মণিপুরে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে
গত মে মাস থেকে সহিংসতায় অন্তত ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে; ঘরছাড়া হয়েছে হাজার হাজার মানুষ।
জাতিগত সহিংসতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরকে এতটাই বিপর্যস্ত করে তুলেছে যে অনেকে এ পরিস্থিতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই ও সংখ্যালঘু কুকিদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
বিবিসি লিখেছে, সম্প্রতি কুকি সম্প্রদায়ের দুই নারীকে বিবস্ত্র করে রাস্তায় হাঁটানোর ঘটনা নারীদের ‘যুদ্ধের অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের সর্বশেষ উদাহরণ।
দুই মাস আগের ওই ঘটনার ভিডিও চলতি সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে ভারতে।
ওই ভিডিও যখন ধারণ করা হয়েছিল, মণিপুরে জাতিগত সহিংসতা তখন চরম পর্যায়ে ছিল। সহিংসতার শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে সেখানে। হাজার হাজার মানুষ হয়েছে বাস্তুচ্যুত।
কুকিদের হাতে এক মেইতেই নারীর ধর্ষণের শিকার হওয়ার ‘মিথ্যা’ খবর ছড়িয়ে পড়লে এ রাজ্যে সহিংসতা শুরু হয়। সেই সহিংসতা চলাকালে দুই নারীকে বিবস্ত্র করে রাস্তায় হাঁটানো হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সহিংসতা কবলিত রাজ্যটিতে সফর না করায় এবং এখন পর্যন্ত শক্ত কোনো মন্তব্য না করায় দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অনেকদিন ধরেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর সমালোচনা করে আসছেন।
দুই নারীকে বিবস্ত্র করে রাস্তায় হাঁটানোর ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর অবশ্য মোদী বলেছেন, ওই ঘটনা ভারতকে ‘লজ্জিত করেছে’।
কেন সহিংসতা?
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য রাজ্যটি বাংলাদেশের পূর্বে মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত। সেখানে আনুমানিক ৩৩ লাখ মানুষের বসবাস, যাদের অর্ধেকের বেশি মেইতেই সম্প্রদায়ের।
এর বাইরে ৪৩ শতাংশ কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মানুষের বাস, যারা রাজ্যটির প্রধান সংখ্যালঘু উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত।
মণিপুরে গত মে মাসে শুরু হওয়া সহিংসতায় কমপক্ষে ১৩০ জন নিহত এবং ৪০০ জন আহত হয়েছেন। সহিংসতা ঠেকাতে সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী ও পুলিশ তৎপরতা শুরু করলে ৬০ হাজারের বেশি মানুষকে ঘর ছাড়তে হয়েছে।
পুলিশের অস্ত্রাগার লুট করাসহ শতাধিক গির্জা এবং এক ডজনের বেশি মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে এই সময়ে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক গ্রাম।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইরা মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু সম্প্রদায়ের। মণিপুরে মেইতেইদের ‘শিডিউলড ট্রাইব’ (তফসিলি জাতিগোষ্ঠী) হিসেবে গণ্য হয় না। সে কারণে সরকারি চাকরি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থায় কোটা সুবিধার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হয়ে আসছে বলে মেইতেইদের অভিযোগ।
গত কয়েক বছর ধরে মেইতেইরা ভারতে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে লড়াই করছে। তবে তাদেরকে ‘শিডিউলড ট্রাইব’ এর স্বীকৃতি দিলে অন্য সংখ্যালঘু আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য ওই রাজ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে- এই আশঙ্কা থেকে মেইতেইদের ওই স্বীকৃতির বিরোধিতা করছে রাজ্যের অন্য আদিবাসী সংখ্যালঘুরা, যাদের একটি বড় অংশ ধর্মীয়ভাবে খ্রিস্টান।
কুকি সম্প্রদায় বলছে, মেইতেই নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার নামে তাদের সম্প্রদায়কে উপড়ে ফেলার নীল নকশা তৈরি করছে। সেজন্যই তারা মেইতেই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়তে বাধ্য হচ্ছে।
‘চতুর্মুখী যুদ্ধ’
বিবিসি জানায়, নিজেদের জমি ও বসবাসের অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে মেইতেই, কুকি ও নাগা এই তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলছে। আলাদা রাজ্যের দাবিসহ ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে এই তিন সম্প্রদায়ই আবার ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। তবে সাম্প্রতিক বিরোধ মূলত কুকি ও মেইতেইদের মধ্যে।
ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলে যে সাতটি রাজ্য ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত, তার একটি মণিপুর। এর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মেইতেইরা মণিপুর, মিয়ানমার ও আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করে আসছেন। তাদের বড় অংশ হিন্দু, কেউ কেউ সানামাহি ধর্ম অনুসরণ করেন।
আর কুকিদের বেশিরভাগ খ্রিস্টান, যারা ভারতের উত্তর-পূর্বে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মণিপুরের অনেকেই তাদেরকে মিয়ানমারের অভিবাসী মনে করে।
মেইতেইরা রাজ্যের রাজধানী ইম্ফল উপত্যকায় বসবাস করে। আর কুকিরা আশেপাশের পাহাড় ও এর বাইরে বসবাস করে।
দ্য ফ্রন্টিয়ার মণিপুর পত্রিকার সম্পাদক ধীরেন এ সাদোকপাম বলেছেন, এবারের সংঘাতের মূলে ধর্ম নয়, জাতিগত দ্বন্দ্ব থেকে এই লড়াই।
নারীদের উপর সহিংসতা কেন?
দিল্লিতে বিবিসির গীতা পাণ্ডে বলেন, দুই নারীকে বিবস্ত্র করে রাস্তায় হাঁটানোর ভিডিওটি মূলত নারীদেরকে ‘ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মাধ্যমে যুদ্ধের অস্ত্র’ বানানোর সবশেষ উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম বলছে, গত মে মাসে এক মেইতেই নারীকে কুকি মিলিশিয়ারা ধর্ষণ করেছে বলে একটি ‘মিথ্যা’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি জাতিগত সহিংসতার রূপ নেয়।
ভারতের দ্য প্রিন্ট লিখেছে, দুই নারীকে বিবস্ত্র করার ঘটনা কুকি উপজাতি নারীদের ওপর মেইতেই সম্প্রদায়ের ‘প্রতিশোধমূলক সহিংসতার’ চিত্রটি উন্মোচন করেছে।
সরকারের অবস্থান
ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিই মণিপুরের ক্ষমতায় রয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং একজন মেইতেই।
জনসংখ্যার দিক দিয়ে মেইতেইরা রাজ্যের ৫৩ শতাংশ হলেও তারা রাজ্যর বিধানসভার ৬০টি আসনের মধ্যে ৪০টি দখল করে আছে। ফলে ওই অঞ্চলে ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রভাব থাকলেও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মণিপুরের সহিংসতা নিয়ে নীরব ছিলেন। এ নিয়ে বিরোধীদলের সমালোচনাতেও পড়তে হয়েছে তাকে।
তবে ওই ঘটনার পর তিনি বলেছেন, ঘটনাটি ‘ভারতকে লজ্জিত করেছে’ এবং দোষী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মণিপুরের মেয়েদের সঙ্গে যা হয়েছে, তা কখনোই ক্ষমা করা যাবে না।
তবে মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সাম্প্রতিক জাতিগত সহিংসতার জন্য কুকিদের দোষ দিয়েছেন।
তিনি মনে করেন, কুকিরা বিদ্রোহীদের সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে।
আর কুকিরা বলছে, হেরোইন ব্যবসার জন্য পপি চাষের বিরুদ্ধে বীরেন সিংয়ের সাম্প্রতিক যুদ্ধ মূলত তাদের লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে।
