Published : 11 Jan 2026, 03:23 PM
উপহার বহনের অনুষঙ্গ হিসেবে বর-কনের বাড়ি ডালা-কুলা পাঠানোর রীতি বহু পুরনো। ষাট বা সত্তুর দশকের দিকে ডালা মানেই ছিল বড় ট্রাঙ্ক ভর্তি করে কনের শাড়ি, চুলের ফিতা, আলতা ও গয়না নিয়ে আসা।
এই রীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে নব্বইয়ের দশকে। তখন মোটা কাগজে বানানো গোল ও চারকোনা ডালায় নতুন বর ও কনের বিয়ে আর গায়ে হলুদের সাজসজ্জার নানান অনুষঙ্গ পাঠানো হত।
সেই ডালার চারপাশে থাকতো সোনালি বা রুপালি জরি আর ডালা মোড়ানো হতো রঙিন পাতলা পলিথিন সাদৃশ্য কাগজে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের ডালা সাজানোর ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। আগে যেখানে নির্দিষ্ট নিয়ম আর চেনা সাজই ছিল মূল আকর্ষণ, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে রংয়ের বৈচিত্র্য, উপকরণের নতুনত্ব এবং ব্যক্তিগত গল্প তুলে ধরার প্রবণতা।
যদিও এখনও ট্রাঙ্ক, ডালা-কুলা সবই পাঠানো হয়। তবে ‘ট্রেন্ড’ বা ধারা হিসেবে চলছে রিকশা পেইন্ট বা আলপনা করা ট্রাঙ্ক, থিম নির্ভর ডালা সাজানো, অল্প বা হালকা সাজ বা ফুল, পাখি আকারের ডালা সাজানো।

ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতা
‘ব্রাইডাল ক্রিয়েশন’য়েল পরিচালক ও উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা বলেন, “এখনকার ডালা সাজানোর সবচেয়ে বড় ট্রেন্ড হল ঐতিহ্য ধরে রেখে আধুনিক উপস্থাপনা। আগে লাল কাপড়, সোনালি জরি আর চেনা ফুলের সাজই বেশি দেখা যেত। এখন সেই লাল-সোনালির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্যাস্টেল রং, অফ-হোয়াইট, সবুজ বা হালকা গোলাপি, পিচের মতো রং।”
এতে ডালার সাজ হয় নরম, মার্জিত ও ছবি তোলার জন্যও আকর্ষণীয়।
প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার বাড়ছে
ফুলের দোকান ও বিয়ের সাজসজ্জার অনুষঙ্গ নিয়ে কাজ করা মোমিন হোসেনের মতে, “কয়েক বছর ধরে কৃত্রিম সাজের চেয়ে প্রাকৃতিক উপকরণের দিকেই ঝোঁক বেশি। তাজা ফুল, শুকনা ফুল, পাট, বাঁশ, কাঠ বা মাটির তৈরি উপকরণ দিয়ে ডালা সাজাতে পছন্দ করেন অনেকেই।”
এই ধরনের সাজে পরিবেশবান্ধব ভাবনার পাশাপাশি ডালায় আসে গ্রামবাংলার আবহ; যা শহুরে বিয়েতেও আলাদা মাত্রা যোগ করে।

মিনিমাল সাজের জনপ্রিয়তা
একসময় ডালা সাজানো হতো ভারী সাজে, অতিরিক্ত অলংকার আর ডালা ভরাট করা হত নানা উপকরণে। তবে এখন সেই ধারণা বদলে গেছে।
আবিদা সুলতানা বলেন, “অনেকেই এখন হালকা ও পরিপাটি ডালা পছন্দ করছেন। কম রং, নির্দিষ্ট থিম আর পরিষ্কার উপস্থাপনাই এখানে ডালা সাজের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এতে ডালার প্রতিটি উপহার আলাদা করে চোখে পড়ে এবং রুচিশীলও দেখায়।”
বিষয়-ভিত্তিক ডালা সাজানো
বর্তমান ধারায় বিষয়-ভিত্তিক ডালা সাজানো বেশ জনপ্রিয়। বিয়ের রং, কনের পোশাকের নকশা বা বিয়ের আয়োজনের সামগ্রিক ভাবনার সঙ্গে মিল রেখে ডালা সাজাতে পছন্দ করেন অনেকেই।
কেউ কেউ আবার ঋতুভিত্তিক থিমও বেছে নিচ্ছেন। যেমন- শীতে উষ্ণ রং ও শুকনো ফুল, বর্ষায় সবুজ ও সাদা ফুলের ব্যবহার আর বসন্তে হলুদ আর সবুজের সমারোহ।
বিয়ের সাজসজ্জার অনুষঙ্গ নিয়ে কাজ করা মোমিন হোসেন বলেন, “থিমভিত্তিক সাজ তুলনামূলক নতুন ধারাই বলা যায়।”
ব্যক্তিগত পছন্দের ছোঁয়া
এখনকার ডালা সাজানোর আরেকটি বড় পরিবর্তন হল- ব্যক্তিগত গল্প বা অনুভূতি তুলে ধরা।
কনের পছন্দের রং, প্রিয় ফুল বা ছোট কোনো স্মারক ডালার সাজে যুক্ত করা হয়। এতে ডালা শুধু আনুষ্ঠানিক উপহার না থেকে একটি আবেগঘন বার্তায় পরিণত হয়। যা বর-কনের জন্য স্মৃতি হয়ে থাকে।

ফুলের নকশায় নতুন ভাবনা
ফুলের ব্যবহারেও এসেছে নতুনত্ব। গোল করে সাজানো ফুলের বদলে এখন দেখা যাচ্ছে স্তরভিত্তিক বা অসমমিত নকশা।
দেশি ফুলের পাশাপাশি মৌসুমি ফুল ব্যবহার করে ডালাকে হালকা ও প্রাণবন্ত রাখা হয়। এতে ডালা দেখতে যেমন সুন্দর হয়, তেমনি দীর্ঘ সময় তাজাও থাকে।
আলো ও কাপড়ের ব্যবহার
কিছু ডালার সাজে হালকা কাপড়ের ভাঁজ, নরম নেট বা সুতি কাপড়ের ব্যবহারও দেখা যায়। কখনও কখনও খুব সূক্ষ্ম আলো ব্যবহার করে ডালাকে আরও আকর্ষণীয় করা হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার আয়োজনে।
“এসব ছোট উপাদান ডালার সাজকে আলাদা করে তোলে, তবে অতিরিক্ত হলে সৌন্দর্য নষ্ট হতে পার “- মন্তব্য করেন, আবিদা সুলতানা।

ফুল-পাখি ও বর-কনে থিম পান-সুপারি, টাকার ডালা
হলুদের বিভিন্ন ডালার মধ্যে কিছুটা ভিন্ন ধারায় সাজানো হয় পান-সুপারি ডালা। আগে যদিও কুলা বা পানদানিতে করে পান-সুপারি দেওয়া হত, তবে এখন নানান বিষয় যোগ হয়।
বর-কনে আবহে পান-সুপারি ডালা সাজানো আনে ভিন্নতা। আবার ময়ূর আকৃতিতে পানের খিলি করে বা পাতা খুলেও সাজানো হয়। এছাড়া ফুলের তোড়ার আকারে টাকা দিয়েও উপঢৌকন সাজানো হয়।
আরও পড়ুন
বিয়ের আগে উৎকণ্ঠা যেভাবে সামলানো যায়