১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ইন্টারজেনারেশনাল ফ্রেন্ডশিপ’ দুই প্রজন্মের মানুষের মাঝে বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন

প্রজন্মগত ব্যবধান দূর করে সমাজকে করে তোলে আরও সংযুক্ত ও সহানুভূতিশীল।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Apr 2026, 05:05 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:22 PM

আজকের ব্যস্ত ও বিচ্ছিন্ন সমাজে বন্ধুত্বের ধারণা অনেকটা সীমিত হয়ে পড়েছে। তবে যখন দুজন মানুষের বয়সের ব্যবধান কমপক্ষে ১৮ বছর হয়, তখন তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বকে বলা হয় আন্তঃপ্রজন্মগত বন্ধুত্ব বা ‘ইন্টারজেনারেশনাল ফ্রেন্ডশিপ’।

এই সম্পর্ক শুধু দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং প্রজন্মগত ব্যবধান দূর করে সমাজকে করে তোলে আরও সংযুক্ত ও সহানুভূতিশীল।

প্রবীণের জ্ঞান-অভিজ্ঞতা আর তরুণের উদ্যম-আধুনিক চিন্তা মিলে এই বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে এক অনন্য সেতুবন্ধন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “ইন্টারজেনারেশনাল ফ্রেন্ডশিপ’ শুধু দুজনের মধ্যে সম্পর্ক নয়, এটি দুই প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। প্রবীণরা তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, আর তরুণরা প্রযুক্তি, নতুন ধারণা ও উদ্যম নিয়ে আসেন। এতে উভয়ের জীবনই সমৃদ্ধ হয়।”

এই বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ

সমাজে বয়সভিত্তিক বিভাজন খুব স্পষ্ট। প্রবীণরা প্রায়ই একাকিত্বে ভোগেন, আর তরুণরা মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তায়। ‘ইন্টারজেনারেশনাল ফ্রেন্ডশিপ’ এই দুইয়ের মাঝে সেতু তৈরি করে।

‘জার্নাল অফ এইজিং স্টাডিজ’য়ে ২০২৩ সালে প্রকাশিত এই বিষয়ে করা গবেষণায় উল্লেখ করা হয় যে, যেসব তরুণ ও বয়স্করা নিয়মিতভাবে প্রজন্মগত বিভেদ অতিক্রম করে একে অপরের সাথে মেলামেশা করেন, তাদের জন্য জ্ঞানীয়, শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক উপকারিতা রয়েছে।

প্রবীণরা পান নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত থাকার আনন্দ, আর তরুণরা পান জীবনের মূল্যবান শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা।

রিডার ডাইজেস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি’র উন্নতি-বিষয়ক মনোবিদ ড. অ্যাবি স্টেফান বলেন, “ইন্টার’ মানে ‘মাঝে’ এবং এটি পারস্পরিকতা ও উভয়ের প্রভাবে একটি অনুভূতি প্রকাশ করে।”

তিনি আরও বলেন, “শক্তিশালী আন্তঃপ্রজন্মীয় বন্ধুত্বগুলো বিষয়টি কাজে লাগায়। কারণ এগুলো সমবয়সি বন্ধুত্বের তুলনায় অনেক বিস্তৃত অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং দক্ষতার ওপর নির্ভর করে।”

মানে হল- এই বন্ধুত্বগুলো অনেক বেশি পরিপূর্ণ ও আকর্ষণীয় হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, কারণ এগুলো শুধু ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এই বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পারস্পরিক শিক্ষা। প্রবীণরা জানায় তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, সফলতা ও ব্যর্থতার গল্প। এতে তরুণরা শেখে ধৈর্য, সহনশীলতা ও দূরদর্শিতা।

অন্যদিকে তরুণরা প্রবীণদের শেখায় প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন ধারণা ও আধুনিক চিন্তাভাবনা। ফলে উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়।

‘ইন্টারজেনারেশনাল ফ্রেন্ডশিপ’  মানসিক ও সামাজিক উপকারিতা

এই বন্ধুত্ব একাকিত্ব দূর করে মানসিক শান্তি দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে- প্রবীণরা পান নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ, যা তাদের মনে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করে।

তরুণরা পান অভিজ্ঞতার আলোয় নিজেদের সমস্যা সমাধানের পথ। এতে উভয়ের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সহানুভূতি জাগে এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হয়।

সমাজের জন্যও এই বন্ধুত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বয়সের ভিত্তিতে বিভাজন কমিয়ে সমাজকে করে তোলে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক।

প্রজন্মগত ব্যবধান দূর হয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়ে এবং সমাজের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত হয়।

‘ইন্টারজেনারেশনাল ফ্রেন্ডশিপ’ বাস্তবে যেমন হয়

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিবেশীদের মধ্যে বয়স্ক কারও সঙ্গে তরুণদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কেউ কেউ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে এই সম্পর্ক তৈরি করেন। কখনও কোনো বয়স্ক ব্যক্তি তরুণদের পড়াশোনায় সাহায্য করেন, আবার তরুণরা তাদের প্রযুক্তি শেখান।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই গড়ে তোলে গভীর বন্ধুত্ব।

ঢাকার আদাবরের বাসিন্দা বয়সে প্রবীণ ইফতিখার আহমেদ বলেন, “আমার নাতির বয়সি জারিফ নামের একটা ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। সে আমাকে মোবাইলের নতুন অ্যাপ শেখায়, আর আমি তাকে জীবনের অভিজ্ঞতা শোনাই। এতে আমার একাকিত্ব কমেছে, আর সে পেয়েছে দিকনির্দেশনা।”

‘ইন্টারজেনারেশনাল ফ্রেন্ডশিপ’ যেভাবে গড়ে তোলা যায় এই বন্ধুত্ব

সম্মান ও শ্রদ্ধা: বয়স নির্বিশেষে একে অপরকে সম্মান করতে হবে।

খোলামেলা কথা: নিজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা, অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা

সময় দেওয়া: নিয়মিত দেখা করা, গল্প করা, একসঙ্গে সময় কাটানো।

সীমা মেনে চলা: একে অপরের ব্যক্তি স্বাধীনতার জায়গা সম্মান করা।

ইতিবাচক মনোভাব: ভিন্নতাকে গ্রহণ করা, শেখার মানসিকতা রাখা।

“ইন্টারজেনারেশনাল ফ্রেন্ডশিপ’ শুধু দুজনের জীবন নয়, সমাজের জন্যও একটি ইতিবাচক উদাহরণ। এটি দেখায় যে বয়স কখনও বন্ধুত্বের বাধা হতে পারে না। বরং ভিন্ন প্রজন্মের মানুষেরা একে অপরের জীবনকে করে তোলে আরও সমৃদ্ধ ও অর্থপূর্ণ”- বলেন ড. স্টেফান।

আরও পড়ুন

বড়বেলাতেও বন্ধু পাতানো যায়

বন্ধুত্বে বিষাক্ততা চিহ্নিত করার উপায়

বন্ধুত্ব আর প্রেম এক নয়

বন্ধুত্ব পুনরুদ্ধারের ৫ পন্থা