Published : 05 Aug 2023, 06:02 PM
নিপুন নকশার অনুসরণে দক্ষ কারিগরের হাতেই তো তৈরি হয় বৈচিত্র্যময় অলঙ্কার।
তবে কোনো কারিগর নয়, বড় কোনো মানুষও নয়- যদি ছোট ছোট হাতে তৈরি হয় নানান রকম গহনা, বিশেষ করে যাদের হাতের স্পর্শে চলে জীবিকার সংগ্রাম- তাহলে কেমন হয় ব্যাপারটা।
এমনই আয়োজন স্বচক্ষে আজ (৫ অগাস্ট) থেকে দেখা যাবে রাজধানীর ধানমণ্ডির সড়ক তিনের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ‘সুতোয় বুনি স্বপ্ন, আনন্দে গাঁথি মালা’ স্লোগানে পথশিশুদের হাতে তৈরি গহনার প্রদর্শনীতে।

তবে আয়োজন হঠাৎ করেই হয়নি। দেশীয় গয়না তৈরির প্রতিষ্ঠান ‘শৈলী’র কর্ণধার তাহমিনা শৈলী গত কয়েক মাস ধরে হাজারিবাগের বস্তিতে থাকা শিশুদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অলঙ্কার তৈরির নিপুন কৌশলে পারদর্শী করে তুলেছেন।
শৈলী বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকম’কে বলেন, “যখন এসব শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব পাই তখন থেকেই আমি কাজ শুরু করে দেই। আর প্রশিক্ষক হিসেবে নিজের দায়বদ্ধতা থেকেই কীভাবে এর থেকে শিশুরা অর্থ উপার্জন করতে পারবে, অনলাইন ও অফলাইনে প্রচারণা চালিয়ে বিক্রি করতে পারবে সে বিষয়েও বিবেচনা করি।”


২৩ জন শিশু এখানে কাজ করেছে। এই ২৩ জনকে বাজারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ও বাজারকে এদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই মূলত প্রদর্শনীর ভাবনাটা আসে বলে জানান, শৈলী।

এই আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতায় আছে সুইজারল্যান্ডের দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘তের দে জোম’য়ের একটি উদ্যোগ ‘ক্ল্যারিসা’। তারা বাংলাদেশ ও নেপালের শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ ও নিপীড়নমূলক কাজ থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছে।
প্রশিক্ষণের পরে শৈলীর প্রস্তাবেই প্রতিষ্ঠানটি এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে; যেখানে গহনার শিশু কারিগররা উপস্থিত থাকবেন, জানাবেন তাদের নিজেদের কথা।


শৈলী আশা প্রকাশ করে বলেন, “প্রদর্শনীতে আরও কিছু দেশীয় ফ্যাশন ও বুটিক হাউজ উপস্থিত আছে। তারা যখন দেখবে, দেশে আরও কিছু গহনা কারিগর তৈরি হয়েছে, তাদের করা কাজ দেখবে, তাদের জীবনের গল্পগুলো জানতে পারবে তখন এই শিশুগুলোর জন্য ‘লোকাল মার্কেট’ আরও প্রশস্ত হবে এবং শিশু কারিগরেরাও বাজার চাহিদা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারবে বলে আমি আশা রাখি।”
প্রশিক্ষণের সময় শিশুদের গহনা তৈরির খুঁটিনাটি কৌশল শেখানো হয় এবং দেশীয় কাঁচামালের মাধ্যমে গহনা তৈরি করা হয়।


শিশুরা খুব সহজে এবং আনন্দসহকারে যে কাজটা শিখেছে, সেসব প্রকাশ পেয়েছে নানানভাবে।
এমনই এক শিশু গহনা কারিগর আহাদুল লিখেছে, “আমার অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছা করে, কিন্তু আমার হাতের লেখা ভালো না!”
তারপরও আহাদুলের লেখায় উঠে এসেছে তার জীবন সংগ্রামের কাহিনি। জুতার কারখানার এক শিশু শ্রমিক, যাকে কাজ করতে হয় সকাল বিকাল। কোনো কোনো সময় অতিরিক্ত কাজ করতে হলে রাত ১০টাও বাজে। সেজন্য অতিরিক্ত ২০টাকা মজুরি জুটলে কাজ অনেক খাটুনির। এর ফাঁকে সে স্কুলে যায়। বন্ধুদের সাথে টিকটক বানায় স্বপ্ন দেখে একদিন জুতার কারকাখানার ‘সুপারভাইজার’ হবে।


তারপর ঘটনাক্রমে এই গয়না প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়, টিডিএইচ’য়ের স্কুলের কল্যাণে।
সে লিখেছে- ‘এখানে গয়না বানানো শিখালো আমাদের সবাইকে। মাত্র কয়েকদিনে গয়না বানানো শিখে গেছি আমি। এখন গয়নার ব্যবসায়ী হতে ইচ্ছা করছে।’
আরেক কারিগর সতেরো বছরের সুমাইয়া আক্তার। দশম শ্রেণিতে পড়া শেষ করতে না করতেই বিয়ে হয়ে যায়। এখন একটা চমড়ার ফ্যাক্টরিতে হাজিরা কার্ড লেখার কাজ করছেন সাত মাসের এই অন্তঃসত্ত্বা। শ্বশুর বাড়ির চাপে আর পড়া হয়নি। তবে ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির শখ, স্বপ্ন দেখতেন একসময় শুধু তার আঁকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী হবে। সেই শখের সাথে এই গয়না প্রশিক্ষণ মিলে তাকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে এখন।


সে লিখেছে- ‘আমি যে এলাকায় থাকি সেখানে গহনার বেশ চাহিদা, কিন্তু আনকমন বা একটু অন্যরকম কিছু পাওয়া যায় না। সবই গতানুগতিক। তাই চিন্তা করলাম, যদি আমি এই ব্যাবসা করতে পারি, অনেকের কাছে পৌঁছাতে পারব।’
৭ অগাস্ট পর্যন্ত বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে, এমন আরও শিশু গহনা কারিগরদের গল্পকথা জানা যাবে প্রদর্শনীতে। আর গয়না তো থাকছেই।