১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এয়ার ফ্রায়ার কিনতে ও ব্যবহারে যেসব বিষয় খেয়াল রাখা দরকার

সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি না জানলে এয়ার ফ্রায়ারের রান্নাও ক্ষতিকর হতে পারে।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Jul 2026, 05:55 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:44 PM

আধুনিক ব্যস্ত জীবনে ঝটপট এবং কম তেলে রান্না করার জন্য ‘এয়ার ফ্রায়ার’ ব্যবহারের চল বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তেল ছাড়া, শুধু গরম বাতাসের ঘূর্ণন ব্যবহার করে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই কিংবা যেকোনো ভাজাপোড়া খাবার মচমচে করে তৈরি করার এই প্রযুক্তিকে অনেকেই স্বাস্থ্যকর রান্নার একমাত্র চাবিকাঠি মনে করছেন।

তবে পুষ্টিবিজ্ঞানী ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এয়ার ফ্রায়ার যেমন মেদ কমাতে দারুণ সাহায্য করে, তেমনি এর ভুল ব্যবহারে শরীরে দানা বাঁধতে পারে মারাত্মক সব স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

এয়ার ফ্রায়ার ব্যবহারের সুফল

যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের পুষ্টিবিদেরা জুলিয়া জুমপানে, প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ডুবো তেলে ভাজার তুলনায় এয়ার ফ্রায়ার ব্যবহার করা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

ক্যালরি ও চর্বি হ্রাস: ডুবো তেলের রান্নার তুলনায় এয়ার ফ্রায়ারে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কম ক্যালরি এবং চর্বি থাকে। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রক্তে কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।

অ্যাক্রাইলামাইড যৌগের ঝুঁকি কমানো: চিকিৎসা সাময়িকী ‘ফুড কেমিস্ট্রি’-তে প্রকাশিত, চীনের তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর স্কুল অব মেডিসিনের অন্তর্ভুক্ত তিয়ানজিন কি ল্যাবরেটরি অব ফুড সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, আলু বা শর্করার ধরনের খাবার উচ্চ তাপে ডুবো তেলে ভাজলে ‘অ্যাক্রাইলামাইড’ নামক এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

গবেষক রুই লিউ করা গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, এয়ার ফ্রায়ারে রান্না করলে খাবারে এই ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

এয়ার ফ্রায়ার ব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষতি

উপকারিতা থাকলেও বেশ কিছু চিকিৎসা গবেষণায় এয়ার ফ্রায়ারের কিছু নেতিবাচক দিকও উঠে এসেছে।

অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের জন্ম:  দক্ষিণ কোরিয়ার চুং-আং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত, ‘মিট সায়েন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, মাংস বা চর্বিযুক্ত খাবার অতিরিক্ত উচ্চ তাপে এয়ার ফ্রায়ারে রান্না করার সময় ‘পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন’ এবং ‘হেটেরোস্যাক্লিক অ্যামাইনস’ তৈরি হতে পারে”।

চর্মরোগ ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রাসায়নিকগুলোও শরীরে মরণব্যাধির ঝুঁকি বাড়াতে সক্ষম।

কোলেস্টেরল অক্সিডেশন প্রোডাক্টস: ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব সান্তা মারিয়া’র গবেষক ভি. এস. ডি অলিভেইরা ও তার দল পরিচালিত, ‘ফুড অ্যান্ড কেমিক্যাল টক্সিকোলজি’-তে প্রকাশিত ল্যাবরেটরি গবেষণায় দেখা গেছে, এয়ার ফ্রায়ারে যখন মাছ বা চর্বিযুক্ত উপাদান রান্না করা হয়, তখন কোলেস্টেরল অক্সিডেশন প্রোডাক্টস বা (সিওপি) নামক এক ধরনের ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়।

এই উপাদান রক্তনালীর দেয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে হৃদরোগ ও ধমনী আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

এয়ার ফ্রায়ারের নিরাপদ ব্যবহারের ৫টি নিয়ম

বিভিন্ন স্বাস্থ্য-বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং ভি. এস. ডি অলিভেইরা গবেষণার ফলাফলে, ক্ষতির ঝুঁকি কমিয়ে এয়ার ফ্রায়ারের রান্না নিরাপদ করার কৌশলও জানান।

অতিরিক্ত উচ্চ তাপ এড়িয়ে চলা: আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, খাবারের পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে এবং ক্ষতিকর গ্যাস উৎপাদন রোধ করতে রান্নার তাপমাত্রা সব সময় (৪০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস-এর নিচে রাখা উচিত।

খাবার পুড়িয়ে না ফেলা: যেকোনো ক্রিস্পি বা মচমচে খাবার তৈরির সময়, সেটা যেন কালো বা অতিরিক্ত পোড়া পোড়া না হয়ে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। পোড়া অংশে বিষাক্ত উপাদান বেশি থাকে।

অল্প তেলের স্প্রে ব্যবহার করা: পুরোপুরি তেল ছাড়া ড্রাই বা শুষ্ক রান্না না করে সামান্য অলিভ অয়েল বা সরিষার তেলের স্প্রে ব্যবহার করা ভালো, এটি খাবারের আর্দ্রতা ও পুষ্টি বজায় রাখে।

গাদাগাদি করে খাবার না রাখা: বাস্কেটের ভেতরে অতিরিক্ত খাবার গাদাগাদি করে রাখলে বাতাস চলাচল করতে পারে না, ফলে কিছু অংশ কাঁচা থেকে যায় যা পেটের গোলযোগ ঘটাতে পারে।

প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি বর্জন: এয়ার ফ্রায়ারের বাস্কেটের ভেতরে ভুলেও কোনো প্লাস্টিকের পাত্র, সাধারণ পলিথিন বা প্লাস্টিকের চামচ ব্যবহার করা যাবে না। উচ্চ তাপে প্লাস্টিক গলে খাবারে বিষাক্ত ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ মিশে যেতে পারে।

এয়ার ফ্রায়ার কেনার ক্ষেত্রে যা খেয়াল রাখা উচিত

আমেরিকার পণ্য উৎপাদন ও টেস্টিং ম্যাগাজিন ‘কনজিউমার রিপোর্টস’ এবং ‘গুড হাউসকিপিং’ -এর ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে এয়ার ফ্রায়ার কেনার সময় ৩টি বিষয় যাচাই করে নেওয়া উচিত।

আকার বা ধারণক্ষমতা: গুড হাউসকিপিং ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের মতে, একা বা দুজনের সংসারের জন্য ২ থেকে ৩ লিটারের ফ্রায়ার যথেষ্ট। তবে চার বা তার বেশি সদস্যের মাঝারি ও বড় পরিবারের জন্য ৫ থেকে ৭ লিটারের বাস্কেটযুক্ত এয়ার ফ্রায়ার কেনা উচিত।

নন-স্টিক কোয়ালিটি ও টক্সিন ফ্রি: ফ্রায়ারের বাস্কেটটি যেন অবশ্যই পিএফওএ এবং বিপিএ মুক্ত সার্টিফাইড নন-স্টিক কোটের হয়। সস্তা ও নিম্নমানের কোটিংয়ের ফ্রায়ার উচ্চ তাপে বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়াতে পারে।

ডিজিটাল কন্ট্রোল ও মোড:  ‘কনজিউমার রিপোর্টস’-এর প্রোডাক্ট ট্রায়াল অনুযায়ী, প্রি-সেট মেনু (যেমন: বেইকিং, রোস্টিং, ডিফ্রস্ট) এবং ডিজিটাল টাইমারযুক্ত সংস্করণগুলো রান্না করা অনেক বেশি সহজ ও নিরাপদ করে তোলে।

পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের সহজ উপায়

আমেরিকান ক্লিনিং ইনস্টিটিউট-এর ঘরোয়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, এয়ার ফ্রায়ার দীর্ঘদিন নতুনের মতো সচল রাখতে এর সঠিক যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিবার ব্যবহারের পর ধোয়ার নিয়ম: রান্না শেষ হওয়ার পর বাস্কেটটি ঠান্ডা হতে দিতে হবে। এরপর কুসুম গরম পানি, নরম স্পঞ্জ এবং তরল ডিশ ওয়াশ দিয়ে আলতো করে ধুয়ে নেওয়া ভালো। ভুলেও তারের মাজনি ব্যবহার করা যাবে না, এতে নন-স্টিক কোটিং নষ্ট হয়ে যায়।

হিটিং এলিমেন্ট পরিষ্কার: ফ্রায়ারের ওপরের দিকে থাকা হিটিং কয়েলটিতে চর্বি বা তেল জমলে ওভেনের মতো দুর্গন্ধ হতে পারে। মাসে অন্তত একবার প্লাগ খুলে একটি ভেজা সুতি কাপড় দিয়ে ভেতরের কয়েলটি মুছে পরিষ্কার করা উচিত।

পুরোপুরি শুকানো: ধোয়ার পর বাস্কেটটি ভালো করে শুকিয়ে তবেই মূল মেশিনের ভেতর ঢোকানো উচিত, অন্যথায় ভেতরে আর্দ্রতা জমে যান্ত্রিক ক্ষতি হতে পারে।

আরও পড়ুন

যেসব জিনিস কখনই কাপড় শুকানোর যন্ত্রে দেওয়া যাবে না

টিভি পর্দা ঝকঝকে রাখার সহজ উপায়

মাইক্রোওয়েভে যে কোনো তরল গরম করার ক্ষেত্রে সাবধান

যেভাবে বুঝবেন এসি’র বাতাস গোপনে অসুস্থ করছে