Published : 19 Sep 2026, 05:21 PM
কৈশোর ও যৌবনের উষালগ্নে শরৎ-উপন্যাসের নায়িকারা আমাদের কাছে এসেছিলেন মূলত স্বপ্নের বাতাবরণে। আমাদের প্রাণের মধ্যে যেমন তাঁরা পল্লবিত হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি বাইরের জগতেও নারীচরিত্রের প্রতিমূর্তি হয়ে উপস্থিত থাকতেন। নির্জনে নিজের মনে যখন কোনো নারীর কথা ভাবতাম, তখনো শরৎচন্দ্রের মেয়েরা কাছে এসে চুপে চুপে কথা বলতেন; আবার যখন বন্ধুমহলে নারীর রূপ, মমতা ও কষ্ট নিয়ে কথা হতো, তখনো শরৎ-সাহিত্যের নারীরা দৃষ্টান্ত হিসেবে হাজির হতেন।
সে নারী কেবল নায়িকারূপে আবির্ভূত হতেন এমন নয়--কেউ মাতৃরূপে, কেউ ভগ্নিরূপে, কেউ সাহসিকা কিংবা বিদ্রোহীরূপে উপস্থিত থাকতেন। তাঁদের তুলনায় শরৎচন্দ্রের সাহিত্যজগতে পুরুষ চরিত্র অনেক সময়ই যেন গৌণ হয়ে পড়ে। পুরুষতান্ত্রিক সংসারে পুরুষ নায়কের আসনে বরিত হলেও প্রাত্যহিক গার্হস্থ্য জীবনের সূক্ষ্ণতায় তার উপস্থিতি সব সময় সমান গভীর নয়। বাস্তব জীবনে প্রবেশের আগে, নারী-পুরুষের নিজস্ব সম্পর্ক স্থাপনেরও আগে, একসময় আমরা শরৎচন্দ্রের চোখ দিয়েই নারীকে দেখতে শিখেছিলাম।
মাঝে মাঝে ইন্দ্রনাথ, সুরেশ কিংবা ডাক্তার ওরফে গিরিশ মহাপাত্র ওরফে সব্যসাচীর মতো চরিত্রের দেখা মিললেও তারাও অন্নদা, রাজলক্ষ্ণী, কমল, সাবিত্রী কিংবা ‘বামুনের মেয়ে’র মতো নারীচরিত্রের পাশে কখনো কখনো ম্লান হয়ে থাকত। সংসারে এত বীর্যবতী, অপমানিত, অবহেলিত, বিদ্রোহী ও তথাকথিত ‘চরিত্রহীনা’ নারীর আধিক্য সত্ত্বেও তাঁর উপন্যাসের নায়িকারা সমাজে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কিংবা সংস্কারের বেড়া ডিঙাতে পেরেছিলেন কি না-সে আলাপও কম হতো না।
ব্যক্তিগতভাবে নারীচরিত্র অঙ্কনের ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক সীমারেখার ব্যাপারে চিরকাল শ্রদ্ধাশীল থেকেছি, কিন্তু তাঁর চরিত্রগুলোর বিকাশ নিয়ে সর্বদা প্রশ্নহীন থাকিনি। আমার মনে হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যবর্তী সময়ের বাঙালি সমাজে জাতপাত, ধর্ম ও সামাজিক সংস্কারের দ্বন্দ্বের মধ্যে শরৎচন্দ্র একধরনের সেতুবন্ধের কাজ করেছিলেন। শতবর্ষ পরে এসে তাঁর নারীরা আমাদের কাছে প্রাচীন মহাকাব্যের নারীদের মতো বাস্তব ও অবাস্তবতার বহুবিধ বিভেদ তৈরি করবে--এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু একদিন সমাজের অবরোধবাসিনীদের অজানা কাহিনি তিনিই প্রবলভাবে সাহিত্যের সামনে তুলে এনেছিলেন।
তিনি একজন বিধবাকে বিয়ে দিতে পেরেছিলেন কি না-আজ সে প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাঁর বেশ আগেই বঙ্কিমচন্দ্র বিধবা-বিবাহের প্রশ্নকে উপন্যাসে নিয়ে এসেছিলেন। বঙ্কিমের ব্যক্তিগত ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষণশীলতার দ্বারা প্রভাবিত হলেও তাঁর শিল্পসত্তা অনেক সময় সেই সীমা অতিক্রম করেছে। বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনী কিংবা কৃষ্ণকান্তের উইল-এর রোহিণী বিধবা হয়েও বাংলা উপন্যাসের উজ্জ্বল উপস্থিতি।
রামমোহনের সতীদাহবিরোধী আন্দোলন, বিদ্যাসাগরের বিধবা-বিবাহ প্রচলনের সংগ্রাম এবং কৌলীন্য ও বহুবিবাহবিরোধী সংস্কার-প্রচেষ্টা সমাজে গভীর আলোড়ন তুলেছিল। তারপরও শরৎচন্দ্র গল্প বলার ক্ষেত্রে সব জায়গায় সমান ঝুঁকি নিতে চাননি। বঙ্কিম বিধবা-বিবাহের প্রশ্নে রক্ষণশীল অবস্থানে থেকেও নবসমাজে উত্থিত সংকটটির ভালো-মন্দ এড়িয়ে যেতে পারেননি; অথচ প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে এসেও শরৎচন্দ্র সে পথে খুব বেশি এগোতে চাননি হয়তো।
তবু ঊনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের প্রথমভাগের নারী, নিম্নবর্গ এবং সামাজিকভাবে অমর্যাদাপ্রাপ্ত মানুষের যে জীবনচিত্র তিনি রেখে গেছেন, তা সময়ের মূল্যবান সাহিত্যিক দলিল। যে সময়ে দাঁড়িয়ে নারীর পক্ষে একজন ঔপন্যাসিকের যতখানি ন্যায়সংগত বিবেচনা সম্ভব ছিল, তার অনেকটাই শরৎচন্দ্র করেছিলেন। নারীর হৃদয়, নারীর ব্যথা এবং নারী হয়ে জন্ম নেওয়ার সামাজিক অমর্যাদার কথা তাঁর মতো নিবিড়ভাবে খুব কম লেখকই বলেছেন। তাঁর পূর্বের দুই মহান কথাসাহিত্যিক বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ মানবচরিত্র উদ্ঘাটনে যে সাফল্য অর্জন করেছিলেন, শরৎচন্দ্র তার সঙ্গে একটি প্রবল সামাজিক মাত্রা যুক্ত করেছিলেন। উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে বাঙালি হিন্দু নারীর সামাজিক অবস্থান বুঝতে তাঁর সাহিত্য অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক উৎস।
তবে শরৎচন্দ্রের মতোই বলতে হয়, জীবনের অপরাহ্নে দাঁড়িয়ে সেই সব চরিত্রের কথা বলতে বসে তাদের সত্য-মিথ্যা আজ নির্ণয় করা সহজ নয়। শ্রীকান্তে রাজলক্ষ্ণী ও তার দিদি সুরলক্ষ্ণীর বিবাহের ঘটনাটিই ধরা যাক। কুলীন পাত্র প্রথমে একশ এক টাকা দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত সত্তর টাকায় রফা হয় এবং একই রাতে দুই বোনের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়। দুই দিন পরে টাকা নিয়ে সে বাঁকুড়া চলে যায়; আর ফিরে আসে না। বছর-দেড়েক পরে সুরলক্ষ্ণী জ্বরে মারা যায় এবং আরও পরে রাজলক্ষ্ণীর মৃত্যুসংবাদ রটে, যে-রাজলক্ষ্ণীকেই আমরা পরে পিয়ারী বাইজি হিসেবে দেখতে পাই।
সেই পিয়ারী ওরফে রাজলক্ষ্ণীই ছিল আমাদের তারুণ্যের অন্যতম রোমান্টিক নায়িকা। তারই প্রেমের অভিঘাতে শ্রীকান্ত উচ্চারণ করেছিল-‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না-ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে।’ রাজলক্ষ্ণী ও শ্রীকান্তের প্রেমের মধ্যে রোমান্টিক প্রবাহ থাকলেও সম্পর্কটি কখনো সরল ছিল না। রাজলক্ষ্ণী একই সঙ্গে সুন্দরী, তরুণী, পিয়ারী বাইজি, অর্থসম্পন্ন এবং সামাজিকভাবে বহিষ্কৃত এক নারী; আবার বঙ্কুকে পুত্রের মতো গ্রহণ করা তার মাতৃত্ববোধেরও প্রকাশ। অন্যদিকে শ্রীকান্তের সঙ্গে রয়েছে তার শৈশবের গভীর টান, অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা, আকাঙ্ক্ষা ও অবদমন। শরৎচন্দ্রের বহু উপন্যাসেই নারী-পুরুষের সম্পর্কের এই জটিলতা ফিরে ফিরে এসেছে।
২.
যদিও এই আলোচনায় শরৎচন্দ্রের নারীচরিত্র নিয়ে কিছু কথা বলাই আমার প্রাথমিক আগ্রহ ছিল, তবু তাঁর মুসলিম পাঠকদের মধ্যকার কিছু বিতর্ক ও সংশয়ের কথাও বলতে চাই। এসব আলোচনা হয়তো সাহিত্যের মূল বিচারে জরুরি নয়, এমনকি আমার নিজের কাছেও নয়; কিন্তু সাহিত্য যেহেতু একটি সামাজিক উৎপাদন, সমাজ ও মানুষের প্রশ্ন পুরোপুরি তার সীমানার বাইরে থাকে না।
এটি সত্য যে, বাংলা উপন্যাসের মুসলিম পাঠকদের একাংশ আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের বিকাশকাল থেকেই একধরনের অভিমান বহন করেছেন। বিশেষ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বাংলা কথাসাহিত্যের প্রধান নির্মাতার কাছে তাঁরা বিষয়গত বঞ্চনা ঘটেছে বলে মনে করেছেন। মুসলিম চরিত্র এবং ভারতের পূর্ববর্তী মুসলিম শাসকদের উপস্থাপনায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক রয়েছে। সাহিত্যবিচারে এসব অভিযোগের অনেকটাই পরিপ্রেক্ষিতনির্ভর; তবু একটি সংঘাতময় জাতিসত্তার ইতিহাসে এ ধরনের পাঠ-প্রতিক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্যও করা যায় না।
এসব বিবেচনা করতে গিয়ে সাহিত্যকে যদি কেবল নীতিপ্রচারের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে শিল্পের নিজস্ব স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবু এটুকু বলা যায়, শরৎচন্দ্রের পূর্বে সামাজিকভাবে অবহেলিত মানুষের প্রতি এমন নিবিড় মানবিক দৃষ্টি বাংলা কথাসাহিত্যে খুব বেশি দেখা যায়নি। তিনি জাতপাত, ধর্ম ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের বাইরে মানুষকে দেখার চেষ্টা করেছেন। তারপরও মুসলিম পাঠকের কিছু ঐতিহাসিক অস্বস্তি রয়ে গেছে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত আত্মজৈবনিক উপন্যাস শ্রীকান্ত-এর সূচনাতেই ‘ইস্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ’-এর বর্ণনা আছে। মারামারির সেই ঘটনার মধ্যেই ইন্দ্রনাথের সঙ্গে শ্রীকান্তের পরিচয়। পরবর্তী সময়ে অনেক মুসলিম পাঠকের প্রশ্ন হয়েছে: মুসলমান কি বাঙালি নয়?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কেবল ওই শব্দবিভাজন দিয়ে শরৎচন্দ্রের সামগ্রিক অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব নয়। ঘটনাটির পটভূমি ভাগলপুর; এ কারণে গবেষকদের কেউ কেউ ‘বাঙালি’ বলতে সেখানে বাংলা ভাষাভাষী এবং ‘মুসলমান’ বলতে প্রধানত স্থানীয় উর্দু বা হিন্দিভাষী মুসলমান ছাত্রদের বোঝানো হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এটিকে শরৎচন্দ্রের নিজের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা হিসেবে না দেখে একটি ঐতিহাসিক পাঠ হিসেবেই গ্রহণ করা নিরাপদ।
তৎকালে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের মধ্যেও বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন ছিল। উচ্চ ও মধ্যবর্গের মুসলমানের একটি অংশ বাংলা ভাষার পাশাপাশি উর্দু-ফারসি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও নিজেদের যুক্ত ভাবতেন। কলকাতার ফুটবল সংস্কৃতিতে মোহামেডান স্পোর্টিং ও মোহনবাগানের আলাদা সামাজিক পরিচয়ও পরবর্তী সময়ে সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে ভাষাগত পরিচয়ের বিপরীতে ধর্মগত পরিচয়ের উপস্থিতি তখন একটি বাস্তব সাংস্কৃতিক সংকট ছিল।
কিন্তু শ্রীকান্ত পুরোপুরি পড়লে শরৎচন্দ্রকে সহজে ধর্মীয় পক্ষপাতিত্বের লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। তাঁর গল্প-উপন্যাসে বিধৃত জীবনচিত্র তাঁর অভিজ্ঞতা ও শিল্পসত্তার সমান্তরালে প্রবাহিত। শুভ ও মানবিক চেতনার উদ্বোধন তাঁর শিল্পসাধনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জীবনসায়াহ্নে তাঁর কিছু রাজনৈতিক বক্তৃতা ও অভিভাষণ নিয়ে সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠতে পারে, কিন্তু সেগুলোর বিচারও তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে করা উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি হিন্দু ও মুসলমান-উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচনা করেছেন।
শ্রীকান্ত তথা শরৎচন্দ্রের জীবনের নায়ক ইন্দ্রনাথ। তার সঙ্গে পরিচয় না ঘটলে হয়তো শ্রীকান্তের জীবনবৃত্তান্তই অন্য পথে অগ্রসর হতো। শরৎচন্দ্র পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লিখে যাননি; তাই শ্রীকান্তকে তাঁর সাহিত্যিক আত্মজীবনের একটি প্রধান উৎস হিসেবে পড়া অযৌক্তিক নয়। বিশ্বসাহিত্যে এ ধরনের আত্মজৈবনিক উপন্যাসের অভাব নেই। ম্যাক্সিম গোর্কির আত্মজৈবনিক রচনাত্রয়ীর সঙ্গে শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তের দূরবর্তী তুলনাও করা যায়-দুই লেখকেরই জীবনসংগ্রাম তাঁদের কথাসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
জীবনীকারদের বর্ণনায় ভাগলপুরে শরৎচন্দ্রের কৈশোরের বন্ধু রাজেন্দ্রনাথ মজুমদারের সঙ্গে শ্রীকান্তের ইন্দ্রনাথ চরিত্রের মিল খোঁজা হয়েছে। ইন্দ্রনাথ সাহসী, মানবিক, জাতপাতের তোয়াক্কা করে না; কিন্তু তাকে লেখক অবিমিশ্র নির্দোষ চরিত্রও করেননি। তার মানবিকতার সঙ্গে কুসংস্কার ও অতীন্দ্রিয় বিশ্বাসও মিশে আছে।
দরিদ্র সাপুড়ে শাহজি ও অন্নদাদির সঙ্গে ইন্দ্রনাথের পরিচয়ের মধ্যে ছিল সাপ বশ করার মন্ত্র ও বিষনাশক পাথরের প্রতি তার বিশ্বাস। পরে সেসব প্রতারণা বলে মনে হলে সে ক্ষুব্ধ হয়; কিন্তু অন্নদাদির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। ইন্দ্রের বিশ্বাসী মন প্রথমে মেনে নিতে পারে না যে একজন হিন্দু নারী মুসলমান সাপুড়ে শাহজির সঙ্গে ঘর করতে পারে। পরে জানা যায়, শাহজি নিজেও একসময় হিন্দু ব্রাহ্মণ ছিল। শরৎচন্দ্র এখানে ধর্ম ও সামাজিক পরিচয়ের স্থিরতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান।
অন্নদা স্বামীর সঙ্গে ঘর ছেড়ে যায়; স্বামী ধর্মান্তরিত হলেও স্ত্রী তার সম্পর্ক পরিত্যাগ করে না। এই কাহিনিতে শরৎচন্দ্র ধর্মের চেয়ে মানবসম্পর্কের জটিলতাকেই বড় করে দেখিয়েছেন। ইন্দ্রের মধ্যেও জাতপাতের বালাই ছিল না-‘মড়ার আবার জাত কী!’ শাহজির মৃত্যুর পর ইন্দ্র ও শ্রীকান্ত তাকে কবর দেয়; লোকাচার সেখানে তাদের মানবিক কর্তব্যের বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
৩.
১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্মানসূচক ডি.লিট প্রদান করে। একই ঢাকা-সফরে তিনি মুসলিম সাহিত্য সমাজের আয়োজনে বক্তব্য রাখেন। সেই সময়ের একটি অভিভাষণে তিনি যে মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন তার কেন্দ্রীয় কথা ছিল-সাহিত্যের দরবারে লেখকের ধর্ম নয়, তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ই মুখ্য। তিনি আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন যে তাঁকে হিন্দু, মুসলমান, বহুদেবতাবাদী বা একেশ্বরবাদী হিসেবে বিচার না করে বাঙালি সাহিত্যিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন-সকল ক্ষেত্রেই যদি গুণী ও মহৎ মানুষকে তাঁর ধর্ম বা জাতপরিচয় নির্বিশেষে যোগ্য আসন দেওয়া যেত, তবে সমাজের কত বিভেদই না দূর হতে পারত।
এই সময় কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক আলাপও গুরুত্বপূর্ণ। ‘অবাঞ্ছিত ব্যবধান’ প্রসঙ্গে মুসলিম সমাজ ও বাংলা সাহিত্যের সম্পর্ক নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেখানে শরৎচন্দ্রের মূল বক্তব্য ছিল-হিন্দু ও মুসলমান লেখকদের মধ্যে কৃত্রিম ব্যবধান মাতৃভাষা ও সাহিত্যের ক্ষতি করে। তাঁর মতে, সাহিত্যের সৌন্দর্য ও মাধুর্যের প্রয়োজনেই পরিবর্তন আসবে; হিন্দুয়ানি বা মুসলমানির কল্যাণের জন্য নয়, ভাষা ও সাহিত্যের কল্যাণের জন্য।
ঢাকায় শরৎচন্দ্রকে মুসলিম সমাজ নিয়ে উপন্যাস লেখার অনুরোধ করা হয়েছিল বলেও বিভিন্ন স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়। সেই অনুরোধের উত্তরে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন-এমন বর্ণনাও প্রচলিত। কিন্তু মহেশ ছাড়া মুসলিম সমাজকে কেন্দ্র করে তাঁর পূর্ণাঙ্গ গল্প বা উপন্যাসের সংখ্যা খুবই সীমিত। মহেশে গফুর ও আমিনার জীবনের মধ্য দিয়ে মূলত দরিদ্র মুসলমান কৃষকের ওপর জমিদারি ও সামাজিক নিপীড়নের কাহিনি উঠে এসেছে।
মহেশ একসময় পাঠ্য হওয়ার পরে ধর্মীয় আপত্তির মুখে পাঠ্যতালিকা থেকে সরানো হয়েছিল-এমন দাবি বিভিন্ন পরবর্তী লেখায় পাওয়া যায়; তবে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি বা শিক্ষাবোর্ডের দলিল শনাক্ত করা প্রয়োজন। অতএব এটিকে আপাতত প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে না বলাই ভালো।
১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.লিট প্রদানকে কেন্দ্র করে কিছু মুসলিম ছাত্রের আপত্তির কথাও বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তবু তাকে পুরো মুসলিম সমাজের অবস্থান হিসেবে দেখা চলে না; কারণ একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকেই শরৎচন্দ্র উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন। সমাজের ভেতরের মতভেদও সামাজিক বিবর্তনেরই অংশ।
তৎকালীন কলকাতায় সাহিত্য, ধর্মীয় অনুভূতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আরও কয়েকটি সংঘাত ঘটছিল। রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার নির্দিষ্ট পঙ্ক্তি নিয়েও মুসলিম সমাজের একাংশ আপত্তি তুলেছিল বলে সমকালীন বিতর্কে পাওয়া যায়। এসব ঘটনার ব্যাপ্তি ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে অবশ্য সতর্ক থাকা প্রয়োজন-কোনো গোষ্ঠীর একাংশের প্রতিক্রিয়াকে গোটা সম্প্রদায়ের অবস্থান বলে ধরা ইতিহাসসম্মত নয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩১ সালের ভোলানাথ সেন হত্যাকাণ্ডটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কলকাতার বইবিক্রেতা ও লেখক ভোলানাথ সেনের প্রাচীন কাহিনী নামে মহানবীর একটি চিত্র প্রকাশ নিয়ে তীব্র ধর্মীয় আপত্তি দেখা দেয়। পরে ভোলানাথ সেন ও তাঁর দুই কর্মচারী হামলায় নিহত হন। আদালতের নথি নিয়ে আধুনিক গবেষণায় ঘটনাটির সঙ্গে বইয়ের ওই চিত্রকে কেন্দ্র করে তৈরি ধর্মীয় ক্ষোভের সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে কারা কাকে উসকেছিল, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা অঞ্চলের ভূমিকা কী ছিল-এসব বিষয়ে স্মৃতিকথা ও পরবর্তী বর্ণনায় ভিন্নতা থাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
এই সামাজিক আবহে একজন ভিন্ন ধর্মের লেখকের পক্ষে অন্য সম্প্রদায়ের অন্তর্গত জীবন নিয়ে সমালোচনামূলক সাহিত্য রচনা কতটা জটিল ছিল, তা অনুমান করা যায়। প্রশংসার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাসে ত্রুটি, দুর্বলতা ও অন্ধকারও আসে। পাঠক যদি প্রশংসা গ্রহণ করেন কিন্তু সমালোচনা গ্রহণ না করেন, তাহলে সাহিত্যিকের কাজ কঠিন হয়ে পড়ে।
শরৎচন্দ্র নারীর মূল্য গ্রন্থে ইসলামের নবীর জীবনে নারীর মর্যাদা ও সম্পত্তির অধিকারের কিছু ইতিবাচক দিকের উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু কোনো ধর্মীয় সমাজই কেবল প্রশংসার দ্বারা সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণ করতে পারে না। ধর্ম ও সাহিত্যের পরিধি পুরোপুরি একই বৃত্তে মেলে না। সাহিত্যে ধর্ম মূলত সাংস্কৃতিক ও মানবিক উপাদান হিসেবে আসে-তার সঙ্গে চরিত্র, রাজনীতি, মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে।
৪.
বলা হয়ে থাকে, মুসলিম পাঠকদের অনুরোধ কিংবা মুসলিম সমাজকে আরও প্রত্যক্ষভাবে সাহিত্যে আনার ভাবনা থেকেই শরৎচন্দ্র শ্রীকান্তের চতুর্থ পর্বে গহর চরিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন। এ দাবির নিশ্চিত প্রাথমিক দলিল আমার হাতে নেই; তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের পরিবর্তে প্রচলিত ধারণা হিসেবেই দেখা ভালো।
গহর শ্রীকান্তের বাল্যবন্ধু। একসময় একই ক্লাসে পড়েছিল। বহুদিন পর স্টেশনে হঠাৎ তাদের দেখা। গহর কবি, ভাবুক এবং বৈষ্ণব সাধনার প্রতিও আকৃষ্ট। আশ্রমের কমললতার সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মুসলমান হয়েও সে বৈষ্ণব ভাবজগতের কাছে যেতে দ্বিধা করে না। অন্যদিকে নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করে না। তার জীবন যেন দুই সাংস্কৃতিক ধারার মাঝখানে একটি সেতু।
এই মিশ্র জীবনধারা হিন্দু-মুসলমান উভয় গোঁড়ামির সঙ্গেই সংঘাত সৃষ্টি করে। শরৎচন্দ্র গহরের মধ্যে এমন এক মানুষকে নির্মাণ করেন যার মানবিক সম্পর্ক ধর্মীয় সীমানার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। বিপ্রদাসে শরৎচন্দ্র পরে হিন্দু আধ্যাত্মিকতা ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দিকে অপেক্ষাকৃত বেশি মনোযোগ দিয়েছেন-সাহিত্যসমালোচনায় এমন পর্যবেক্ষণ আছে; কিন্তু বিপ্রদাস যে গহর-চরিত্র নিয়ে প্রতিক্রিয়ার ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে লেখা হয়েছিল-এই কার্যকারণ সম্পর্কের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আমি পাইনি। তাই সে দাবি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত।
মুসলিম পাঠক যেভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান না কেন, অন্য ধর্মের লেখকের কাছে নিজের ধর্মের অবিমিশ্র প্রশংসা প্রত্যাশা করা সাহিত্যবিচারের জন্য সুবিধাজনক নয়। নিজ সমাজের সমালোচনা নিজের সম্প্রদায়ের লেখকের মুখে শোনা আর অন্য সম্প্রদায়ের লেখকের মুখে শোনা সামাজিকভাবে এক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না-এ মানবসমাজের পরিচিত মনস্তত্ত্ব। কাজী নজরুল ইসলাম, মীর মশাররফ হোসেন, কাজী ইমদাদুল হক কিংবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ জীবন নিয়ে যে স্বাধীনতায় লিখেছেন, একই বিষয় অন্য ধর্মের লেখক লিখলে পাঠকের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারত।
গহর চরিত্র নির্মাণে শরৎচন্দ্র এমন এক মিলিত সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের দিকে গিয়েছিলেন, যার দীর্ঘ ঐতিহ্য ভারতীয় সাহিত্যে আছে। কবীর, মালিক মুহম্মদ জাইসি, বুল্লেহ শাহ, লালন-তাঁদের রচনায় ধর্মীয় সীমানা অতিক্রমের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। শরৎচন্দ্রের জীবদ্দশায় নজরুলও সারা জীবন এই মিলনের সাধনা করেছেন।
শরৎচন্দ্রের চেয়ে নজরুল বয়সে ছোট হলেও তাঁদের রাজনৈতিক ও মানবিক চেতনায় কিছু মিল খোঁজা যায়। উভয়ের সঙ্গেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সম্পর্ক ছিল। চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর নজরুল রচনা করেন চিত্তনামা; গ্রন্থটি ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয় এবং এখন শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে ১৯২৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত শরৎচন্দ্রের পথের দাবী এ বছর শতবর্ষে উপনীত হয়েছে।
আমার মনে হয়, শরৎচন্দ্রের কিছু কবি-চরিত্র নির্মাণের সময় নজরুলের মতো সমকালীন বিদ্রোহী কবির ছায়া তাঁর মনে এসে থাকতে পারে। পথের দাবীর কবি শশী কিংবা শ্রীকান্তের গহরের সঙ্গে নজরুল-চরিত্রের কিছু দূরবর্তী মিল আমার চোখে পড়ে। এটিকে প্রমাণিত জীবনীমূলক সম্পর্ক না বলে পাঠকের একটি তুলনামূলক অনুমান হিসেবেই দেখা উচিত।
১৯২১ সালের ডিসেম্বরে চিত্তরঞ্জন দাশ কারাবন্দী হওয়ার পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে নজরুলের কাছে বাঙ্গলার কথা পত্রিকার জন্য লেখা চাওয়া হয়। সেই প্রেক্ষাপটে নজরুল ‘ভাঙার গান’-পরবর্তী কালের ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’-রচনা করেন। এটি ২০ জানুয়ারি ১৯২২-এর বাঙ্গলার কথায় প্রকাশিত হয়। বাসন্তী দেবীর সঙ্গে নজরুলের গভীর স্নেহের সম্পর্ক ছিল; তিনি তাঁকে মাতৃসম্মান দিতেন এবং চিত্তনামাও তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন।
চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রভাবে শরৎচন্দ্র কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। দেশবন্ধু সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রকে গভীর সম্মান করতেন। তাঁর লেখার পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক পাঠানোর বিখ্যাত ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যিক স্মৃতির অংশ হয়ে আছে-যেখানে শরৎচন্দ্র নিজেই শেষ পর্যন্ত একশ টাকা লিখেছিলেন বলে বর্ণিত হয়।
চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পরের বছর, ১৯২৬ সালে, পথের দাবী গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এর আগে এটি বঙ্গবাণী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বই আকারে বের হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার একে বিপজ্জনক ও রাষ্ট্রবিরোধী বলে বিবেচনা করে এবং ৪ জানুয়ারি ১৯২৭ সরকারি গেজেটের মাধ্যমে বইটির কপি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে।
এই ঘটনার পর শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের মতামত চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বইটির রাজনৈতিক উত্তেজক চরিত্র সম্পর্কে নিজের আপত্তি জানিয়ে বলেন, শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লেখার পর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার জন্যও লেখককে প্রস্তুত থাকতে হয়। রবীন্দ্রনাথের সেই চিঠি শরৎচন্দ্রকে আহত করেছিল। তিনি উত্তরে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যদিও সেটি পাঠাননি। সেখানে তাঁর বক্তব্যের সারকথা-সরকার তাঁকে ক্ষমা করবে কি না, সেটি তাঁর প্রধান বিবেচনা নয়; তিনি যা উচিত ও সত্য মনে করেন, তা বলতে পেরেছেন কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
পথের দাবীর সব্যসাচীর বাস্তব মডেল কে-এ নিয়েও দীর্ঘদিন নানা অনুমান আছে। কেউ রাসবিহারী বসু, কেউ সুভাষচন্দ্র বসু, কেউ অন্য বিপ্লবীর ছায়া দেখেছেন। একক কোনো ব্যক্তিকেই নিশ্চিতভাবে সব্যসাচীর মডেল বলা কঠিন; বরং স্বাধীনতাকামী একাধিক বিপ্লবী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে মিলিত হয়েছে বলেই মনে হয়।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের মহত্তম প্রতিভাদের একজন। কিন্তু পথের দাবী প্রসঙ্গে তাঁর চিঠিটি ঔপনিবেশিক শাসন, লেখকের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ সম্পর্কে তাঁর অবস্থানের একটি জটিল ও বিতর্কযোগ্য দিক উন্মোচন করে। তাঁকে সামগ্রিকভাবে বিচার না করে এই নির্দিষ্ট ঘটনার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতেই চিঠিটি পড়া অধিক যুক্তিসংগত।
৫.
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের দেড়শত বছর পূর্ণ হলো। একজন কথাসাহিত্যিক তাঁর জীবদ্দশাতেই নিজের ভাষাভাষী পাঠকের সীমানা অতিক্রম করে সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁর কাহিনি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষা, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিতে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে বহু চরিত্র মূল উপন্যাসের সীমা ছাড়িয়ে প্রায় লোককাহিনির মর্যাদা পেয়েছে।
এখানে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলে শেষ করি। ২০০২ সালে শরৎচন্দ্রের দেবদাস অবলম্বনে নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার পর বিশুদ্ধ সাহিত্য মহলে মূল কাহিনি বিকৃতির অভিযোগে বেশ হৈচৈ হচ্ছিল। সে সময় আমার প্রবীণ সহকর্মী, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নির্মল সেন, এ ব্যাপারে আমার মতামত জানতে চেয়েছিলেন-একজন চলচ্চিত্রকার মূল সাহিত্যকর্ম থেকে কত দূর যেতে পারেন?
আমি চলচ্চিত্রের স্বাধীনতার পক্ষেই বলেছিলাম। আমার কাছে আসল বিস্ময় ছিল অন্য জায়গায়। লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ কিংবা রোমিও-জুলিয়েটের মতো দেবদাসও ধীরে ধীরে মূল বইয়ের সীমানা অতিক্রম করেছে। বাংলা ভাষায় জন্ম নেওয়া এক ব্যর্থ প্রেমিক ভারতীয় উপমহাদেশের বহু ভাষা ও সংস্কৃতিতে নিজের দুঃখ ছড়িয়ে দিতে পেরেছে।
এটিই শরৎচন্দ্রের গল্প নির্মাণের আসল ক্ষমতা। একটি চরিত্রকে তিনি এমনভাবে নির্মাণ করতে পেরেছিলেন যে চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত লেখকেরও একার থাকেনি-পাঠক, দর্শক ও পরবর্তী শিল্পীদের সম্পদ হয়ে উঠেছে। বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এমন সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক বিস্তার খুব কম লেখকের ভাগ্যেই ঘটেছে।