঁছে দেওয়া যায়।
২০২৬ সালের নির্বাচন দিকে এগোতে গিয়ে ভুয়া তথ্যের বিস্তার আমাদের জনপরিসরকে দুর্বল ও বিভক্ত করতে পারে। এই হুমকি কেবল তাত্ত্বিক নয়; পূর্ববর্তী নির্বাচনের ব্যর্থতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং জনআস্থার পতনই এর প্রমাণ। তাই আমরা নীতিনির্ধারকদের আহ্বান জানাই, যাতে আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে যাচাইয়ের জন্য উন্মুক্ত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। সংবাদমাধ্যমের মালিক এবং সাংবাদিকদের অনুরোধ, যাচাইয়ের গুরুত্ব বোঝার জন্য এবং এটিকে তাদের পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করার জন্য, কারণ এটি শুধু সাংবাদিকতার নয়, গণতন্ত্রের সুরক্ষাও নিশ্চিত করে। নাগরিকদেরও আহ্বান, সমালোচনামূলকভাবে সতর্ক থাকার জন্য। কেবল তখনই বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারবে যে ২০২৬ সালের নির্বাচন প্রতিফলিত করবে জনমতের সঠিক প্রতিচ্ছবি, মিথ্যা বয়ানের নয়।