২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯ কার্তিক ১৪৩৩

সারাদিন ক্লান্ত, কিন্তু বিছানায় গেলেই ঘুম গায়েব? দায়ী হতে পারে ‘হাইপারঅ্যারোজাল’

মস্তিষ্কের অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থা বা 'হাইপারঅ্যারোজাল'-এর কারণে ঘুম উধাও হয়ে যেতে পারে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 24 Oct 2026, 07:04 PM

Updated : 24 Oct 2026, 07:04 PM

সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর শরীর যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চায়, তখন বিছানায় পিঠ ঠেকানো মাত্রই ঘুমিয়ে পড়ার কথা। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটে ঠিক উল্টোটা।

বিছানায় শোয়ামাত্রই যেন মাথার ভেতর চিন্তার সব দরজা একসঙ্গে খুলে যায়। শরীর চরম ক্লান্ত হলেও মস্তিষ্ক পুরোপুরি জেগে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতিকে বলা হয় ‘টায়ার্ড বাট ওয়্যার্ড’; যার মূল কারণ ‘হাইপারঅ্যারোজাল’ বা অতিরিক্ত উত্তেজনা।

ঘুম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমাতে যাওয়ার সময়ে মস্তিষ্ক ও শরীর যখন অতিরিক্ত মাত্রায় সতর্ক বা ‘হাই অ্যালার্ট’ মেজাজে থাকে, তখনই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

হাইপারঅ্যারোজাল যেভাবে আপনার ঘুম কাড়ে

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার ‘চার্লটসভিলে নিউরোলজি অ্যান্ড স্লিপ মেডিসিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিস উইন্টার রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “হাইপারঅ্যারোজাল’ প্রধানত দুই ধরনের হতে পারে, মানসিক ও শারীরিক।”

মানসিকভাবে এটি হতে পারে সারাদিনের কোনও কথোপকথন মাথায় ঘুরপাক খাওয়া, আগামীকালের দায়িত্ব নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা বা ‘আমি আদৌ ঘুমাতে পারছি কি না’ তা বারবার যাচাই করা।

আর শারীরিক লক্ষণের মধ্যে রয়েছে শরীরের পেশি শক্ত বা টানটান হয়ে থাকা।

ডা. উইন্টার আরও ব্যাখ্যা করেন, “মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তবে সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হিসাব করতে শুরু করে যে, ঘুমের আর কতটুকু সময় বাকি আছে বা আগামীকাল সে কীভাবে কাজ করবে।

তখন এই সাধারণ জাগরণকে মস্তিষ্ক একটি ‘জটিল সমস্যা’ হিসেবে ধরে নেয় এবং সমাধানের জন্য পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে এক দুষ্টচক্রে পড়ে যায় মানুষ আর ঘুম না আসার দুশ্চিন্তা আরও বেশি জাগিয়ে রাখে।”

খারাপ ঘুমের বাজে প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম-বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েস্পার’-এর ঘুম বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. চেলসি রোরশাইব বলেন, “হাইপারঅ্যারোজালের কারণে দীর্ঘদিন ভালো ঘুম না হলে দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তি, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের 'অ্যামিগডালা' নামক অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে, যা মানুষের আবেগ ও মানসিক চাপ সামলায়। ভালো ঘুম না হলে এই অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, ফলে দৈনন্দিন ছোটখাটো মানসিক চাপও সহ্য করা সম্ভব হয় না।”

বিছানায় গেলেই কেন জেগে ওঠে মস্তিষ্ক?

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইনটিগ্রেটিভ অ্যাডাল্ট স্লিপ কোচ’ ও ‘সিবিটি-আই’ বিশেষজ্ঞ লেয়া অ্যান বোলেন বলেন, “আমরা কেবল বিছানায় শুয়ে পড়লাম বলেই সারাদিনের ঘটনা, সমস্যা আর আবেগগুলো আমাদের পেছনে ফেলে যায় না। ঘুমাতে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ল্যাপটপ বা মোবাইলে অফিসের কাজ করা, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করা, ইমেইল দেখা বা কোনও উত্তেজনাপূর্ণ খবর মস্তিষ্ককে সচল রাখে, ফলে ফোন রেখে দেওয়ার পরও মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে।”

ড. চেলসি রোরশাইব আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক কারণ উল্লেখ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে ঘুম না আসার সমস্যায় ভুগতে ভুগতে মস্তিষ্ক বিছানাকে ‘জেগে থাকার স্থান’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে। একে বলা হয় ‘লার্নড রেসপন্স’। ফলে একজন মানুষ সারাদিন শান্ত থাকলেও বিছানায় চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই তার ‘সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মাথায় চিন্তার ঝড় বয়।”

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কী করবেন?

ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে নিজেকে শান্ত রাখতে নিচের কৌশলগুলো অনুসরণ করা যায়।

ঘড়ি দেখা বন্ধ করা: বারবার ঘড়ির দিকে তাকানো যাবে না। এটি মনের ওপর চাপ বাড়ায় এবং রাতকে একটি মানসিক চাপের সময় হিসেবে রূপান্তর করে।

প্রশান্তি তৈরির স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় করা: ড. রোরশাইব, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, মেডিটেইশন বা ভিজ্যুয়ালাইজেশনের পরামর্শ দেন। এগুলো শরীরকে রিল্যাক্স বা শিথিল করতে সাহায্য করে।

২০ মিনিটের নিয়ম: বিছানায় শোয়ার পর ২০ মিনিটের মধ্যেও যদি ঘুম না আসে, তবে জোর করে শুয়ে থাকা যাবে না। বরং বিছানা ছেড়ে উঠে অন্য একটি মৃদু আলো ও শান্ত ঘরে যেতে হবে। সেখানে বসে বই পড়া, ছবি আঁকা বা পাজল মেলানোর মতো কোনও আরামদায়ক কাজ করতে হবে। যখন আবার চোখে ঘুম নেমে আসবে, তখন বিছানায় ফিরে যেতে হবে। এতে মস্তিষ্ক বিছানাকে জাগরণের সঙ্গে মেলাবে না।

সহজ একটি রুটিন গড়া

দিনের ব্যস্ততা এবং রাতের ঘুমের মাঝখানে কিছুটা সময়ের ব্যবধান বা 'ব্রিদিং স্পেস' রাখা উচিত। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ডায়েরিতে আগামীকালের কাজের তালিকা লিখে রাখার অভ্যাস করা যেতে পারে, যাতে মন সেই চিন্তা থেকে মুক্ত হয়।

ড. উইন্টার অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, “ঘুমানোর এই রুটিন যেন খুব বেশি কঠোর বা বাঁধাধরা না হয়। কারণ ‘আমাকে এই নিয়ম মেনেই ঘুমাতে হবে’— এমন চিন্তাও মনের ভেতর নতুন চাপের সৃষ্টি করতে পারে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীর ও মনকে শান্ত করার একটি পরিবেশ তৈরি করা, নির্দিষ্ট কোনও মিনিটে ঘুমানোর গ্যারান্টি দেওয়া নয়।

পুরনো খবর:

জানলে অবাক হবেন, দাঁত যেভাবে ঘুমের বারোটা বাজায়
অন্ধকারে ঘুম যে কারণে শরীরের জন্য ভালো
নির্ঘুম রাতের সমাধান
প্রতিদিন ছোট ঘুম দেওয়ার অভ্যাস কি ভালো?