স্তন-জরায়ু ক্যান্সার: শতমুখে হাসি ফোটাতে চলছে মাধবীর সাইকেল
স্তন ও জরায়ুমুখ সংক্রমণ ও ক্যান্সারে ভোগা প্রায় ৪০০ নারীকে চিকিৎসা সেবার আওতায় আনার ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন মাধবী।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা শ্রমিক লক্ষ্মী বৈদ্যের স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ে ২০১৯ সালে। স্তন অপসারণের পর শুরু হয় কেমোথেরাপি। ধাপে ধাপে আটটি কেমোথেরাপি আর রেডিওথেরাপির ধকল সামলে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি।
চিকিৎসার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় মাথার চুল ঝরে গেছে, চেহারায় এসেছে পরিবর্তন; তবু লক্ষ্মীর মুখে হাসি ফোটে ক্যান্সার জয়ের আনন্দে।
লক্ষ্মীর মত স্তন ও জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার সাবিনা ইয়াসমিন মাধবী। ২০১৭ সাল থেকে সাইকেলে চড়ে সারাদেশ ঘুরে দেখার পাশাপাশি প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের কাছে ক্যান্সার সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি।
২৭ বছর বয়সী মাধবী পেশায় একজন উদ্যোক্তা; ‘মাধবী মার্ট’ নামে একটি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান চালান তিনি। ক্যান্সার আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা সেবার আওতায় আনা থেকে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তাদের পাশে থাকার ব্রত নিয়েছেন এ তরুণী।
শুরুটা কীভাবে হল?
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মাধবী বলেন, ”যেহেতু নকশি কাঁথা নিয়ে কাজ করছি, কোন অঞ্চলে কী ধরনের নকশি কাঁথা সেলাই হয়, কারা কাজগুলো করে, এসব দেখার ইচ্ছে ছিল। তাই সারাদেশ সাইকেলে করে ঘোরা শুরু করলাম।
“তখন ভাবলাম, যেহেতু সাইকেল চালানো শুরুই করেছি, একদম প্রান্তিক পর্যায়ে যাব। এমন কিছু করব, যাতে আমার দ্বারা আরো মানুষ উপকৃত হবে।”
কিন্তু কীভাবে? মাধবী ভেবে দেখলেন, বাংলাদেশে নারীরা স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে অনেক পিছিয়ে আছে; বিশেষ করে ক্যান্সারের মত রোগের ক্ষেত্রে। আর সেটা যদি স্তন বা জরায়ু ক্যান্সার হয়, তাহলে অনেকেই তা প্রকাশ করেন না, অথবা রোগ চিহ্নিতই হয় না।
”গ্রামের নারীরা পড়াশোনা কম জানেন, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও তেমন ভালো না। কোনো নারী ক্যান্সার আক্রান্ত হলেও নিজে নিজে চিকিৎসা করা, কোথায় চিকিৎসা হবে, কে চিকিৎসা করাবে, কোথায় গেলে সঠিক চিকিৎসা পাবে এসব জানেন না। আমার তাই মনে হয়েছে, ক্যান্সার নিয়ে কাজ করব।”
স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি এবং পোশাক কারখানায় গিয়ে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সারের উপসর্গ নিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ শুরু করেন মাধবী। এরপর অনেক নারীর ফোন পেতে শুরু করেন।
“আমি যাদের সচেতন করে আসছি, সেই ছাত্রীরা ফোন করে। তাদের মায়েরাও ফোন করেন। অনেকে বলেন- ‘আপা, আমার স্তনে চাকা অনুভূতি হচ্ছে। প্রচণ্ড রকমের ব্যথা হয়।’ মানে স্তন ক্যান্সারের লক্ষণগুলো উনারা আমাকে বলা শুরু করলেন।”
আর তখন মাধবীর উপলব্ধি হয়, শুধু সচেতন করলে তো হবে না, যাদের উপসর্গ আছে, তাদের চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতন করতে মাধবীর সাইকেলযাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রাম থেকে। সেখানেই ২০১৭ সালে প্রথম রোগীকে পান। পঞ্চাশোর্ধ্ব ওই নারী কর্মীকে সেসময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে তার কোর বায়োপসি করানো হলে ‘ম্যালিগন্যান্ট টিউমার’ ধরা পড়ে। ডাক্তার জানান, ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে সেই পোশাক কর্মীর।
গল্পে গল্পে মাধবী বলেন, “ওই নারীর স্তন অপসারণ করানো হয়। কিন্তু ক্যান্সার যেহেতু স্তনের আশেপাশেও ছড়িয়ে গিয়েছিল, তাই তাকে কোমোথেরাপি দেওয়া হয়। রেডিওথেরাপিও দেওয়া হয় একই হাসপাতালে।
“উনি এখনও বেঁচে আছেন; সুস্থ আছেন। তিন মাস পর পর নিয়মিত মেডিকেল ফলোআপ চালিয়ে যাচ্ছেন।”
সাবিনা ইয়াসমিন মাধবী কি শুধু নারীর চিকিৎসা সেবা নিয়ে কাজ করছেন?
উত্তরে তিনি বললেন, “২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আমি ৪০০ নারীকে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছি। তারা আমার মাধ্যমে চিকিৎসার আওতায় এসেছে। আমি শুধু নারীকে নিয়ে কাজ করি, অধিকাংশই নারী।
”অল্প কয়েকজন পুরুষ রোগী আছেন, তারা দেখা যায় ওই নারী রোগীর পরিবারের সদস্য। কিংবা আমার নিজের আত্মীয় হয়ত এলাকা থেকে আসেন। তখন তো আমি আর বলতে পারি না যে, আমি পুরুষ রোগীদের চিকিৎসা করাই না। তবে নারীস্বাস্থ্য নিয়েই আমি খুব বেশি সিরিয়াস।”
কোন রোগীর কবে কোন চিকিৎসা, পরীক্ষা বা ডাক্তার দেখানোর তারিখ, তাও তাদের ফোন করে তাগাদা দিয়ে রাখেন মাধবী। এ কাজে নিজের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সহযোগিতাও পান।
পাশাপাশি ঢাকায় নিজের বাসায় অনেক রোগীকে থাকতে দেন। শ্রীমঙ্গলের লক্ষ্মী বৈদ্য, যশোরের আয়েশা কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির দিনগুলোতে মাধবীর ঢাকায় বাসায় এসে থাকতেন।
মাধবী বলেন,”আমি দেখলাম, রোগীগুলো যে ঢাকায় আসবে, সে টাকাও তাদের নেই। যাওয়া আসার ভাড়া, একটা ওষুধ কেনা, খাওয়া-দাওয়া, ঢাকায় এসে থাকা একেবারেই সম্ভব না। আবার তাদের পরিবারও তাদের সাপোর্ট করত না। মানে অবহেলা। ডাক্তারকে স্তন দেখানো একটা লজ্জার ব্যাপার। কারো কারো সামর্থ্য থাকলেও পরিবার মানসিকভাবে সহায়তা করত না।
“.এমন ক্ষেত্রে টাকা পাঠিয়ে দিই। ঢাকায় এসে চিকিৎসা নিয়ে তাদের আবার বাড়ি পাঠানোর টিকেট করে দিই।“
রোগীদের চিকিৎসা সেবার এই ব্যয়ভার কীভাবে সামলাচ্ছেন সাবিনা ইয়াসমিন মাধবী?
তিনি বললেন, লক্ষ্মী বৈদ্যর চিকিৎসা সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে করা হয়েছিল। তাতে অনেক টাকার দরকার হয়।
“অনেক পরিচিত মানুষ আছেন, যারা দেশের বাইরে থাকেন। আমি তাদের সহায়তায় লক্ষ্মীর চিকিৎসার জন্য ফান্ড সংগ্রহ করেছিলাম। সেটা দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে নিয়েছিলাম।”
সরকারি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি নিতে পারেন রোগীরা। এরপরও অনেক পরিস্থিতিতেই রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে নিতে হয়।
”একটা রোগীর দায়িত্ব নিলে তো তাকে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া যায় না। কারণ এতদিন ধরে চিকিৎসা করিয়ে রোগী যদি সুস্থ হয়, তারপর ফলোআপ ছেড়ে দিলে তিনি কিন্তু আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবেন।”
”তাই আমি যে রোগীর দায়িত্ব নিই, তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা চালিয়ে নিতে যতটুকু ব্যয় হয়, আমার ব্যবসা থেকে যে আয় হয়, সেখান থেকে ততটুকু ব্যয় করি।”
ক্যান্সারে আক্রান্ত নারী রোগীদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে যাওয়ার অভিজ্ঞতায় স্বাস্থ্য খাতের অনেক ’দুর্বল’ দিক নজরে পড়েছে সাইক্লিস্ট মাধবীর।
ঢাকার মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পাঁচটি রেডিওথেরাপির মেশিন নষ্ট থাকায় রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জানিয়ে বলেন, “সরকারি হাসপাতালের এই অবহেলা, কিংবা স্বল্পতা, বা অনাগ্রহ খুব কষ্টের।”
তার মতে, সরকারি চিকিৎসা সেবায় এসব সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে ক্যান্সারের মত রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
“মহাখালী হাসপাতালে জনবল স্বল্পতা আছে। এখানে আমার রোগীরা যায়। তাদের স্তন থেকে মাংস বা রক্ত নিয়ে কোর বায়োপসি করাতে হয়।দেখা যায়, আমাকে ১৫ দিন পরের সিরিয়াল দিচ্ছে তারা। রোগী যাচ্ছে ১০০ জন, সেখানে সেবা দিচ্ছে ২০ জনকে; তাহলে ৮০ জনকে তো বাধ্য হয়েই বাইরে (বেসরকারি হাসপাতালে) যেতে হচ্ছে।
“হাসপাতালে হয়ত পাঁচ হাজার টাকা নেয় কোর বায়োপসি করতে। বাইরে গেলে সেটা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগছে।হাড়ের একটি পরীক্ষা আছে, সেটা পরমাণু বিভাগে করতে হয়।এই পরীক্ষা হয় বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে করতে হবে, নয়তো অন্যখানে। আর বেসরকারি হাসপাতালে টেস্ট করতে গেলে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার খরচ হয়ে যায়।”
আবার রোগী ও তার পরিবারের ধারণা না থাকার কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি হলে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়।
“থার্ড বা ফোর্থ স্টেজে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যয়বহুল। প্রাথমিকভাবে যদি একজন নারীর ক্যান্সার ধরা পড়ে, তখন কিন্তু অল্প খরচে চিকিৎসা করানো যায়। আর সরকারি হাসপাতালে গেলে বিনামূল্যেও চিকিৎসা পাচ্ছে।
”কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, নারীর শরীরে ক্যান্সারের লক্ষণ দেখা দিলেও তিনি কিন্তু ডাক্তারের কাছে যান না। এটা যে ক্যান্সারের লক্ষণ সেটাও হয়ত তিনি জানেন না। নারী এসব লুকিয়ে রাখেন যতোটা সময় ব্যথা-যন্ত্রণা সহ্য করা যায়। যখন স্তন গলে যাওয়া শুরু করে, স্তনের বোঁটা থেকে রক্ত-পুঁজ বার হয়, তখন তিনি ডাক্তারের কাছে যান।”
স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনায় কাজ করতে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারি হাসপাতালের সহযোগিতা পাওয়ার কথাও মাধবী বলেন।
”আমি একেবারে প্রান্তিক পর্যায়েও গেছি। সন্দ্বীপ, হাতিয়া, চর ফ্যাশন, উড়ির চর, নিঝুম দ্বীপ, চর কুকরি-মুকরি এমন দ্বীপাঞ্চলে কাজ করা খুবই কঠিন। আমি প্রশাসন থেকে শুরু করে ওখানকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানিয়ে সেখানে যেতাম। এসব জায়গা থেকে সরকারি অথবা আমি নিজ খরচে রোগীদের চিকিৎসা সেবার আওতায় আনছি দেখে তারা আমাকে ইতিবাচক ভাবেই গ্রহণ করেছে।”
৬৪ জেলা ঘুরে দেখতে পথে নামা এই তরুণী ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫১টি জেলা ভ্রমণ করেছেন। সেসব জায়গায় সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে বড় কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে তাকে পড়তে হয়নি।
“জেলা প্রশাসক, স্বাস্থ্য পরিচালক এদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে অনুমতি নিতাম। তাদের কাছে আবেদন করতে হয়। অনুমোদন দিলে সেই অনুমোদন দেখিয়ে আমি স্কুল-কলেজ ও গার্মেন্ট কারখানায় প্রচার চালাতে যেতাম।
”আমাদের দেশে এ বিষয় নিয়ে তো কেউ কথাই বলে না। সেখানে আমি একটা মেয়ে হয়ে নেত্রকোণা থেকে সাইকেলে চড়ে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সেই পঞ্চগড়, সেই তেঁতুলিয়া যাচ্ছি; ওখানে বরং আমাকে পেয়ে খুশি।”
কীভাবে কাজটা করেন মাধবী?
সাধারণত পাঁচ জন অথবা ১০-১৫ জন রোগী নিয়ে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করেন। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ভিত্তিতে নন-ক্যান্সার ও ম্যালিগন্যান্ট রোগীর চিকিৎসা শুরু হয়।
”সাধারণ চিকিৎসা হলে ওখানেই সেবা নিয়ে রোগীরা বাসায় যায় এবং একটা স্ক্রিনিংয়ের মধ্যে থাকে। উন্নত চিকিৎসা দরকার হলে তাদের বিভাগীয় হাসপাতাল অথবা ঢাকায় নিয়ে আসি।”
সাবিনা ইয়াসমিন মাধবীর জন্ম নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায়।ময়মনসিংহের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসির চৌকাঠ পেরিয়ে ঢাকায় আসার পর তার জীবন সংগ্রাম শুরু হয়। বেঁচে থাকার তাগিদে অর্থ উপার্জনের তাড়া থেকেই মূলত নকশি কাঁথার ব্যবসায় জড়িয়ে যান।
২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আর ছাত্র পড়িয়ে যে টাকা উপার্জন করতেন, তাতে সংসার চালানো সহজ ছিল না। পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান হয়েও বড় সন্তানের মতই দায়িত্ব নিতে হয়েছে মাধবীকে।
তিনি বলেন, “আমি নিজে স্বাধীনচেতা; ঘুরতে পছন্দ করি। তখন আমি সারাদেশে বিভিন্ন জায়গা থেকে নকশি কাঁথা সংগ্রহ করি, যেটাকে বলে পাইকারিতে নেওয়া। এরপর ঢাকায় বিক্রি করতাম। এভাবে যখন কাস্টমার বাড়ছে একটু একটু করে, আয় বাড়ছে, তখন আমি ভাবলাম বড় আকারে শুরু করা যাক।”
এখন তার মাধবী মার্ট জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলায় প্রায় তিন হাজার নারীকর্মীর মাধ্যমে বানানো নকশি কাঁথা সারা দেশে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করছে।
এই উদ্যোক্তা নারীর ইচ্ছা, নিজের ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থ দেশে যে নারীরা কাঁথা বানাচ্ছেন তাদের সেবায় ব্যয় করবেন। পাশাপাশি ক্যান্সারের চিকিৎসা নিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনার রয়েছে তার।
“আমি এত রোগীর দায়িত্ব নিয়েছি... প্রথম দিকে বুঝতে পারিনি এতোটা। যে রোগী আসছেন, তার চিকিৎসা করাচ্ছি। এখন পর্যন্ত আমি ব্যক্তিগতভাবে কাজ করছি। এর মধ্যে লক্ষাধিক মা-বোনকে সচেতন করেছি।
“কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, যে পরিমাণ নারী আক্রান্ত হচ্ছেন, এখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই কাজ করতে হবে। তাই আমি একটি ফাউন্ডেশন করার কাজ করছি। হয়ত ২০২৩ সাল থেকে শুরু করতে পারব।”
আগামীতেও কি শুধু স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার নিয়ে কাজ করবেন মাধবী?
তিনি জানালেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সমস্যা নিয়ে কেউ খুব একটা কথা বলে না, তাই তিনি একটু ‘খোলামেলা’ কথা বলতে চান।
“প্রান্তিক পর্যায়ে নারীদের পিরিয়ডের জন্য মাসে দেড়শ-দুশো টাকা খরচ করে ন্যাপকিন কেনা সহজ নয়। তাই তখন তারা পুরাতন কাপড় ব্যবহার করেন। আর এই পিরিয়ডে পুরাতন কাপড় ব্যবহারের সঙ্গে জরায়ু ক্যান্সারের একটা সম্পর্ক আছে। আমি মাসিক স্বাস্থ্য নিয়েও সচেতন করছি।”
২০২১ সালে তিনি উড়ির চরের ১০ জন নারীর জরায়ুর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন।তারা কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত না হলেও সবারই জরায়ুতে সমস্যা ছিল। কারও জরায়ুতে ইনফেকশন ছিল, কারও ছিল টিউমার।
মাধবী বলেন, “তাদের নৌকা-ট্রলারে করে এনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলাম।প্রায় একমাস সেখানে থেকে সুস্থ ভাবে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়েছি।”
তবে নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা শুধু স্তন আর জরায়ু নিয়েই নয়। যেসব এলাকায় মাধবী সচেতনতার বার্তা নিয়ে গেছেন, সেখানে অনেকের কোলন ক্যান্সার, কারো ফুসফুসের ক্যান্সারও দেখেছেন। সেসব রোগী কোথায় যাবে?
“তাই আমি ভেবেছি, যেহেতু ক্যান্সার নিয়ে কাজ করছি, সব ধরনের ক্যান্সার নিয়েই কাজ করব। আর শুধু ক্যান্সার নয়, একজন নারীর সুস্থভাবে বাঁচার জন্য তাকে যতভাবে সচেতন করা যায়, আমি সেটা করে যাব।”
স্তন অপসারণ হোক অথবা কেমোথেরাপির পর চুল ঝরে যাওয়ার মত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, রোগীর পরিবারকে স্পষ্ট ধারণা দিতে তার স্বজনকে চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন মাধবী।
ব্যবসা, সাইকেল চালানো, ক্যান্সার সচেতনতা ও রোগীদের চিকিৎসার আওতায় আনা– সব মিলিয়ে এই তরুণীর উদ্যোগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও স্বীকৃতি পাচ্ছে। আর্তমানবতার সেবায় অবদান রাখায় একাধিক সম্মাননা তিনি পেয়েছেন।
মাধবী বলেন, এমন প্রাপ্তি ’সঠিক পথে’ থাকার বার্তা দেয়। তবে প্রান্তিক পর্যায়ে যারা কাজ করেন, তারা মূলত নিজের ’তৃপ্তির’ জন্য কাজ করে যান।
“একজন ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষ যখন ক্যান্সার থেকে মুক্ত হয়, তাকে না দেখলে, তার মুখের দিকে না তাকালে সেই অনুভূতি বোঝা সম্ভব নয়।
”যখন তারা শোনে যে ক্যান্সার মুক্ত হয়েছে, আনন্দে কেঁদে ফেলে। যখন এমন দেখি, তখন মনে হয় এই তো আমার জীবনের অর্জন।”
