Published : 10 May 2026, 12:36 PM
গর্ভাবস্থায় শিশুর সুস্থ বিকাশ এবং মায়ের সুরক্ষার জন্য পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর আগমনে মায়ের সুষম পুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হয়।
কারণ মায়ের শরীরে পুষ্টির অবস্থার ওপরে আগত শিশুর স্বাস্থ্য অনেকটাই নির্ভর করে ।
গর্ভস্থ শিশু ও মা- উভয়ের জন্যই নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনতে পারে গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি। এর ফলে গর্ভাবস্থায় ও প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং এমনকি দীর্ঘমেয়াদী গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যাও হতে পারে।
অপুষ্টির কারণে একটি শিশুর যে কয়েকটি সমস্যা হতে পারে, যেমন-
গর্ভাবস্থা এতটাই স্বাভাবিক যে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে গর্ভবতী নারীরা ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ তাদের শরীরে এ সময় নানান হরমোনগত ও শারীরিক পরিবর্তন ঘটে।
যখন একজন গর্ভবতী নারী পর্যাপ্ত পুষ্টি পান না, তখন তিনি বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিতে থাকেন, এর মধ্যে রয়েছে:
অ্যানিমিয়া: মায়ের আয়রন বা লৌহের অভাবজনিত কারণে শিশুর কম ওজন অথবা অপরিণত জন্মের ঝুঁকি থাকে। একইভাবে, আয়রনের অভাব বা রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত মহিলাদের প্রসবোত্তর বিষণ্ণতায় ভোগার ঝুঁকিও বাড়ে।
উচ্চ রক্তচাপ: এর কারণে অনেক সমস্যা হতে পারে। অন্যতম হল- ‘প্লাসেন্টায়’ বা গর্ভফুলে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া, যা ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ধীর করে দেয় এবং ভ্রূণ প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না।
অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে মায়ের ভবিষ্যতে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং গর্ভাবস্থায় ওজন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস: এর ফলে শিশুর অকাল জন্ম অথবা উচ্চ জন্ম-ওজনের ঝুঁকি থাকে, যা মায়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
এছাড়াও, শিশু এবং মায়ের পরে টাইপ টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
প্রি-এক্লাম্পসিয়া: প্রি-এক্লাম্পসিয়ায় আক্রান্ত মহিলাদের কিডনি বা বৃক্ক, লিভার বা যকৃত, মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গ ও রক্ত ব্যবস্থার ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রি-এক্লাম্পসিয়া প্লাসেন্টাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি: গর্ভবতী মহিলাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় পরিবর্তন আসে, যার ফলে তাদের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যোনিপ্রদাহ, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং প্রসব পরবর্তী সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
সুষম পুষ্টি এবং পর্যাপ্ত তরল পান গর্ভাবস্থায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখতে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
প্রসবকালীন অসুবিধা
এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক পুষ্টি, যত্ন এবং খাদ্য পরিকল্পনার মাধ্যমে এই স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা, এমনকি এড়ানোও সম্ভব। এজন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস গড়ে তোলার প্রসবপূর্ব পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
গর্ভাবস্থায় পুষ্টির মান উন্নত করার জন্য পাঁচটি সাশ্রয়ী পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়া: প্রয়োজনীয় সমস্ত পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের ফল, শাকসবজি, শস্যদানা, চর্বিহীন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি খাওয়ার ব্যাপারে নজর দিতে হবে। খাবারগুলো যত বেশি রঙিন হবে, তত ভালো।
বেগুনি, কমলা, সবুজ ইত্যাদি রংয়ে ভরা প্লেট খাবারে আরও বেশি ভারসাম্য আনে।
পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া: এমন খাবার বেছে নিতে হবে যেগুলোতে পুষ্টিগুণ বেশি তবে ক্যালোরি কম। যেমন- পাতাযুক্ত শাকসবজি, কম ক্যালরিযুক্ত সবজি এবং চর্বিহীন প্রোটিন।
ভ্রূণের সুস্থ বিকাশের জন্য ফোলেইট, আয়রন এবং ক্যালসিয়াম গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করা: প্রক্রিয়াজাত খাবারে সাধারণত চিনি, সোডিয়াম এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে। এর পরিবর্তে বাদাম, বীজ ও ফল বেছে নিন।
প্রসবপূর্ব ভিটামিন গ্রহণ করা: চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে গর্ভাবস্থার পরিকল্পনা করার আগে এবং পরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও ভিটামিন গ্রহণ করা উপকারী। যেমন: ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি।
শরীরকে আর্দ্র রাখা: গর্ভাবস্থায় প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল পান করা উচিত। পানি রক্ত এবং ‘অ্যামনিওটিক ফ্লুইডে’র পরিমাণ বজায় রাখতে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও মূত্রনালীর সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে।
প্রতিদিন অন্তত আট গ্লাস পানি পান করার চেষ্টা করতে হবে।
গর্ভাবস্থায় পুষ্টির অবস্থা উন্নত করার জন্য একজন পুষ্টিবিদের সাথে পরামর্শ করুন। সুস্থ সন্তান পেতে এমন খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে যার মাধ্যমে মা নিজে ও শিশুকে একটি সুস্থ জীবন উপহার দিতে পারেন।
![]() |
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেল্থ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর। |
আরও পড়ুন